একটা সময় ছিল যখন দুপুরের খাবারের পরপরই আমাকে দৌড় দিতে হত টিউশনিতে। দুপুরে ঘুমানোর উপায় ছিল না। কিন্তু লকডাউনের পর থেকে টিউশঙ্গুলো সব বন্ধ হয়ে গেল । হাতে আমার অফুরন্ত সময়। ক্যাম্পাসেও যেতে হয় না। সারাদিন বাসায় শুয়ে বসে মুভি দেখে কিংবা বই পড়ে কাটানো যায়। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে টিউশন চলে যাওয়ার কারণে আমার হাত খরচে টান পড়তে শুরু করলো। বাসায় আমার টাকা চাইতে কখনই ভাল লাগে নি। বাধ্য হয়ে অন্য কাজ খুজতে শুরু করলাম। পেয়েও গেলাম একটা। ডেলিভারিম্যানের কাজ। তাও আবার রাতের বেলা।
রাতের কাজ করতে হয় বলেই আমাকে এখন দুপুর বেলা ঘুম চলে আসে । আজকেও সেই রকম পরিকল্পনাই ছিল কিন্তু জেনির কারণে সেটা বাস্তবায়ন করা সম্বব হল না।
জেনি ফোন দিয়েছে । তার নাকি জরুরী কথা আছে। আমাকে বলতেই হবে এবং আমাকে তা শুনতেই হবে। এটার সাথে নাকি আমার নিজের নিরাপত্তাও জড়িত।
ঠিক হল দুপুরের খাবার আমরা এক সাথে খাবো। নির্ধারিত সময়ে নির্ধারিত স্থানে পৌছে গেলাম। ডেলিভারি শুরুর পর থেকে অন্তত এই ব্যাপারটা আমার ভেতরে বেশ ভাল ভাবেই পেয়ে বসেছে। যে কোন স্থানে সময় মত গিয়ে পৌছানো। রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখি জেনি আগে থেকেই সেখানে বসে আছে। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার বুঝতে কষ্ট হল না যে সে কিছু একটা নিয়ে চিন্তিত কিংবা বলা যায় কিছুটা ভীত সে। আমরা রাত তিনটা পর্যন্ত ডেলিভারির কাজ করি। তারপর আমাদের ছুটি। আমি সোজা বাসায় গিয়ে ঘুম দেই। জেনির চোখের দিকে তাকিয়ে মনে হল ও একদমই ঘুমাতে পারছে না কদিন ধরে। চোখের নিচে কেমন কালো দাগ হয়ে গেছে। সেই সাথে চোখগুলো যেন একটু বেশি ভেতরে ঢুকে গেছে।
আমাকে দেখতেই জেনি খানিকটা হাসলো । শুকনো হাসি । মেয়েটা আসলেই কিছু নিয়ে চিন্তিত ।
আমি একটু হেসে বললাম, কী খবর? এতো জরূরী তলব ?
জেনি আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আর কাজ করবো না।
আমি খানিকটা অবাক হয়ে বললাম, সে কি কেন?
-না, আমি কাজ করবো না । তোমারও উচিৎ কাজটা না করা !
বুঝতে পারলাম যে জেনির সাথে খারাপ কিছু হয়েছে কিংবা ও এমন কিছু দেখে ফেলেছে সেটা ওর দেখা উচিৎ হয় নি । আমি একটা বড় করে নিঃশ্বাস ফেললাম । মেয়েটাকে প্রথম যেদিন দেখেছিলাম সেদিনই মনে হয়েছিলো এই মেয়েটা কাজটা করতে পারবে না ঠিক মত । আজকে ঠিকই আমার ধারনাটা সত্যিই হল । বললাম, কী হয়েছে বলবে আমাকে ?
-তুমি কি জানো আমরা কাদের খাবার সরবারহ করছি ?
-না ! আমি জানি না । আমি জানতে চাইও না । আমাদের চাকরির প্রথম শর্তই তো এটা ছিল ! কী ডেলিভারি করছি আর কাদের ডেলিভারি করছি সেটা নিয়ে মোটেও কৌতুহল দেখানো যাবে না । আমি তো দেখাই নি । তুমি কেন দেখাচ্ছো ?
-আমি …… আমি …..
জেনি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল। আমি ওর উদ্দিগ্ন চোখের দিকে তাকিয়ে রইলাম কিছুটা সময় । মেয়েটাকে কিছু যেন একটা শান্তি দিচ্ছে না । মেয়েটা কি ডেলিভারি করার সময় কিছু দেখেছে ? এমন কিছু জেনে ফেলেছে যা তার জানার কথা না ।
টিউশনী বন্ধ হয়ে গিয়ে আমি যখন অতৈ সাগরে পড়তে যাচ্ছিলাম তখনই ক্যাম্পাসের বড় ভাই আমাকে এই কাজের সন্ধ্যানটা দিলেন। ডেলিভারি ম্যান শুনে প্রথমে একটু সংকোচ হচ্ছিলো । কিন্তু অর্থের পরিমানটা শুনে আমার চোখ কপালে উঠলো। প্রতিদিন দুই হাজার টাকা!
মানে মাসে আমি ষাট হাজার টাকা আয় করতে পারবো ! কেবল ডেলিভারি করার জন্য এতো টাকা ! কী ডেলিভারি করবে ? অবৈধ কিছু নাতো ? পুলিশি ঝামেলা আছে নাকি ?
আমি বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল, এতো টাকা দিচ্ছে, কী ডেলিভারি করতে হবে ভাই ?
বড় ভাই খানিকটা বিরক্ত কন্ঠে বলল, সেটা তোমার জানতে হবে না । তবে কোন অবৈধ কিছু না ।
আমি বললাম, না মানে এতো টাকা দিচ্ছে যে ?
বড় ভাই বলল, এসব নিয়ে তোমাকে মোটেও ভাবতে হবে না । তোমার কাজ হবে কেবল খাবার পৌছে দেওয়া । একটা রেস্টুরেন্ট থেকে শহরের নানান স্থানে তোমাকে খারাব নিয়ে যেতে হবে ।
বড় ভাই একটু থামলেন । মোবাইল বের করে কি যেন দেখলো সে । তারপর আবারও বলল, কোন ভয় পেও না । কোন অবৈধ জিনিসপত্র না । পুলিশের ঝামেলাতে তোমাকে পড়তে হবে না । আর যদি কোন সময়ে পুলিশের ঝামেলা হয়ও তবে তোমাকে রক্ষা করা হবে । সেই মোতাবেগই কন্ট্রাক্ট সাইন করা হবে।
এবার আমি আবারও চমকালাম । সামান্য ডেলিভারি ম্যানের কাজের জন্যও কন্ট্রাক্ট !
বড় ভাই বলল, চল আমার সাথে গেলেই দেখতে পারে । আজ রাত পোনে বারোটার দিকে আমি তোমাকে নিয়ে যাবো ! ঠিক আছে ?
আমি আর কিছু জানতে চাইলাম না । এই দুঃসময়ে দিনে দুই হাজার টাকা পাওয়া মুখের কথা না । এমন কি অবৈধ জিনিস হলেও আমি সম্ভবত কাজ করতে দ্বিধা বোধ করতাম না ।
বড়ভাই বাইক নিয়ে আমার বাড়ির সামনে এসে হাজির হলেন সময় মত। আমি তার পেছনে চেপে বসলাম। আমি থাকি মোহাম্মাপুরে । রেস্টুরেন্টটা ধানমন্ডিতে । পৌছাতে খুব বেশি সময় লাগলো না ।
অদ্ভুত একটা রেস্টুরেন্ট । কোন নাম নেই । ধানমন্ডির সব থেকে অভিজাত স্থানে রেস্টুরেন্টটা অবস্থিত । দুইতলা বিল্ডিং । নিচ তলাকে গ্যারেজ । খুব বেশি হলে চার থেকে থেকে পাঁচটা গাড়ি ধরবে। উপর তলাতে মূল রেস্টুরেন্ট। পাশ দিয়ে লেক চলে গেছে। বাইরে থেকে দেখতে বেশ চমৎকার আর একটা অভিজাত অভিজাত ভাব রয়েছে । সারা দিন সেটা বন্ধ থাকে । চাকরি শুরুর পর থেকে আমি দিনের বেলাতে বেশ কয়েবার গিয়েছি । সাটার টেনে বন্ধ করে দেওয়া থাকে সকল কাঁচের গ্লাস গুলো। রেস্টুরেন্ট চালু হয় রাত বারোটার পর থেকে ।
আমি ভীত আর খানিকটা সংকুচিত ভাবে সিড়ি দিয়ে উপরে উঠলাম । ভেতরে ঢুকতেই কেমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল মনে । কেন যে এই রকম অনুভূতি হল সেটা আমার কাছে পরিস্কার নয় । তবে বড় ভাই সাথে না থাকলে আমি যে কোন সময় দৌড় দিতাম, সেটা খানিকটা নিশ্চিত । এই ভয়ের অনুভূতিটা হওয়ার কি কারণ সেটা বুঝতে পারলাম না !
রেস্টুরেন্টের ভেতরে মৃদু আলো খেলা করছে । মাঝে মাঝে সেই আলো দিক পরিবর্তন করছে । ভেতরের পুরো অংশটুকুর চেহারা কেমোন বদলে যাচ্ছে । আর চারিদিকে একটা মিষ্টি গন্ধ ছেঁয়ে আছে । আমি অনেক চেষ্টা করেও গন্ধটা চিনতে পারলাম না । বড় ভাই আমাকে একটা টেবিলে নিয়ে বসালো । আমি চারিদিকে তাকাতে শুরু করলাম । বন্ধুদের সাথে ধানমন্ডির অনেক রেস্টুরেন্টেই আমি গিয়েছি । কিন্তু এটা সব থেকে আলাদা । স্পষ্টই এখানে যারা আসে তরা সব অভিজাত আর পয়সাওয়ালা মানুষ । বড় বড় কাঁচে ঘেরা জানলা গুলো সব ভারী পর্দা নিয়ে ঘেরা । আলো বাইরে যাবে না ।
বড় ভাই আমাকে রেখে কোন দিকে গেল আমি টের পেলাম না । চারিদিকে ভাল করে লক্ষ্য করতে শুরু করেছি । দেখলাম আমি ছাড়াও আরও একজন মানুষ রয়েছে রেস্টুরেন্টের ভেতরে । একেবারে কোনার দিকে বসে আছে । আপন মনে কফি খাচ্ছে কিংবা কফির মত কিছু কাচ্ছে কফি কাপে। এতো দুরে বসার কারনে আমি তার চেহারা পরিস্কার দেখতে পাচ্ছি না । তবে কেন জানি মনে হল সে মাঝে মাঝে আমার দিকে চোখ তুলে তাকাচ্ছে ।
বসার কিছু সময় পরেই দেখলাম একজন আমাকে এক কফি দিয়ে গেল । কফি জিনিসটা আমার বেশ লাগে । কাপে চুমুক দিতেই পুরো শরীর টা যেন একটু দুলে উঠলো । এমন চমৎকার কফি আমি আমার পুরো জীবনে খেয়েছি বলে মনে পড়লো না । আমার মনের ভেতর থেকে মুহুর্তের ভেতরেই সব দ্বিধা আর দ্বন্দ্ব গায়েব হয়ে গেল । যে অস্বস্তিটা কাজ করছিলো সেটাও কেটে গেল ।
কফি শেষ করার সাথে সাথে একজন কোর্ট টাই পরা ভদ্রলোক আমার সামনে এসে বসে পড়লেন । মনে হল যে আমার কফি শেষ করার জন্যই তিনি বসে ছিলেন । আমার দিকে তাকিয়ে বলল, অপু তাহলে কাল থেকেই কাজ শুরু করে দাও।
কোন রকম ভনিতা না করেই তিনি কথাটা বললেন। আমি তার দিকে তাকালাম । বয়স খুব বেশি মনে হল না । খুব বেশি হলে ত্রিশ । তবে চেহারাতে কোন উজ্জল্য নেই । কেমন যেন একটা মন খারাপ করে ব্যাপার আছে । বিশেষ করে চোখ দুটো যেন বড় বেশি শান্ত । এক ভাবে তাকিয়ে থাকলে কেমন যেন লাগে।
লোকটা কথা বলার পর একটা কাগজ বের করে দিলেন আমার দিকে । তাকিয়ে দেখলাম একটা কন্ট্রাক্ট পেপার । সেখানে নানা রকম রুলস লেখা। কয়েকটা রুলস আমার দৃষ্টি কাড়লো। একটা কোন ভাবেই কোন কৌতুহল দেখানো যাবে না । কী ডেলিভারি করছি কিংবা কাকে করছি সেসব নিয়ে প্রশ্ন করা যাবে না। আরেকটা হচ্ছে খাবার ডেলিভারিতে দেরি করা যাবে না মোটেও। এক মিনিটও না!
আমি বললাম, ঢাকা শহরে আসলে সময় সময় কোথাও যাওয়াই মুসকিল । আপনি তো জানেন!
-সেটা নিয়েও তোমাকে খুব বেশি ভাবতে হবে না কারণ তোমার ডেলিভারি শুরু হবে রাত বারোটার পরে । রাস্তা ফাঁকা থাকবে ।
এবার আমি সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম। রাত বারোটা ! তার মানে কি আমাকে সারা রাতই কাজ করতে হবে ? আর কে রাত বারোটার পরে অর্ডার দিবে শুনি !
লোকটা আবারও আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল, প্রতিদিন খুব বেশি ডেলিভারি করতে হবে না তোমাকে দুইটা থেকে তিনটা। রাত তিনটার ভেতরেই সব কাজশেষ হয়ে যাবে। প্রতিটা ডেলিভারি প্যাকেটের গায়ে সময় ও ঠিকানা লেখা থাকবে সেগুলো ঠিক ঠিক সেই সময়েই পৌছাতে হবে। একটুও যেন দেরি না হয়। আবারও বলছি কোন ভাবেই দেরি করা যাবে না। বুঝতে পেরেছো কি?
আমি বললাম, জি।
লোকটা আবার বলল, পথে কোন সমস্যা হবে না । যদি সমস্যা হয় তাহলে সেটা তোমাকে আগে থেকে কিংবা ফোনের মাধ্যমেই জানিয়ে দেওয়া হবে !
আমি এই ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারলাম না । আমার যাওয়ার পথে কোন সমস্যা হলে সেটা এরা কিভাবে জানবে ? কে জান !
লোকটা আবারও বলল, আর যে কোন সমস্যাতে আমরা তোমাকে রক্ষা করবো । এটা নিয়ে তোমাকে চিন্তা করতে হবে না।
আমি এই লাইন গুলো কন্ট্রাক্টও দেখলাম । সেখানে বলা হয়েছে যে আমাকে সব রকম নিরাপত্তা দেওয়া হবে । এতো সুযোগ সুবিধা তো ভাল ভাল মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোও দেয় না । আর এরা কি না সামান্য একজন ডেলিভারি ম্যানকে দিচ্ছে ! আমি আর কিছু ভাবলাম না ! আর কিছু ভাবার নেইও। প্রতিদিন হাজার দুই টাকা মানে হচ্ছে এই দুঃসময়ে বেশ কিছু দিন নিশ্চিন্তে কেটে যাওয়া।
আমি ডেলিভারি বয় হয়ে গেলাম । নিজের সাইকেল ছিল । সেটা চেপেই কাজ শুরু করে দিলাম পরদিন থেকেই ।
জেনির কথায় আবার বাস্তবে ফিরে এলাম। জেনি বলল, তুমি কি বুঝতে পারছো আমাদের চাকরিটা ছেড়ে দিতে হবে!
আমি এবার একটু বিরক্ত হলাম । তবে সেটা আমি মুখে প্রকাশ করলাম না । আমি চাকরিটা করছি মোট ৫৫ দিন । একদিনও মিস করি নি । এই ৫৫ দিনে আমার পকেটে এক লাখ দশ হাজার টাকা এসেছে । টাকা দিতে একটা দিনও তারা দেরি করে নি। এমন চমৎকার একটা চাকরি আমি কেন ছেড়ে দিবো শুনি ?
আমি বললাম, কেন শুনি?
জেনি গলার স্বর একটু নামিয়ে বলল, শোন ওরা মানুষ না ! বুঝেছো ? ওরা মোটেও মানুষ না ! তুমি বুঝতে পারছো না !
আমি বললাম, কেন মনে হল যে ওরা মানুষ না ?
-আমি দেখেছি ওদের ! সত্যিই বলছি আমি ওদের দেখেছি !
আমি বললাম, তুমি নিশ্চয়ই কন্ট্রাক্টে সাইন করেছিলে? মনে আছে ? সেখানে কী লেখা ছিল মনে নেই তোমার? তুমি কেন দেখেছো ?
জেনি যেন একটু সময়ের জন্য থেমে গেল । কিছু যেন মনে করার চেষ্টা করলো । তারপর বলল, শোন ওসব কথা বলে লাভ নেই। আমি ওদের আসল চেহারা দেখে ফেলেছি । ওরা মানুষ না । কী ভয়ংকর ওদের চেহারা ! আর খুব বোটকা গন্ধ ওদের শরীরে । এমন কি ওরা রেস্টুরেন্টেও আসে । ওদের গায়ের গন্ধ লুকানোর জন্য এক ধরনের সেন্ট ব্যবহার করে যাতে বাইরের মানুষ ওদের চিনতে না পারে !
আমি কিছু বলতে গিয়েও বললাম না । কারণ আমার ঠিক একই অনুভূতি হয়েছে যখন আমি প্রথম প্রথম খাবার ডেলিভারি করতে গিয়েছিলাম । আমার সেদিনের কথা এখনও পরিস্কার মনে আছে । আমার চাকরির প্রথম দিন ছিল সেদিন । আমি ঠিক সময় মত হাজির হয়ে গেলাম রেস্টুরেন্টে । বারোটার বাজার কিছু সময় আগেই । রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করলাম । সেই অনুভূতিটা মনের ভেতরে জেগে উঠলো । ভেতরে ঠিক সেই গত দিনের মত মৃদু আলো দেখতে পেলাম । আজকে দেখতে পেলাম আগের দিনের মতই দুরে একজন বসে আছে কফির কাপ হাতে নিয়ে । একটা টেবিলের উপরে এক কাপ কফি রাখা । কাউকে বলে দিতে হল না যে কফির কাপটা আমার জন্যই রাখা হয়েছে । আমি কোন বাক্য ব্যয় না করে সেই টেবিল চলে গেলাম । কোন দিকে না তাকিয়ে কাপে চুমুক দিলাম । মাথার ভেতরে একটা তৃপ্তির অনুভূতি বয়ে গেল । সত্যিই এই কফির কোনো তুলনা হয় না । বেশ সময় নিয়েই কফি শেষ করলাম । কফি শেষ করতেই একজন এসে হাজির হল আমার সামনে । হাতে একটা প্যাকেট। আমার হাতে সেটা দিয়ে কফির কাপটা নিয়ে চলে গেল কোন কথা না বলেই ।
প্যাকেটটা বেশ ভারী । একটা বড় ডিকশনারী সাইজের প্যাকেট ! ভেতরে কী আছে কে জানে ! প্যাকেটটার উপরে একটা কাগজ টেপ দিয়ে আটকানো রয়েছে । সেখানে একটা ঠিকানা লেখা । ধানমন্ডির কাছেই । নিচে আমার জন্য কয়েকটা লাইন লেখা ।
প্যাকেটা ডেলিভারি দিয়ে ফেরৎ আসবে । পেমেন্ট আগেই দেখা হয়েছে । রাত দেরটার আগে পৌছানো চাই । একটুও যেন দেরি না হয়।
আমি কাধে করে একটা ব্যাগ নিয়ে এসেছিলাম । প্যাকেটটা ব্যাগে ভরে নিলাম । তারপর নিচে সাইকেল নিয়ে রওয়ানা দিয়ে দিলাম । ঠিকানাটা গুগল ম্যাপসে এন্টার করতেই একেবারে পয়েন্ট আকারেই ঠিকানাটা পাওয়া গেল। আমি মোবাইলটা মোবাইল ক্যারিয়ারে সেট করে সাইকেল চালাতে শুরু করলাম ।
একটার বাজার কিছু পরেই আমি বাড়ির সামনে এসে হাজির হলাম । বাড়ির সামনে এসে খানিকটা চমকাতে হল আমাকে। ঠিকানা দেখে নিশ্চিত হলাম যে আমি সঠিক স্থানেই এসেছি। আমি ভেবেছিলাম ধানমন্ডির ভেতরে বাসা যেহেতু নিশ্চয়ই অনেক আধুনিক বাড়ি হবে। কিন্তু এই বাড়িটা মোটেই আধুনিক নয় । একেবারে পুরানো একতলা বাড়ি । পুরো বাড়িটা উচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। তবে গেটটা একটু নিচু । সেটা দিয়েই বাড়ির ভেতরটা দেখা যাচ্ছে । গেট দিয়ে বেশ কিছুটা সামনে এগিয়ে গেলে বাড়িটা। বাড়ির সামনে বেশ কিছুটা ফাঁকা স্থানে নানান গাছপালায় ভরে আছে । গেটের বাইরে থেকেও আমি অযত্নের ছাপ দেখতে পাচ্ছি। গেটের ঠিক সামনেই একটা ৬০ পাওয়ারের আলো জ্বলছে । পুরো বাড়ি অন্ধকার । আর কোন আলো নেই। নেই কোন আওয়াজ।
আমি কিছু সময় বোকার মত তাকিয়ে রইলাম বাড়িটার দিকে । যদিও রাস্তার পাশেই বাড়ি এবং আশে পাশে আরও বেশ কিছু উচু উচু বিল্ডিং রয়েছে তবে এই বাড়ির ভেতরে ঢুকতে কেমন যেন ভয় ভয় করতে লাগলো । গেটের কাছে কি কেউ আছে ?
আমি সাইকেলটা দাড় করিয়ে দু একবার ডাক দেওয়ার চেষ্টা করলাম ।
কেউ আছেন ?
ফুড সার্ভিস। অর্ডার এসেছে।
কোন আওয়াজ এল না। কী করবো বুঝতে পারলাম না। এভাবে চলে যাওয়ার তো কোন উপায় নেই। গেট দিয়ে কি ঢুকবো ভেতরে ?
মন সায় দিল না । কারণ এই ভাবে রাতের বেলা কারো বাড়ির গেট দিয়ে ঢোকাটা মোটেই বুদ্ধিমানের কাজ হবে না । চোর বলে পুলিশে দিতে পারে। তবে যেহেতু অর্ডার এসেছে তার তো জেগে থাকার কথা ! তারপরেও ভেতরে ঢুকতে সাহস হচ্ছে না ।
আবার চলেও যেতে ভরশা পাচ্ছি না । ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি একটা বিশ বেজে গিয়েছে । দেড়টা বাজতে আর বেশি সময় বাকি নেই।
উপরওয়ালার নাম নিয়ে গেটে মৃদুভাবে হাত দিলাম । আমাকে খানিকটা অবাক করে দিয়েই গেটটা খুলে গেল । গেট বন্ধ নয় । ধীরে ধীরে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করলাম । অন্ধকার রাত । চারিদিকটা একেবারে সুনশান নিরব। বাড়ির সামনে দিয়ে একটা পাকা রাস্তা চলে গেছে যদিও এটা প্রধান রাস্তা না । ধানমন্ডির আবাসিক এলাকার রাস্তা । বাড়িটা একেবারে শেষ মাথায় । আশে পাশে বড় বড় অনেক বিল্ডিং রয়েছে । তবে এই বাড়ির ভেতরটা যেন অন্য কোন জগতের । বেশ কিছু গাছ পালা রয়েছে । উপরের দিকে তাকালে বলতে গেলে কিছুই দেখা যায় না ।
আমি গাছে ঘেরা বাড়ির লনের রাস্তা দিয়ে বাড়ির দিকে এগিয়ে চললাম । চারিদিকে উচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা । তার উপরে আবার কাঁটা তার দেওয়া । মানুষজনকে বাড়ি থেকে দুরে রাখার জন্যই এই ব্যবস্থা । অথচ বাড়ির গেট খোলা ! আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না ব্যাপারটা । অন্তত একটা দারোয়ান তো থাকার কথা গেটে ! হাটছি আর চারিদিকটা আরও ভাল করে দেখছি। গেটের কাছের আলো এতো দুর এসে ভাল ভাবে পৌছায় না । বাড়ির ভেতর থেকে কোন আলো আসছে না । তবে এই অন্ধকারের ভেতরেও চারিদিকে অযত্নের ছাপ বোঝা যাচ্ছে স্পষ্ট। অনেক দিন কেউ বাগানের পরিচর্যা করে না । গেট থেকে বাসা পর্যন্ত রাস্তাটাও পরিস্কার করে না কেউ । বাসায় কি কেউ থাকে না ?
আমি কি পরিত্যাক্ত এক বাড়িতে চলে এসেছি ?
কিন্তু ঠিকানা যা দেওয়া আছে আর বাড়ির নাম্বারটা রয়েছে সেটা থেকে তো ভুল হওয়ার কথা না।
তবে গেট দিয়ে এই পর্যন্ত আসতে আমার মনে একটা অনুভূতি খুব তীব্র ভাবেই কাজ করছে । সেটা হল কেউ আমার দিকে তাকিয়ে আছে । আমার প্রতিটা পদক্ষেপ যেন সে লক্ষ্য করছে ! কোথা থেকে লক্ষ্য করছে সেটা আমার জানা নেই তবে কেউ দেখছে আমাকে !
আশে পাশের কোন বিল্ডিং থেকে কি ?
আমি জানি না। মনের ভেতরে সেই ভয়টা আস্তে আস্তে বাড়ছে । মনকে কিছুতেই শান্ত করতে পারছি না । এই ভয়টা আমি কেন পাচ্ছি কে জানে ! আমার কি এখনই চলে যাওয়া উচিৎ এখান থেকে ?
হঠাতই একটা শব্দ হল !
শুকনো পাতা মাড়িয়ে কেউ এগিয়ে আসছে । বুকের ভেতরটা ধরাৎ করে উঠলো । এমন একটা নির্জন বাড়িতে কেউ যদি আমার উপরে হামলা করে বসে তাহলে হয়তো আমার লাশও খুজে পাওয়া যাবে না ।
ঐ তো ! আরেকবার !
আরেকবার হল আওয়াজ টা !
আমি দৌড় দিতে যাবো তখনই দেখতে পেলাম তাকে । অন্ধকারের ভেতরেও জ্বলজ্বল করছে চোখ দুটো ! আমার দিকে একভাবে তাকিয়ে আছে । আমি দৌড়াতে যাবো তখনই ব্যাপারটা বুঝে ফেললাম।
একটা বেড়াল !
আমার দিকে আছে । আমি বেড়ালটাকে চিনতে পেরেছি এটা জানান দিতেই সেটা মিয়াও বলে ডেকে উঠলো।
আমি কিছুটা সময় বোকার মত সেটার দিকে তাকিয়ে রইলাম । তারপর আবারও প্রধান বাড়ির দিকে হাটা দিলাম ।
যখন দরজার কাছে এসে দাড়ালাম তখনও ৫ মিনিট বাকি আছে । মোবাইলের আলো জ্বেলে দরজাটা ভাল করে দেখলাম ।
নাহ ।
এই দরজা নিয়মিত খোলা হয়।
অন্তত দিনে একবার হলেও কেউ এটা খোলে । তার মানে ভেতরে লোক থাকা খুব সম্ভব। পাশের কলিংবেল দেখতে পেলাম ।
আমি আর খুব একটা চিন্তা না করে কলিংবেলে চাপ দিলাম ।
একবার ।
দুবার ।
তারপর আরেকবার।
আরেকবার চাপ দিতে যাবো ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে একটা গাঢ় আওয়াজ ভেসে এল ।
‘পার্সেল দরজার সামনে রেখে চলে যাওয়া।’
আওয়াজটা এতোটাই আকস্মিৎ এল যে আমি খানিকটা চমকে উঠলাম । আরেকটু হলে আমার হাত থেকে মোবাইলটা পড়ে যেত। তবে সামলে নিলাম । সাথে সাথেই একটা তীব্র বোটকা গন্ধ নাকে এল ! গন্ধটা দরজার ওপাশ থেকে আসছে সেটা আমার বুঝতে কষ্ট হল না।
গন্ধটা পরিচিত মনে হল বেশ । একটু আগেই আমি ডাস্টবিনের সামনে দিয়ে এসেছিলাম । অনেক দিনের পচা ডাস্টবিন পরিস্কার করতে গেলে যেরকম গন্ধ বের হয় ঠিক সেই রকম গন্ধ ।
এরা কি গোসল করে না নাকি !
নাকি বাড়ির ভেতরটা ডাস্টবিন বানিয়ে ফেলেছে !
কে জানে !
যাক আমার কী !
আমি প্যাকেটটা দরজার কাছে রেখে কয়েক মুহুর্ত দাঁড়িয়ে রইলাম । ঠিক বুঝতে পারছিলাম না কী করবো । আশা করেছিলাম যে দরজা হয়তো খুলে যাবে । তবে সেটা খুলল না । পাশে একটা বেড়াল দেখেছি । বেড়ালটা যদি এসে খেয়ে নেয়?
নিক ! আমার সেটা চিন্তা করার দরকার নেই । আমাকে পার্সেল রেখে চলে যেতে বলা হয়েছে । বেড়াল খেল কি কুকুর খেল সেটা আমার দেখার বিষয় না।
আমি আর দাঁড়ালাম না । গেটের দিকে হাটা দিলাম । গেট দিয়ে যখন বের হয়েছি তখনই পেছন থেকে দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম । চারিদিকে এতো সুনশান নিরবতা বিরাজ করছে যে আওয়াজটা আমি পরিস্কার শুনতে পেলাম । খুব ইচ্ছে হল যে আমি একটু ফিরে যাই কিন্তু সেই কৌতুহলটা দমন করে নিলাম । চাকরীর প্রধান শর্তই হচ্ছে কৌতুহল দেখানো যাবে না ।
পরের দিন আবারও নির্ধারিত সময়ে পার্সেল নিতে গেলাম। রেস্টুরেন্টে দেখি আবার জন্য আবারও এক কাপ কফি অপেক্ষা করছে । দেখেই বোঝা যাচ্ছিলো যে সদ্যই টেবিলে এনে রাখা হয়েছে। যেন তারা ঠিকই জানতো আমি এখনই এসে হাজির হবে। আজকে কফির কাপের সাথে একটা নীল খাম রয়েছে। খামটা খুলতেই সেখান থেকে চকচকে দুটো এক হাজার টাকার নোট বের হয়ে এল । আমার মনটা ভাল হয়ে গেল । মনের ভেতরে একটা সুক্ষ ইচ্ছে কাল রাত থেকেই কাজ করছিলো যে আজই আমি চাকরিটা ছেড়ে দেব কিন্তু চকচকে নোট দুটো দেখে সেই ইচ্ছেটা একেবারেই চলে গেল ! আমাকে তো নিশ্চিয়তা দেওয়া হয়েছে যে আমার কোন ক্ষতি হবে না যদি আমি কোন প্রকার কৌতুহল না দেখাই ।
গত দিনের মত আজও দেখতে পেলাম একজন কফি খাচ্ছে একেবারে পেছনের একটা টেবিলে । এবং সেই অনুভূতিটা আজও আমার হল যে সে আমার দিকে মাঝে মাঝেই তাকাচ্ছে । যথারীতি কফি খাওয়া শেস হওয়ার সাথে সাথে সেই ওয়েটার লোকটা এসে হাজির । হাতে পার্সেল । বিনা বাক্য ব্যয়ে সেটা দিয়ে খালির কাপ নিয়ে চলে গেল ।
প্রথম প্রথম আমি যখন নতুন কোথাও পার্সেল পৌছাতে যেতাম, আমার মনে একটা ভয় কাজ করতো । বেশির ভাগ পার্সেলের ঠিকানাই হত নির্জন কোন বাড়ি । আজ পর্যন্ত নতুন এপার্টমেন্ট বিল্ডিংয়ে আমি কোন পার্সেল দিতে যায় নি । প্রথম দিনের সেই বাড়িটাতে সপ্তাহে একবার গিয়েছি। প্রতিবারই সেই কালো বেড়ালটার সাথে আমার দেখা হয়েছে । চার-পাঁচতলা বিল্ডিংয়ে পার্সেল পৌছেছি বেশ কয়েকবার তবে সেই বিল্ডিংগুলো সবই পুরানো । এই রেস্টুরেন্টের কাস্টোমারেরা যেন নতুন বিল্ডিংয়ে থাকেই না । এবং প্রতিবারই আমি যখন গেটের কাছে পার্সেল নিয়ে গেছি, প্রতিবারই গেটের ওপাশ থেকে আমাকে কেউ বলেছে পার্সেল যেন আমি গেটের কাছে রেখেই চলে যাই । আজ পর্যন্ত আমি কোন কাস্টোমারের চেহারা দেখি নি । কেবল কন্ঠস্বর শুনেছি ।
কেবল একটা বাক্যই ।
‘দরজার সামনে পার্সেল রেখে চলে যাও।’
আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে, স্থান আলাদা হলেও সবগুলো স্থানেই গলার ভয়েজ যেন আমার কাছে একই মনে হয়েছে । মনে হয়েছে যেন এখই লোক ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে আমার কাছ থেকে পার্সেল গ্রহণ করছে। গলার স্বর গাঢ় আর থেবড়ানো । কোন মানুষের গলার স্বর যে এমন হতে পারে সেটা আমার ধারনার বাইরে ছিল । প্রথম প্রথম আমার বেশ ভয়ভয় করতো । তবে সপ্তাহ দুই যেতে না যেতেই আমার ভয়টা আস্তে আস্তে কমে এল । আর প্রতিদিন দুই এক হাজার টাকার নোট আসছিলো পকেটে। এটাও ভয় কাটাতে সাহায্য করলো বেশ ।
প্রথম প্রথম একটা করে ডেলিভারি থাকলেও আস্তে আস্তে সেটা বাড়তে থাকলো । একটা থেকে দুইটা, দুইটা থেকে চারটা । সাইকেল নিয়ে আমার সামলাতে হিমসিম খাচ্ছিলাম । কারন ডেলিভারি শেষ করতে হত তিনটার আগেই । বারোটা থেকে তিনটা।
বিশ দিনের মাথায় আমাকে রেস্টুরেন্ট থেকে একটা স্কুটি কিনে দেওয়া হল । আমার কাজে তারা খুবই সন্তুষ্ট । তারা চায় আমি যেন তাদের সাথে দীর্ঘদিন কাজ করি । বছর খানেক এখানে কাজ করলেই এই স্কুটিটা আমার হয়ে যাবে । আমাকে কেবল শর্ত মেনে কাজ করে যেতে হবে ।
এতো ভাল একটা চাকরি, আর এই মেয়ে বলে কিনা ছেড়ে দিতে?
জেনি আমার দিকে অনুনয় করে বলল, প্লিজ তুমি চাকরিটা ছেড়ে দাও। এরা মানুষ না।
আমি জেনির দিকে তাকিয়ে বললাম, আচ্ছা, তুমি কী দেখেছো আমাকে বল।
জেনি এদিক ওদিক তাকিয়ে নিল একটু। তারপর আমার দিকে আরও একটু এগিয়ে এল । তারপর বলল, তুমি জানো যে পার্সেল আমরা নিয়ে যাই তার ভেতরে কী আছে ?
আমার মনে যে কৌতুহল হয় নি এমন না। অনেকবার মনে হয়েছে যে একটু প্যাকেটা ফুটে করেই দেখি ভেতরে কী আছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটা আর করা হয় নি। কী দরকার বাবা ! ওরা তো বলেছেই যে ভেতরে কোন অবৈধ জিনিসপত্র নেই। তাহলে আর কী সমস্যা?
জেনি আবারও আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি জানো ঐ পার্সেলের ভেতরে কী থাকে ?
প্রশ্নটা করবো না করবো না করেও, করেই ফেললাম, কী থাকে ?
জেনির সাথে আমার পরিচয়টা রেস্টুরেন্টের মাধ্যমেই । দিন দিন আমার কাজের পরিমান বৃদ্ধি পাচ্ছিলো । অর্থ্যাৎ আমাকে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বেশি সংখ্যক ডেলিভারি করতে হচ্ছিলো । সাইকেল থেকে স্কুটিতে এসেছেও আমি ঠিকমত কুলিয়ে উঠছিলাম না । আমার নিজের কাছেও মনে হচ্ছিলো যে আরেকজনকে যদি কাজে নেওয়া হত, তাহলে হয়তো আমার কাজটা আরও একটু সহজ হত !
প্রায় দেড় মাস কাজ করার পরে একদিন রাতে যথারীতি রেস্টুরেন্টে হাজির হলাম অর্ডার নেওয়ার জন্য । স্কুটিটা পার্ক করতে গিয়ে লক্ষ্য করলাম সেখানে আরেকটা স্কুটি পার্ক করা রয়েছে । এটা আমার কাছে খানিকটা নতুন মনে হল । আমি গত দেড় মাসে একদিনও দেখি নি রাতের বেলা এখানে কোন গাড়ি পার্ক করা রয়েছে । পুরো গ্যারেজটা ফাঁকা থাকে । অন্তত আমি যত সময় থাকি তত সময় কোন গাড়ি থাকে না ।
তবে এটার ব্যাপারে খুব বেশি কৌতুহল দেখালাম না । আমার এসব ব্যাপারে কৌতুহল দেখানোর কথা না । আমি সিড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেলাম । আজকে আমার জন্য নতুন কিছু অপেক্ষা করছিলো । রেস্টুরেন্টে ঢুকেই আমি মেয়েটাকে দেখতে পেলাম । এই পরিবেশের সাথে বড্ড বেমানান । আমার কফির কাপ সেখানে রাখা, সেই টেবিলের উল্টো দিকে মেয়েটা বসে কফি খাচ্ছে । আমি কোন দিকে না তাকিয়ে আমার কফির কাপের সামনে গিয়ে বসলাম । কফির কাপের নিচেই আমার নীলখাম রাখা ছিল । সেটা পকেটে ভরে কফির কাপে চুমুক দিলাম ।
মনের ভেতরে একটা ইচ্ছে কাজ করছিলো যে সামনে বসা মেয়েটার সাথে একটু কথা বলি কিন্তু সেটা বললাম না । নিজেকে নিয়ন্ত্রন করে নিলাম ! তবে দেখলাম মেয়েটি নিজ থেকেই আমার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল ।
-হ্যালো! আমি জেনি!
একটু ইতস্তর করে আমি হাতটা ধরলাম । তারপর বললাম আমি অপু !
-তুমি কত দিন ধরে কাজ কর এখানে ?
-এই মাস দেড়েক!
-অনেক দিন । আমি গতকালকে জয়েন করেছি । আমি তো প্রথমে বিশ্বাসই করতে পারি নি যে প্রতিদিন এরা দুই হাজার টাকা দেবে ! তোমাকে দেয় তো টাকা পয়সা ঠিক মত ?
আমি বললাম, হ্যা। একদম নিয়মিত । এখনও একদিনও পেমেন্ট মিস হয়নি। মেয়েটার মুখে একটা হাসি দেখতে পেলাম। আমার কাছ থেকে নিশ্চিত হয়ে মেয়েটা যেন একটু শান্তি পেল। তারপর বলল, রেস্টুরেন্টটা নতুন তাই না ? একদিন ভাবছি বন্ধুদের নিয়ে আসবো ! আচ্ছা কেবল কি আমরাই কাজ করি এখানে ? আর কেউ করে ?
-আমি যতদুর জানি, না । এতো দিন আমি একা ছিলাম । আজকে তুমি যুক্ত হলে ।
-আচ্ছা আচ্ছা।
আমি কিছু বলতে গিয়েও বললাম না । মেয়েটার কেমন কৌতুহলী চোখ নিয়ে সব দিকে তাকাচ্ছে । এটাই আমার কাছে ভাল লাগলো না । গতকাল কি জেনিকে ওরা ঠিক মত ব্রিফ করে নি ? মেয়েটা মনে হচ্ছে এই কাজটা ঠিক মত করতে পারবে না ।
কফি শেষ করে আমাদের পার্সেল চলে এল । দুজনে এক সাথেই নিচে নামলাম । জেনিকে দেখলাম নিজ থেকে এগিয়ে এসে আমার কাছ থেকে নাম্বার নিল । বলল যেহেতু আমরা কলিগ, আমাদের মাঝে যোগাযোগ থাকা দরকার।
স্কুটি নিয়ে বের হতে যাবে তখন আমি জেনিকে বললাম, জেনি।
-বল।
-তোমার কাজ কেবল পার্সেল পৌছানো। ঠিক আছে? অন্য কিছু খেয়াল করবে না, অন্য কিছু নিয়ে ভাববেও না।
-এই কথা কেন বলছো?
-না মানে নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি । কৌতুহল দেখাবে না এবং কোন কিছুতে ভয় পাবে না । তাহলেই সব কিছু ঠিক থাকবে।
জেনি কী বুঝলো কে জানে! স্কুটি নিয়ে বের হয়ে গেল । আমি নিজেও বের হয়ে গেলাম নির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে।
তারপর থেকে আমাদের প্রতিদিনই দেখা হতে লাগলো । আমরা একই সাথে ফুড পার্সেল নিতে রেস্টুরেন্টে যাই । কফি খেতে খেতে কথা বলি । জেনি নানান কথা বলে । বেশির ভাগ সময়ই আমি চুপ করে শুনি । ঠিক সাত দিনের মাথায় রেস্টুরেন্টে গিয়ে দেখি জেনি আসে নি । প্রতিদিন আমার আগেই চলে আসে ও । সেদিন এল না । তার পরের দিনও না । ওকি কাজ ছেড়ে দিল ? নাকি আমি চলে যাওয়ার পরে আসে ? কে জানে ! তারপর আর আজকে এই মেয়ে আমাকে ডেকে নিয়ে এসেছে এখানে ! কত কথা বলছে !
জেনি বলল, তুমি জানো ঐ বক্সের ভেতরে কী থাকে ?
আমি বললাম, কী থাকে ?
-তুমি বিশ্বাস করবে না কী থাকে !
একবার মনে হল জেনিকে বলি যে, কী থাকে না থাকে সেটা আমার জানার দরকার নেই । আমি জানতে চাই না । কিন্তু একটু যে কৌতুহল হচ্ছিলো না সেটা বলবো না !
জেনি বলল, গত পরশু দিন আমার সাথে একটা ভয়ানক ঘটনা ঘটেছে ।
-কী ভয়ানক ঘটনা ?
জেনি একটু সময় চুপ করে তাকিয়ে রইলো টেবিলের উপরে রাখা খাবারের প্লেটের দিকে । তারপর বলল, তুমি তো জানো আমাদের কন্ট্রাক্টের একটা রুলস হচ্ছে ডেলিভারির সময়ে আমাদের কোথাও থামা চলবে না।
হ্যা । এই নিয়মটা আছে । ডেলিভারির সময় আমাদের রেস্টুরেন্ট থেকে সোজা কাস্টোমারের বাড়ি, সেখান থেকে অন্য বাড়ি। মাঝে কোথাও থামা চলবে না । আমি কেবল মাথা ঝাকালাম।
জেনি বলল, আমার চা খাওয়ার বাতিক একটু বেশি । সেদিন যাওয়ার পথে দেখি পথের মাঝে একটা চায়ের দোকান । লোভ সামলাতে পারলাম না । স্কুটিটা এক পাশে দাড় করিয়ে চা খেয়ে নিলাম এক কাপ । তারপর আবারও রওয়ানা দিলাম । কিন্তু কিছু দুর যেতেই আমাকে দুইটা পুলিশ থামালো । টহল দিচ্ছিলো । আমাকে বলা হয়েছিলো যে কোন পুলিশি ঝামেলা হবে না। আর হলেও তারা সামলে নিবে ।
আমি জেনির দিকে তাকিয়ে রইলাম । আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করছি জেনি কী বলে । জেনি বলে চলল, পুলিশ দুজন আমাকে বেশ কিছু সময় ধরে নানা রকম প্রশ্ন করলো । তারপর আমাকে ব্যাগের ভেতরে থাকা পার্সেল বের করতে বলল । সেগুলো তারা খুলে দেখবে । যদিও খুব একটা ভয় করছিল না আমার । প্যাকেটের ভেতরে যদি অবৈধ কিছু না থাকে, কেবল খাবার থাকে তাহলে তো আর আমার চিন্তার কোন কারণ নেই । আমি একটা প্যাকেট বের করে দিলাম । পুলিশ দুজন হাতে নিয়ে কিছু একে অন্যের দিকে তাকাতে লাগলো । তারপর একজন একটা পেনসিল নাইফ বের করল। মাঝ বরাবর কেটে ফেলল ।
লাইনগুলো বলে জেনি কিছু সময় আবার চুপ করে রইলো । আমি লক্ষ্য করলাম এই এসির ভেতরেও জেনির কপালে একটু একটু ঘাম জমেছে । আমি বললাম, কী দেখলে তুমি?
একটু দম নিয়ে জেনি আবার বলল, প্যাকেটটা খুলতেই চারিদিকে একটা তীব্র কটু গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল । আমার মনে হল আমি জীবনে এতো তীব্র পঁচা গন্ধ কোন দিন পাই নি । আমার নাড়ি ভূড়ি সব উল্টে এল । ল্যাম্প পোস্টের আলোতে দেখতে পেলাম প্যাকেটের কাটা অংশ থেকে মুরগির পঁচা নাড়িভূড়ি বের হয়ে এসেছে । আমার মত পুলিশ দুই জনও তীব্র ভাবেই অবাক হয়েছে। তারা যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না যে কেউ মুরগির পঁচা নাড়ি ভূড়ি এভাবে প্যাকেট করে নিয়ে যেতে পারে । একজন আমার দকে তীব্র রাগের দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে বলল, এগুলো কী? তুমি না বললে খাবার ! এ ……
আরও কিছু বলতে যাচ্ছিলো সে তার আগেই তার ফোন বেজে উঠলো । ফোনের দিকে তাকাতেই সে সোজা হয়ে গেল । তারপর ফোন টা ধরেই বলল, জি স্যার !
দেখতে পেলাম তার মুখের ভাব বদলে গেছে । সে বলার চেষ্টা করলো, জি স্যার ! না মানে ……।। জি স্যার ! জি আচ্ছা স্যার ……
আমি বললাম, এরপর?
জেনি বলল, আমাকে অবাক করে দিয়ে পুলিশ লোকটা বলল, সরি ম্যাডাম, আমরা আসলে বুঝতে পারি নি । প্লিজ কিছু মনে করবেন না ।
তারপর পাশের লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, এই রশিদ গাড়িতে স্কচটেপ আছে । জলদি নিয়ে আসো তো । কুইক !
পুলিশের গাড়িটা আমাদের থেকে একটু দুরেই দাঁড়িয়ে ছিল । লোকটা সেখানে থেকে দ্রুত স্কচটেপ নিয়ে এল । তারপর নিজ দায়িত্বেই ওরা প্যাকের কাটা অংশ টেপ দিয়ে আটকে দিলো এবং সেটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিল । আমার কেন জানি সেটা আর নিতে ইচ্ছে করলো না । একটা ঘেন্না করতে লাগলো ।
পুলিশ দুজন নিজেদের গাড়ি নিয়ে যেতেই আমার ফোনে ফোন এসে হাজির । ওপাশ থেকে বলল, আমাদের কাস্টমার ক্ষুদার্থ ! জলদি যাও ……
কন্ঠটা এতো ঠান্ডা ছিল যে আমার পুরো শরীর কেঁপে উঠলো । আমার সেটা অমান্য করার কোন শক্তি ছিল না। আমি আপনাআপনি স্কুটিতে চেঁপে বসলাম ।
আমার মনের ভেতরে কেমন একটা অদ্ভুত মিশ্র প্রতিক্রিয়া হল । অন্য সময় কিংবা অন্য কোন বিষয় হলে হয়তো আমি জেনির সাথে একমত হতাম । তবে এখন কেন জানি আমার কাছে ব্যাপারটা মোটেই খারাপ কিছু মনে হল না । কেবল মনে হল কেউ যদি মুরগির নাড়ি ভুড়ি খায় । খাক ! আমার কী ? আমার কাজ হচ্ছে সেগুলো তার কাছে পৌছে দেওয়া এবং বিনিময়ে টাকা নেওয়া । অন্য কিছু আমার ভাবার দরকার নেই ।
জেনির কথা আমি অবিশ্বাস করলাম না । আমার মনে হল জেনি সত্য কথা বলছে । এর পেছনে আরেকটা কারণও আছে । যে বড় ভাই আমাকে এই চাকরিটা জোগার করে দিয়েছে, তার কাওরান বাজারে মুরগির আড়ত আছে । সুতরাং প্যাকেটের ভেতরে এই বস্তুগুলো কোথা থেকে আসে সেটা মেলাতে আমার কষ্ট হল না । কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে কোন মানুষ কি এই পঁচা জিনিসগুলো খেতে পারে? আদৌও কি সম্ভব ? নাকি এর পেছনে অন্য কোন কারণ আছে?
আমি জেনির দিকে তাকিয়ে বললাম, আচ্ছা বুঝলাম । কিন্তু সেটা কী সমস্যা আমি তো বুঝতে পারছি না । হ্যা ঠিক আছে পঁচা নাড়িভূড়ি নিয়ে যাচ্ছো । কিন্তু এতে আমার তোমার কী সমস্যা ? হতে পারে এটা ওরা কোন প্রাণীকে খাওয়ায়? নিজেরাই খাবে এমন কোন মানে তো নেই!
জেনি যেন খানিকটা অবাক চোখেই আমার দিকে তােকিয়ে রইলো । তারপর বলল, তোমার কাছে এটা স্বাভাবিক মনে হচ্ছে?
-না । স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না । কিন্তু জগতে কতই না অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটে । আর আমরা সে কাজ করছি সেটার পেমেন্ট কি স্বাভাবিক ? বল স্বাভাবিক ? কিছু অস্বাভাবিক কাজের জন্যই আমাদের কে এতো টাকা দেওয়া হচ্ছে । তবে কাজটা অস্বাভাবিক হতে পারে অন্যায় না । অন্যায় কাজ তো হচ্ছে, হচ্ছে কি?
জেনি আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময় । যেন বুঝতে চেষ্টা করছে আমার মনভাব। তারপর বলল, তুমি যদি ওদের চেহারা দেখতে তাহলে এই কথা বলতে না !
-তুমি দেখেছো ওদের?
-হ্যা। কী বিভৎস ওদের চেহারা সেটা তোমাকে বলে বোঝাতে পারবো না । ঐদিনই আমি পার্সেল নিয়ে আবারও রওয়ানা দিলাম। তিনটার ভেতরে দুইটা পার্সেল জায়গা মত স্থানে পৌছে দিলাম । তবে তৃতীয়টা পৌছাতে গিয়ে আমার কেমন যেন ভয় করতে শুরু করলো । আমার একদম প্রথমদিনই আমি এখানে এসেছিলাম পার্সেল দিতে । একটা চারতলা বিল্ডিং। কাস্টোমার তিন তলায় থাকে । আমি ধীর পায়ে উপরে গেলাম সিড়ি দিয়ে । আমার বুকের ভেতরে একটা দুরু দুরু অনুভূতি হচ্ছিলো ।
জেনির চোখের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পারছিলাম ও একটা ভয় অনুভব করছে । যেন সেই দৃশ্যটা চোখের সামনেই দেখতে পাচ্ছে ও । জেনি টেবিলের উপরে রাখা গ্লাস থেকে ঢকঢক করে পানি খেল । তারপর বলল, আমি কলিং চাপ দিলাম । একবার দুবার তিন বার ! অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছিলো । বারবার মনে হচ্ছিলো যেন দৌড় দিয়ে চলে যাই । আরও একবার কলিংবেল চাপ দিলাম । তারপরই আমি প্রতিদিনের মত যা হওয়ার তাই হল । তীব্র একটা বোটকা গন্ধ পেলাম । তারপর ভেতর থেকে আওয়াজ শুনতে পেলাম । আমাকে বলা হল আমি যেন প্যাকেট রেখে চলে যাই । আমিও এটা শোনার জন্যই অপেক্ষা করছিলাম। আমি প্যাকেটটা নিচে রেখে চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াই । করিডোর দিয়ে সিড়ি পর্যন্ত যেতেই আমি পেছন থেকে দরজা খোলার আওয়াজ পেলাম । অন্যান্য দিন সাধারনত এরকম হয় না । রাত নিতব্ধ থাকে । আমি যখন বিল্ডিংয়ের নিচে নেমে আসে কিংবা সিড়ির দিয়ে কয়েকধাপ নেমে আসি তখনই দরজা খোলার আওয়াজ পাই । কোনদিন সেটাও পাই না । কিন্তু আজকে এতো জলদি কেন দরজা খুলে গেল সেটা আমি বুঝতে পারলাম না। সম্ভবত আজকে আমার পৌছাতে একটু দেরি হয়েছিলো বলেই দরজাটা খুলে গেল।
কথাগুলো একভাবে বলেই জেনি চুপ করলো কিছু সময়ের জন্য । এবার আমি নিজে ওকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিলাম । এবার সত্যিই আমি নিজে খানিকটা চিন্তিত হলাম জেনির চেহারা দেখে । মেয়েটা সত্যিই ভয় পেয়েছে সেটা বুঝতে মোটেও কষ্ট হল না আমার । আমি বললাম, তুমি যদি না বলতে চাও তাহলে বলতে হবে না । আমি তোমার কথা বিশ্বাস করছি ।
জেনি বলল, না। আমি তোমাকে বলি । তাহলে হয়তো তুমি ব্যাপারটা বুঝতে পারবে ।
আমি ওকে আরও একটু দম নেওয়ার সময় দিলাম । জেনি নিজেও যেন একটু সময় নিল । আমার মনে হল যেন ও মনে মনে গুছিয়ে নিচ্ছে কথাগুলো। জেনি আবারও বলতে শুরু করলো, আমি নিজেকে নিয়ন্ত্রন করার খুব চেষ্টা করলাম । কিন্তু খুব একটা কাজ হল না । আমি পেছনে তাকিয়ে ফেললাম । ঠিকই দরজাটা পুরোপুরি খুলে গেল । তার সেই জিনিসটা বের হয়ে এল ।
জেনির চোখের দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল যে ও এখনও চোখের সামনে তাকে দেখতে পাচ্ছে ।
-ওটাকে আর যাই বলা হোক, মানুষ কোন ভাবেই বলা যাবে না । কোন ভাবেই না । লম্বায় আমার সমানই হবে । মানুষের মতই গড়ত । চোখ মুখ হাত সবই রয়েছে । তবে সেগুলো মানুষের মত নয় । মুখের স্থানে অনেকটা লম্বা ঠোঁট রয়েছে । কালো ঠোঁট। পাখিদের যেমন হয় । আরও ভাল করে বললে কাকের যেমন হয় । সেই ঠোঁটের উপরেই নাকের ফুটো । তার একটু উপরে চোখ। মানুষের মত গলা থেকে বুক আর কোমর । তবে সেগুলো বেশ সরু। পা আর হাতের নিটে চারটা করে আঙ্গুল । তিনটা একদিকে বাকি একটা অন্য দিকে।
পুরো শরীরে কোন পোশাক নেই । তবে কালো আবরন রয়েছে । সেটা আমার দিকে কিছু সময় অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো । আমি যে ঘুরে দাড়াবো সেটা সম্ভবত আশা করে নি । চোখ দুটো মানুষের মত না । অনেকটা গোল গোল । তার ভেতরে কালো চোখের মনি । আমার দিকে তাকিয়ে রয়েছে স্থির ভাবে ।
আমি চুপচাপ শুনে গেলাম । কী যে বলবো সেটা বুঝতে পারছি না । কী বলা উচিৎ ?
কিছু যে একটা অস্বাভাবিক কাজ আমি করছি সেটা আমি শুরু থেকেই জানতাম । তবে সেটা যে এমন হবে সেটা তো বুঝতে পারি নি ।
জেনি বলল, সেটা তারপর দ্রুত প্যাকেটটা নিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিল। পুরোটা পথ আমি কিভাবে এসেছি কেবল আমি জানি । আমার মনে যে কী ভয় ধরে গেছে সটা আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারবোনা ।
আমি বললাম, তুমি কী করতে চাও?
-জানি না কী করবো তবে আর যাচ্ছি না আমি । তোমারও যাওয়া উচিৎ না। তোমার সেফটির জন্যই আমি বললাম। আমি যাবো না ওখানে। বুঝতে পেরেছো কি ! তবে আমি চুপও থাকবো না। এই সব ভয়ংকর প্রাণী আমাদের মাঝে রয়েছে । না জানি ওরা কী করবে ! আমি কালই পুলিশের কাছে যাবো। আমার এক বন্ধুর বাবা পুলিশে আছে। তাকে খুলে বলবো । অন্তত ঐ রেস্টুরেন্টে আর যে কয়টা বাড়ি আমি চিনি সেখানে পুলিশ নিয়ে যাবোই । বেটাদের ধরবো তারপর দেখা যাক কী করা যায় !
আমি জেনির কাছ থেকে বিদায় নিয়ে এলাম । মনের ভেতরে অদ্ভুত সব চিন্তা ভাবনা কাজ করছে । কিছুতেই আমি সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না । জেনি যা বলেছে সেটা আমি মোটেই অস্বীকার করছি না । অন্য কেউ ওর কথা এতো সহজে বিশ্বাস করবে না আমি জানি । কিন্তু পুরোপুরি ভাবেই বিশ্বাস করেছি । তাহলে এখন আমার কী করা উচিৎ ?
জেনির কথা মত কাজ কর্ম বাদ দিয়ে দেওয়া উচিৎ ? আমিও জেনির সাথে সুর মিলিয়ে ঐ প্রাণীগুলোকে ধরিয়ে দিবো ?
নাকি কিছুই হয় নি ভেবে আগের মতই পার্সেল সার্ভিস দিয়ে যাবো ?
একটা ব্যাপার আমি খুব ভাল করেই বুঝতে পারছি যে যদি জেনির সাথে হাত মিলাই তাহলে প্রতিদিন আমার পকেটে যে দুই হাজার টাকা করে আসছে সেটা আর আসবে না । সেটা বন্ধ হয়ে যাবে । দেশের পরিস্থিতি খুব সম্প্রতি ভাল হবে বলে আমার মনে হয় না । আমি তখন কী করবো ?
আর মেনে নিলাম যে তারা মানুষ না । কিন্তু ওরা আমার কি কোন ক্ষতি করছে ? এই যে এতোদিন আমি ওদের বাসার সামনে গিয়ে হাজির হলাম যদি আমার কোন ক্ষতি করার ইচ্ছে ওদের থাকতো তাহলে তারা ঠিকই ক্ষতি করে ফেলতো ! তাহলে নিশ্চিত একটা অর্থ প্রাপ্তির পথ আমি কেন বন্ধ করবো ? আর অন্যকেই বা কেন বন্ধ করতে দিবো ?
আমি বাসার নিচে এসে আবারও স্কুটিটা ঘুরিয়ে ফেললাম । সোজা হাজির হলাম রেস্টুরেন্টের সামনে । আমি দিনের বেলা যতদিন এখানে এসেছি ততদিন দরজা বন্ধই পেয়েছি । কিন্তু আজকে আমাকে অবাক করে দিয়েই দরজার একটা পাল্লা মনে হল খোলা । আমি স্কুটিটা সামনে পার্ক করে দরজা দিয়ে ঢুকে গেলাম ভেতরে।
সেদিনের সেই কম বয়সী লোকটা আমার দিকে বেশ কিছু সময় তাকিয়ে রইলো । আমি এতো সময়ে জেনির কাছ থেকে যা শুনেছি সবই বলে দিয়েছি । সে শান্ত মুখে আমার কথা শুনলো । তারপর বলল, তোমার মনে হয় যে জেনি যা বলেছে সব সত্যি?
আমি ইতস্তত করে বললাম, হ্যা সত্যি ।
-তারপরেও তুমি এসেছো ?
-হ্যা ।
-কারণ কি জানতে পারি কি?
-কারণটা খুবই স্বাভাবিক । আমি আগে থেকেই জানতাম যে কাজ আমি করছি তার ভেতরে কিছু তো অস্বাভাবিকতা আছে । আর কাজটা যেহেতু অবৈধ না, এবং সেই প্রাণীগুলো মানুষ হোক বা না হোক তারা মানুষের ক্ষতি করছে না। করছে কি ? তাহলে কেন আমি তাদের শান্তিভঙ্গ করবো ?
এইবার লোকটার মুখে হাসি ফুটলো । তারপর বলল, তোমার কথা শুনে খুশি হলাম। তুমি এখন আসতে পারো । জেনির ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে !
একটু ভয় হল । জেনিকে আবার না ওরা কিছু করে ফেলে । আমি বললাম, জেনিকে কী করবেন আপনারা?
লোকটা একটু হাসলো। তারপর বলল ভয় পেও না । আমরা খুন খারাবীতে বিশ্বাসী নই । তবে জেনির ব্যাপারে কিছু করতে হবে। যেহেতু সে আমাদের ব্যাপারে হুমকি হয়ে দাড়াতে পারে । তুমি চিন্তা কর না । আমরা সামলে নিবো ।
আমার মনে তবুও জেনির জন্য একটু চিন্তা হতে লাগলো । মনে হল যে জেনির যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে সেটার জন্য আমিই দায়ী থাকবো । কিন্তু এখানে আমার আর কী বা করার ছিল । আমি যখন উঠতে যাবো তখন লোকটা আবারও আমার দিকে তাকিয়ে বলল, ইউ আর রাইট ! ওরা ডিফারেন্ট কিন্তু ক্ষতিকর না । আমাদের দেশে ভিন্নতাকে সবাই গ্রহন করতে পারে না, ভয় পায়, ক্ষতি করার চেষ্টা করে । আমরা কেবল ওদের একটু সাহায্য করছি । আর কিছু না ।
আমি হঠাৎ বলল, ওরা কারা?
দেখতে পেলাম লোকটার চোখ কেমন যে জ্বলে উঠলো । তবে সেটা নিভে গেল সাথে সাথেই । আমি বললাম, সরি, আসলে এই কৌতুহল আমি দমাতে পারলাম না ।
লোকটা বলল, ওরা কারা এটা জানার খুব একটা দরকার নেই । কেবল এই টুকু বলে রাখি যে ওরা এই পৃথিবীতে আছে অনেক দিন থেকে । অনেক দুর থেকে এসেছে, এখনও আসছে । আমাদের কাজ কেবল ওদের খাবার সরবারহ করা । বিনিময়ে আমরা এর অর্থ পাই । ঠিক আছে ?
-জি ঠিক আছে !
পরিশিষ্টঃ
রেস্টুরেন্ট থেকে আমাকে একটা বাইক কিনে দেওয়া হয়েছে । সেই সাথে প্রতিদিনের পেমেন্টের পরিমানটাও বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে । তবে খাবার ডেলিভারির সময়টা একটু বেড়েছে এখন । আগে তিনটার ভেতরে সব শেষ করতে হত এখন চার পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে । সেই সাথে আমাকে আরও একটু সুবিধা দেওয়া হয়েছে । আমাকে একটা আলাদা চাবি দেওয়া হয়েছে । চাবিটা অনেকটা মাস্টার কি এর মত । আমাকে এখন আর কাস্টমারদের বাসায় গিয়ে কলিংবেল চাপতে হয় না । এই চাবি টা দরজাতে প্রবেশ করালেই দরজা খুলে যায় । এই এক চাবি দিয়ে সব দরজা খুলে যায় । আমি দরজার কাছে প্যাকেটটা রেখে আবার দরজা বন্ধ কে চলে আসি । সুতরাং কাস্টোমার পেছনে আমার সময় কম খরচ করতে হয় । বেশি বেশি ডেলিভারি করা যায়।
আমি হিসাব করে দেখেছি, মাসের ভেতরে ঘুরে ফিরে পঞ্চাশটা বাড়িতে আমি খাবার সাপ্লাই করি । যদিও এখনও কারো সাথে আমার সামনা সামনি দেখা হয় নি । তবে একদিন তাদের সামনে থেকে দেখার বেশ ইচ্ছে আমার । আমার কাছে চাবি থাকা স্বত্ত্বেও কাজটা কারতে আমি ঠিক সাহস পাই না । যতই আমাকে বলা হোক যে ওরা আমার কোন ক্ষতি করবে না তারপরেও আমার এই সাহস এখনও হয় না যে ওদের ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ি । প্রতিবার দরজা খুলতেই একটা বিদঘুটে গন্ধ এসে নাকে লাগে । যা একেবারেই সহ্য হয় না ! কোন মতে খাবার রেখেই চলে আসি !
জেনির সাথে আমার মাস খানেক পরে আবার দেখা হয়েছিলো । আমি ওকে ডাক দিলাম । আমার ডাক শুনে আমার দিকে ফিরে তাকালো । কিন্তু ওর চোখের দৃষ্টি দেখে আমি অবাক হলাম । আমার কাছে এসে বলল আমি ওকে চিনি কি না ! সে নাকি আমাকে চেনে না ! ঐ লোকটা বলেছিলো যে জেনির ব্যবস্থা ওরা নিবে । সম্ভবত এই ব্যবস্থা নিয়ে ফেলেছে ! জেনি আমাকে চিনতে পারছে না, এর অর্থ হচ্ছে ওর কিছু মনে নেই । মনটা খানিকটা শান্ত হল । জেনির আপাতত ঠিক আছে । যে ভয়টা পাচ্ছিলাম সেটা হয় নি ।
জেনির মত আমিও যদি বেশি কৌতুহল দেখাতে যাই তাহলে আমারও হয়তো এমন কিছু হবে । দরকার নেই এসব চিন্তা করার। আমার কাজ হচ্ছে ফুড ডেলিভারি করা । এর বিনিময়ে আমি টাকা পাই । আমি সেটাই করি বরং । এতো কৌতুহল দেখানোর কী দরকার শুনি !
এই গল্পটি আগে সামহোয়্যার ইন ব্লগে প্রকাশিত। এই রকম একটা ডেলিভারি গল্প লিখছি নতুন করে তাই মনে হল এই গল্পটা সাইটে প্রকাশ করা যাক।

