অপু তানভীর

প্রাচীন মমি (দ্বিতীয় পর্ব)

4.8
(37)

প্রথম পর্ব

সকাল বেলা আমার ঘুম ভাঙ্গলো বেশ বেলা করে। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম প্রায় এগারোটা বেজে গেছে । একটু অবাক হলাম আমি । সাথে সাথেই আমার গত রাতের কথা মনে পড়ে গেল । সাথে সাথে আমি পুরো ঘরের দিকে চোখ বুলালাম । পুরো ঘর ফাঁকা । এরপর আমার চোখ চলে গেল । দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ ।

আমি দরজা খুলে বাইরের ঘরে বেরিয়ে এলাম । সেটাও বন্ধ । আমার গত রাতের কথা সব মনে পড়ে গেল । সাথে সাথে পুর শরীরে একটা কাটা দিয়ে উঠলো ।

গতকাল রাতে আমার চোখের সামনে সেই অস্বাভাবিক ব্যক্তিটা লাফ দিয়ে গেট পার হয়ে চলে গেল । আমি কেবল অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়ে রইলাম । কিছুতেই নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না । এটা কি আদৌও সম্ভব ? তখনই আমার পাশে বসে থাকা মেয়েটির একটা দীর্ঘশ্বাস শুনতে পেলাম । মেয়েটি বলল, চলুন আপনাকে বাসায় পৌছে দিয়ে আসি।

-মানে? আমাকে কেন পৌছে দিতে হবে?

-কারণ এই বাসায় এখন ওরা রয়েছে । পথে ওদের সাথে দেখা হয়ে যেতে পারে । আপনাকে একলা পেলে ওরা ছাড়বে না।

-ওরা মানে কারা?

-এতো কিছু জানতে হবে না । আসুন আমার সাথে সাথে । কোন কথা বলবেন না । কেমন?

এই বলে মেয়েটি আমার সামনে সামনে হাটতে শুরু করলো। আমি কোন কথা না বলে মেয়েটির পেছন পেছন হাটতে শুরু করলাম । তখনই একটা ব্যাপার আমার মনে এল ।বাসার গেটের ঠিক পাশেই একটা ছোট ঘর রয়েছে । সেখানে দারোয়ান বসে থাকার কথার । সে সারারাত পাহাড়া দেয় । ব্যাটা কই এখন? একটু থেমে সেদিকে তাকালাম । অন্ধকার তখন চোখে বেশ ভালভাবেই সয়ে গেছে । কিন্তু আমি দারোয়ানের টিকিটাও দেখতে পেলাম না । ব্যাটা গেল কই?

-এই দাড়ালে কেন? জলদি এসো ।

সামনের মেয়েটি চাপা স্বরে ডাক দিল আমাকে । আমি আবারও দ্রুত হাটা দিলাম । আমার বাসার কাছে এসেছি তখনই পেছনে থপথপ আওয়াজ শুনতে পেলাম । আওয়াজটা আমার দিকে এগিয়ে আসছে দ্রুত । মেয়েটিকে দেখলাম প্রায় এক লাফে আমার কাছে চলে আসতে । তারপর আমার হাত ধরে এক প্রকার হেচকা টান দিয়ে আমাকে প্রায় উড়িয়ে নিয়ে এসে ফেললো আমার ঘরের ভেতরে । তারপর সে দরজাটা বন্ধ করে দিল । আমাকে হাতের ইরাশায় চুপ থাকতে বলে সে দরজাতে কান দিয়ে কি যেন শুনতে লাগলো । আমি নিজেও ভয়ে জমে গেলাম । বাইরে যে কী হচ্ছে সেটা আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না । এমন কেন হচ্ছে !

বাইরের সেই থপথপ আওয়াজটা শুনতে পেলাম । ঘরের চারিদিকে সেই আওয়াজটা কিছু সময় ঘোরাঘুরি করলো । তারপর সেটা দূরে চলে গেল । একটা সময় দেখলাম মেয়েটার দরজার কাছ থেকে সরে এল । আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপাতত আর ভয় নেই ।

আমি সাথে সাথেই বললাম, ভয় নেই মানে? কিসের ভয় নেই । ওরা কারা ? আর সব থেকে বড় কথা তুমি কে? এখানে কিভাবে এলে?

মেয়েটা আমার প্রশ্নের জবাব দিলো না । পুর ঘরে ঘুরে দেখতে লাগলো কি যেন । তারপর বাইরের ঘরে রাখা সোফার উপরে গিয়ে বসল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমিই তাহলে নতুন নায়েব মশাই?

আমি বললাম, হ্যা । আমাকে এরা নায়েব বলেই ডাকে । হিসাব তো আমি ম্যানেজার । এই এস্টেট দেখা শুনা করি ।

-আলী ওয়াজেদ তোমাকে নিয়ে এসছে তাহলে ? বুড়ো নায়েব না নিয়ে এসে এবার দেখি জোয়ান নায়েব নিয়ে এসেছে । বেশ ভাল । তা বিয়ে করেছো?

-না ।

মেয়েটা আমার দিকে তাকিয়ে রইলো । তারপর বলল, আমার নাম আয়েশা । আমি ……

আয়েশা কথা শেষ করলো না । আমার মনে হল যে ও আমাকে কিছু বলতে গিয়েও বলল না । যেন শেশ মুহুর্তে মনে হল যে আমাকে এই কথা না বলাই ভাল ।

আমি ঘরে আলোর জন্য একটা মোমবাতি জ্বাললাম । তারপর সেটা টিটেবিলের সামনে রেখে নিজেও শোফার অন্য পাশে বসলাম । আমার ভেতরে এখন খানিকটা জানার স্পৃহা । এই মেয়ে এখানে কিভাবে এল? আলী ওয়াজেদ সাহেবকে সে কিভাবে চেনে ? আয়েশা আমার দিকে হাসি মুখ দিয়ে তাকিয়ে রয়েছে । মোমের আলোতে ওর চেহারাটার দিকে আমার মনে হল যে চেহারাটা কেমন যে মলিন মলিন ! না ঠিক মলিন না, মনে হল অনেক পুরোনো কাউকে দেখছি । যদিও বয়সে সে আমার মতই হবে তবে কেন জানি তার চেহারা চুল বাঁধার ধরন, পরনের শাড়ি সব কিছুতেই একটা পুরানো পুরানো ভাব রয়েছে ।

আয়েশা নানান কথা বার্তা বলতে শুরু করলো । এই জমিদারির কথা । কখন সেটা শুরু হয়েছে কে ছিল এই সব । এখন কি আছে না আছে । আমি আস্তে আস্তে শুনতে লাগলাম । আমার মনে হল যে আয়েশার কথার মাঝে একটা আলাদা আকর্ষন রয়েছে । বারবার যেন শুনতেই মন চায় । আমি সেই কথার মায়ায় পড়ে গেলাম যেন ।

এইভাবে কথা বলতে বলতে আমার মনে হল যেন আমার ঘুম আসছে । হঠাৎ করে এতো ঘুম আসছে কেন সেটাই বুঝতে পারলাম না । এক সময় আমার পক্ষে চোখের পাতা খোলা রাখাই দুস্কর হয়ে গেল । আয়েশার কথা শুনতে শুনতে আমি ঘুমিয়ে গেলাম ।

একটা ব্যাপার আমার মাথায় কিছুতেই ঢুকলো না । আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বসার ঘরে । মানলাম আয়েশা আমাকে খাটে নিয়ে এসেছে । কিন্তু দরজা ভেতর থেকে বন্ধ । এটার ব্যাখ্যা আমি কোন ভাবেই পেলাম না । আয়েশা যদি বের হয় তাহলে দরজা কিভাবে ভেতর থেকে বন্ধ হল । ঘরটা ভেতর থেকে ছিটকানি দেওয়া ছিল । আধুনিক লক না যে বাইরের থেকেও আটকানো যাবে । এটা কেবল ভেতর থেকেই বন্ধ করা সম্ভব ।

আমি সবারে বের হয়ে এলাম । তখনই দেখতে পেলাম বাড়ির ভেতরে দুজন মানুষ ঢুকছে । একজনকে আমি চিনতে পারলাম । সাথে সাথেই আমার কৌতুহল বেড়ে গেল । এদের একজন হচ্ছে সেই একজন যার ছেলে পুলিশের জয়েন কয়েছে এবং আলী ওয়াজেদ সাহেবের জমি ছিনিয়ে নিয়েছে । এই লোক এখানে কি করছে?

আমি পা চালিয়ে দ্রুত জমিদারের বৈঠক খানার দিকে হাটা দিলাম । সেখানে হাজির হয়ে আমাকে অবাক হতে হল । কারণ ভদ্রলোক যা বলতে এসেছিল তার সারমর্ম হল তিনি ভুল করেছেন । তিনি জমি ফেরত দিতে এসেছেন । আমার মাথায় কিছুই ঢুকও না । কি হল এটা ?

গতকাল এই লোকই বেশ দাম্ভিক ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে দিল । আজকে এমন ভেজা বেড়ালের মত আচরণ কেন করলো! যখন সে ফেরত চলে গেল আলী ওয়াজেজ আমার দিকে খানিকটা কৌতুকের সুরে বলল, কি নায়েব আমা জমি ছাড়াতে পুলিশ লাগে না ! বুঝেছো !

-কিন্তু কিভাবে হল এসব ?

উত্তরে জমিদার সাহেব কেবল হাসলেন । কোন উত্তর দি্লেন না ।

আম পরে এর আসল কারণ জানতে পারলাম । ঐদিন রাতে ঐ পুলিশের বাসায় নাকি একদম পিশাচ হামলা করেছিলো । পুলিশকে নাকি একেবারে মেরেই ফেলেছিল তবে শেশ মুহুর্তে মারে নি । মরমর অবস্থায় তাকে ফেলে চলে আসে । তারা বুঝে যায় যে হামলা কে করেছে । তবে যারা হামলা করেছিল তারা কেউ যে মানুষ নয়, এই ব্যাপারে সবাই এক মত ছিল । মানুষের সাথে যুদ্ধ করা যায় কিন্তু একদম পিশাচের সাথে কিভাবে যুদ্ধ করা সম্ভব !

এই খবর আমাকে আরও বেশি কৌতুহল করে তুলল । আমি বুঝতে পারলাম আগের দিন রাতে আমি ঠিক এমনই একজঙ্কে দেখেছিলাম । এমনই একদম আমার ঘর পর্যন্ত এসেছিল এবং চারিদিকে ঘোরাঘুরি করেছিল । কিন্ত সেটা কি আসলেই পিশাচ?

আলী ওয়াজেদ খান কি এই পিশাচ গুলো পোষে ? নাকি কোন ভাবে নিয়ন্ত্র করে ? আমি এর কোন উত্তর খুজে পেলাম না । তবে মনের ভেতরে সেই কৌতুহল জমা হয়ে রইলো । জানার একজটা আগ্রহ ঠিকই রয়ে গেল ।

দুদিন পরে আমার মনের কৌতুহল মেটাতে আমি রাতে বের হলাম । তবে আজকের রাত ঐ দিনের রাতের মত ছিল না । বাইরে ঝিঝি ডাকছিল । আলো জ্বলছিল । সব কিছু স্বাভাবিক মনে হল । আমি বাড়ির চারিদিকে নিঃশবদে হাটতে লাগ্লাম । হাটতে হাটতে আমি সেই ভাঙ্গা বাড়্র দিকে চলে গেলাম । ভাঙ্গা বাড়িটার ভেতরে ঢুকতেই যাবো তখনই সেদিনের মত কেউ আমার পেছনে এসে দাড়ালো । আমার মনে হল হয়তো আবারও আয়েশা এসে দাড়িয়েছে । আমি ঘুরে দাড়াতেই আমার ভুল ভাঙ্গলো । আমার পেছনে জমিদার আলী ওয়াজেদ খান দাড়িয়ে। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কি ব্যাপার নায়েব এখানে কি করছো?

আমি একটু থতমত খেলাম । তারপর নিজেকে খানিকটা সামলে নিয়ে বললাম, ঘুম আসছে না । তাই একটু হাটাহাটি করছিলাম । এদিকে এই বাড়িটার ভেতরে কি আছে ?

-তেমন কিছু নেই । আসো দেখাই তোমাকে !

এই বলে সে সেই বাড়ির ভেতরের দিকে হাটা দিল । আমি একটু থেমে তার পেছনে হাটতে থাকলাম । এই বাড়িটাও দুইতলা । যার বেশির ভাগ ঘরই ভেঙ্গে পড়েছে । আমরা একটার পর আরেকটা ঘর পার হতে লাগলাম । আলী ওয়াজেদ সাহেব আগের জমিদারের নানান কথা বলতেলাগলো। তাদের পূর্ব পুরুষ কেমন ছিল । কী কী করতো ! হঠাত আমরা একটা ঘরে এসে হাজির হলাম । এবং আমি খানিকটা অবাকই হয়ে গেলাম । ঘরটা মোটেও ভাঙ্গা চোরা নয় । চারিদিকে অযত্নের ছাপ পরেছে। নিয়মিত পরিস্কার করা হয় না । কিন্তু ঘরে মানুষ আসে এটা বুঝতে পারলাম । এবং ঘরে আলো জ্বলছে । সেই আলোতেই আমি দেখতে পেলাম দেওয়ালে নানান মানুষের ছবি টাঙ্গানো ।

আলী ওয়াজেদ বললেন, এরা সব আমাদের আগেরকার পূর্ব পুরুষ । আমি একে একে সবার ছবি দেখতে শুরু করলাম । একটা ছবির সামনে এসে আমার চোখ থেমে গেল ! একজন মেয়ের ছবি । এতো গুলো পুরুষের মাঝে একটাই মেয়ে ! আমাকে দাঁড়িয়ে পড়তে দেখে আলী ওয়াজেদ বললেন, ইনি আয়েশা খানম । আমার প্রো প্রো পিতামহের মেয়ে ।

আমার মনে হল যেন আমি একটা হার্টবিট মিস করলাম । চোখের সামনে আয়েশাকে এভাবে দেখে আমি অবাক না হয়ে পারছ না । গতদিন এই মেয়েটিই আমার সামনে এসেছিল, এই ব্যাপারে আমার কোন সন্দেহ নেই । কিন্তু কিভাবে?

আমি আর কিছু ভাবতে পারলাম না । আমার মাথা ঘুরতে শুরু করলো । মনে হল এখান থেকে আমার বের হয়ে যাওয়া উচিৎ ! আমি আলী ওয়াজেদকে বলে ভাঙ্গা বাড়ি থেকে বের হয়ে এলাম । সোজা নিজের ঘরের দিকে হাটা দিলাম । রাতের খাবার আগেই খেয়েছি । তাই শুয়ে পড়লাম সাথে সাথে ।

রাত তখন কয়টা হবে আমি জানি না, আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল । ঘুম ভাঙ্গার সাথে সাথেই আমি টের পেলাম যে আমার ঘরে কেউ রয়েছে । ঘর ময় সে ঘুরে বেড়াচ্ছে । আমি অন্ধকারে তার অয়বয় দেখতে পেলাম । আমাকে বলে দিতে হল না ঘরে সে ঘুরে বেড়াচ্ছে !

বুকের মাঝে একটা ঠান্ডা ভয়ের স্রোত বয়ে গেল !

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 37

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *