4.6
(21)

পিয়ন যখন নায়রার কার্ডটা আমাকে দেখালো আমি একটু অবাক হলাম । ডাক্তার নায়রা হাসান ! এমবিবিএস । যদিও ফেসবুক আর ইনস্টাগ্রামে ওর ছবি দেখি নিয়মিত । খুব শীঘ্রই বিয়ে হতে চলেছে ওর । এই সময়ে ও এখানে কেন ? এই সময়ে আমার সাথে দেখা করতে এসেছে ।

আমি পিয়নকে বললাম নায়রাকে কেবিনে নিয়ে আসার জন্য । মিনিট খানেক পরেই নায়রাকে কেবিনে ঢুকতে দেখলাম ।

আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসলো । আমার কেন জানি ওর হাসি দেখে বেশ ভাল লাগলো । নায়না মেয়েটাই এমন । ও যখন আশে পাশে থাকে তখন মন এমনি এমনিই ভাল হয়ে যায় । অনেক দিন পরে নায়রাকে দেখতে পেলাম । আগে একটা সময় ছিল যে প্রায় প্রতিদিনই নায়রার সাথে দেখা হত । নায়রা ক্লাস শেষ করে আসতো আমার অফিসে । পরে গল্প করতাম, এক সাথে ডিনার করতাম তারপর আরও অনেক কিছু ।

আমি ওর দিকে তাকিয়ে বললাম, হেই কি খবর ! অনেক দিন পরে দেখা হল !
-হুম ! প্রায় দুই বছর !
-হ্যা । ফেসবুকে ছবি দেখলাম । তোমার হবু বর চমৎকার দেখতে ।

কথাটা বলতেই দেখলাম নায়রার মুখ কেমন যেন কালো হয়ে গেল । আমার দিকে তাকিয়ে বলল, বিয়েটা ভেঙ্গে গেছে !
-কি !
-হ্যা ।
-কিভাবে ? কেন ?
-সেই ব্যাপারেই কথা বলতে এসেছি ।

আমি প্রথমে ঠিক বুঝতে পারলাম না । নায়রার বিয়ে ভেঙ্গে গেছে এবং নায়রা আমার সাথে কথা বলতে এসেছে । আমি সত্যি এর কোন অর্থ বুঝতে পারলাম না । আমি বললাম, আমি ঠিক বুঝতে পারলাম না । তোমার বিয়ে ভেঙ্গেছে । আই এম সরি ফর দ্যাট । কিন্তু এর জন্য আমার সাথে কথা মানে …

নায়রা বলল, মানে হচ্ছে সায়েমকে কেউ আমাদের ভিডিও দেখিয়েছে ।
-আমাদের ভিডিও মানে ?
-আমাদের ভিডিও মানে বুঝতে পারছো না ?

নায়রার ইংঙ্গিতটা বুঝতে পেরে আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল । প্রথম কিছু সময় লাগলো আমার কথাটা হজম করতে । নায়রা বলছে কি ! কি সর্বনাশের কথা ! আমি কোন মতে বললাম, কি বলছো এসব ?
-হ্যা । সায়েমকে কেউ আমাদের ভিডিও দেখিয়েছে । তোমার চেহারা দেখা যাচ্ছে না সেখানে কিন্তু আমার চেহারা দেখা যাচ্ছে । আর তুমি তো জানো আমি কেমন শব্দ করতাম । যারা চেনে আমাকে তারা চিনে ফেলবে !!
আমি বললাম, এবং তুমি মনে কর কাজটা আমি করেছি?
-নয়তো আর ক?
-তোমার কি মাথা খারাপ হয়েছে ! আমি কেন করবো কাজটা শুনি? আমার কি স্বার্থ ? তোমার কি মনে নেই যে আমাদের সব কিছু কিভাবে শুরু হয়েছিলো আর শেষ কিভাবে হয়েছিলো । তখনই তো আমি তোমাকে ঠেকাতে পারতাম ।
-জানি না আমি কিছু । আমি কিছু জানি না । কিছু ভাবতে পারছি না আমি !
-বিশ্বাস কর আমি কিছু করি নি । আমি কোন দিন ভিডিও করি নি । বিশ্বাস কর ।

নায়রা আমার দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলো । বোঝার চেষ্টা করলো যে আমি মিথ্যা বলছি কি না । একটা সময়ে মনে হল যেন ও আমাকে বিশ্বাস করেছে । আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তাহলে কে করলো কাজটা ! সায়েমের সাথে বিয়ে ভেঙ্গেছে বুঝলাম । গেল সেটা । কিন্তু নতুন কারো সাথে বিয়ে ঠিক হলে সেটাও যে ভাঙ্গবে না সেটার নিশ্চয়তা কি !
-বিশ্বাস কর আমার কাছে কোন ভিডিও নেই । মানে ঐ রকম কিছু নেই । তোমার কিছু ছবি এখনও আছে । তবে ভিডিও নেই ।
-বাবা খুব আপসেট হয়ে গেছেন ।

আমি কি বলবো বুঝতে পারলাম না । মেয়ের ভিডিও বের হয়েছে এবং সেটা তার হবু বরকে পাঠানো হয়েছে এই খবর যে কোন বাবাই আপসেট হবে । কিন্তু এখানে আমার কি করার আছে । হ্যা এটা সত্য এই ঘটনার সাথে আমি জড়িতো যে কোন ভাবে কিন্তু আমার তো কোন দোষ নেই ।

নায়রা চলে গেল । তবে বলে গেল যে একটা কিছ ভাবতে হবে আমাদের । এই সমস্যা থেকে বের হতে হবে । সেটা তো হবেই ।

বাসায় ফিরে ল্যাপটপ বের করলাম । নায়রার বেশ কিছু ছবি আমার কাছে রয়েছে । নানান ধরনের ছবি । ছবি গুলো দেখতে শুরু করলাম একের পর এক । হঠাৎই একটা ছবিতে এসে আটকে গেলাম । ছবিতে নায়রা ঘুমন্ত অবস্থায় রয়েছে । বিছানার উপুর হয়ে শুরু আছে । আমি পাশেই শুয়ে ছিলাম । চুপ গুলো পিঠের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এক চোখ ঢেকে আছে চুলে । নায়রার শরীরে কিছু নেই । সকালের আলো এসে পড়েছে ওর শরীরে । আমি তখন তুলেছিলাম ছবিটা ।

আমার একে একে সব কিছু মনে পড়তে লাগলো । নায়রার সাথে আমার সম্পর্ক প্রায় তিন বছরের মত ছিল । আমি কি ওর প্রেমিক ছিলাম ? কি জানি ! তবে আমাদের মাঝে কিছু একটা ছিল । একটা বিয়ের অনুষ্ঠানে প্রথম দেখা । তারপর বন্ধুত্ব । একসময় আমরা খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলাম । আমাদের মধ্যে সপ্তাহে প্রায় প্রতিদিনই দেখা হত । আর এমনও আছে যে কোন কোন সপ্তাহে প্রতিটি দিনই আমরা রাতে এক সাথে থাকতাম । একে অন্যের সঙ্গ ভাল লাগতো আমাদের খুব । আমি তখন সবে চাকরিতে ঢুকেছি । নিজের বাসা নিয়ে থাকি অন্য দিকে নায়রা মেডিকেলের থার্ড ইয়ার । ঢাকায় বাসা হওয়ার স্বস্ত্বেও হলে থাকতো । তাই খুব একটা সমস্যা হত না আমার বাসায় আসতে । আমাদের মাঝে কথাই ছিল যে কোন কমিটমেন্ট থাকবে না । যখন মনে হবে যে আর দুজন দুজনকে ভাললাগছে না তখন আলাদা হয়ে যাবো । আর ও জানতো যে ডাক্তারের সাথেই ওকে বিয়ে করতে হবে ।

কিন্তু আমাদের ভিডিও করলো কে ? এটাই তো আমি ঠিক বুঝতে পারছি না । সত্যি বলতে কি ওর সাথে যা কিছু হয়েছে সব হয়েছে আমার বাসাতেই । কখনও বেড রুম কখন ড্রয়িং রুম কিংবা ডাইনিং । বাথরুমে গোসলের সময়েও কয়েকবার আমাদের মাসে ইন্টারকোর্স হয়েছে । কখনই আমরা হোটেলে যাই নি । কয়েকবার অবশ্য নায়রাদের বাসাতেও গিয়েছি আমি যখন ওর বাবা মা থাকতো না । আমি কোন দিন ভিডিও করি নি । তাহলে ভিডিওটা করলো কে ? কিভাবে ? আমি এই প্রশ্নটার উত্তর খুজে পেলাম না ।

পরদিন অফিস শেষ করে বের হতেই দেখি নায়রা অফিসের সামনে দাড়িয়ে রয়েছে । আমাকে বের হতে দেখে এগিয়ে এল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কালকে বাবা খুব বেশি রাগারাগি করেছে।
-তারপর ?
-বলেছে বাসা থেকে বের হয়ে যেতে । আমার মুখ তিনি দেখতে চান না
-এখন?
-জানি না কি করবো !
আমি একটু ইতস্তঃ করে বললাম, আমার বাসায় যাবে? মানে যদি রাতে কোথাও যেতে না চাও !
-চল । আসলে এই জন্যই এসেছিলাম । মনে হচ্ছে বাসায় যাওয়া হবে না আর ।
-আচ্ছা বাসায় চল । তারপর দেখা যাক কি করা যায় ।

নায়রাকে বাসায় এনে নিজেই কফি বানিয়ে দিলাম ওকে । ঠিক আগে যেমন করে আমরা ব্যালকুনীতে বসে কফি খেতাম, বিকেলে গল্প করতাম সেই ভাবে গল্প করলাম । বললাম, ভিডিওটা কি বাইরে এসেছে ? আইমিন কোন সাইটে আপলোড হয়েছে?
-না ! সায়েম আমাকে দেখালো ভিডিও টা ।
-তারপর নিজেই ডিলিট করে দিল । বলল যে নামায় নি । এও বলল এটা দেখার পরে ওর পক্ষে আমাকে বিয়ে করা সম্ভব না । ওকে দোষ দেই না আমি ।
-তাহলে কি কেবল বিয়ে ভাঙ্গাই লক্ষ্য ছিল ।
-তাই তো মনে হচ্ছে ।
-তার মানে আবার বিয়ে ঠিক হলে আবারও ভিডিও পাঠাবে।
-হুম !

একটু চিন্তার ব্যাপার । আমি ওর মনযোগ অন্য দিকে নেওয়ার জন্য কথা বার্তা অন্য দিকে নিয়ে গেলাম । নানান কথা শুরু করলাম । একটা সময়ে খেয়াল করলাম যে গল্পের ভেতরে আমি নিজেও ঢুকে গেছি । ওর সাথে কথা বলতে ভাল লাগছে । কেন জানি মন ভাল হয়ে গেল অনেক । এমন কি দেখলাম নায়রার মনও ভাল হয়ে গেছে ।

এমন সময় কলিংবেল বেজে উঠলো । আমি উঠে গিয়ে দরজা খুলতে দেখি এক মাঝ বয়সী ভদ্রলোক দাড়িয়ে । লোকটাকে কেমন যেন চেনা চেনা মনে হল । পরিচিত চেহারা । ভদ্রলোক আমার দিকে তাকিয়ে বলল, নায়রা কোথায়?
সাথে সাথেই বুঝে গেলাম ইনি কে । নায়রার বাবা । চেহারা দেখেছি নায়রাদের দেওয়ালে, ছবিতে । সরাসরি কোন দিন দেখা হয় নি ।
পেছন থেকে নায়রার আওয়াজ পেলাম ।
-বাবা। তুমি এখানে?

নায়রার বাবা দেখলাম ঘরের ভেতরে ঢুকলো । তারপর আমার কলার চেপে ধরলো । এ
এই সেই শয়তান টা ! তুই পাঠিয়েছি ভিডিও ! বল !

আমি যে কি বলবো বুঝতেই পারলাম না । আমি যতই বলি না কেন যে আমি পাঠাই নি নায়রার বাবা বিশ্বাস করবে বলে মনে হয় না । তবে আমাকে কিছু বলতে হল না । দেখলাম নায়রা এগিয়ে এসে ওর বাবাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করছে । বলল, বাবা ওকে ছেড়ে দাও ।
-এটাকে আমি ছাড়বো না । এটাকে আমি পুলিশে দেব । এতো সাহস ওর !
-বাবা প্লিজ ছেড়ে দাও ।
-না ছাড়বো না । পুলিশে ফোন দিচ্ছি আমি এখনই ।
-বাবা প্লিজ ছেড়ে দাও ওকে । ও কিছু করে নি ।
-তুই কিভাবে জানিস ও করে নি ?
-কারণ ভিডিওটা আমি পাঠিয়েছি !

ঘরের ভেতরে যেন বোমা ফাঁটলো ! নায়রার বাবা তো অবাক হলেনই আমিও অবাক হয়ে গেলাম । এই মেয়ে বলে কি !!

নায়রার বাবা চলে গেলেন কিছু সময় পরে । নায়রা রয়ে গেল । আমি ওর বাবাকে বললাম যে আমি নায়রাকে বাসায় দিয়ে আসবো । কিছু সময় পরে আমি জানতে চাইলাম, এমন কাজ কেন করলে শুনি ?
-জানি না ।
-তুমি ভিডিও করেছিলে?
নায়রা হেসে ফেলল । বলল, হ্যা করেছিলাম । একবার না বেশ কয়েকবার ।
-সব গুলো এখনও রেখে দিয়েছো।
-হুম !
-বিয়ে কেন ভাঙ্গলে? তুমিই না বলেছিলো একজন ডাক্তার ছেলেকেই বিয়ে করবে। যতদুর জানি সায়েম সাহেব একদম তোমার চাহিদা অনুযায়ী একজন মানুস । ডাক্তার সরকারি চাকরি । সব কিছু রয়েছে ।
নায়রা কিছু সময় চুপ করে রইলো । তারপর বলল, আমিও তাই ভাবতাম । কিন্তু তারপর যখন সায়েমের সাথে মিশলাম বুঝতে পারলাম যে আমি হ্যাপি না । আমার কেবল তোমার আমার এক সাথে কাটানো সময় গুলোর কথা মনে পড়তো । কিছুতেই মাথা থেকে বের করতে পারতাম না এসব ! কিন্তু ঐদিকে আবার মাথা থেকে ঐ একটা শান্ত সুনিশ্চিত জীবনের কথাটাও বের করতে পারতাম না । কিন্তু যতই বিয়ের ডেট এগিয়ে আসতে লাগলো বুঝতে পারলাম না ঐ জীবন থেকে এই জীবনটাকে আমি মিস করছি বেশি । এবং কিছুতেই মন থেকে বের করতে পারছি না । যখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে বিয়ে করবো না সায়েম কে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে । ডেট পরে গেছে কার্ড ছেপে গেছে এমন কি কমিউনিটি হল ভাড়া নেওয়া হয়ে গেছে । শেষে এই বুদ্ধি বের করলাম ।

আমি কি বলবো খুজে পেলাম না । কেবল তাকিয়ে রইলাম নায়রার দিকে । তারপর বলল, তো এখন কি করবে ?
-জানি না কি করবো ! তোমাকে বিয়ের জন্য চাপ দিচ্ছি না আমি । বলছি না বিয়ে করতেই হবে । আমি জানি তুমি বিয়ের মত একটা ঝামেলা কাধে নিতে চাও না । স্বাধীন থাকতে চাও । তবে আমি চাই তোমার সাথে সময় কাটাতে …. আগের মত …..
-আগের মত? তোমার পরিবার?
-জানি না কিছু । এতো কিছু ভাবতে ভাল লাগছে না । আমি কেবল আমি কি চাই সেটা করলাম ! আর কিছু না !

কেন জানি নায়রাকে জড়িয়ে ধরতে ইচ্ছে করলো । এগিয়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলাম । তারপর ওর কপালে একটা ছোট্ট চুমু খেয়ে বললাম, কমিউনিটি হল যে ভাড়া করেছিলে সেটা কি ক্যান্সেল করে দিয়েছে তোমার বাবা ?
নায়রা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, জানি না তো না । বাবা জানে । কেন জানতে চাইছো?
-তোমার বাবাকে বল ক্যান্সেল না করতে । আর বিয়েট ডেট টাও একই থাকুক । কেবল বরের নামটা চেঞ্জ করে দিতে বল।
-তুমি নিশ্চিত ?
-হ্যা । বিয়ে ব্যাপারটা পছন্দ না হলেও তুমি তো পছন্দ । আর মুখে যতই স্বীকার না করি তোমার বিয়ে ভাঙ্গার পরে আমার সত্যিই ভাল লাগছিলো ।

তারপরই আর কি! নায়রার সাথে ঐ দিনই বিয়ে হয়ে গেল । একই কমিউনিটি সেন্টারে । অনেকে আমাকে ডাক্তার ভেবে ভুল করছিলো । বর যে বদলে গেছে অনেকে জানতেই পারলো না ।

গল্প টি হিন্দি সিনেমা লুডুর কাহিনী থেকে অনুপ্রাণিত

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.6 / 5. Vote count: 21

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

One thought on “বর বদল

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *