মহাজাগতিক প্রেমিকা

oputanvir
4.8
(49)

এপয়েন্টমেন্ট লেটারটা হাতে নিয়ে আমি অবাক হয়ে কিছুটা সময় তাকিয়ে রইলাম । গোটা গোটা অক্ষরে লেখা শর্ত গুলোর একটার দিকে আমার চোখ আটকে রইলো । আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিলো না যে এমন কিছু শর্ত কোন কোম্পানী দিতে পারে । আবার মনে হল আমি নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখছি । কারণ সকালে থেকে আমার সাথে যে বিস্ময়কর ঘটনা ঘটছে সেটা বাস্তবে ঘটার সম্ভাবনা খুব কম ।

সকাল বেলা আমি এমনিতেই একটু বেলা করে ঘুমাই । বিশেষ করে আমি যখন বেকার তখন সকালে উঠেই অফিস যাওয়ার তাড়া নেই । কিন্তু আজকে সকাল সাতটার সময়ই আমার ঘুম ভেঙ্গে গেল একটা অপরিচিত নাম্বারে । প্রথমবার আমি ঠিক ফোনটা ধরতে পারলাম না । এই সকাল বেলা আমাকে পরিচিত কেউ ফোন করবে না । অবশ্য আমাকে এমনিতেও কেউ ফোন করে না খুব দরকার না হলে ।

দ্বিতীয়বার রিং বাজার পর ফোনটা রিসিভ করলাম ।

-মিস্টার অপু রহমান বলছেন ?

পরিস্কার এবং গম্ভীর কন্ঠ শুনে আমি খানিকটা সচেতন হয়ে উঠলাম । আমি ঘুম জড়ানো কন্ঠটা আমি যথা সম্ভব স্বাভাবিক করে বললাম

-জি বলছি ।

-আপনি জনশন কোম্পানিতে এক্সিকিউটিভ পদে এপ্লাই করেছিলেন ?

আমি খানিকটা মনে করার চেষ্টা করলাম । বিডি জবসে আমি অনেক কোম্পানিতেই এপ্লাই করি, করেছি । আগে একটা হিসাব রাখতাম এখন আর সেটা রাখা হয় না । হয়তো করেছি, তবে নামটা আমি ঠিক মনে করতে পারলাম না । তবুও বললাম

-বিডি জবসের মাধ্যমে ?

-জি !

-হ্যা করেছিলাম ।

-জি । আপনার ভাইভা আজকে সকাল এগারোটায় । আপনার মেইলে একটা আপনার মেইল পাঠানো হয়েছে । সেখানে ভাইভার সিডিউল আর ঠিকানা পাঠানো হয়েছে গতকাল রাতে । আপনি দেখেছেন ?

-জি দেখেছি ।

যদিও এটা মিথ্যা কথা । আমি মেইল চেক করা বন্ধ করে দিয়েছি অনেক আগেই । ফোনটা কেটে গেল । আমি মেইল চেক করে দেখলাম সেখানে আসলেই একটা মেইল এসেছে । গুলশানের একটা ঠিকানা দেওয়া । সিডিউল টাইম এগারোটা পনের !

আমি ঘড়ির দিকে তাকালম । সাতটা এগারো বেজে গেছে । আমাকে যদি গুলশানে পৌছাতে হয় তাহলে আমাকে এখনই উঠতে হবে । তবুও আমি কিছুটা সময় শুয়েই রইলাম । ভাবতে লাগলাম আমি ইন্টারভিউতে যাবো কি না । চাকরির জন্য অপেক্ষা করতে করতে আমি আশা ছেড়ে দিয়েছিলাম । একটা সময় খুব আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতাম কিন্তু এখন প্রায় সবই হারিয়ে গেছে । এখন আর চাকরি করার আগ্রহ নেই । বাইক কিনেছিলাম বাসা থেকে কিছু টাকা নিয়ে । এখন সময় করে পাঠাওতে বাইক চালাই । ভাল ভাবেই চলে যায় ।

তবুও কি মনে হল আমি আবার উঠে পড়লাম । যাই একবার ভাইভা দিয়েই আসি । আর বাইক নিয়ে তো বের হতেই হবে । একটু আগেই না হয় বের হলাম আজকে ।

নির্দিষ্ট ঠিকানাতে পৌছাতে পনের মিনিট লেট হয়ে গেল । চকচকে মেঝের উপর দিয়ে হাটার সময়ই আমার প্রথম ব্যাপারটা মনে হল । এমন একটা অফিসে আমাকে ভাইভার জন্য কোন ভাবেই ডাকার কথা না । তাহলে ডাকলো কেন? আমি এই কথাটা চিন্তা করতে করতেই এগিয়ে যাচ্ছিলাম ।

গিয়ে দেখি আমি ছাড়া আর কেউ অপেক্ষা করে নেই । ভাবলাম যে এখানে আসাটাই ভুল হয়েছে । এখানে আমার চাকরি হবে না । উঠে ফেরার পথ ধরতে যাবো ঠিক সেই সময়ে একজন আমার দিকে এগিয়ে এল ।

-আপনি অপু রহমান ?

-জি ! আসুন । রাস্তায় সম্ভবত খুব জ্যাম ছিল, তাই না ?

বলেই লোকটা হাসলো । আমি লোকটার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ভাল করে দেখলাম । কালো স্যুট পরে আছে লোকটা । সাথে কালো টাই আর চকচকে সু । মুখে একটা হাসি লেগেই আছে ।

আমি কথার জবাব না দিয়ে কেবল হাসলাম একটু । লোকটা বলল

-আসুন আমার সাথে । অন্যদের ইন্টারভিউ শেষ হয়েছে মাত্রই ।

আমি লোকটার পেছন পেছন হাটতে লাগলাম । আমার তখনও মনে হচ্ছে কি যেন ঠিক নেই এখানে । অথবা আমি আমার ভাগ্যকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলাম না ।

ইন্টারভিউ হল সংক্ষিপ্ত আর সহজ । আমি যখন ভাইভাবোর্ড থেকে বের হলাম তখনই মনে হল আমার চাকরিটা হয়ে যাচ্ছে । কেন এমন মনে হল ঠিক বিশ্বাস হল না কিন্তু মনে হল । আমাকে বসতে বলা হল । আরও নাকি কি কাজ আছে । কিন্তু আমার মনে হল আজই আমাকে এপয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়ে দেওয়া হবে । হলই তাই । আধা ঘন্টার ভেতরেই আমার হাতে চলে এল লেটার ।

বেতনের পরিমাণটা দেখে আমি বেশ বড় রকমের ধাক্কা খেলাম । আমার তখনও মনে হতে লাগলো যে আমি এখনও স্বপ্ন দেখছি । এতো সহজে এমন চাকরি আমার হতে পারে না। এটা নিশ্চয়ই বড় ধরনের কোন ঝামেলা । কিছুটা সময় কেবল সোফার উপর বসেই রইলাম । কি করবো ঠিক বুঝতে পারছিলাম না । একবার মনে হল নিশ্চিত হওয়ার জন্য আরেকবার কথা বলে দেখি । কিন্তু সেই পরিকল্পনা বাদ দিলাম । তারপর চাকরির শর্ত গুলো পড়তে শুরু করলাম । তখনই আমি পরের ধাক্কাটা খেলাম । চাকরির একটা শর্ত দেওয়া রয়েছে যে চাকরিতে থাকা অবস্থায় আমার কোন প্রেমিকা থাকতে পারবে না । এমনি কি বিয়ের করতে চাইলে আমাকে অফিসের অনুমুতি নিতে লাগবে !

আমি কিছুটা সময় তাকিয়ে রইলাম কাগজটার দিকে । আমার ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিলো না যে এমন কিছু শর্ত কোন কোম্পানী দিতে পারে । আবার মনে হল আমি নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখছি । আমি যতদুর জানি কেবল মাত্র স্বসস্ত্রবাহিনীতে যারা চাকরি করে তারা যখন বিয়ে করতে যায় তখন অনুমুতির একটা ব্যাপার থাকে । কিন্তু প্রেমিকা থাকতে পারবে না এমন শর্ত তো কেউ দেয় না । এমন অদ্ভুদ শর্ত দেওয়ার অর্থ কি ?

-আপনার কি কিছু জিজ্ঞেস করার আছে ?

আমি মুখ তুলে তাকিয়ে দেখি স্যুট পরা লোকটা লোকটা আমার সামনে এসে দাড়িয়ে আছে । আমি বললাম

-কিছু জিজ্ঞেস করার ছিল ।

-আসুন আমার সাথে ।

আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে লোকটা হাটতে শুরু করলো । আমিও তার পেছন পেছন হাটতে শুরু করলাম । একটা কেবিনের দরজার সামনে এসে দাড়ালো যে । তারপর দরজা খুলে বলল

-ভেতরে মিস নিহিন সুলতানা আছে । আপনি তার সাথেই কাজ করবেন । আপনাকে সব কিছু সেই বুঝিয়ে দিবে । তার সাথেই বরং কথা বলুন ।

আমি কেবিনে ঢুকতেই আরেকটা বড় রকমের ধাক্কা খেলাম । আজকে কি হচ্ছে আমার সাথে !

আমি বেশ কিছু দিন ধরেই বাইক শেয়ার করি । আরও ভাল করে বললে এটাই হচ্ছে আমার আয়ের সব থেকে বড় উৎস। পরপর তিন দিন মেয়েটা আমার বাইকে উঠেছে। অর্থ হচ্ছে মেয়েটা বাইকের জন্য রাইড রিকোয়েস্ট করেছে এবং পরপর তিন দিন আমাকেই পেয়েছে । বাইক শেয়ারে এমন ঘটনা খুব একটা হয় না । কারন যখন মোবাইলে নোটিফিকেশ আসে তখন আমার উপরে এটা নির্ভর করে যে আমি সেই রাইডটা নিবো কি না, এবং আমি নিজেই ফোন দেই । প্রথম দিন যখন ফোন দিয়ে হাজির হলাম মেয়েটাকে দেখে আমি খানিকটা চমকে গেছিলাম । মেয়েটা ধবধবে সাদা রংয়ের কামিজ আর সাদা লেগিংস পরে ছিল । এই পোশাকটা আমার খুব বেশি পছন্দ । সিমুকে আমি অনেকবার বলতাম এটা পরার জন্য । কিন্তু ও এসব একদম পছন্দ করতো না । মেয়েটার দিকে কিছুটা সময় তাকিয়ে রইলাম । মেয়েটা খুব স্বাভাবিক ভাবেই এসে আমার সাথে কথা বলল তারপর বাইকের পেছনে উঠে বসলো । বুঝতে কষ্ট হল না মেয়েটার বাইকে চড়ে অভ্যাস আছে ।

কিন্তু পরপর তিন দিন যখন একই মেয়ে আমার বাইকে এসে উঠলো তখন আমি অবাক না হয়ে পারলাম না । এমনটা আসলেই খুব একটা হয় না । তাহলে এমন কেন হচ্ছে ?

আমাকে দেখে মেয়েটা একটু যেন হাসলো । যেন আমাকে এখানে দেখবে সেটা সে আগে থেকেই আশা করেছিলো । তাহলে মেয়েটার কি কোন হাত আছে ? নাহ । সম্ভাবনা টা একদম বের করে দিলাম । এমন টা হতেই পারে না । এই মেয়েকে রাইড শেয়ার বাদ দিয়ে আমি আর কোন দিন দেখি নি ।

যখন আমি অফিস থেকে বের হলাম তখন কেন জানি অন্য রকম অনুভুতি হচ্ছে । কিছুতেই নিজের সৌভাগ্যের ঘটনাটা বিশ্বাস হচ্ছে না । সিড়ির কাছে আসতেই আবারও ওর ফোনে আবারও একটা বাইক রাইডের রিকোয়েস্ট আসলো । আমার কেন জানি মনে হল এই রিকোয়েস্টাও ঐ নিহিন সুলতানা থেকে । আমি রিকোয়েস্ট টা গ্রহন করবো না করবো না করেও এক্সেসপ্ট করে ফেললাম । ফোন দিলাম । আমি কন্ঠটাও চিনতে পারলাম খুব সহজেই । তখনই আমার মনে হল যে আমার চাকরি পাওয়ার পেছনে মেয়েটার নিশ্চয়ই হাত আছে । এই মেয়েটা নিশ্চিত ভাবেই কিছু না কিছু করেছে ।

-অপু সাহেব !

আমি ফিরে তাকালাম । নিহিনই দাড়িয়ে আছে । আমার দিকে তাকিয়ে হাসলো । তারপর বলল

-ব্যাপারটা খুব ইন্টারেস্টিং । তাই না ? পরপর চারদিন !

আমিও হাসলাম । আসলেই ব্যাপারটা খানিকটা অন্য রকমই । এমনটা হয় না বললেই চলে ।

-ঠিক বলেছেন ।

আমি বাইক স্টার্ট দিতে দিতে নিহিন আমার পেছনে উঠে এল । আমি বললাম

-কোথায় যাবেন ?

যদিও ডেস্টিনেশন আমি আগে থেকেই জানি । তবুও আমি প্রশ্নটা করলাম । নিহিনের হাসির শব্দ শুনলাম । তারপর বলল

-এটাই সম্ভবত আপনার শেষ রাইক শেয়ার । আর বাইক রাইড শেয়ার করা লাগবে না । রাইট ?

-মনে হচ্ছে ।

আমার কেন জানি মনে হল নিহিন সুলতানার সাথে আমার সামনে আরও অনেক রাইড শেয়ার করতে হবে । আমি বাইক স্টার্ট দিলাম । অনুভূব করলাম নিহিন আমার শরীর ঘেষে এসেছে । একটু যেন বেশিই কাছে ।

দুই

আমার চাকরির একটা শর্ত ছিল যে আমার অবশ্যই কোন প্রেমিকা থাকবে না । কিন্তু তিন মাসের মাথায় সেই শর্ত আমি ভেঙ্গে ফেললাম । এবং সব থেকে মজার ব্যাপার হচ্ছে নিহিন আমার প্রেমিকা হয়ে গেল । মেয়েটা একদম শুরু থেকেই আমার প্রতি একটু যেন বেশিই আগ্রহী ছিল । আমি প্রথম প্রথম একটু নিজেকে দুরে রাখতে চেয়েছিলাম । এক তো আমার চাকরির শর্ত হচ্ছে প্রেম করা যাবে না দুই হচ্ছে সিমু আমাকে ছেড়ে চলে যাওয়ার পরপরই আমার আসলেই এই প্রেম ভালবাসার সম্পর্কের উপরে বিরক্ত ধরে গিয়েছিলো কিন্তু এই মেয়েটাকে আমি কিছুতেই দুরে রাখতে পারলাম না । সে আমার প্রেমিকা হয়েই গেল ।

দিন গুলো সত্যিই সত্যি চমৎকার ভাবে কাটতে লাগলো । নিহিন নামের মেয়েটা যে কি পরিমান চমৎকার প্রেমিকা হতে পারে সেটা আমি ভাবতেও পারছিলাম না । এতোদিন আমি গল্প উপন্যাসে যে যে রকম প্রেমিকার কথা শুনে এসেছিলাম নিহিন একদম সেই রকম একজন মেয়ে । আমার পছন্দের সব কিছু সে করে । আমাকে মুখে ফুটে কিছু বলতেও হয় না যে আজকে এই ভাবে সেজো আমার জন্য কিংবা এই ভাবে আমাকে জড়িয়ে ধরো, এই ভাবে অভিমান করো আমার সাথে । কেমন করে যেন নিহিন সব বুঝে যায় । ওর সব কিছু যেন আমার মনের মত । আমি মাঝে মাঝে কেবল ওর দিকে অবাক হতে তাকিয়ে থাকি । আর ভাবি আসলেই এমন কেউ আমার ভাগ্যে ছিল !!

আমার প্রথম প্রথম ভয় হত যে আমার আর নিহিনের সম্পর্কের ব্যাপারে অফিসে জানতে পারলে হয়তো আমার চাকরি চলে যাবে । তাই আমি খানিকটা লুকিয়ে রাখতাম. কিন্তু পরে আমি বুঝতে পারলাম যে নিহিন আমার চাকরির থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ন । চাকরিতে যদি খুব বেশি সমস্যা করে তাহলে আমি চাকরিটা ছেড়ে দিব ।

কিন্তু সমস্যা হল অন্য খানে । এমন কিছু যে আমার জন্য অপেক্ষা করছিলো সেটা আমি ভাবতেও পারি নি ।

অফিস শেষ করে বের হতেই নিহিন আমার কাছে এসে বলল

-শুনো আজকে আমার একটু কাজ আছে ।

-আমি আসবো ?

-নাহ । তোমাকে আসতে হবে না । আমি একজনের বাসায় যাবো ।

নিহিন কার বাসায় যাবে ? একটু কৌতুহল হল । কারণ এই ছয় মাসে আমি একটা ব্যাপার লক্ষ্য করেছি যে নিহিনের কোন বন্ধু বান্ধব কিংবা আত্মীয় নেই । আমি কয়েকবার জানতে চেয়েছি কিন্তু ও ব্যাপারটা এড়িয়ে গেছে । নিহিনের পরিচিত বলতে কেবল মাত্র আমি আর আগে ছিল আমাদের বস আজগর সাহেব । আজগর সাহেব কদিন আগে দেশের বাইরে গেছেন কোন একটা কাজে । শুনেছি খুব সম্প্রতি তার নাকি ফেরৎ আসার সম্ভবনা নেই । সেই হিসাবে নিহিনের পরিচিত মানুষ কেবল আমি । মানে অফিসের বাইরে আমার সাথে ছাড়া ও আর কারো সাথে মেশে না । এই ব্যাপারটা আমার কাছে সব সময়ই একটু অদ্ভুদ লেগেছে । যাক সেটা আমি মেনে নিয়েছি । কিন্তু আজকে যখন বলল একজনের বাসায় যাবে তখন একটু কৌতুহল হলই । বললাম

-কার বাসায় যাবে ?

নিহিন সে প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল

-আছে । তুমি চিনবে না ।

-তা তো চিনবো না বুঝলাম । কিন্তু আমাকে বলতে কি সমস্যা ?

নিহিন এবার আমার কাছে এগিয়ে এসে আমার ঠোঁটে আলতো করে চুমু খেয়ে বলল

-এতো জোর কর না প্লিজ । সময় হোক আমি নিজেই তোমাকে বলবো সব । আমি এখন যাই ?

আমি আর কিছু বললাম না । নিহিন আবার বলল

-আমার ফিরতে একটু দেরি হবে । কেমন ? আমি ফিরে তোমাকে ফোন দিব ?

-আচ্ছা !

আমি নিহিনের চলে যাওয়া দেখলাম । সত্যি বলতে কি আমার কেমন যেন অদ্ভুত লাগলো । এমন কেন যে লাগলো সেটা আমি বলতে পারবো না ।

আমি বাইক স্টার্ট দিলাম । আজকে যেহেতু নিহিন আমার সাথে নেই তাই এতো জলদি বাসায় ফেরার কোন তারা নেই । বলতে ভুলে গেছি মাস খানেক ধরেই আমি নিহিনের ফ্ল্যাটে উঠে এসেছি । ওর জোড়াজুড়িতেই । আমরা যেহেতু একে অন্যের কথা চিন্তা না করে থাকতে পারি না সেহেতু দুরে দুরে থেকে কি লাভ । এর থেকে কাছাকাছি থাকি সব সময় । এক সাথে থাকা শুরুর পনেরো দিনের মাথায় আমি একদিন আবিস্কার করলাম যে নিহিন সেই ফ্ল্যাট টা আমার নামে লিখে দিয়েছে । আমি মোটেই বুঝতে পারলাম না এমন একটা কাজ সে কিভাবে আর কেনই বা করলো ! ওর কাছে জানতে চাইলে ও কেবল বলল যে আমাকে সে মন দিয়েছে আর সামান্য ফ্ল্যাট দিতে পারবে না !

আমি আপন মনে বাইক চালাচ্ছিলাম । শহর ছেড়ে চলে এলাম বসিলা ব্রিজের দিকে । আগে সময় পেলেই এখানে আমি আসতাম । একা একা সময় কাটাটাম নদীর ধারে । আজকেও কিছু সময় বসে থাকতে ইচ্ছে ইচ্ছে করলো । এখানে দিনের বেলাতেও লোকজন খুব একটা আসে না । শহরের সকল কোলাহল সব ব্রিজের ঐ পাশ পর্যন্ত । এই পাশে যেন সব নিরব । আর সন্ধ্যা হওয়ার পরপরই এখানে লোক চলাচল একদমই কমে যায় ।

নদীর কাছেই একটা চায়ের দোকান আছে । লোকজন কম হলেও এই দোকান টা খোলা থাকে অনেক রাত পর্যন্ত । দোকানে এক কাপ চায়ের কথা বলে আমি নদীর পাড়ে গিয়ে বসলাম । সব সময় এখানেই বসে আমি চা খেতাম । আমার মত অনেকেই খেত ।

একটু পরেই চা এসে হাজির । তবে যে চা দিয়ে গেল সে অন্য লোক । চায়ের দোকানের মামা নয় । আমি খুব বেশি মাথা ঘামালাম না । আপন মনে চুমুক দিলাম চায়ে । স্বাধটাও যেন একটু অন্য রকম লাগলো । অথবা অনেক দিন পরে এখানে চা খেতে আসছি এই জন্য হয়তো অন্য রকম লাগছে । কিন্তু একটু পরে যখন মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো তখন বুঝতে পারলাম কোথায় কোন সমস্যা আছে ।

উঠে দাড়ানোর চেষ্টা করলাম । কিন্তু সাথে সাথেই আমার মাথা ঘুরে উঠলো । বুঝতে পারলাম যে চায়ের ভেতরে কিছু মেশানো ছিল ।

কিন্তু কেন ?

আমার বাইকটা !

হ্যা ! বাইকটা নেওয়ার জন্যই এই কাজটা করেছে কেউ । অন্ধকার নেমে গেছে । কেবল দোকান থেকে টিমটিমে আলো এসে চারিদিকে আলোকিত করে দিচ্ছে কিছুটা । সেই আলোতেই আমি দেখতে পেলাম স্যুট টাই পরা এক লোক আমার দিকে এগিয়ে আসছে । চোখ বন্ধ করার আগে আমি লোকটার চেহারা ভাল করে দেখার চেষ্টা করলাম । তারপরই খানিকটা অবাক হয়ে গেল । লোকটা বিদেশী !

আমি বুঝতেপারলাম না একজন বিদেশী আমার বাইক কেন চুরি করতে যাবে ! আমি জ্ঞান হারালাম ।

তিন

চোখ খুলে কিছু সময় বোঝার চেষ্টা করলাম আমি কোথায় আছি । নরম বিছানায় শুয়ে আছে । আমার মনে হল নিহিন আমার পাশে শুয়ে আছে । প্রতিদিন সকালে আমাদের যেভাবে ঘুম ভাঙ্গে । এভাবে কেটে গেল কয়েকটা মুহুর্ত । তার পরেই আমার সব কিছু মনে পড়ে গেল । নদীর ধার, আমার চায়ের কিছু মেশানো হয়েছিলো আমি জ্ঞান হারিয়েছিলাম !

কিন্তু আমি এখানে কেন ?

আমি তো ভেবেছিলাম তারা কেবল আমার বাইক নিয়ে যাবে কিন্তু আমাকে এখানে কেন নিয়ে এসেছি । আমি ঝট করে বিছানা থেকে উঠে বসলাম । আর তখনই লক্ষ্য করলাম যে আমি কেবল একা নই রুমের ভেতরে । বিছানা থেকে একটু দুরে একটা বড় টেবিল । তার ওপাশে পাতা চেয়ারে একজন বসে আছে । কি যেন পড়ছে । আমি জেগে উঠেছি এটা যে জানে তবুও আমার দিকে সে তাকিয়ে নেই । আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই তিনি বই থেকে মুখ না তুলে লোকটা ইংরেজিতে বলল

-ঘুম ভাল হয়েছে মিস্টার অপু ?

-আপনি কে ?

-আমি কে সেটা জরুরী না । জরুরী হচ্ছে আপনি এখানে কেন ? তাই না ?

-হ্যা । তাই । আমাকে এখানে কেন আনা হয়েছে ?

-কারণ তো আছেই । তার আগে বলেন আপনি সুস্থবোধ করছেন তো ?

আমি কোন কথা বললাম না । লোকটা বলল

-অপু সাহেব, আপনার সাথে আমাদের জরুরী কথা আছে । আমি জানি আপনাকে এভাবে এখানে আনা আর বেআইনি কিন্তু এ ছাড়া আমাদের আর কোন উপায় ছিল না । আমরা কি কথা বলতে পারি ? আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে কথা শেষ হলেই আপনাকে আমরা আপনার বাসায় পৌছে দেওয়া হবে । আপনার কোন ক্ষতি হবে না ।

আমি বললাম

-বলুন কি কথা ?

লোকটা এবার মুখ তুলে আমার দিকে চাইলো । তারপর চোখের ইশারাতে আমাকে টেবিলের পাশে রাখা খালি চেয়ারে বসতে ইশারা করলো । আমি নিরবে সেখানে গিয়ে বসলাম ।

লোকটা হাতে এবার একটা আইপ্যাড দেখতে পেলাম । সেটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল

-এই মেয়েকে নিশ্চয়ই আপনি চিনেন ?

আমি ছবিটার দিকে তাকালাম । সাথে সাথেই আমার মুখ শক্ত হয়ে গেল । আমি বলল

-যদি নিহিনের কিছু হয় !

লোকটা যেন আমার কথা শুনে খুব মজা পেল । একটু হেসে বলল

-চিন্তা করবেন না । আমরা আপনার প্রেমিকাকে কিছু করবো না । বরং তাকে কিছু করার কোন ক্ষমতা আমাদের নেই । আমরা আপনাকে বাঁচাতে চাইছি ।

আমি খানিকটা বোকার তাকিয়ে রইলাম । তারপর বললাম

-মানে ? কি বলতে চাইছেন আপনি !

লোকটা আবারও বলল

-আমার কথা হয়তো আপনার বিশ্বাস হবে না । তার আগে আমি আমার পরিচয় দিয়ে নেই ।

এই বলে লোকটা কোর্টের পকেট থেকে একটা আইডি কার্ড আমার দিকে বাড়িয়ে দিল । আইডি কার্ডটার দিকে তাকিয়ে আমি খানিকটা অবাক হলাম । লোকটার নাম এরিক বিপমিন । সে আমেরিকান স্পেস রিসার্চ এন্ড টেকনোলজির একজন বড় কর্মকর্তা । আমি সত্যিই এবার অবাক না হয়ে পারলাম না । এই লোক আমার কাছে কি চায় ?

এরিক বলল

-এবার আমি আপনাকে যা বলবো তা নিশ্চয়ই আপনার বোধগম্য হবে ? শুরু করবো ?

আমি কোন কথা না বলে কেবল মাথা নাড়ালাম । এরিক আবারও আমার দিকে আইপ্যাডটা বাড়িয়ে দিল । বলল

-ছবি দুটো দেখুন ।

সোয়াপ করে দুটো ছবি দেখলাম । দুটো মেয়ের ছবি । তাদের সাথে দুজন যুবক ।

এরিক বলল

-এই দুজনের সাথে আপনার কি মিল আছে বলেন তো দেখি ?

-জানি না । একজন তো সম্ভবত আমেরিকান । অন্য জন আফ্রিকার কোন দেশের হবে । রাইট ?

-হ্যা । উগান্ডার অধিবাসী ।

-এদের সাথে আমার কি মিল হতে পারে ? কেবল বয়সে আমরা কাছাকাছি । আর কোন মিল খুজে পেলাম না ।

আমি ছবি দুটো আবারও দেখলাম । এরিক আমার দিকে ঝুকে এসে বলল

-আমি যদি বলি, এই দুজনের যে প্রেমিকা ছিল আর আপনার যে বর্তমান প্রেমিকা আছে তারা একই জন তাহলে কি বিশ্বাস করবেন ?

আমি বলল

-আপনার নিশ্চয়ই মাথা খারাপ হয়ে গেছে । তাই না ?

-জি না মিস্টার অপু । আমি ঠিক বলছি । আপনার প্রেমিকা আর এই ছেলে দুটোর প্রেমিকা একই জন । একই মেয়ে ! আরও ভাল করে বলল একই প্রাণী !

-আপনি কি বলছেন এই সব ?

-হ্যা । আপনার এই প্রেমিকা এই পৃথিবীর কো প্রাণী নয় । সে স্পেশ থেকে আসা একজন প্রাণী । সে কিছু খুজতে এসেছে এই পৃথিবীতে । কিছু দিন পরপরই সে একজন ছেলেকে খুজে নেয় । তার সাথে প্রেম ভালবাসা শুরু করে । তার কদিন পরেই ছেলেটা মারা যায় । উগান্ডাতে এই যুবক মারা যাওয়ার পরে তাকে পুলিশ ধরে ফেলেছিলো কিন্তু সেখানে থেকে কিভাবে পালিয়ে যায় যেন । আমেরিকান ছেলেটার মারা যাওয়ার সময়ও আমরা তাকে ধরেই ফেলেছিলাম । কিন্তু আমাদের হাত থেকেও সে পালিয়ে গেছে । অনেক খোজার পরে তাকে আবার খুজে পেয়েছি । তার শরীর থেকে নির্গত আলাদা রে সিগনেচার আমাদের বিশেষ ভাবে তৈরি স্যাটেলইট ধরা পড়ে । এই স্যাটেলাইট টা আমরা তৈরি করেছিলাম মহাজাগতিক প্রাণীদের অস্তিত্ব খোজার জন্য । তবে এটার ক্ষমতা খুব সীমিত তাই সব সময় সেই রে সিগনেচার ধরা পড়ে না । মাঝে মাঝে পড়ে । তাই বিভিন্ন রুপে থাকলেও তাকে আমরা খুজে বের করেই ফেলি ! কদিন আগেও দুইটা আলাদা রে সিগনেচার আমরা ধরতে পেরেছিলাম । মাঝে হঠাৎ করেই একটা গায়েব হয়ে যায় । আজকে আবার বেশ কয়েকটা ধরা পড়ছে থেকে । ওরা বেশ কয়েকজন এখানে এসে হাজির হয়েছে । ওরা কিছু একটা প্লান করছে । কি করছে সেটা আমাদের জানা দরকার !

আমি চুপ করে বসে রইলাম কিছুটা সময় । আমার মাথায় এসব কিছুই ঢুকছে না । বারবার মনে হচ্ছে এটা কি সত্য হতে পারে । এরিক আবার বলল

-আপনার সাথে আপনার প্রেমিকার পরিচয় হওয়ার আগের ঘটনা গুলো একটু চিন্তা করে দেখুন । গভীর ভাবে চিন্তা করে দেখুন । তাহলেই অসংগতিটা ধরতে পারবেন ।

আমি আবারও চিন্তা করতে লাগলাম । আসলেই তো । নিহিনের সাথে আমার পরিচয়টা ঠিক স্বাভাবিক না । বিশেষ করে পরপর চারবার ঐভাবে বাইকে রিকোয়েস্টা আমার কাছে কিভাবে এল ?

এরিক বলল

-ওরা টেকনোলজিতে আমাদের থেকে অনেক অনেক এগিয়ে । অনেক বেশি উন্নত । কিন্তু ওরা আমাদের কাছে কি চায় ?

আমি কি করবো ঠিক বুঝতে পারলাম না । এরিক যে মিথ্যা বলছে না সেটা আমি বুঝতে পারছি । কিন্তু এখন আমার কি করতে হবে ? আমার করনীয় কি ? এরিক বলল

-আপনাকে কিছু করতে হবে না । এই বলে একটা কয়েনের মত গোল বস্তু আমার হাতে দিল । তারপর একটা ছোট রিমোর্ট কন্ট্রোলার আমার হাতে দিল । তারপর বলল

-দেখুন আগের দুজন মারা গেছে । আপনিও মারা যেতে পারেন । নিজেকে বাঁচান । তবে আপনি চাইলে আরও অনেক কেই বাঁচাতে পারেন । ওরা যা খুজছে তা যদি আপনার কাছ থেকে না পায় তাহলে অন্য কারো কাছে যাবে । অন্য কাউকে মারবে । সো সিদ্ধান্তটা আপনার !

আমি কিছুটা সময় চিন্তা করে বললাম

-আমাকে কি করতে হবে ?

-কিছু না । কেবল এই কয়েনের মত জিনিসটা দেখছেন এটা ঐ প্রাণীর শরীরে চেপে ধরবেন । তারপর এই রিমোর্টের লাল সুইট টা চেপে ধরবেন । ব্যাস আর কিছু করা লাগবে না । সে আর পালাতে পারবে না । যত সময় এই কয়েকটা ওর শরীরে আটকে থাকবে তত সময় সে আমাদের হাতে বন্দি । আমরা তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাই । তার উদ্দেশ্য জানতে চাই ।

আমি তখনই ঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছি না । আমার আসলে কি করা উচিৎ এখন ? কি করবো ?

চার

নিহিনের ফ্ল্যাটে ফিরে এলাম । তখনও নিহিন ফেরৎ আসে নি । এরিক বলেছিলো সে আসবে না । মহাজাগতিক এই প্রাণী গুলো বেশি চালাক । তারা সব দিকে লক্ষ্য রাখে । ওরাই আমাকে চাকরির ব্যবস্থা করে দিয়ে । ওদের কাছাকাছি নিয়ে এসেছে । তারপর প্রতিটা সময় আমার দিকে লক্ষ্য রেখেছে । আমি কোথায় যাই না যাই । এই জন্য আমার সাথে এরিক আগে যোগাযোগ করতে পারি নি । যদি ওরা জেনে যায় তাহলে সাথে সাথেই অন্যত্র চলে যায় । তাই আজকে আমার সাথে যোগাযোগ করেছে ।

আমি মনে মনে ঠিক করে নিলাম । এরিক আমাকে যা যা করতে বলেছে সেটা আমি করবো না । আমি ওকে সরাসরি জিজ্ঞেস করবো । দেখি নিহিন কি উত্তর দেয় । আমি নিহিননের চোখের দিকে তাকিয়ে থেকেছি কেবল । ঐ চোখ কখনও মিথ্যা বলতে পারে না । আমার কেবলই মনে হয়েছে মেয়েটা আমাকে ভালবাসে । সত্যিই ভালবাসে !

নিহিনের বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় বারোটা বেজে গেল । আমি টিভি দেখছিলাম । অবশ্য কিছুই দেখছিলাম না । কেবল চেয়েছিলাম । মাথার ভেতরে এরিকের কথাই ঘুরছিল ।

দরজা দিয়ে নিহিন ঢুকতেই আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো । আমি ওর নিঃশ্বাস নেওয়ার আওয়াজ টুকু পর্যন্ত শুনতে পাচ্ছিলাম । মেয়েটা আমাকে জড়িয়ে ধরে পরম আনন্দ পাচ্ছে । আমি বললাম

-কি হয়েছে ?

নিহিন কোন কথা বলল না । কেবল চুপ করেই রইলো । আমি বললাম

-আমার কিছু বলার আছে ।

নিহিন আমার কন্ঠ শুনেই বুঝলো কিছু সমস্যা হয়েছে । আমাকে ছেড়ে দিয়ে বলল

-কি হয়েছে ?

আমি পকেট থেকে মোবাইল বের করেই সেই ছেলে দুটোর ছবি দেখালাম ওকে । ছবি দুটো দেখতেই ওর মুখ গম্ভীর হয়ে গেল । আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল

-ঐ আমেরিকান তোমার সাথে যোগাযোগ করেছিলো তাই না ?

-সেটা বড় কথা না । আমি জানতে চাই যে এই দুটো ছেলে তোমার কারণে মারা গিয়েছে কি না ?

নিহিন অনেকটা সময় চুপ করে থেকে বলল

-হ্যা ।

আমি বললাম

-তো এবার আমার পালা ? আমি মরবো ? আমাকে মারবে তুমি ?

-না না । প্লিজ এমন করে বলো না । আমি তোমাকে কোন মরতে দিতে পারি ?

-তাহলে ? কেন এসেছো তুমি আর কি চাও ?

নিহিন বলল

-আজকে আমি সত্যিই তোমাকে বলতাম সব । কিন্তু তুমি ….

-আমি সব জানতে চাই । কেন তুমি আমার সাথে এমনটা করলে ? আমি তোমাকে ভালবেসেছিলাম …

নিহিনের চোখে আমি অশ্রু দেখতে পেলাম । নিহিন বলল

-আমিও তোমাকে ভালবাসি অপু । আমি যে উদ্দেশ্য নিয়েই তোমার কাছে আসি না কেন আমি তোমাকে ভালবাসি এটা মিথ্যা না ।

-তাই ?

-তাহলে কেন আমাকে সত্য বল নি । আর এটা তোমার আসল রূপও তো না । আমি তোমাকে চিনিও না । কে তুমি ?

নিহিন বলল

-আমার আসল চেহারা দেখতে চাও ? ভয় পাবে না তো ?

আমি কেবল তাকিয়ে রইলাম ওর দিকে । কোন কথা বললাম না । সাথে সাথে ওর চেহারা পরিবর্তিত হতে লাগলো । ওর মুখটা আরও লম্বাতে হতে থাকলো । শরীরের রংটা গাঢ় সবুজ হতে সুরু করলো । দুই হাত নিচ দিয়ে আরও আরও দুটো হাত বের হয়ে এল । সেই সাথে পা টাও আরও একটু যেন লম্বা হয়ে এল । পেছন দিয়ে লেজ বের হয়ে । চোখ কানটা একটু দেবে গিয়ে কান দুটো খরগোসের কানের মত খাড়া হয়ে গেল । আমি কেবল তাকিয়ে তাকিয়ে ওর পরিবর্তন দেখলাম । তারপর থপ করে বসে পড়লাম ।

-অপু ।

আমি মুখ তুলে তাকালাম । প্রাণীটা আমার দিকে তাকিয়ে আছে ।

-আমার কথাটা একটা বার শুনবে ?

আমি মুখ নাড়তে দেখলাম না । তবে ওর কথা আমি ঠিকই শুনতে পাচ্ছি ।

-তোমার নাম কি ?

-আমার নাম “টিচিন্ছটি” । আমি সত্যিই তোমার কিংবা তোমাদের কোন ক্ষতি করতে আসি নি ।

-তাহলে ঐ ছেলে দুটো কিভাবে মারা গেল ? কিভাবে ?

আমি আবারও লক্ষ্য করলাম যে টিচিন্ছটির মুখ নড়লো না । তবে আমার কথা শুনতে কোন কষ্ট হচ্ছে না । টিচিন্ছটি বলল

-আমার গ্রহের অবস্থান তোমাদের গ্রহ থেকেও অনেক দুরে । আমরা আমাদের কে বলি “টিফগ্গুলা” তবে তোমার বৃহস্পতি গ্রহের পেছনে আমাদের একটা সাব স্টেশন আছে । ওটা এমন ভাবে বানানো যে তোমাদের দেশের বিজ্ঞানীরা ওটাকে বৃহস্পতি গ্রহের একটা উপগ্রহ হিসাবে ধরে নিয়েছে । আমরা সেখান থেকেই তোমাদের পৃথিবীর উপর চোখ রাখি ।

টিচিন্ছটি একটু থামলো । ওর দিকে তাকিয়ে আমার অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে । আমি বিশ্বাসই করতে পারছি না যে একটা মহাজাগতিক প্রাণী আমার সামনে দাড়িয়ে আছে । এতোদিন আমার সাথেই ছিল । নিহিন বা টিচিন্ছটি আবার বলতে শুরু করলো

আমাদের গ্রহে আমরা সব কিছুতেই তোমাদের থেকে এগিয়ে । আমাদের অনেক ক্ষমতা । তার একটা তুমি দেখতেই পাচ্ছো যে আমি যে কোন রূপ ধরতে পারি । তবে কেবল মাত্র একটা জিনিস চিন্তা করলে আমরা তোমাদের থেকে অনেক পিছিয়ে । সেটা হচ্ছে আমাদের লাইক এক্সপেনশন খুব কম তোমাদের থেকে । তোমরা একেক জন কম করেই ৬০/৭০ বছর বাঁচো । আবার কেউ কেউ ১০০ বছর কিংবা তার থেকেও বেশি । তোমাদের সৌর বছর হিসাবে আমাদের গড় আয়ু মাত্র ১০/১৫ বছর ছিল । এবং দিন দিন সেটা কমছিল । কোন ভাবেই এটা বাড়ানো সম্ভব ছিল না । এমন চলতে থাকলে আমরা হয়তো খুব শ্রীঘ্রই বিলুপ্ত হয়ে যাবো । তারপরই আমরা তোমাদের আবিস্কার করি । আমাদের বিজ্ঞানীরা তোমাদের মানুষের ডিএনএ নিয়ে বিস্তার গবেষণা করেছে । তারপর তারা মত দেয় যে তোমাদের শুক্রানু দিয়ে যদি আমাদের গর্ভধারন করানো যায় তাহলে আমাদের আয়ু বেশ খানিকটা বেড়ে যেতে পারে । কিন্তু সেটা হতে হবে একেবারে পারফেক্ট কম্বিনেশন । যদি আমাদের আর তোমাদের ডিএনএ ম্যাচ না করে তাহলে আমাদের আয়ু বাড়ানো সম্ভব না ।

আমাদের জাতির মধ্যে আমি হচ্ছি সব থেকে পারফেক্ট ডিএনএ গঠনের অধিকারী । আমাকেই বেঁছে নেওয়া হয় নতুন প্রাজাতীর টিফগ্গুলা তৈরির জন্য । তাই আমি এখানে এসেছি । আজ থেকে প্রায় ৪০ বছর আগে থেকেই আমরা তোমাদের এই গ্রহে অবস্থান করছি । তোমাদের মাঝেই আছি । কেবল মাত্র নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার জন্য । আর যে দুজন মারা গেছে সেটার জন্য আমি আমার ভুল ছিল । ওরা দুজনেই খুব কাছাকাছি ছিল আমার ডিএনএ ম্যাচের জন্য কিন্তু পারফেক্ট ছিল না । আমার সাথে মিলন করার সময় ওরা চাপটা সহ্য করতে পারে নি । কিন্তু

আমি বললাম

-কিন্তু ?

-কিন্তু তুমি দেখো … একদম সুস্থ আছো । তোমার কিছু হয় নি কারণ তুমি আমার পারফেক্ট ম্যাচিং ! আর আমার যাবার সময় চলে এসেছে কারণ গতকালই আমি নিশ্চিত হয়েছি যে আমার শরীরে নতুন প্রাণের সৃষ্টি হয়েছে ।

আমি চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলাম । আমি যেন নিজের কানকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছিলাম না । নিহিন বা টিচিন্ছটি বলল

-তুমি আমার এবং আমাদের যে উপকার করেছো তার কথা আমরা কোন দিন ভুলবো না । তোমার ডিএনএ স্যাম্পল আমি আজকেই পাঠিয়ে দিয়েছি । আর সব থেকে বড় উপহার তো সাথে করেই নিয়ে যাচ্ছি ।

এই বলে সে নিজের পেটের দিকে হাত দিল । কেবল অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম । কি বলবো ঠিক বুঝতে পারলাম না । সেই সময়ে একটা থপ করে আওয়াজ হল । মনে হল কিছুর সাথে যেন এসে কিছু ধাক্কা মারলো । আমার চোখে চলে গেল নিহিন বা টিচিন্ছটির পেছনে । আমরা ড্রায়িং রুমে বসে কথা বলছিলাম । একটা কাচের জানালা খোলা ছিল । সেটার দিকেই আমার চোখ গেল । কাঁচের জানালার কাছে একটা ফাঁটল দেখতে পাচ্ছি । তবে সেটা ভেঙ্গে পড়ে নি ।

আওয়াজ হওয়ার সাথে সাথেই নিহিন বা টিচিন্ছটি আমাকে নিচে দেওয়ালের আড়ালে চলে গেল । আমার দিকে তাকিয়েই বলল

-স্নাইপার ! পাশের বিল্ডিং থেকে গুলি করেছে । ভাগ্য ভাল যে বুলেট প্রুফ কাঁচ লাগিয়েছিলাম ।

-কি ! কিন্তু ওরা যে বলল তোমার সাথে কথা বলতে চায় । তুমি কি চাও সেটা জানতে চায় !

-অপু ওরা আমাকে ধরে আমাকে কেটে কুটে পরীক্ষা করছে চায় । বুঝেছো !

সেই সময় আমার ফোন বেজে উঠলো ।

আমি তাকিয়ে দেখি অপরিচিত নাম্বার । আমি রিসিভ করলাম । ওপাশ থেকে এরিকের কন্ঠস্বর শুনতে পেলাম ।

-আমি জানতাম তুমি এরকমই করবে । তোমাকে বলেছিলাম কয়েকটা ওর শরীরের সাথে চেপে ধরতে ।

আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে এরিক আবার বলল

-কোন রকম চালাকি করবা না । আমরা পুরো বিল্ডিংটা ঘিরে রেখেছি । তুমি ওকে রেখে বের হয়ে আসবে । ঠিক আছে ? নয়তো তোমার কিছু হয়ে আমাদের কোন দায় থাকবে না । আমি তোমাকে ৫ মিনিট সময় দিলাম । তারপরেই আমরা ভেতরে ঢুকবো !

লাইন কেটে গেল । আমি টিচিন্ছটির দিকে তাকালাম । ও যতই অন্য গ্রহের প্রাণী হোক ও তো আর উড়তে পারে না । আর গুলি ওকেও আঘাট করবে । এখন ?

টিচিন্ছটি বলল আমার স্পেশ শীপটা এই বিল্ডিং ছাদে ল্যান্ড করানো । নির্দিষ্ট সুইচ টিপে সেটা অদৃশ্য করা । আমি ছাড়া কেউ সেটা খুজে পাবে না । একবার যদি সেখানে পৌছাতে পারি তাহলে আর কোন চিন্তা নেই । কিন্তু সিড়িতে তো ওর পজিশন নিয়ে আছে । তাহলে ?

তখনই আমার মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি এল । এরিক আমাকে পাঁচ মিনিট সময় দিয়েছে ।

তাই না ? ঠিক আছে পাঁচ মিনিট পরে আমিই বের হব ।

আমার চোখের দিকে তাকিয়েই টিচিন্ছটি বুঝে গেল আমি আসলে কি বুঝাতে চাইছি । তারপর সেই সবুজ চারটা হাত দিয়েই আমাকে জড়িয়ে ধরলো । তারপর বলল

-তোমার এই উপকার আমি কোন দিন ভুলতে পারবো না ।

তারপর টিচিন্ছটি আমাকে নিয়ে চলে গেল শোবার ঘরে । আস্তে আস্তে আমার রূপ ধরতে শুরু করলো । কয়েক মুহুর্ত পরে আমি দেখলাম আমার সামনে আরেকটা আমি দাড়িয়ে আছি । আমার দিকে তাকিয়ে বলল

-আমি তাহলে যাই এবার !

আমি হঠাৎ বললাম

-আর তাহলে দেখা হবে না !

-জানি না । যদি আমাদের গ্রহের টিফগ্গুলারা টিকে থাকতে পারে তাহলে একদিন না একদিন কেউ আসবেই তোমার সাথে দেখা করতে । ভাল থাকো ।

তারপর আমার রূপ ধরা টিচিন্ছটি দরজা খুলে বের হয়ে গেল । আমি দরজা আটকে দিলাম ।

আমি জানি ও দরজা দিয়ে বের হওয়ার সাথে সাথেও এরিক নিজের টিম নিয়ে ঘরে ঢোকার চেষ্টা করবে । যতটা সময় আমি এখানে বন্দী থাকবো তত সময় ওরা ভেবে নিবে ঘরের ভেতরে টিচিন্ছটিই আছে । দরজা খুলে আমাকে দেখতে পেয়ে ওরা ওদের ভুল বুঝতে পারবে । কিন্তু ততসময়ে টিচিন্ছটি নিজের স্পেশশীপের কাছে পৌছে যাবে আশা করি ।

আমি দরজাতে আঘাতের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছি । আমি মনে মনে দোয়া করতে থাকি টিচিন্ছটি পৌছে যেতে পারে তার স্পেশ শীপের কাছে । আমার মহাজাগতিক প্রেমিকা যেন নিরাপদে তার গ্রহে পৌছে যায় !

পরিশিষ্টঃ

অনেক কয় বছর পর । আমার বয়স হয়েছে বেশ । চাকরি থেকে থেকে রিটায়ার্ড করেছি গত বছর । এখন সারাদিন শুয়ে বসেই কাটে । বিয়ে শাদী আর করি নি । একা একা দিন কেটে যায় । মাঝে মাঝেই বাসার সামনের এই পার্কে বসে থাকি। কত কিছু ভাবি ।

কদিন থেকেই লক্ষ্য করছি একটা যুবক ছেলে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে । এক দিন দুদিন নয় । প্রায়ই প্রতিদিনই । আমি আজকে সেই যুবককে হাতের ইশাতে ডাকলাম ।

যুবক কাছে এসে বসলো আমার পাশে । আমি তার দিকে তাকিয়ে বলল

-তোমাকে কি আমি চিনি ?

যুবক না সূচক মাথা নাড়ালো । আমি আবার বললাম

-তুমি কি আমাকে চিনো ?

যুবক এবার হ্যা সূচক মাথা নাড়ালো ।

আমি বললাম

-তাই ? কিন্তু আমি তোমাকে ঠিক চিনতে পারছি না ।

যুবক বলল

-আমার মাকে আপনি চিনতেন । তার নাম টিচিন্ছটি ।

আমি কেন যেন অবাক হলাম না । আমি জানতাম একদিন না একদিন কেউ না কেউ আসবেই । যুবক বলল

-আমাদের পুরো গ্রহ আপনাকে চিনে । আমাদের পুরো গ্রহের প্রত্যেক মানুষের দেহে এখন আপনার ডিএনএ সিগনেচারওয়ালা জিন রয়েছে ।

আমি কি বলবো খুজে পেলাম না । যুবকটি বলল

-আমি আপনাকে আমাদের গ্রহে নিয়ে যেতে এসেছি । আমার মায়ের শেষ ইচ্ছে ছিল যেন আপনি তার কবরটা একবার এসে দেখে যান । জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সে আপনাকে ভালবেসে গিয়েছে । আপনি কি যাবেন ?

আমি আমার মহাজাগতিক প্রেমিকার কথাটা মনে করার চেষ্টা করলাম । সেই চোখ দুটো আমি এখনও পরিস্কার মনে করতে পারি । অন্য গ্রহের হলেও কি টলটলে মায়াবী চোখ ছিল তার ! তার শেষ ইচ্ছে আমি অবশ্যই পূরণ করবো !

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 49

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

One Comment on “মহাজাগতিক প্রেমিকা”

Comments are closed.