ভালোবাসার খোঁজে

4.7
(76)

অনু চুপ করে দাড়িয়ে রয়েছে সায়নের সামনে। সায়নের হাতে একটা চায়ের কাপ। তার চোখ ফাইলের দিকে। অনু যে তার সামনে দাড়িয়ে আছে সেটা যেন ভুলে গেল গেছে সে। অনু আবারও মৃদুর স্বরে বলল, স্যার আমার লোনের ব্যাপারটা?
সায়ন ফাইল থেকে চোখ তুলে তাকালো অনুর দিকে । তারপর বলল, আপনি কত টাকার জন্য লোন এপ্লিকেশন করেছেন?
-স্যার ১০ লাখ ।
-আপনার বেতন কত?
-সব মিলিয়ে স্যার ২৯ হাজার টাকার মত ।
সায়ন যেন একটু ভাবলো । তারপর বলল, এই বেতনে কি এতো টাকা লোন স্যাংসান হওয়ার কথা ? যদি আপনার পুরো বেতনটুকুও কেটে নেওয়া হয়, তাহলে এই পুরোটাকা শোধ হতে কত সময় লাগবে বলুন তো ?
অনু মাথা নিচু করে দাড়িয়ে রইলো । তার কাছে কোন উত্তর নেই । কিন্তু টাকা না পেলে সামনে কি হবে সেটা অনু ভাবতেও পারছে না। রিয়াদের হাসপাতালের বিল এরই ভেতরে ৮ লাখে এসে দাড়িয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে বিল না দিলে এরপর থেকে আর কোন চিকিৎসা হবে না। অনুর কলেজ জীবনের এক বন্ধু হাসপাতালে চাকরি করে এই জন্যই এতো টাকা বাকিতে চিকিৎসা করাতে পেরেছে কিন্তু এখন সেও হাত তুলে ফেলেছে। সে বলেছে যে আর বেশি সময় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে সামলানো তার পক্ষে সম্ভব না। রিয়াদের বাসায় অবস্থাও যে খুব ভাল তাও না। জমিজমা বিক্রি করে আনবে সেটাও সম্ভব না। রিয়াদের আরও চারটা ভাইবোন আছে। নিজের পরিবারের কাছে তো যাওয়াই যাবে না । তারা রিয়াদের সামনে বিয়েটা মোটেও মেনে নেয় নি। সব মিলিয়ে অনুর একেবারে দিশেহারা অবস্থা !
অনুর চোখ দিয়ে পানি বের হয়ে এল আপনা আপনি। কোন মতে বলতে গেল, স্যার আমার হাজব্যান্ড ….
অনুকে কথা শেষ করতে না দিয়ে সায়ন বলল, আমি জানি আপনার সাথে কী হচ্ছে। আপনার হাসব্যান্ড হাসপাতালে ভর্তি। ক্যান্সারের শেষ স্টেজ প্রায়। এই যে ১০ টাকা আপনি চাচ্ছেন এতে কেবল বকেয়া বিল পরিশোধ হবে। সামনে আর তার চিকিৎসা খুব একটা হবে না। সামনে কী করবেন ভেবেছেন কি?
অনু কোনকথা না বলে চুপ করে দাড়িয়ে রইলো। সায়ন উঠে দাঁড়ালো। নিজের চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে বসলো সামনে সোফাটার উপরে। অনুর দিকে তাকিয়ে বলল, আসুন মিসেন অনু। আপনার সাথে কয়েকটা কথা বলা যাক।
অনু আস্তে আস্তে হেটে গিয়ে বসলো সামনের সোফাতে। সোফাটা বেশ নরম আর মোলায়েম। এর আগে তার এখানে বসার সৌভাগ্য হয় নি। আজকে হল। সায়ন বলল, আমি আপনাকে আজকে একটা অফার দিই । অফারটা মন দিয়ে ভাববেন । সেটা গ্রহন করা বা না করা আপনার সিদ্ধান্ত। ঠিক আছে?
অনু কেবল মাথা ঝাকালো । সায়ন বলল, আপনি আপনার হাজব্যান্ড কে কতটুকু ভালবাসেন?
-জ্বী?
অনু যেন ঠিক মত বুঝতে পারলো না । সায়ন বলল, মানে তাকে কতটুকু ভালবাসেন ? তাকে বাঁচাতে কী করতে পারেন?
-আমার সম্ভব সব কিছু?
-এনিথিং?
-জ্বী !
-ধরুন আপনার সামনে এমন পরিস্থিতি এল যে আপনার সামনে একটা অপশান । সেটা নিলে আপনার হাজব্যান্ড রক্ষা পাবে কিন্তু আপনি কোনদিন আর তাকে আপনার কাছে পাবেন না । তাহলে কি আপনি সেই ডিলটা নিবেন?
অনু এবারও ঠিক বুঝতে পারলো না । কেবল তাকিয়ে রইলো সায়নের দিকে ।
সায়ন এবার সরাসরি অনুর দিকে তাকালো। অনুর যেন একটু অস্বস্তি লাগা শুরু হল। সায়ন বলল, আমাকে আমার এক বন্ধু বলেছিলো টাকা দিয়ে আসলে সব কিছু করা যায় না। কথাটা সত্য অনেক দিক দিয়েই। যেমন টাকা হলেই মানুষকে বাঁচানো যায় না। যা একেবারেই উপরওয়ালার হাতে। কিন্তু টাকা দিয়ে অলমোস্ট সব কিছু করা যায়। টাকা দিয়ে ভালোবাসাও কেনা যায় ।
অনু তখনও চুপ । সায়ন আবার বলল, আমি এই টাকা দিয়ে ভালোবাসা কিনতে চাই। আপনার ভালোবাসা, আমার প্রতি।
-মানে ?
-মানে খুব সোজা। এখন থেকে আমি রিয়াদের সকল চিকিৎসার ভার নিবো। তার যাবতীয় খরচ আমার।
অনু কী বলবে কিছুই বুঝতে পারলো না। এমন কিছু যে তার সামনে আসতে পারে সেটা সে ভাবতেও পারে নি।
সায়ন আবার বলা শুরু করলো, যদি রিয়াদ মারা যায় মানে আমি বলছি না যে যে মারা যাক, যদি যায় তাহলে এরপরে আপনি আমাকে বিয়ে করবেন এবং যদি রিয়াদ সুস্থ হয়ে ওঠে, তাহলে তাকে আপনি ডিভোর্স দিয়ে আমাকে বিয়ে করবেন।
অনু অবাক হয়ে কেবল তাকিয়ে রইলো সামনের মানুষটার দিকে। মনের ভেতরে একটা তীব্র রাগ জেগে উঠলো। সামনে মানুষটা বলছে কী ! ওর ইচ্ছে হল এখনই এখান থেকে উঠে যায়। চাকরি ছেড়ে দেয় এখনই।
সায়ন একটু হাসলো । তারপর বলল, আমার উপর খুব রাগ হচ্ছে বুঝি? দেখুন আমি আপনাকে খারাপ কিছু বলি নি। একটা ডিল অফার দিয়েছি। এটা গ্রহণ করা বা না করা একান্তই আপনার ব্যাপার। ভাবুন তারপর সিদ্ধান্ত নেবেন !

অনু বলতেই যাচ্ছিলো যে খ্যাঁতা পুড়ি তোর ডিলের কিন্তু তখনই দেখলো সায়ন পকেট থেকে একটা চেক বের করলো। সেটা বাড়িয়ে দিল ওর দিকে। চেকটা হাতে নিয়ে অনু দেখলো সেটা একটা দশ লাখ টাকার চেক।
সায়ন বলল, আই লাইক ইউ ভেরি মাচ অনু। ইউ লাভ ইয়োর হাসব্যান্ড। দ্য পিয়র কাইন্ড অব লাভ। দিস ইজ ভেরি রেয়ার নাওএডেইজ! এই ১০ লাখ আমার পক্ষ থেকে উপহার। এটা ফেরৎ দিতে হবে না । এটা দিয়ে হাসপাতালের বকেয়া বিল পরিশোধ করুন । তারপরের সিদ্ধান্ত কী নেবেন সেটা আপনার উপরে। যদি আপনার উত্তর না হয়, তাহলে ইটস টোটালি ফাইন। আপনি স্বাভাবিক ভাবেই অফিস করবেন যেভাবে করে আসছিলেন। কাজ করবেন বেতন নিবেন ! ওকে …?
অনু বলল, জ্বী স্যার ।
-হ্যাভ এ গুড ডে !

দুই
সায়নের মনে একটু কনফিউশন ছিল যে অনু ডিলটাতে রাজি হবে কিনা। হতে পারে আবার নাও হতে পারে। যদি হয় তখন? একটা মানুষ কি আরেকটা মানুষকে এভাবে ভালোবাসতে পারে যে তাকে রক্ষা করার জন্য তাকে ছেড়ে দুরে চলে যাবে? এটা কি সম্ভব?
রিয়াদের খোজ খবর রাখছিল সে ঠিক । দুই দিনের মাথায় হাসপাতালের বিল আবারো দুই লাখে উঠে গেল । এখানে যতদিন থাকবে এভাবে বাড়তেই থাকবে । এক সপ্তাহে পরে অনু এল । ওকে তখন খানিকটা পরাজিত আর ক্লান্ত মনে হচ্ছে। রাত তখন দশটা । সায়ন নিজের বাসায় বসে আপন মনে গান শুনছিলো। কাজের লোকটা এসে জানালো যে একটা মেয়ে তার সাথে দেখা করতে এসেছে । মেয়েটার নাম অনু । জলদি তাকে ঘরে নিয়ে আসতে বলল ।
অনু শান্ত ভাবে ঘরে ঢুকে সায়নের সামনেই বসলো । মাথা নিচ করে বলল, আমি আপনার ডিলে রাজি ।
-সত্যিই রাজি?
-জ্বী ।
-তার মানে যখন তুমি আমার কাছে আসবে তখন আমাকে সত্যিই ভালোবাসবে যেভাবে তুমি তোমার স্বামীকে বাসো ?
-আমি আমার সর্বোচ্চটা দিয়ে চেষ্টা করবো ।
-’চেষ্টা’ ইজ নট এনাফ অনু ।
-প্লিজ । আমি আর কী করতে পারি? আমি চেষ্টা করে যাবো সত্যি বলছি।
-ওকে ।

তারপর রিয়াদের সকল চিকিৎসার ভার সায়ন নিজেই নিলো। উন্নত চিকিৎসার জন্য রিয়াদকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যাওয়া হল। সাথে অনুও গেল। সায়ন মাঝে মাঝে সেখানে যেত। অনুকে দেখতো। ওর কেবল দেখার ইচ্ছে ছিল যে সত্যিই যদি রিয়াদ ফিরে আসে তাহলে অনু তাকে ছেড়ে ওর কাছে আসে কিনা।
কিন্তু সেটা আর দেখা হল না। রিয়াদ আর ফিরে এল না। প্রায় তিন মাস চিকিৎসার পরে সেটা মারা গেল হাসপাতালেই। সেদিন অনুর কান্না দেখে সায়নের মনটা কেমন যেন বিষন্ন হয়ে উঠলো। বারবার মনে হল কেউ কি ওর জন্য এভাবে ব্যাকুল হয়ে কাঁদবে? সত্যিই সেই মানুষগুলো বড় ভাগ্যবান যাদের এমন ভালোবাসার মানুষ থাকে।
রিয়াদের প্রতি সায়নের একটু ঈর্ষা হল। ওর তুলনায় রিয়াদের কিছুই নেই। সায়ন নিজে দেখতে বেশ সুদর্শন। টাকা পয়সার কোন অবাক নেই। বিদেশ থেকে বড় ডিগ্রি রয়েছে। সব কিছু আছে তারপরেও রিয়াদের কাছে যেন কোন এক দিকে সে ঠিকই পরাজিত!
সব কিছু আবার স্বাভাবিক ভাবে চলতে আরও কিছু সময় লাগলো। অনু এক সময় আবারও অফিসে আসা শুরু করলো। একদিন অনু ওর রুমে এসে ঢুকলো। তারপর বলল, আমাদের মাঝে একটা ডিল হয়েছিল। আপনি আপনারটা রেখেছেন । এবার আমার পালা।
সায়ন কিছু সময় তাকিয়ে রইলো । তারপর বলল, ইউ ডোন্ট হ্যাভ টু !
-কেন নয়?
-মানে তুমি যদি না চাও তাহলে আমাকে বিয়ে করতে হবে না । রিয়াদ যদি বেঁচে যেত আমি তোমাকে বলতাম না যে তাকে ছেড়ে আমার কাছে আসো। সত্যিই বলতাম না। আমি খুব ভাল করেই জানি রিয়াদকে তুমি যেভাবে ভালোবাসতে, যেভাবে ভালোবাসো আমাকে তুমি কোন দিন ভালোবাসতে পারবে না । এটা সম্ভবই না । সো, বেটার নট ট্রাই । তুমি ফ্রি !
অনু অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো কেবল । সায়ন বলল, তবে আমি তোমাকে সত্যি বিয়ে করতে চাই । তুমি রাজি হবে কিনা সেটা একান্তই তোমার নিজের সিদ্ধান্ত। তবে রাজি হওয়ার ব্যাপারে তোমাকে একটা ব্যাপার অবশ্যই মাথায় রাখতে হবে যে আমি রিয়াদের চিকিৎসার খরচ দিয়েছি এই জন্য তুমি কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রাজি হবে, এই ব্যাপারটা যেন না হয় ! যদি কখনও মনে হয় আমি সামনের মানুষটাকে পছন্দ করি কিংবা করবো, নিজ থেকেই ভালোবাসতে পারবো তাহলে ….
অনু যখন দরজা ঠেলে বের হচ্ছিলো তখনও ওর ঠিক যেন বিশ্বাস হচ্ছে না যে, এমনও মানুষ হয়! সত্যিই এমন মানুষ হয়!

তারপর? তারপরের গল্পটা অন্য কোন গল্প। সেই গল্পে হয় অনু আর সায়নের ভালোবাসার গল্প থাকবে।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.7 / 5. Vote count: 76

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

One Comment on “ভালোবাসার খোঁজে”

  1. আর নয় ভালোবাসা, এখন থেকে ভালো বাসা খুজবো।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *