ডেলিভারি দিতে হবে

4.8
(14)

বাবার মৃত্যুর পর আমাদের জীবনটা একটু কঠিনই হয়ে গিয়েছিল। আমি তখন সবে মাত্র কলেজে ভর্তি হয়েছি। আমাদের জন্য জীবনে টিকে থাকা একটু কঠিনই হয়ে গেল বটে। তবে আশার কথা ছিল যে বাবা আমাদের একটা ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। পেশায় ড্রাইভার হওয়ার কারণে তার মনে একটা অয় ছিল যে হয়তো যে কোনো সময় তিনি মারা যেতে পারেন। বিশেষ করে আমাদের দেশের রাস্তার যা অবস্থা সেখানে একজন ড্রাইভারের মনে এই ভয়টা থাকা অস্বাভাবিক না। তাই তিনি আমাদের জন্য দুইটা সিএনজি কিনে রেখেছিলেন। সেটার ভাড়া আসত নিয়মিত। বাবার চলে যাওয়ার পরেও সেই ভাড়া আসা বন্ধ হল না। এই বলে আমাদের চারজনের পরিবার কোন মতে খেয়ে পড়ে টিকে রইলো।
আমার বাবা আরেকটা কাজ করে গিয়েছিলেন। তিনি আমাকে গাড়ি চালানো শিখিয়েছিলেন খুব যত্ন করে। আমার বয়স আঠার হওয়ার সাথে সাথেই আমি লাইসেন্স করে ফেলি। বাবার পিকআপ ভ্যানটা অনেকদিন পরে ছিল বাসার সামনে। বাবা না থাকায় সেটা চালানো হয় নি। অনেকবার আমরা ভেবেছি যে ভ্যানটা বিক্রি করে দিব তবে বাবার শেষ স্মৃতি হিসাবে সেটা কেউ বিক্রি করতে রাজি হয় নি। মা বলেছিল যে যদি জীবনে খুব বড় বিপদ আসে তখন না দেখা যায়। আমি নিয়মিত তাই এটা নিয়ে এলাকার ভেতরেই ঘুরে বেড়াতাম সেটা সচল রাখতে।
এভাবে কিছুদিন যাওয়ার পরেই কাজটা এল। আমাদের পাশের বাসার রমিজ চাচা কিছু মালামাল গাজীপুর পাঠাবে। আগে সব সময় বাবাই এই সব মালামাল নিয়ে যেতেন। আজকেও তেমনটা দরকারে তিনি মায়ের কাছে এলেন। আমাকে পাঠাতে চান। মা প্রথমে রাজি হচ্ছিল না। আমি যদিও ভাল গাড়ি চালাই তবে আমি কোখন এভাবে কাজ করি নি। তখন সবে মাত্র আমার লাইসেন্স হয়েছে। তবে আমি যেতে চাইলাম। আমার তখন টাকা আয়ের একটা উপায় দরকার ছিল। যেকোনো ভাবেই হোক সংসারে আমাকে আয়যোগ করতেই হবে। তাই শেষ পর্যন্ত মা রাজি হয়ে গেল। আমিও বাবার মতই কাজ শুরু করে দিলাম।
তারপর থেকেই আমি প্রায়ই পিকআপ নিয়ে এদিক সেদিন যেতাম। মাও মেনে নিলেন। তবে শর্ত হচ্ছে পড়াশোনা করতে হবে। এটা কোনো ভাবেই বাদ দেওয়া যাবে না। যেহেতু একটা আয়ের উৎস আছে আমাদের, তাই নিয়মিত পিকআপ নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। এভাবেই আস্তে আস্তে আমি গাড়ি চালানোতে আরও একটু দক্ষ হয়ে উঠছিলাম। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠলাম। কাজ চলতে লাগল আরও বেশি। যেদিন যেদিন ক্লাস থাকত না সেদিন সেদিনই আমি ট্রিপে যেতাম।
তারপরই আমার কাছে আরেকটা কাজ এসে হাজির হল। এবং বলা যায় এটাতে আমার জীবনটা অনেকটাই বদলে গেল।

আমাদের ক্লাসের সিমিনকে ক্লাসের কেউ ঠিক পছন্দ করত না। শব্দটা ঠিক অপছন্দ হবে না। সিমিনকে সবাই এড়িয়ে চলত। সিমিনও যে সবার সাথে মিশতে চাইতো ব্যাপারটা তেমন না। সে ক্লাস করেই নিজের মত করে ক্যাম্পাস ছেড়ে চলে যেত। সিমিন দেখতে কিছু বেশ সুন্দরই ছিল কিন্তু তারপরেও ক্লাস কিংবা বাইরের কেউ সিমিনের দিকে খুব একটা এগিয়ে যেত না। এরপর পেছনে ঠিক কী যে কারণ রয়েছে সেটাও কারো জানা ছিল না। তবে তারা সবাই একটা ব্যাপার অনুভব করতে পারত যে তারা সিমিনের আশে পাশে ঠিক স্বস্তি বোধ করছে না। এই কারণে সবাই এড়িয়েই যেত সিমিনকে।
সেদিন ক্লাস শেষ করে আমি বের হচ্ছিলাম তখন সিমিন আমাকে ডাক দিল। আমার দিকে সে যখন এগিয়ে আসছিল তখন আমার মনের ভেতরে একটা সুক্ষ অস্বস্তিবোধ করলাম। তবে মুখে কিছু বললাম না। সে আমার সামনে এসে বলল, তোমার সাথে কয়েকটা কথা ছিল। সমস্য না হলে একটু কথা বলতাম।
আমি বললাম, না না সমস্যা নেই কোনো! কী কথা ছিল?

সিমিন আমাকে নিয়ে ক্যাম্পাসের কাঠাল তলায় গিয়ে বসলাম। সিমিন বলল, তোমাদের একটা ট্রান্সপোর্টের বিজনেস আছে, তাই না?
আমি একটু হেসে বললাম, বিজনেস ঠিক না। একটা পিকআপ ভ্যান আছে মাঝারি ধরণের। আর দুই সিএনজি। সিএনজি দুইটা ভাড়ায় চলে। আর পিকআপ ভ্যানটা দিয়ে মালপত্র পরিবহন করা হয়। আমিই চালাই সময়ে সময়ে।
সিমিন কী যেন ভাবল তারপর বলল, তোমার পিকআপ ভ্যানে কত কেজির মালামাল বহন করা যাবে?
-এই ধর এক হাজার থেকে বারোশ কেজি!
-গুড । চলবে এতেই।
তারপর মনে মনে আরও কিছু যেন চিন্তা করল সে। তারপর বলল, আমাদের জন্য কিছু মালামাল পৌছে দিতে পারবে? মধুপুর।
আমি একটু চিন্তা করলাম। টাঙ্গাইল খুব বেশি দুরে না। তবে দিনের থেকে রাতের বেলা হলেই বেশি ভাল হবে। আমি জিজ্ঞেস করতে যাবো যে কী পৌছাতে হবে তার আগেই সিমিন বলল, তবে তোমাকে যেতে হবে রাতের বেলা। বুঝেছো? দিনের বেলা ন। পারবে?
সিমিন এমন ভাবে কথাটা বলল যে আমার কাছে মনে হল যেন ও নিশ্চিত ভাবে কিছু লুকালো। কোন অবৈধ কিছু কি নিয়ে যেতে হবে? আমার মনের কথা বুঝতে পেরেই যেন সিমিন বলল, তবে ভয় নেই আমরা অবৈধ কিছু পাঠাব না, একেবারে বৈধ জিনিস।
আমি বললাম, কী?
সিমিন একটু হেসে বলল, ফ্রেশ মিট। গরু খাসীর মাংস। তবে এখানে আমাদের বিশ্বস্ত মানুষ দরকার। অনেকের কাছে পুরো ব্যাপারটা অস্বাভাবিক লাগতে পারে। তবে চিন্তা কর না। তুমি যদি কাজটা ভাল করে করতে পার তবে আশা করি তোমার লাভই হবে। করবে?
আমি একটু চিন্তা করলাম। যদি ফ্রেশ মাংসই তবে এতো লুকোচুরির দরকার কেন। তবে যখন সিমিন টাকার পরিমানটা দেখালো তখন আমার মনের ভেতরে সন্দেহটা কেন জানি আরও বড় হয়ে উঠল। এই দুরুত্বে মালামাল পরিবহনের জন্য পরিমানটা প্রায় তিনগুণ। আমার মনের ভেতরে একটা কু ডেকে উঠল বতে তবে টাকার লোভ বড় লোভ। আমি রাজি হয়ে গেলাম। সিমিনের মুখের হাসি দেখে আমার মনে হল যেন ও জানতোই আমি রাজি হয়ে যাব।
তবে একটু পরেই সিমিনের মুখটা একটু গম্ভীর হয়ে গেল। সে বলল, দেখ এই কাজের সব থেকে বড় শর্ত হচ্ছে তুমি এটার ব্যাপারে কাউকে কিছু বলতে পারবে না । এটাই হচ্ছে শর্ত। এটা খুব বেশি জরুরী।
আমি বললাম, মাংসই যদি ডেলিভারি করি এটা বললেই কি আর না বললেই কী?
সিমিন আমার দিকে কিছু সময় চুপ থেকে বলল, আসলে মাংস ডেলিভারিতে সমস্যা না। সমস্যা হচ্ছে তুমি মাংসটা কোথায় আর কার কাছে ডেলিভারি করছ। এই ব্যাপারটা গোপন থাকা দরকার। আমাদের আগে যে ডেলিভারি ম্যান ছিল সে হঠাৎ করে মারা গেছে। নতুন করে আমরা কাউকে পাচ্ছি না আপাতত যার উপরে বিশ্বাস করা যায়। তোমাকে আমি অনেকদিন ধরেই। তাই মনে হল যে তোমাকে বিশ্বাস করা হয়।
সিমিন কিছু চুপ করে বলল, তুমি যদি প্রথম কাজটা করার পরে আর না করতে চাও সেটাও ফাইন। আর তোমাকে বিরক্ত করব না। তবে প্লিজ এটা কাউকে বলতে পারবে না। ঠিক আছে!
আমি মাথা নাড়লাম। সত্যি বলতে কি মাংসই পরিবহন করতে হয় তবে সেতা নিয়ে আমার খুব একটা মাথা ঘামানোর দরকার নেই। টাকা পেলেই হল। আমি সিমিনকে হ্যা বলে দিলাম। সেই সাথে ওকে কথা দিলাম যে এই ডেলিভারির কথা আমি কাউকে জানাবো না কোনো দিন।
সিমিন জানালো যে ট্রিপ নিয়ে আমাকে আজকে রাতে যেতে হবে। এগারোটার দিকে পিকআপ পয়েন্টে আসতে হবে। আমার মোবাইলে লোকেশন পাঠিয়ে দিবে সে। এবং সব থেকে বড় কথা হচ্ছে আমাকে এডভান্সও দিয়ে দিল। বাকিটা কাজ শেষ হওয়ার পরে। টাকাগুলো পকেটে নিয়েই মনটা ভাল হয়ে গেল। হঠাৎ করে টাকা পেয়ে যাওয়ার মত আনন্দের আর কিছু হতে পারে না।

এগারোটার আগেই আমি নির্ধারিত স্থানে পৌছে গেলাম। সেখানে পৌছে মনের ভেতরের একটা সন্দেহ দূর হয়ে গেল। এটা এটা মেংগল মিটের একটা ওয়্যার হাউজ। প্রতিদিন এখান থেকে সারা দেশে ফ্রেশ মাংশ যায়। আমি তেমনই একটা ওয়্যারহাউজে এসেছি।
আমি গেটের কাছে আসতেই দেখতে পেলাম যে সিমিন দাঁড়িয়ে রয়েছে। আমার জন্যই যে অপেক্ষা করছিল সেই ব্যাপারে সন্দেহ নেই। আমার পিকআপেই উঠে বসল সে। আজকে সিমিনকে একটু অন্য রকম লাগছে। সিমিনকে আমি প্রায়ই প্রতিদিনই ক্যাম্পাসে দেখি। সাধারণ সেলিয়ার কামিজই সে পরে আসে তবে আজকে ওর পরণে সম্পূর্ন কালো পোশাক। কালো রংয়ের টাইট লেটাক্সের বডিসুইট পরেছে। বডিস্যুটটা ওর পুরো শরীরটাকে একেবারে ঢেকে রেখেছে। আর উপর উপরে কালো জ্যাকেট। এমন পোশাকে ওকে দেখে একটু অবাক না হয়ে পারলাম না। সিমিন আমার পিকআপে উঠে বসল। তারপর আমাকে বলল কোন দিকে যেতে হবে।
আমি দেখতে পেলাম আরও বেশ কিছু পিকআপ ভ্যান দাঁড়িয়ে রয়েছে। তবে আমরা সেদিকে না গিয়ে পেছনের দিকে গেলাম। সেখানে আমাদের জন্য একটা দরজা খোলা রয়েছে। সেটা দিয়েই ভেতরে ঢুকে পড়লাম। আমি গাড়ি থামাতেই সিমিন নেমে পড়ল গাড়ি থেকে এবং দেখতে পেলাম দুজন লোক এগিয়ে এল। সিমিন তাদের সাথে কিছু কথা বলে আবারও আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল, পেছনের দরজাটা খুলে দাও। আমি নেমে গিয়ে সেটা করলাম।
তারপর ওরা আমার সামনেই মাংসের প্যাকেটগুলো লোড করতে শুরু করল। সিমিন আমার পাশেই দাঁড়িয়ে ছিল। সে বলল, তুমি চাইলে খুলে দেখতে পার। এখানে মাংসই আছে।
আমারও তাই মনে হল। এখানে মাংস ছাড়া আর কিছু নেই।
লোডিং শেষ হয়ে গেল দ্রুতই। তারপর দেখলাম সিমিন নিজেও আমার সাথে পিকআপে উঠে বসল। আমি কিছুটা অবাক হয়ে বললাম, তুমি কি যাবে আমার সাথে?
সিমিন মাথা নাড়ল। বলল, প্রথমদিন দিন তো। তোমার সাথেই যাই। ভেবেছিলাম অন্য কাউকে পাঠাব তবে তারপর মনে হল যে আমার যাওয়াই ভাল।
আমি একটু খুশিই হলাম বটে। গাড়ি চলতে শুরু করল।

দুই
পিকআপ ভ্যানটা মধুপুর জঙ্গলের ভেতরে ঢোকার আগেই একটা পুলিশ চেকপোস্ট পরল। আমাকে বসে থাকতে বলে সিমিন নিজেই নেমে গেল। আমি দেখলাম সিমিন সেই চেকপোস্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পুলিশের সাথে কী যেন কথা বলল। একটু পরে একজন পুলিশ অফিসার আমার দরকার কাছে এসে আমার দিকে তাকালেন। সিমিন সাথেই ছিল। অফিসারটি আমার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়। আমি ভেবেছিলাম যে হয়তো কিছু জিজ্ঞেস করবে, কিংবা আমার ড্রাইভিং লাইসেন্স দেখতে চাইবে। তবে তেমন কিছুই চাইলো না। আমাকে কিছু জিজ্ঞেসও করল না। সিমিনের দিকে তাকিয়ে বলল, নতুন?
সিমিন উত্তর দিল, হ্যা।
-পারবে তো?
-আশা করা যায়।
আর কিছুই জানতে চাইলেন না অফিসার। সে নিজের জায়গায় চলে গেলেন। এমন কি সে পিকআপের পেছনের জিনিসপত্রও দেখল না। আমার বুঝতে কষ্ট হল না যে এমন পিকআপ আগেও গিয়েছে অনেক।
চেকপোস্ট পার করে আরো আধা ঘন্টা গাড়ি চলার পরে সিমিন আমাকে একটা মাইলপোস্ট দেখাল। বলল, এই মাইলপোস্ট পার করলেই দেখবে একটা কাচা পথ চলে গেছেন জঙ্গলের ভেতরে। সেদিকে যেতে হবে।
আমি একটু পরেই দেখতে পেলাম সেই পথে। গাড়ির গতি কমিয়ে সেদিকে ঢুকিয়ে দিলাম গাড়িটা।
জঙ্গলের ভেতরের রাস্তা হলেও আমার বুঝতে কষ্ট হল না যে এই রাস্তায় নিয়মিত গাড়ি আসে। সেই গাড়ির চলার পথ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। গাড়িটা আমি নিয়ে চললাম সামনের দিকে। সিমিনের দিকে তাকিয়ে দেখি সে একটু গম্ভীর হয়ে সামনের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। তার মুখে একটা চিন্তার বলিরেখা দেখতে পাচ্ছি আমি। তারপরই গাড়িটা গোল মত জায়গায় এসে হাজির হল। সামনে আর পথ দেখতেপাচ্ছি না। আমি গাড়ি থামিয়ে দিলাম।
সিমিনের দিকে তাকাতেই সিমিন বলল, এখন একটু অপেক্ষা করতে হবে।
-কেউ আসবে?
-হ্যা। এখনই আসার সময়।
-ফোন করা যাবে না।
আমার কথা শুনে সিমিন একটু হাসল তারপর বলল, ওরা ফোন ব্যবহার করে না।
আমি একটু অবাক হলাম। এই সময়ে এসে ফোন ব্যবহার করে ব্যাপারটা আমার কাছে অদ্ভুত মনে হল। আমি আরও কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবো কিন্তু সিমিনের চেহারা দেখে চুপ করে গেলাম। আমার মনে হল যে এই গাড়ির ভেতরে না বসে থেকে আমি বরং একটু নিচে নামি। যখন আসবে তখন না হয় দেখা যাবে। নির্জন এই জঙ্গলে আমি এর আগে আসি নি। আমি যখন দরজা খুলতে যাবে তখন সিমিন ঝট করে আমার হাত চেপে ধরল। কিছুটা তীব্র কন্ঠে বলল, করছো কী?
আমি একটু থতমত খেয়ে গেলাম। এমন কী কাজ করছি যে সিমিন এভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাল। আমি বললাম, একটু বাইরে যেতাম!
সিমিন বলল, খবরদার না। এই খানে এসে কোন ভাবেই বাইরে যাওয়া যাবে না।
-কেন?
আমার এই কেন’র জবাব দিল না। ওর চোখে আমি একটা বিরক্তি দেখতে পেলাম। ছোট বাচ্চাদের প্রশ্ন শুনে বড়রা যেমন বিরক্তি দেখায় তেমন। আমি আসলে পুরো ব্যাপারটায় কী যে আচরণ করব সেটা বুঝতে পারছি না। অন্য সময় হলে কিংবা অন্য কেউ হলে আমি হয়তো অন্য ভাবে প্রতিক্রিয়া দেখাতাম কিন্তু এখনকার পরিস্থিতি আর সিমিন থাকার কারণে আমার মনের ভেতরে একটা আলদা অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে। আমি কিছুটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছি। সিমিন ঠিক এই রকম আচরণ কেন করল সেটা আমি বুঝতে পারলাম না।
আমি ওর দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলাম কেবল। সিমিন তখন একটু শান্ত হয়ে এল। তারপর বলল, এরপর থেকে যখন আসবে তখন কোন ভাবে দরজা খুলে নামবে না। মনে থাকবে?
আমি কোন কথা বললাম না। কেবল মাথা ঝাকালাম। সিমিন আমাকে আরও কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু দেখলাম সে থেমে গেল। তার চেহারা দেখেই আমি বুঝতে পারলাম যে সে কিছু একটা বুঝতে পেরেছে বা অনুভব করতে পেরেছে। আমিও অবশ্য সেটা অনুভব করতে পারলাম একটু পরেই। চারিদিকটা একটু যেন বেশি নির্জন হয়ে গেছে এবং আর হঠাৎ করেই যেন ঠান্ডা ভাবটা এসে হাজির হয়েছে। তারপরই আমি দেখতে পেলাম প্রাণীগুলোকে। ঠিক কী ধরণের প্রাণী সেগুলো আমি বুঝতে পারলাম না প্রথমে। প্রথমে দেখেই মনে হল যে কুকুরের পাল। তারপর মনে হল যে ঠিক কুকুর না শেয়াল হবে। এই রাতের বেলা এই বনের ভেতরে কুকুর কিভাবে আসবে! কিন্তু শেয়াল এতো বড় হয় না!
অনেকগুলো প্রাণীর মাঝে আমি এবার একজন মানুষকে দেখতে পেলাম। চাঁদের আলোতে তার দেহের অবয়ব রহস্যময় মনে হচ্ছিল। আমি সেদিকে তাকিয়ে রইলাম একভাবে। আমি চোখ সরারেপারছিলাম না। লোকটা চাদের আলো পেরিয়ে আমার গাড়ির হেটলাইটের সামনে এসে হাজির হল। আমি চেহারার দিকে তাকিয়ে একটু যেন খাবি খেলাম। আমি বলব না যে চেহারাটা খুব ভয়ংকর কিংবা বিকৃত। স্বাভাবিক মানুষের মতই চেহারা। তবে এই চেহারার ভেতরে কিছু রয়েছে। খুব বেশি অস্বাভাবিক কিছু। আর আমার কাছে মনে হল যে লোকটার চোখ জ্বলছে। কুকুর বিড়ালের চোখ অন্ধকারে যেমন জ্বলে তেমন!
সিমিন আমার দিকে তাকিয়ে বলল, গাড়িতেই থাক। নামবে না খবরদার।
সিমিনের কথাটা আমার কাছে আবারও আদেশের মতই শোনাল তবে এইবার আমার কেন জানি সেটা শুনতে মোটেই আপত্তি ছিল না। আমি কোন ভাবেই নিচে নামব না। নামতে চাইও না।

আমি দেখলাম সিমিন দরজা খুলে নেমে গেল। সে লোকটার সামনে প্রথমে তাকে জড়িয়ে ধরল। দেখলাম লোকটাও তাই করল। এবং কিছু সময় ধরে সেই জড়াজড়ি চলল বেশ কিছুটা সময়। আমার কাছে পুরো ব্যাপারটা কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হল। বিশেষ করে এই ভাবে মানুষেরা তো একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে না। এটা অনেকটা ……
আমার মাথার ভেতরে অদ্ভুত একটা চিন্তা এসে হাজির হল। পশুরা যেমন করে নিজেদের সন্তানদের আদর করে আমার কাছে ব্যাপারটা সেই রকম মনে হল। আমি অবাক হয়ে সেদিকে তাকিয়েই রইলাম।
একটু পরেই দেখলাম তারা দুইজন জানালার কাঁচের সামনে এসে দাঁড়লো। আমার দিকে পুরুষটা কঠিন আর ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়। তারপর সিমিনের দিকে তাকিয়ে বলল, পারবে তো?
সিমিন সাথে সাথে বলল, হ্যা বাবা, আপনি চিন্তা করবেন না একদম। ও পারবে!
তার মানে ইনি সিমিনের বাবা! সিমিনের বাবা এই জঙ্গলের ভেতরে কেন থাকে? এই প্রশ্নটা আমার মাথা বারবার ঘুরপাক খেতে লাগল কিন্তু আমি কোন উত্তর খুজে পেলাম না।
সিমিনের বাবা আমার দিকে আবারও কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়। আমার মনে হল যে কিছু বলা দরকার কিন্তু কেন জানি আমার বুকের মধ্যে অন্য রকম একটা অনুভূতি এসে জড় হয়েছে। ঠিক ভয় লাগছে না এখন আর তবে আমি শান্তি পাচ্ছি না।
সিমিনের বাবা আর কিছু অবশ্য জানতে চাইলেন না। তিনি গাড়ির পেছনের দিকে চলে গেলেন। একটু পরেই আমি অনুভব করলাম যে গাড়ি থেকে মাল আনলোড করা হচ্ছে।
মালামালগুলো আনলোড হতে খুব বেশি সময় লাগল না। একটু যেন বেশি তাড়াতাড়ি হল। সিমিন ফিরে এল্কটু পরেই। ওর হাতে একটা সাদাখাম। আমার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল, এখানে বাকি টাকা আছে। আজকে তাহলে ফিরে যাও!
আমি বললাম, তুমি যাবে না আমার সাথে?
-আজকে না। আজকে এখানে থাকি। অনেক দিন পর বাবার সাথে দেখা হল।
-তোমাদের বাসা এখানে? এই জঙ্গলে?
সিমিন হাসল। তারপর বলল, হ্যা। ভেতরে বাড়ি আছে। যাই হোক। সাবধানে যেও। পথ চিনতে অসুবিধা হবে না। তবে একটা কথা মনে রাখবে যে কোন ভাবেই গাড়ি থেকে নামবে না। যাই দেখো না কেন গাড়ি থেকে না নামলে কোন সমস্যা হবে না। ক্লাসে কথা হবে আরও।

আমাকে আর কিছু বলার সুযোগ দিল না সে। আমি যখন গাড়িটা ঘুরিয়ে ফেরার পথ ধরলাম তখন কী মনে করে একবার ভাল করে তাকালাম মিররে। পেছনের দিকে হেড লাইটের আলো নেই। তাই তাদেরকে আর ভাল করে দেখা যাচ্ছে না। দেখলাম সেখানে সিমিন আর সিমিনের বাবা ছাড়াও আরও কয়েকটা অবয়ব এসে হাজির হয়েছে। দুই পায়ে দাঁড়িয়ে আছে তারা। তবে সেগুলো পুরোপুরি মানুষের আকৃতিতে নেই। আমি গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিলাম। সত্যি বলতে কি এখানে থাকার কোন ইচ্ছেই আমার নেই। আমি এরপর আর সিমিনের কথায় এখানে আসবো না। যখন গাড়িতা দ্রুত যাচ্ছিল তখন আমি অনুভব করছিলাম যে বনের ভেতর দিয়ে আমার গাড়িকে সমান্তরালে রেখে কয়েকটা জীব দৌড়ে চলেছে। কেবল মাত্র যখন আমার গাড়িটা আবার হাইওয়েতে উঠল তখনই কেবল অনুভব করতে পারলাম যে সেই জীবটা আমার পিছু ছেড়েছে। বাসায় কিভাবে পৌছালাম আমি নিজেই জানি না। এই ভয়ের উৎস আমার জানা ছিল না।

পরের দিন আমি ক্লাসে গিয়ে সিমিনকে দেখতে পেলাম। আমার দিকে তাকিয়ে এমন ভাবে হাসল যেন কিছুই হয় নি। আমি একটু অবাক না হয়ে পারলাম না। কারণ আমি কাল রাতে এসেছি গাড়ি নিয়ে। সিমিন কিভাবে এল? সে যদি সত্যিই রাতে সেখানে থেকে গিয়ে থাকে তাহলে সকালের আগে বাসা থেকে তার বের হওয়ার কথা না।
নাকি ওর নিজেস্ব গাড়ি আছে? এটাই থাকা স্বাভাবিক। নয়তো আজকের সকালের ক্লাসে সে হাজির থাকতে পারত না। আর বেশি কিছু চিন্তা করলাম না আমি। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিলাম যে আর আমি সিমিনের হয়ে কাজ করব না। কিন্তু সেটা সম্ভব হল না আমার পক্ষে। সেদিনই আমার টাকাটা বিশেষ ভাবে দরকার হয়ে পড়ল। নাদিয়া মানে আমার ছোট বোনের এসএসসি পরীক্ষার ফর্ম ফিলাপ করতে হবে। টাকা না নিয়ে আমার উপায় ছিল না। পরের সপ্তাহে আবারও আমি সিনিনের ডেলিভারি নিয়ে মধুপুরের দিকে রওয়ানা দিলাম। সব কিছু আগের দিনের মত করেই হল। তবে এবার আমাকে যেতে হল একা একাই।
মনের ভেতরে অস্বস্তি আর ভয় কাজ করছিল। আমি সেদিনের দৃশ্যগুলো মনে করার চেষ্টা করলাম। সিমিনের বাবার সে চোখজোড়া কল্পনা করার চেষ্টা করলাম। সত্যি বলতে কি আমার ইচ্ছে হচ্ছিল যে টাকাটা সিমিনকে ফেরত দিয়ে আমি বাসা চলে যাই। আমার দরকার নেই এই টাকার ।
কিন্তু আমি জানি যে আমার টাকার দরকার। আর আমাকে এই কাজটা করতেই হবে। এই পরিমান টাকার জন্য আমার অন্তত আরও তিন চারটার ট্রিপ দিতে হবে যেখানে মাত্র কয়েক ঘন্টায় আমি এই টাকা আয় করতে পারছি।
সেদিনের মত আমি পুলিশ চেক পোস্টটাও পার হয়ে গেলাম। তারপর যখন পাঁকা রাস্তা ছেড়ে মাটির রাস্তায় নেমে এলাম তখনই আমার মনে সেই অস্বস্তিটা এসে ভর করল। আমার মনে হতে লাগল যে যখনই পিকআপটা মাটির রাস্তায় চলা শুরু করেছে তখন থেকেই কেউ আমার গাড়ির সাথে ছুটে চলেছে। সেদিন ফেরার সময়েও আমার ঠিক একই অনুভূতি হয়েছিল। সিমিনের কথা মনে করলাম। সে আমাকে স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে যে আমি যেন গাড়ি থেকে না নামি। আমার কাজ হবে আমি গাড়ি নিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় যাবো এবং সেখানে জিনিস পৌছে দিয়ে চলে আসব। আমাকে গাড়ি থেকে নামতে হবে না। আমি সেটা মনে করেই অন্য চিন্তাগুলো মাথা থেকে বের করে দিলাম। আমার অন্য কিছু ভাবতে হবে না।
আমি নির্দিষ্ট স্থানে পিকআপ নিয়ে গিয়ে গাড়ি থামালাম। কিছু সময় সেখানেই বসে রইলাম। কারো কোন দেখা নেই। আমি সেই অন্ধকারের ভেতরে হেড লাইফ অফ করে দিয়ে কিছু সময় আমি চুপ করে বসে রইলাম। কিন্তু কারো দেখা নেই। কেউ আসছে না। একবার কী বের হয়ে একটু হাটাচলা করবো? কেউ যেহেতু এখনও আসে নি তাই একটু হাটাহাটি করলেই বা কী!
আমি যখন দরজায় হাত দিতে যাবো খোলার জন্য তখনই আমি সেই অস্বস্তিকর অনুভূতিটা টের পেলাম। এক লাফে তাপমাত্রা নেমে এল। আমি চুপ থেমে গেলাম সেখানেই। তারপরই আমি চাঁদের আলোর মাঝে সিমিনের বাবাকে দেখতে পেলাম। দেখতে পেলাম তার পেছনের বড় বড় কুকুরের মত প্রাণীগুলোকেও। সেগুলো অবশ্য সামনে এল না। কেবল সিমিনের বাবাই সামনে এগিয়ে এলেন। আমার জানালার কাছে এসে আমার দিকে কিছু সময় তাকালেন। তারপর পেছনে চলে গেলেন। একটু পরেই আমি অনুভব করলাম যে পিকআপ থেকে মালপত্র নামানো হচ্ছে। খুব দ্রুতই খালি হয়ে গেল। আমি দ্রুত পিকআপ ঘুরালাম। এক্সেলেটরে চাপ দেওয়ার আগে, কী মনে হতে যখন আমি মিররভিউতে পেছনে তাকালাম আর সাথে সাথে আমার শরীর জমে গেল। আমি দেখতে পেলাম যে সিমিনের বাবার পাশে আরও দুইটা প্রাণী এসে হাজির হয়েছে। সেগুলো মানুষের মত দুই পায়ে হাটলেও তার মুখটা মানুষের মত নয়। সেই দুটোর মাথা অনেকটা শেয়ালের মত। তারা সেই মাংসের প্যাকেট নিতে ব্যস্ত। তবে একটু পরেই তিনজনই টের পেল যে আমি তাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছি। তারা তিনজনই আমার দিকে ফিরে তাকাল। আমি আর কিছুই ভাবতে পারলাম না। সর্ব শক্তি দিয়ে এক্সেলেটরে চাপ দিলাম। কাঁচা রাস্তায় কিভাবে যে গাড়ি চালালাম সেটা আমি নিজেও জানি না।

পরের পর্ব

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.8 / 5. Vote count: 14

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *