এআই গার্লফ্রেন্ড

4.6
(22)

জীবনে আমি অনেক রকমের ঝামেলায় পড়েছি কিন্তু এইবার যেমন বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছি তেমনটা আর কখনো পড়ি নি। সামান্য একটা মজা করতে গিয়ে যে এমন ঝামেলাতে আমি পড়ে যাব সেটা আমি কল্পনাও করতে পারি নি। আমার কোন ধারণাই ছিল না আমার সেদিনের সামান্য সেই মজার পরিণামটা এমন হবে। আমার শান্তির জীবনটা এভাবে অশান্তিতে ভরে যাবে।
ঘটনা শুরু সপ্তাহ দুয়েক আগে। আমি আমার কাজের জন্য এআই এর ব্যবহার করি নিয়মিত। আগে যে কাজ করতে আমার দুই দিন লাগত আমি এখন সেই একই পরিমান কাজ কয়েক ঘন্টার ভেতরেই করে ফেলতে পারি। যাইহোক, আমি কাজের ফাকে ফাকে আবার অকাজও করি। তেমন একটা অজাকই আমি করেছিলাম সপ্তাহ দুয়েক আগে।
কাজ করতে করতে একটু শরীরটা জমে গিয়েছিল। তাই একটু ফেসবুকে ঘোরাঘুরি করলাম। তারপরই কী মনে হল আমি চ্যাটজিপিটিকে আমার একটা ছবি দিয়ে বললাম আমার পাশে আমার গার্লফ্রেন্ডের ছবি বানিয়ে দাও। তারপর আমি সেই মেয়েটি কেমন হবে, মানে মেয়েটার চেহারা কেমন হবে, তার চোখ, ঠোট কেমন হবে এসবের কিছু বর্ণনা দিলাম। এক মিনিটের মাথায় চ্যাটজিপিটি আমার পাশে একটা চম্মৎকার মেয়ের ছবি তৈরি করে বসিয়ে বসিয়ে দিল। এমন ভাবে আমাদের বসিয়ে দিল যে দেখলে মনেই হবে যে এটা আমার প্রেমিকা। আমি এই ছবির আরো কয়েকটা ভার্শন তৈরি করলাম। তারপর একটা ছবিটা আমার ফেসবুকে শেয়ার দিলাম।
আমার সার্কেল খুব বেশি বড় না। তবে লাইক কমেন্টের বন্যা বয়ে গেল। যদিও বেশির ভাগই টের পেয়ে গেল যে এটা আসলে এআই দিয়ে তৈরি। তবে অনেকেই বুঝতে পারল না। তারা ভাবল বুঝি সত্যিই আমার প্রেমিকা এটা। যাই কিছু সময় অনলাইনে এই মজা শেষ করে আমি আবার নিজের কাজে ফেরত গেলাম। কিন্তু আমার এই মজার কারণে যে অন্য কিছু ঘটে গেছে সেটা টের পেলাম আমি পরদিন সকাল বেলা। আমি রাতে সব সময় আগে আগেই ঘুমিয়ে পড়ি। তাই রাতে আসলে কী হয় না হয় সেটা আমার জানার কথা না।
সকালে কফির কাপ হাতে নিয়ে আমি যখন নিজের কাজে হত দিতে যাবো তখনই ব্যাপারটা খেয়াল করলাম। আমার ফেসবুকের মেসেজ রিকোয়েস্টে একটা মেসেজ এসেছে। আমি সেটা অন করতেই দেখলাম মাহা নামের একজন আমাকে মেসেজ দিয়েছে। বেশ কয়েকটা মেসেজ। যার শুরুটা হচ্ছে আমি কেন তার ছবি এডিট করে নিজের ছবির সাথে বসিয়েছি। তারপর আরও কতশত অভিযোগ! আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। মেসেজের রিপ্লাই দিয়ে বললাম, কী বলছেন এসব ? আমি কেন আপনার ছবি এডিট করব? আমি আপনাকে চিনি পর্যন্ত না।
উত্তর এল প্রায় সাথে সাথেই। সে আমাকে একটা ছবি পাঠাল।
ছবিটার দিকে তাকিয়ে আমার চোখ কপালে উঠল। গতদিন আমি যে ছবিটা এআই দিয়ে বানিয়েছিলাম সেই ছবিটা। আমার কী যেন মনে হল আমি মেয়েটার প্রোফাইলে ঢুকলাম। এবং প্রোফাইলে ঢুকেই আমার চোখ কপালে উঠল। চ্যাটজিপিটি আমার পাশে যে মেয়েটির ছবি তৈরি করে দিয়েছে সেটার চেহারা এই মেয়েটার সাথে হুবাহু মিল।
আমি আসলে কী বলব বুঝতেই পারলাম না। যদিও আমি অপরাধী না তবে আমি বুঝতে পারছি যে মেয়েটার রেগে যাওয়ার কারণ একেবারে সঠিক। মেয়েটা যে মনে করেছে আমি তার ছবি এডিট করেছি সেটা ভাবা মোটেই ভুল হবে না। আমি যদি মেয়েটার জায়গায় থাকতাম তবে আমি নিজেও এমনটাই মনে করতাম।
আমি মেয়েটাকে বুঝিয়ে পুরো ব্যাপারটা বললাম। আমি কী করেছি, কিভাবে এই ছবি তৈরি করেছি সব কিছু। প্রমানস্বরূপ আমি আমার চ্যাটজিপিটির চ্যাট হিস্ট্রিও মেয়েটাকে দিলাম। তারপর মেয়েটা বুঝল। মানে আমি যে তার ছবি এডিট করি নি সেটা সে বিশ্বাস করল। তবে এরপর জানালো যে এই ছবিটা তার পরিচিত অনেকের কাছেই গেছে এবং সবাই বিশ্বাস করে নিয়েছে যে আমিই তার বয়ফ্রেন্ড।
আমি তাকে আবারও সরি বললাম। আমি আসলে বুঝতে পারি নি এমন কিছু হবে যাবে সেটাও বললাম। আমি তাকে আসলে কোনদিন দেখি নি । আমি আমার প্রোফাইল থেকে ছবিটা সরিয়ে ফেললাম। আসলে ভুলটা আমারই হয়েছে। এই ছবিটা আসলে পাব্লিক প্রাইভেসি দিয়ে শেয়ার করা ঠিক হয় নি। আমার কারণে মেয়েটার একটা বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হল। আর বন্দুকের গুলি ছুটে গেলে যেমন কিছুই করার থাকে না, এখানে আসলে আমার সরি বলা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।
কিন্তু ঘটনা ঘটল আরও কিছু সময় পরে। আমি খেয়াল করলাম যে আমার ফেসবুকে বেশ কিছু ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসে হাজির হয়েছে। আমার বুঝতে আসলে কষ্ট হল না এই মানুষগুলো কারা।
আমি কারো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টই গ্রহণ করলাম না। আমার মনে হল এখন সব থেকে ভাল কাজ হবে যদি আমি আমার আইডিটা ডিএকটিভেট করে রেখে দিই। কিন্তু তখনই আবার মনে হল মাহা নামের মেয়েটাকে আমি বিপদে ফেলেছি। এখন যদি এভাবে আমি আইডি ডিএকটিভেট করে দিই তাহলে ব্যাপারটা আরও অন্য দিকে মোড় নিতে পারে। ওর পরিচিত মানুষরা মনে করতে পারে যে আমি আসলেই তাই প্রেমিক। আমি চুপচাপ থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম।
মাহা আমাকে নক দিল বিকেল এবং সে সরাসরি আমাকে নক দিয়ে ফোন দিতে চাইল। কারণ আমার সাথে যে কথা হবে সেটা নাকি মেসেজে লিখে দেওয়া সম্ভব হবে না। সে সরাসরি আমার নম্বরই চাইল। আমি আসলে কোন কিছু না ভেবে নম্বরটা দিয়ে দিলাম। দেখলাম কিছু সম্য পরেই ফোনে সে হাজির।
আমি হ্যালো বলতেই মাহা তার কথা শুরু করে দিল। মাহা জানাল যে কদিন আগে সে তার ফেসবুকে জানিয়েছিল যে তার একজন প্রেমিক রয়েছে। মূলত মানুষের যন্ত্রণা থেকে বাঁচার জন্য সে এই কথা বলেছিল। আমি মাহার ফেসবুক প্রোফাইল চেক করে দেখেছিলাম। মেয়েটা ফেসবুকে বেশ জনপ্রিয়। প্রায় ৫ লাখের কাছাকাছি তার ফলোয়ার। মূলত এই কারণেই মানুষজন ভেবে নিয়েছে যে আমিই তার প্রেমিক।
আসলে কপাল খারাপ হলে মানুষ মারা খাবেই। মাহার কপালে এই প্যারা লেখা ছিল। তা না হলে আমি কোথাকার কে, তাকে কোনদিন দেখি নি পর্যন্ত আর আমি কী বললাম এআইকে আর সে মাহার ছবি আমার পাশে বসিয়ে দিল। এমনটা ভাগ্য খারাপ না হলে কি হয়?
কিন্তু এরপর মাহা যা বলল তা শুনে আমার চোখ কপালে উঠল। সে বলল, এবার আমার কথা মন দিয়ে শুনুন।
আমি মন দিলাম। সে বলল, দেখুন এমন একটা ঝামেলা হয়ে গেছে যেখানে না আপনার দোষ আর না আমার দোষ। এখানে কারো কিছুই করার নেই। তবে সমস্যা যখন আছে তখন সমাধানও তো থাকবে। তাই না?
আমি বললাম, হ্যা হ্যা তা তো অবশ্যই।
-আপনার আর আমার ছবিটা অলরেডি মানুষের কাছে পৌছে গেছে। এখন যদি আমার সত্যি সত্যিই কোন বয়ফ্রেন্ড থাকত আমি তার সাথে একটা ছবি দিয়ে সবাইকে জানিয়ে দিতাম যে এটা আমার প্রেমিক, আপনি নন।
-আপনার বয়ফ্রেন্ড নেই?
-না।
-কী আশ্চর্য! আপনার মত এতো চমৎকার একজন মেয়ের বয়ফ্রেন্ড নেই?
আমি এই লাইনটা বলে মাহাকে একটু পাম দেওয়ার চেষ্টা করলাম যাতে সে আমার উপর রাগ না করে। যতই আমি বলি নি যে আমার দোষ নেই কিন্তু আমার কারণেই তো এই ঝামেলা এসে হাজির হয়েছে। মাহা একটু চুপ করে রইলো। আমি বুঝতে পারলাম যে আমার এই কথা তার পছন্দ হয়েছে। মনে মনে একটু খুশিও নিশ্চয়ই হয়েছে। আমি বললাম, এখন কী করলে এই ঝামেলা থেকে মুক্তি পাবেন বলুন?
মাহা আরও কিছু সময় চুপ থেকে বলল, দেখুন মানুষ একবার কিছু বিশ্বাস করে নিলে সেটা থেকে তাদের আর বের করে আনা সম্ভব না। বুঝছেন?
-হ্যা একদম ঠিক বলেছেন। আমাদের দেশের মানুষ আসলে এমনই।
-এই জন্য ওরা যা বিশ্বাস করেছে ওদেরকে তাই বিশ্বাস করতে দিন। কয়েকদিনের জন্য আপনি আমার বয়ফ্রেন্ডের ভূমিকায় অভিনয় করুণ!
-কীইইইই! কী বললেন?
-বললাম যে এই কদিন এখন আপনি আমার বয়ফ্রেন্ড হিসাবেই থাকুন!
-সেকি! এটা আবার হয় নাকি?
-কেন হবে না?
-না মানে এইভাবে কারো বয়ফ্রেন্ড হওয়া যায় নাকি?
-একটু আগেই না বললেন আমি একটা চিমৎকার মেয়ে! আমার বয়ফ্রেন্ড হতে সমসয়া কী? সত্যি সত্যি তো আর বলছি না। কদিন এভাবেই থাকুন। তারপর আমি বলব যে আমাদের ব্রেকআপ হয়ে গেছে। তারপর আপনি আপনার রাস্তায় আমি আমার রাস্তায়! দেখুন এই ঝামেলায় থেকে মুক্তি পাওয়ার এর থেকে আর ভাল উপায় নেই।

আমার মনের ভেতরে দুই ধরনের অনুভূতি হতে লাগল। একপাশে আমার মনে হতে লাগল যে মিথ্যা হোক এই মাহার প্রেমিক হওয়ার ব্যাপারটা কিন্তু দারুন একটা ব্যাপার আবার অন্যদিকে আমার মনে হতে লাগল যে এই ঝামেলার ভেতরে যাওয়ার কোন দরকার নেই। এখনই আমি ফোনটোন বন্ধ করে কেটে পড়ি।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি রাজি হয়েই গেলাম। আমি অনেক দিন যাবত আমি কোন প্রেটট্রেম করি নি। একটা ফেইক প্রেম করেই দেখি কী হয়! আমি মাহাকে শর্ত দিলাম যে আমি অনলাইনে তার প্রেমিক হতে রাজি আছি। অনলাইনে একটা রিলেশনশীপ স্টাটাস মাহা দিবে আমাকে ট্যাগ করে। মাঝে মধ্যে হয়তো কোন পোস্টে আমাকে ট্যাগ দিবে। এই পর্যন্তই। এর থেকে বেশি কিছু না।
সেদিন রাতের বেলাই রিলেশনশীপ আপডেট হয়ে গেল। আমার ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট এসে হাজির হতে লাগল শয়ে শয়ে। আমি কারো রিকোয়েস্টই গ্রহন করলাম না। আমি ঠিক করেছিলাম যে এসব আমি দেখব না। তবে না চাইলেও অনেক কিছুই দেখতে হয়। অনেকেই আমাকে নক দিতে লাগল। নানান জন নানান রকম কথা বলতে লাগল। আমার বন্ধুদের অনেকেই আমার এই কাজে খানিকটা বিস্ময় প্রকাশ করল। আমার যে এমন একজন প্রেমিকা হতে পারে অনেকে এটা বিশ্বাসই করতে পারছিল না। কাছের কয়েকজনকে আমি খুলে বললাম আসল ঘটনা তবে বেশির ভাগকেই বললাম না। বলতে ইচ্ছে করল না।
আমি ভেবেছিলাম এই পুরো ব্যাপারটা অনলাইনেই সীমাবদ্ধ থাকবে তবে সেটা রইলো না। পরের মাসেই একটা ঝামেলা এসে হাজির হল। মাহা আমাকে মাঝে মাঝে নক দিয়ে টুকটাক কথা বলত। আমি প্রতিদিন বারোটার আগেই ঘুমিয়ে পড়ি জেনে সে বেশ অবাকই হয়েছিল। বিপরীরে সে রাতের বেলা অনেক সময় জেগে থাকে। এই কারণেই মূলত আমাদের কথা বার্তা একদমই হত না।
তবে একদিন আমার শান্তির দিন শেষ হল। মাহা জানাল যে তাকে যেতে হবে একটা ইভেন্টে। অনলাইনের অনেকেই যাবে। মাহার ইচ্ছে আমিও যাই তার সাথে। আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। আমি বললাম, আরে কী বলছেন?
-হ্যা। যেতেই হবে। দেখুন অনেকেই আসবে সেখানে। অনেক বড় একটা প্রোগ্রাম।
আমি অনেক মানা করার চেষ্টা করলাম কিন্তু কোন লাভ হল না। আমাকে যেতেই হবে! কোন মাফ নেই। শেষে আমাকে যেতেই হল।
অনুষ্ঠানে যাওয়ার আগের দিনই আমাদের দেখা হল। সত্যি বলতে কী মাহাকে প্রথমবারের মত দেখে আমি বেশ অবাকই হলাম। অনলাইনে মেয়েটা যেভাবে সেজেগুজে আসে আজকে সে একেবারে সাধারণ ভাবে এসেছে। সাধারণ মানের একটা কালো টিশার্ট পরেছে আর একটা কালো জিন্স। চুলগুলো পেছনে পনিটেইল করে বাঁধা। কিন্তু আমার কাছে মাহাকে এই সাজেই বেশ ভাল লাগল। এই প্রথমবারের মত আমার কেন জানি মনে হল যে মেয়েটার বয়ফ্রেন্ড হতে পারাটা খুব একটা খারাপ হয় নি।
মাহা আমাকে নিয়ে বসুন্ধরার রিচম্যানের শোরুমে ঢুকল। নিজে পছন্দ করে আমাকে শার্ট আর প্যান্ট কিনে দিল। কত বার যে ট্রায়াল দেয়ালো তার ঠিক নেই। এপেক্স থেকে স্নিকার কিনে দিল। আমি কতবার মানা করলাম কিন্তু সে শুনলো না। তার ভাষ্য হচ্ছে যে তার কাজে আমি যাচ্ছি এখানে সব কিছু তারই হতে হবে।
কেনাটাকা শেষে আমরা আট তলায় খাওয়া দাওয়া করলাম। এটার বিল খানিকটা জোর করেই আমিই দিলাম। যাওয়ার আগে মাহা এক সাথে বেশ কিছু ছবি তুলল। সেলফি তুলল বেশ কয়েকটা। কয়েকতা সেলফিতে একেবারে আমার শরীর ঘেঁষে এসে তুলল। কোন মেয়ের এতো কাছে আসাটা আমার কাছে একটু অস্বস্তিরই বটে। তবে মাহা একদিনই স্বাভাবিক ছিল।
বাসায় গিয়ে দেখলাম মাহা সেই ছবিগুলোর কয়েকটা শেয়ার দিয়েছে। আমাকে ট্যাগ করে দিয়েছে। আমি যে তার বয়ফ্রেন্ড সেটা আসলে কারো মনে আর কোন সন্দেহ রইলো না। এমন কি আমার সে বন্ধুদের আমি আসল ঘটনা বলেছিলাম তারাও সন্দেহ করতে লাগল যে আমার আর মাহার ভেতরেই আসলেই প্রেম শুরু হয়েছে।

ইভেন্টের দিনটা বেশ ভাল কাটল। সত্যি বলতে এমন হইচইয়ের ভেতরে আমি এর আগে খুব একটা যাই নি। আর মাহার মত মেয়ে যখন আমার সাথে ছিল তখন ব্যাপারটা বেশ ভালই লাগছিল। আমাদের বাসায় ফিরতে ফিরতে অনেক রাতই হয়ে গেল। আমি একেবারে মাহাকে ওর বাসায় নামিয়ে দিয়ে তারপর ফিরে এলাম।
এরপর থেকে মাহার সাথে আমার দেখা সাক্ষাত হতে লাগল। প্রায়ই আমাদের দেখা হত। ছুটির দিনগুলোতে সন্ধ্যা কিংবা বিকেলে আমরা এক সাথে বসে কফিটফি খেতাম। একদিন গেলাম উত্তরায় নৌকা ভ্রমণে। বেশ ভাল সময় কাটল। বলাই বাহুল্য যে এই সময়গুলোতে মাহা প্রচুর ছবি তুলত এবং সেসব সোস্যাল মিডিয়াতে শেয়ার দিত। আমি ওর ভিডিও করে দিতাম আবার আমি নিজেও সেই ভিডিওতে থাকতাম। আমাকে মানুষজন চিনতে শুরু করল।

এভাবেই যখন চমৎকার দিন যাচ্ছিল তখনই ঘটল ঘটনা। মাহার কিছু গোপন ছবি প্রকাশ পেয়ে গেল।
আমার এক বন্ধু ছবিগুলো আমাকে পাঠাল। ছবিগুলো দেখে আমার একটু মন খারাপই হল। যতই মাহা আমার ফেইক গার্লফ্রেন্ড হোক না কেন এমন ভাবে তার ছবিগুলো প্রকাশ পাওয়াটা আমি ঠিক মেনে নিতে পারলাম না। তবে ছবি গুলো দেখে একটা ব্যাপার বুঝতে পারলাম যে ছবিগুলো বেশ আগের। সম্ভবত মাহা যখন স্কুলে কিংবা কলেজে পড়ত তখনকার ছবি। ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে যে মাহা উপরের অংশের ছবি। সে মিরর সেলফি তুলেছে। সম্ভবত সেই সময়ের বয়ফ্রেন্ড যে ছিল তাকে দিয়েছে। আর এই বেটা এখন সেই ছবি ছেড়ে দিয়েছে।
আমি মাহাকে কয়েকবার ফোন দিলাম তবে সে ফোন ধরল না। তার আইডিও বন্ধ করে রেখেছে। এদিকে আমার ফেসবুকে মেসেজের বন্যা বয়ে গেল। আমি বাধ্য হয়ে দুদিন আমার আইডি ডিএকটিভেট করে রাখলাম। তারপর আমি একটা খুব সাহসের কাজ করে ফেললাম। আমি মাহাদের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম।
মাহা আমাকে দেখে খানিকটা অবাকই হল। ওর মনের অবস্থা আমি কল্পনা করতে পারছিলাম। মাহার বাবা মার মনের অবস্থাও আমি বুঝতে পারছিলাম। আচ্ছা আমাদের ব্যাপারটার আসল খবর কি মাহার বাবা মা জানেন? আমি ঠিক জানি না।
তবে দেখলাম তারা আমার সাথে বেশ আন্তরিক আচরণ করলেন।
দুপুর খাওয়া দাওয়ার পরে আমি মাহার ঘরে গিয়ে বসলাম। মাহা চুপ করে বসে ছিল খাটের উপরে। আমি ওর ঘর দেখছিলাম। এক সময়ে মাহা বলল, ওর নাম সজিব। আমি যখন স্কুলে পড়ি তখন থেকে আমাদের প্রেম ছিল। সেই সময়ের আবেগ বুঝতেই পারছো। কলেজে উঠে আমি এই ছবিগুলো ওকে দিয়েছিলাম। কিন্তু মাস ছয়েক যেতে না যেতেই আমি টের পেলাম যে সে আমার সাথে চিট করছে। অন্য একটা মেয়ের সাথে তার সম্পর্ক রয়েছে। তখন ব্রেক আপ করে ফেলি। তারপর থেকে আসলে আমি আর কারো সাথেই প্রেমট্রেম করতে চাই নি। আমার মনে হয়েছে সবাই বুঝি সজিবের মতই। এতোদিন পরে সজিব আবার ছবিগুলো কেন ছাড়ল আমি বুঝতে পারলাম না।
আমি বললাম, সম্ভবত আমার সাথে তোমাকে দেখেছে এই কারনে।
-হ্যা। এটাই হতে পারে। এছাড়া আর কি হবে! যাই হোক পুলিশ ধরেছে ওকে।

মাহা চুপ রইল কিছু সময়। তারপর বলল, আমি আসলে সরি। আমার কারণে তোমাকেও অনেক কিছু সহ্য করতে হচ্ছে। তাই না? লোকজন তোমাকে নিয়েও ট্রোল করছে।
আমি একটু হেসে বললাম, তা করছে। দুই দিন আমার কাছে কতগুলো যে মেসেজ এসেছে তার কোন ঠিক নেই।
মাহা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি আসলেই সরি।
-তুমি কেন সরি বলছো? তোমার কি দোষ আছে এখানে?
-তবুও আমারই দোষ!
-তাহলে আমারই দোষ বলা চলে। আমি যদি সেই ছবিটা না ছাড়তাম, তাহলে তো আমাদের দেখা হত না। আর তোমার ছবি প্রকাশ পেত না।
-হ্যা হ্যা বুঝতে পারছি। আমরা দুইজনই দোষী।
আমি বললাম, আসো একটা ছবি তোলা যাক।
মাহা একটু অবাক হল। বলল, কেন?
-আরে আসো না!

আমি মোবাইল বের করে মাহার সাথে ছবি তুললাম।
তারপর ওর সামনেই আমি আমার ফেসবুক একটিভ করলাম। এরপর প্রথমবারের মত মাহার সাথে তোলা সেলফি আমি আমার ফেসবুকে আপলোড দিলাম। সত্যি বলতে এতোদিনে আমি একটা বারও মাহার সাথে তোলা কোন ছবি আপলোড দেই নি। এই প্রথম দিলাম। আর ক্যাপশনে লিখলাম, তোমার কোন ভুল নেই। আর ভুল থাকলেও আমি তোমার সাথেই আছি!
মাহা লাইনটা দেখল। তারপর আমার দিকে তাকাল। ওর চোখে এক অদ্ভুত দৃষ্টি দেখতে পেলাম। আমার দিকে একটু এগিয়ে এসে মাহার নাকের সাথে নিজের নাকটা আলতো করে ঘষে বলল, থ্যাঙ্কিউ।

এরপর ঘটনা দ্রুত ঘটল। এতো সময়ে যারা মাহাকে ছিছি করছিল তারা সবাই মাহা পক্ষে কথা বলতে শুরু করল। বিশেষ করে আমি যে তাকে ছেড়ে যাই নি, তার সাথে আছি এবং থাকবে এই বাক্যেই পুরো ব্যাপারটা মাহার দিকে ঘুরে গেছে।
মাহাকে বললাম যে নিজের ফেসবুকে একটা পোস্ট দিতে। মাহা নিজের অবস্থান তুলে ধরল। সে সেই সময়ে ভুল করেছিল এবং কিভাবে তার সাথে অন্যায় করা হয়েছে সব কিছুই লিখল। এতে পাব্লিক রিএকশন আরো মাহার দিকে গেল। আগের থেকেও মাহার জনপ্রিয়তা বেড়ে গেল। আমি খেয়াল করে দেখলাম মাত্র সপ্তাহ খানেকের ভেতরেই মাহার ফলোহার সংখ্যা প্রায় এক মিলিয়নের কাছাকাছি চলে গেল।

মাহা নিজে প্রোফাইলে আমার সাথে তোলা একটা ছবি সেট করে দিল। এবং আমি নিজেও আমার ফেসবুক প্রোফাইলে আমহার সাথে তোলা একটা ছবি সেট করলাম। যদিও আমরা কেউ এখনও কাউকে ভালোবাসি বলি নি তবে সব কথা তো মুখ ফুটে বলতে হয় না। তাই না? কিছু কিছু সম্পর্ক আসলে কিভাবে তৈরি হয়ে যায় সেটা কেউ জানে না। কেউ বলতে পারে না! এভাবেই আমার এআই গার্লফ্রেন্ড আমার সত্যি সত্যি গার্লফ্রেন্ডে পরিণত হল।

এই গল্পের উৎসটা আসলেই সত্যি। চ্যাটজিপিটিকে সেদিন আমি বলেছিলাম আমার ছবির পাশের একটা ছবি বসিয়ে দিতে। সেই ছবি আমি শেয়ার দিয়েছিলাম আমার ফেসবুকে। আমার লিস্টে যারা আছেন তারা দেখেছেন। তারপর একজন একজনের প্রোফাইল দিল এবং অবাক হয়ে দেখলাম সেই ফেসবুকের মেয়েটার সাথে আমার এআই গার্লফ্রেন্ডের চেহারার আশ্চর্য মিল। দ্রুত ছবিটা ফ্রেন্ডসঅনলিতে নিয়ে নিয়েছি।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের নতুন অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা ফেসবুকে থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.6 / 5. Vote count: 22

No votes so far! Be the first to rate this post.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

4 Comments on “এআই গার্লফ্রেন্ড”

  1. গল্পটি পড়ে বেশ ভালো লাগল। প্রযুক্তির এই যুগে এআই যে মানুষকে এমনভাবে বিপদে ফেলতে পারে, আবার সেই বিপদ থেকেই যে চমৎকার একটি সম্পর্কের সূচনা হতে পারে, তা গল্পে বেশ দারুণভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন।

    বিশেষ করে গল্পের শেষ দিকে এসে নায়কের দৃঢ় অবস্থান এবং মাহার পাশে দাঁড়ানোর বিষয়টি মন ছুঁয়ে গেল। আধুনিক প্রেক্ষাপটে লেখা এমন সাবলীল ও গতিময় গল্প পড়ার অভিজ্ঞতা সত্যিই আনন্দদায়ক।

    চমৎকার এই গল্পের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
    এমন আরও সুন্দর গল্পের অপেক্ষায় রইলাম।
    শুভকামনা!

    1. দিন দিন এআই দিয়ে কত কিছু যে করা যায় কোন ঠিক নেই। সম্প্রতি মেটা এআই ব্যবহার করা শুরু করেছি। এটা দিয়ে কত কিছু যে করা যাচ্ছে, কত রিয়ারেস্টিক ছবি ভিডিও যে তৈরি করা যাচ্ছে সেটার ঠিক নেই। বাস্তবে এটা আরো উন্নত হবে তখন যে কী হবে সেটা বলা মুস্কিল।
      গল্পের নায়করা এমন হয় তবে বাস্তবের নায়করা সম্ভবত এমন হয় না। গল্পেই এই কারণে সুন্দর সমাপ্তি ঘটে বাস্তবে ঘটে না খুব একটা।

      আপনাকে ধন্যবাদ। ভাল থাকুন।

  2. গল্পটা পড়ে মুগ্ধ হলাম।
    এআই দিয়ে একটা ছবি বানানোর মজা কীভাবে একের পর এক ঘটনা ঘটিয়ে শেষ পর্যন্ত দাঁড় করালো এক অনন্য সম্পর্কে; পুরো ব্যাপারটা খুব চমৎকারভাবে এগিয়েছে।
    আপনার গল্প বলার ভঙ্গিটা সহজ আর সাবলীল। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল যেন চোখের সামনে ঘটনাগুলো দেখছি।

    গল্পটার জন্য ধন্যবাদ। শুভকামনা রইলো।

    1. মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ। এই কাজটা আমি বাস্তবে সত্যিই করেছিলাম। মানে কাজের ফাকে আমি এআই দিয়ে ছবি বানিয়ে নিজের প্রোফাইলে তারপর ফ্রেন্ড লিস্টের একজন আমাকে একজনের প্রোফাইলের লিংক দেয়। সেখকানে গিয়ে দেখি সেইমেয়ের চেহারা একেবারে আমার সেই এআই গার্লফ্রেন্ডের মত। যদি সেই মেয়ে আমার এই ছবি দেখত আমি নিশ্চিত আমাকে সে ঝাড়ি দিত মাহার মতই।

      গল্প পড়ে ভাল লেগেছে জেনে ভাল লাগল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *