সাব্বির নাইরার দিকে কিছুটা অবাক হয়েই তাকিয়ে রইল। সত্যি বলতে, নাইরাকে সে এখানে মোটেই আশা করেনি। প্রায় ছয় মাস পর ওকে একেবারে নিজের ফ্ল্যাটের দরজার সামনে দেখবে, এটা সে কোনোভাবেই ভাবেনি। তার বিস্ময়ের ভাবটা নাইরা কিছুক্ষণ উপভোগ করল। তারপর তাকে খানিকটা পাশ কাটিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। সাব্বির কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সে বলল, বেডরুম কোথায়?
উত্তরের জন্য অবশ্য সে অপেক্ষা করল না। ফ্ল্যাটটা ছোট। ড্রয়িং-ডাইনিং ছাড়া মাত্র দুটো রুম। বেডরুমের দরজা খোলাই ছিল, নাইরা নিজেই ঢুকে পড়ল। সাব্বিরও পেছন পেছন যেতে গিয়ে থেমে গেল। তার মনে হল, নাইরা এখন পোশাক বদলাবে। আলমারি খুলে তার কোনো টি-শার্ট বের করে পরবে।
সে বসার ঘরের সোফায় গিয়ে বসল। মাথায় একটাই প্রশ্ন ঘুরছিল, নাইরা কেন এসেছে? আর তার ঠিকানাই বা পেল কীভাবে? নাইরার ইগো খুব প্রবল। সেই ইগো একপাশে সরিয়ে রেখে সে নিজে থেকে সাব্বিরের কাছে এসেছে, ব্যাপারটা সত্যিই অবাক করার মতো। এর আগে নাইরাকে এমন কিছু করতে সে কখনো দেখেনি। এমনকি যেদিন সাব্বির তাকে বলেছিল, আর একসঙ্গে থাকতে চায় না, আলাদা হয়ে যেতে চায়, সেদিনও নাইরা তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। যেন সে জানতই, একদিন এমন কিছু ঘটবে। সাব্বির তার কাছ থেকে দূরে সরে যাবে।
তাদের বিয়েটা খুব স্বাভাবিক কিছু ছিল, সাব্বির সেটা বলবে না। নাইরার মতো মেয়ে তাকে বিয়ে করতে চাইবে, এটা সে কোনোদিন ভাবতেও পারেনি। কেন নাইরা রাজি হয়েছিল, সেটা সে নিজেও জানে না। তবে বিয়ের পরই সম্ভবত নাইরার সেই মোহ কেটে গিয়েছিল। এমন তো হয়, কাউকে দেখে কোনো কারণ ছাড়াই খুব ভালো লেগে যায়। সম্ভবত সাব্বিরের বেলায় নাইরারও তেমনই হয়েছিল। এমন সময় উচিত হল কিছুদিন অপেক্ষা করা। সময়ের সাথে মনের মোহ কেটে যায়, তখন আর সেই মানুষটাকে আগের মতো লাগে না। নাইরা সেই সময়টা পার না করেই হুট করে বিয়ের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল। সাব্বিরেরও উচিত ছিল রাজি না হওয়া। কিন্তু সেও কেন যেন অমত করেনি। আসলে নাইরা মেয়েটাই এমন ছিল। এমন মেয়েকে কোনোভাবেই ফিরিয়ে দেওয়া যায় না। সাব্বিরও পারেনি।
বিয়ের প্রথম কয়েকদিন ভালোই কেটেছিল। তারপর একসময় নাইরা কেমন যেন নির্জীব হয়ে গেল। ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগল। বিয়ের দুই বছরের মাথায় অবস্থা এমন দাঁড়াল যে কালেভদ্রে তাদের কথা হত। ঘর আলাদা হয়ে গিয়েছিল। একই ফ্ল্যাটে থাকলেও তারা ঘুমাত আলাদা ঘরে। দিনের পর দিন একটা কথাও হত না। দুজন যেন দুজনের মতো করে জীবন পার করছিল। তখনই সাব্বিরের মনে হল, এভাবে একসঙ্গে থাকার কোনো মানে নেই। সে আলাদা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিল।
মনে ভয় ছিল, নাইরা হয়তো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাবে। কিন্তু সে শান্তভাবেই কথাটা শুনল, মেনেও নিল। মাস দুয়েকের মধ্যে তারা যার যার পথে চলে গেল। তারপর থেকে সাব্বির এই ছোট ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে একা থাকছে। দিনগুলো খারাপ কাটছিল না। কিন্তু আজ নাইরা আবার এখানে এসে হাজির।
একটু পরে নাইরাকে ড্রয়িংরুমে আসতে দেখা গেল। সে নিজের পোশাক বদলে একটা লং টি-শার্ট আর একটা লেগিংস পরেছে। এই পোশাকগুলো নাইরার জন্য কেনা। সাব্বির কিনে স্বযত্নে রেখে দিয়েছিল আলমারিতে। কোন কারণ ছাড়াই সাব্বির এই কাজটা করেছিল। ওর মনের একটা অংশের আশা ছিল হয়তো কোনো দিন নাইরা এসে হাজির হবে ওর বাসায়। সাব্বিরের পাশে বসতে বসতে সে বলল, দুপুরে কী খাওয়াবে?
সাব্বির বলল, “তুমি এখানে খাওয়ার জন্য এসেছ?
-কেন, আসতে পারি না? তুমি তো চমৎকার রান্না করতে। এই ক’মাস তোমার রান্না আমি খুব মিস করেছি।
-শুধু আমার রান্না? আমাকে না?
নাইরা কী যেন ভাবল। তারপর বলল, তোমাকেও মিস করেছি। তবে রান্নাটাই বেশি।
সাব্বির হেসে ফেলল। অনেকদিন পর সে বুঝতে পারল, এই ছোট ফ্ল্যাটটা হঠাৎ আর আগের মতো খালি লাগছে না।
সাব্বির উঠে রান্নাঘরে গেল। ফ্রিজ খুলে দেখল, ডিম আছে, কিছু আলু, আর চিংড়ি। বাজার করার সময় সে নিজের জন্য এত আয়োজন করে না। প্রায়ই দিনই সে বাইরেই খায়।
নাইরা রান্নাঘরের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়াল। হাত দুটো বুকের ওপর ভাঁজ করা। সাব্বির পিঁয়াজ কাটতে কাটতে টের পাচ্ছিল, নাইরা ওর দিকে তাকিয়ে আছে। বিয়েরপর প্রথম দিনগুলো এভাবেই কাটতো ওদের। সে রান্না করতো আর নাইরা পাশে দাঁড়িয়ে থাকত।
সাব্বির কড়াইয়ে তেল দিল। পিঁয়াজ ছাড়তেই ঘরময় চেনা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল। নাইরা চোখ বন্ধ করে একটা লম্বা শ্বাস নিল। এই গন্ধটা সে সত্যিই মিস করেছে। নাইরা হঠাৎ বলল, তোমার আলমারিতে আমার জন্য পোশাক কিনে রেখেছো!
সাব্বিরের হাত এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। তারপর আবার চলতে শুরু করল। মুখ দিয়ে কোনো কথা বলল না।
-এক কোণায় কিছু কাপড় ভাঁজ করে রাখা। আমার সাইজের।
একটু বিরতি। সাব্বির নিজের মনেই কাজ করে চলেছে। কিছু বলল না। কানের পেছনটা সামান্য লাল হয়ে উঠল। নাইরা সেটা দেখল এবং মনে মনে হাসল। এই মানুষটা এখনও আগের মতোই লজ্জা পেলে ধরা পড়ে যায়।
খাবার টেবিলে সাদামাটা আয়োজন। ভাত, ডিমের ঝোল, আলুভর্তা আর চিংড়ি ভুনা। নাইরা প্রথম লোকমা মুখে দিয়ে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। সাব্বির জিজ্ঞেস করল, কেমন হয়েছে?
-খারাপ না।
-খারাপ না?
-ঠিক আছে, ভালো হয়েছে। তুমি তো জানো আমি মানুষের প্রশংসা ঠিক করতে পারি না।
নাইরা আরেক লোকমা নিল। তারপর বলল, খুব ভালো। এবার খুশি?
সাব্বির হাসল। খেতে খেতে দুজনের মধ্যে ছোটখাটো কথা হল। নাইরার অফিসের কথা, সাব্বিরের ক্যাফের কথা, পাশের ফ্ল্যাটের বুড়ো ভদ্রলোকের বেড়ালটার কথা, যেটা প্রায়ই সাব্বিরের বারান্দায় এসে বসে থাকে।
খাওয়া শেষে নাইরা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। সাব্বির প্লেটগুলো সিঙ্কে রেখে পেছন পেছন এল। বিকেলের আলো তখন পড়ে আসছে। নিচের রাস্তায় রিকশার ভিড়।
নাইরা রেলিংয়ে হাত রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি তোমাকে আরো একটা কথা বলতে এসেছি।
সাব্বির তাকিয়ে রইলো নাইরার দিকে। নাইরা বারান্দা দিয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে আছে। আস্তে আস্তে বলল, আমি জানি আমার সাথে ঐ বাসায় তোমার কিছুটা দম বন্ধ হয়ে আসত। আসলে আমাদের পথ এক রকম ছিল না। যদি আমি খুব ভাল করেই জানি যে তুমি আমাকে ভালোবাসো এখনো যেমনটা আমি বাসি!
সাব্বির একটু যেন থমকে গেল। নাইরা আবারও বলল, আসলে কেবল ভালোবাসা যথেষ্ঠ না এক সাথে দুজন মানুষের পাশাপাশি থাকার। সত্যিই না। তাই না?
-হয়তো। তবে চেষ্টা করলে হয়তো থাকা যায়।
-আমি চাইনা কেবল চেষ্টা করুক। এই জন্য তোমার সিদ্ধান্তকে আমি মেনে নিয়েছি। কিন্তু……
-কিন্তু…
-কিন্তু তোমার আশেপাশে অন্য কোনো মেয়েকে আমি সহ্য করব না। আমার এটা সহ্য হবে না। কিছুতেই না।
সাব্বির একটু অবাকই হল নাইরার কথা শুনে! তখনই সাব্বিরের মনে হল যে আরেকটু চেষ্টা করলে কী হত? একটু চেষ্টা করলে কি এক সাথে থাকা যেত?
এই মেয়েটাকে সে দুই বছর ধরে চিনেছে, অথচ আজ মনে হচ্ছে একেবারে নতুন একজনকে দেখছে। যে মেয়ে কখনো মুখ ফুটে কিছু চায়নি, সে আজ নিজের সব অহংকার একপাশে সরিয়ে রেখে এই অদ্ভুত, অযৌক্তিক কথাটা বলছে। ভালোবাসার মানুষের কাছে যেমন করে মানুষ বাচ্চা হয়ে যায় নাইরার কথাও সাব্বিরের কাছে ঠিক তেমনই মনে হচ্ছে!
সাব্বির অবশ্য মানা করল না। কারণ নাইরা ছাড়া সত্যিই সে অন্য আর কোন মেয়েকে ভালোবাসে না; বাসবেও না।
দুই
সকালের নাস্তার টেবিলে নাইরাকে সবার সাথেই এক টেবিলেই করতে হয়। এই সময়টাই কেবল সবাই এক সাথে বাসায় থাকে। নয়তো আর কখনই কাউকে এক সাথে পাওয়া যায় না। আজকেও নাইরা নাস্তা করছিল আর নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে সকালের সংবাদ ব্রাউজ করছিল, এমন সময় তার বাবা আজিজ আহমেদ খান প্রশ্নটা করলেন।
-তুমি সাব্বিরের সাথে আবার দেখা কেন করছো?
নাইরার মনে হল সে প্রশ্নটা শোনে এমন ভাব করে এড়িয়ে যাবে। নিজে খাওয়ায় মন দিলে তার বাবা সম্ভবত আর প্রশ্নটা করবে না। তবে তার ধারণা সত্যি হল না। আজিজ আহমেদ আবারও প্রশ্নটা করলেন।
-তোমাকে একটা প্রশ্ন করেছি আমি।
নাইরা ফোন থেকে মুখ তুলে তাকালো। দেখতে পেল টেবিলে সবার খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। ঘরের পরিবেশ কিছুটা বদলে গেছে। নাইরা বলল, তুমি কি আমার পেছনে স্পাই লাগিয়েছো?
-আমার ছেলে মেয়েরা কোথায় যায় কার সাথে মিশে সেটা আমাকে খোজ রাখতে হয়? একবার ভুল হয়েছে বারবার ভুল করবো না আমি!
নাইরার মাথার ভেতরে হঠাৎ দপ করে জ্বলে উঠল। কেন উঠল সেটা নাইরা নিজেও জানে না। তার বাবা ভুল বলতে আসলে কী বলতে চেয়েছেন সেটা নাইরা খুব ভাল করেই জানে। নাইরা রাগ প্রকাশ করল না। নিজেকে শান্ত করে বলল, ভাল করেছো স্পাই লাগিয়েছো। এখন থেকে আর লুকোচুরি করতে হবে না।
-কেন গেছো আবার ঐ বদমাইশটার কাছে?
-বাবা সাব্বির বদমাইশ না। সে এমন কোন কাজ করে নি যে তাকে বদমাইশ বলতে হবে!
-আচ্ছা এখন তোমার কাছ থেকে আমার ওর ব্যাপার সার্টিফিকেট নিতে হবে?
এবার নাইরা আর নিজের মেজাজতা ধরে রাখতে পারল না। বেশ চড়া গলায় বলল, হ্যা নিতে হবে। আমার হ্যাজব্যান্ড সম্পর্কে তার অনুপস্থিতিতে কেউ একটা বাজে কথা বলবে না। কেউ না মানে কেউ না!
নাইরার কন্ঠে এমন কিছু ছিল যে সবাই একটু চুপছে গেল। কিছু সময় চুপ করেই রইলো সবাই। চুপচাপ খাবার খেল সবাই। নাইরার মা রেহনুমা আহমেদ বললেন, দেখো আমরা খারাপ কিছু বলছি না। কিন্তু ডিভোর্সের পরে এমন এক্স হাজব্যান্ডের সাথে দেখা করা ভাল দেখায় না। আমরা সমাজে বাস করি, তাই না?
নাইরা উত্তর দিল না। তার নাস্তা খাওয়া প্রায় শেষ। এখনই সে বের হবে। এখন নতুন করে আর কথা খরচ করতে তার ইচ্ছে করছে না।
রেহনুমা আহমেদ বললেন, তুমি জানো তোমার বাবা তোমার বিয়ে কথা ভাবছেন।
নাইরা বলল, বিয়ে! কার সাথে? ঐ ছাগল কিবরিয়ার সাথে?
টেবিলে বসে থাকা সবার দিকে একে একে সে তাকাল। তার বাবা ছোট ভাই আর তার মা সবার উপর চোখ বুলিয়ে তারপর ঠান্ডা গলায় বলল, আমার বিয়ে নিয়ে কারো চিন্তা করতে হবে না। সাব্বিরের সাথে আমার ডিভোর্স হয়েছে তার মানে এই না যে তোমাদের কেউ এই সুযোগ পেয়ে গেছ যে আমাকে অন্য কারো সাথে বিয়ে দিবে। এন্ড অব ডিসকাশন!
নাইরা আর দাঁড়াল না। নাস্তার টেবিল থেকে সোজা নিজের ঘরে ফিরে এল। সেখান থেকে ব্যাগটা নিয়ে আবারও নিচে নেমে গেল গাড়ির কাছে। সকাল বেলা মেজাজ খারাপ করার ইচ্ছে তার ছিল না। এখন হয়তো পুরো দিনটাই খারাপ যাবে।
তখনই নাইরার মনে হল যে আজকে অফিসে গিয়ে আর কাজ নেই এখন। অফিসে গেলে হয়তো মেজাজটা আরো বেশি খারাপ হবে। ড্রাইভারকে সে গাড়ি ঘুরিয়ে মোহাম্মাদপুরের দিকে যেতে বলল। ড্রাইভার একটু অবাক হলেও কোন প্রশ্ন করল না। সে জানে মোহাম্মাদপুরে কার বাসায় যেতে হবে।
নাইরা যখন দরজায় কলিংবেল চাপ দিল তখন তার মনের ভেতরে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছিল। বাসায় এখন কে কে আছে সেটা নাইরা জানে না। দরজা যখন খুলল তখন দরজার পেছনে দাঁড়ানো মানুষটা কিছুটা সময় নাইরার দিকে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তার ভুরু একটু কুঁচকে উঠেছিল তবে সেটা সোজা হয়ে এল। তারপর বললেন, পথ ভুল করে?
নাইরা হাসল। তারপর বলল, মেজাজ খারাপ সকাল থেকে। মনে হল আপনার সাথে কিছু সময় কথা বললে ভাল লাগবে!
রেহেনা পারভিন হাসলেন একটু। নাইরার কথাটা তার পছন্দ হয়েছে বোঝা গেল। তারপর বললেন, নাস্তা করেছো?
নাইরা মাথা ঝাকাল।
-কফি চলবে?
-হ্যা। কফি।
নাইরা ঘরের ভেতরে ঢুকল। তারপর বলল, আব্বু অফিসে চলে গেছে?
রেহেনা পারভিন বললেন, হ্যা।
-সাব্বিরের ক্যাফেতে গিয়েছিলেন?
-হ্যা। বেশ ভালই বানিয়েছে দেখলাম।
-আব্বু গিয়েছিলেন?
-নাহ। তার মেজাজ খুব খারাপ হয়ে আছে। একে তো তোমার থেকে আলাদা হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটা সে মেনে নিতে পারে নি অন্য দিকে চাকরি ছেড়ে দিয়ে ক্যাফে দিয়েছে। জানোই তো এদেশের বাবারা কেমন হয়!
নাইরা হাসল। সে খুব ভাল করেই জানে। রেহেনা পারভিন একটু পরে দুইকাপ কফি নিয়ে এলেন বসার ঘরে এলেন। কফিতে চুমুক দিতে দিতে রেহেনা নাইরার দিকে তাকিয়ে বললেন, সাব্বিরের সাথে তুমি দেখা করতে গিয়েছিলে, তাই না?
নাইরা মাথা ঝাকাল।
-কী বলল সে?
-কিছু বলে নি।
রেহেনা পারভিন আরেকবার কাপে চুমুক দিলেন। তারপর ঘুরে এসে নাইরার পাশে বসলেন। নাইরাকে জড়িয়ে ধরে কিছু সময় আদর করলেন তাকে। নাইরা অনুভব করল যে তার মেজাজ খারাপের ভাবটা কেটে গেছে। নাইরা জড়িয়ে ধরে থাকা অবস্থায় বলল, আমাদের ম্যাচিংটা পার্ফেক্ট ছিল না। আমরা হয়তো দুজন দুজনের জন্য ছিলাম না। তাই না আম্মু?
-এই কথা কেন বলছো?
-জানি না। আমার মনে হল। সাব্বির এখনও আমাকে ভালোবাসে। সত্যিই ভালবাসে। কাল যখন ওর বাসায় গিয়ে হাজির হলাম তখন প্রথমে আমাকে দেখে ও একটু অবাক হল বটে বলে ওর চোখে মুখে আমি আনন্দটা ঠিকই অনুভব করতে পারলাম।
ওর বেডরুমে ঢুকে যখন আলমারি খুললাম তখন যা আশা করেছিলাম ঠিক সেই জিনিসই দেখতে পেলাম!
-কী দেখলে?
-আলমারির এক পাশে আমার জন্য আলাদা ভাবে কাপড় রাখা। যেন ও জানতোই আমি আসব।
এবার রেহেনা পারভিন নাইরে জড়িয়ে ধরা থেকে ছেড়ে মুখোমুখো নিয়ে এলেন। তারপর বলল, তোমাদের ভাব সাব আমি সত্যি কিছু বুঝি না। না তোমার না সাব্বির! তোমরা দুজনই দুজনকে ভালোবাসো অথচ এক সাথে থাকলে না। আলাদা হয়ে গেলে। কেন এমনটা হল?
রেহেনা পারভিনের সাথে আরও কিছ সময় কাটালো। তখন আবারও গাড়িতে উঠল তখন অনুভব করল যে রাগটা আর নেই। এখন সে অফিসে গিয়ে শান্তিমত কাজ করতে পারবে।
তিন
ক্যাফের কাচের দরজার সামনে এসে নাইরা এক মুহূর্ত থামল। ভেতরে গান বাজছে সেটার আওয়াজ বাইরে থেকেই আসছে। কাঁচের দেওয়ালের ধারে সারি সারি ছোট কাঠের টেবিল। বিকেল পাঁচটা বাজে, বেশ ভাল ভিড় দেখা যাচ্ছে ভেতরে।
সে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
প্রথমেই চোখে পড়ল কাউন্টারের পেছনে সাব্বিরকে। সাদা শার্টের হাতা কনুই পর্যন্ত গোটানো, গলায় কালো অ্যাপ্রন। সামনে ঝুঁকে কী একটা হিসাব দেখছে। কিন্তু নাইরার চোখ আটকে গেল তার সামনে দাঁড়ানো মেয়ে তিনজনের দিকে।
তিনজনই কাউন্টারের এপাশে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে। একজন কনুই টেবিলে রেখে থুতনি হাতে ঠেকিয়েছে। আরেকজন চুলের ডগা আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে হাসছে। তৃতীয়জন মেনুকার্ডটা হাতে নিয়ে এমন মনোযোগে দেখছে, যেন জীবনে প্রথম কোনো মেনু দেখছে।
-ভাইয়া, আপনার হাতের ক্যারামেল ল্যাটেটা কিন্তু অসাধারণ। কালকের পর আজকেও না এসে পারলাম না।
-আরে ভাইয়া, আপনি তো অনেক কাজ করছেন।
-আমি কিন্তু পার্ট-টাইম কাজ করতে পারি, ভাইয়া। ফ্রি-তেই।
তিনজনেই হেসে উঠল। সাব্বির মুখ তুলে ভদ্রতার একটা হাসি দিল। ঠিক যতটুকু ব্যবসার জন্য দরকার, তার বেশি না। কিন্তু নাইরার চোখে সেটুকুও বাড়াবাড়ি লাগল।
সে ক্যাফের চারপাশে চোখ বুলাল। কোণার টেবিলে দুজন মেয়ে ল্যাপটপ খুলে বসে আছে, কিন্তু স্ক্রিনের চেয়ে বেশি তাকাচ্ছে কাউন্টারের দিকে। জানালার ধারের টেবিলের একজন কফির কাপ হাতে বারবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখছে। বইয়ের তাকের কাছে দাঁড়ানো মেয়েটা একই বইয়ের পাতা তিনবার উল্টাল, আর প্রতিবারই চোখ গেল সাব্বিরের দিকে।
নাইরার ভেতরে কিছু একটা ধীরে ধীরে শক্ত হয়ে উঠল। দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর যা-ই হোক, নাইরার ধৈর্য আর বাকি ছিল না।
সে ব্যাগটা কাঁধে ঠিক করে নিল। তারপর সোজা কাউন্টারের দিকে হাঁটতে শুরু করল। তার পায়ের শব্দে প্রথমে কেউ ফিরে তাকাল না। কিন্তু কাউন্টারের পাশে এসে সে যখন দেয়ালে লাগানো ছোট কাঠের গেটটা, যেখানে লেখা “স্টাফ ওনলি”, নির্দ্বিধায় ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়ল, তখন সবার চোখ তার দিকে ঘুরে গেল।
সাব্বিরও মুখ তুলে তাকাল। নাইরাকে দেখে তার চোখ বড় হয়ে গেল। তবে কোনো কথা বলল না।
নাইরা সোজা তার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। এত কাছে যে তার কাঁধ সাব্বিরের কাঁধ ছুঁয়ে গেল। সে আলতো করে হাত বাড়িয়ে সাব্বিরের অ্যাপ্রনের ফিতেটা ঠিক করে দিল, যেটা সামান্য বাঁকা হয়ে ছিল। তারপর শার্টের কলারটা সোজা করল। একদম অভ্যস্ত ভঙ্গিতে, যেন প্রতিদিন সকালে এটাই করে এসেছে।
-সারা সারাদিন এই অ্যাপ্রন পরে থাকার দরকার কী?
সাব্বির কিছু বলতে পারল না। মুখ খুলে আবার বন্ধ করল।
নাইরা কাউন্টারের ওপর রাখা সাব্বিরের পানির গ্লাসটা তুলে নিল। এক চুমুক খেয়ে আবার জায়গামতো রাখল। তারপর সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে, এমন গলায় যেন ক্যাফেতে আর কেউ নেই, বলল, দুপুরে কী খেয়েছ? আমি জানি তুমি খাওনি। সবসময় এমনই করো।
-আমি… খেয়েছি। মানে… একটা স্যান্ডউইচ।
-স্যান্ডউইচ খাবার না, সাব্বির।
কাউন্টারের এপাশে দাঁড়ানো তিন মেয়ে এতক্ষণ চুপ করে এই দৃশ্য দেখছিল। চুলে আঙুল পেঁচানো মেয়েটার হাসি কখন মিলিয়ে গেছে, সে নিজেও খেয়াল করেনি। মেনুকার্ড হাতে মেয়েটা আস্তে আস্তে সেটা নামিয়ে রাখল।
অবশেষে একজন গলা খাঁকারি দিয়ে বলল, ভাইয়া… এই আপুটা কে?
সাব্বির প্রথমে নাইরার দিকে তাকাল। তারপর মেয়েটার দিকে। তার ঠোঁট নড়ল একটু তবে কিছু বলার আগেই নাইরা বলল, আমি ওর ওয়াইফ।
তারপর সে মেয়েগুলোর দিকে একবার করে চোখ বুলিয়ে শান্ত চোখে তাকাল। তার চোখের দৃষ্টিতে এটা বলে দিচ্ছে যে এই ছেলেটা একদম আমার। এই দিকে চোখে দিবে না বলে দিমাম। নাইরা তারপর বলল, আপনাদের কফি ভালো লেগেছে জেনে খুশি হলাম। ও সত্যিই ভালো বানায়।
কাউন্টারের এপাশে পিনপতন নীরবতা। মেনুকার্ডওয়ালা মেয়েটা ঢোক গিলল। চুলওয়ালা মেয়েটা হঠাৎ নিজের ফোনের দিকে মনোযোগ দিল। যে প্রশ্নটা করেছিল, সে মুখে জোর করে হাসি টেনে বলল, ও… আচ্ছা। ভাইয়া বিবাহিত, জানতাম না তো।
নাইরা মিষ্টি করে বলল, জানার তো কথা না। ও তো আর কপালে লিখে রাখে না যে আমি বিবাবিত!
মেয়ে তিনজন একে অপরের দিকে একবার তাকাল। তারপর কোনো কথা না বাড়িয়ে তিনটা কফির অর্ডার দিয়েই আস্তে আস্তে ক্যাফের অন্যদিকে সরে গেল।
আশেপাশের চাপা গুঞ্জন ধীরে ধীরে ফিরে এল।
সাব্বির তখনও নাইরার দিকে তাকিয়ে আছে। তার কানের পেছনটা লাল হয়ে উঠেছে, গলার কাছে কিছু একটা আটকে আছে।
সাব্বিরের চোখে যে প্রশ্ন ছিল সেতার উত্তরে নাইরা বলল, গতদিনই আমি বলেছিলাম!
সাব্বির বলল, তাই বলে এভাবে?
-কী ভেবেছিলে? আমি মজা করছি? নাইরা হাসল।
সে কাউন্টারের পেছনের টুলটায় বসে পড়ল, যেন এই জায়গাটা তার বহুদিনের চেনা। সাব্বিরের দিকে মুখ তুলে বলল, আমাকে একটা কফি দাও। তোমার হাতের। চিনি কম।
সাব্বির কয়েক সেকেন্ড দাঁড়িয়ে রইল, হতভম্ব। তারপর হঠাৎ তার ঠোঁটে এমন একটা হাসি ফুটল, যেটা সে কিছুতেই চাপতে পারছিল না। মাথা নেড়ে সে মেশিনের দিকে ফিরল।
-জো হুকুম, ম্যাডাম।
-এই তো! এবার ঠিক আছে।
কাউন্টারের এপাশ থেকে ক্যাফের সবাই আড়চোখে তাদের দিকে তাকাচ্ছিল। কিন্তু নাইরা সেদিকে ফিরেও তাকাল না। তার আসলে ফিরে তাকানোর দরকার নেই।
এই গল্পের ভবিষ্যৎ আসলে কি সেটা আমরা জানি না। হয়তো সামনে গিয়ে আবারও নাইরা আর সাব্বির এক সাথে বসবাস শুরু করবে হয়তো করবে না। তবে নাইরা অন্য কোনো মেয়েকে সাব্বিরের ধারে কাছে আসতে দিবে না সেটা নিশ্চিত ভাবেই বলা যায়। ভালোবাসার মানুষটার সাথে আলাদা হয়ে যাওয়ার থেকেও ভালোবাসার মানুষটা অন্য একজনের হাত ধরেছে এই ব্যাপারটা সহ্য করা বেশি কষ্টের!
ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।
অপু তানভীরের দুটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।
Discover more from অপু তানভীর
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Need to Rafayel season brother