আমি অনেকটা সময় ধরে নীতুর হাত ধরে রাখলাম। আজকে অনেকটা দিন পরে আমরা এভাবে দুজনের কাছাকাছি বসে আছি। এখন তো আমাদের আর দেখাই হয় না আগের মত। ফোনে কথা হলেই ঝগড়া লেগে যায়। আমি আসলে নীতুকে দোষ দিতে পারি না। বরং নীতুকে আমার ধন্যবাদ দেওয়া উচিত। আমার মত একজন লুজারের সাথে সে এতোটা দিন রয়েছে। অন্য কেউ হলে কবেই লাথি মেরে চলে যেত।
আমি নীতু হাত ধরে রেখে বললাম, ঐ আমেরিকান ব্যাংকের কী খবর? এখনও আছে?
নীতু আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, জানি না।
-তোমার ওখানে হ্যা করে দেওয়া উচিত।
নীতু একবার আমার দিকে তাকাল। তারপর আবার চোখ সরিয়ে নিল। আমি বললাম, আমি জানি তোমার নিজের ভেতরে একটা গিল্টি ফিলিং কাজ করছে। তুমি ভাবছো আমাকে ছেড়ে ভাল একটা জায়গায় বিয়ে করলে বুঝি আমাকে ঠকাবে। তাই আমাকে ছেড়ে যেতে পারছো না।
নীতু এবারও চুপ করেই রইলো। আমি বললাম, আসলে জীবনে প্রাক্টিক্যাল হওয়া দরকার। আমি আগে এসব ঠিক বুঝতাম না। তবে যত দিন যাচ্ছে যত বুঝতে পারছি যে আমি একজন লুজার তত এই ব্যাপারটা ভাল ভাবে বুঝতে পারিছি। একটু সুখে থাকার অধিকার সবার আগে। তোমারও। তুমি জানো আমার বাসায় আমার সাথে আমার মা বাবা আর ভাইয়া রিমি কেউ ঠিক কথা বলে না। তাদের কাছে আমি বোঝা ছাড়া আর কিছু না। ফেইল্ড প্রোজেক্ট!
নীতু এবার আমার দিকে তাকাল। আমি ওর চোখ আমার জন্য এক ধরনের মায়া দেখতে পেলাম। অথবা এটা হয়তো আমার প্রতি ওর করুণা। আমি ওর দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলাম চুপ করে। তারপর বললাম, আচ্ছা ধর তুমি আমাকে বিয়ে করলে, তারপর? আমরা সংসার পাতলাম। তখন শুরু হবে সংসারে অভাব অনটন। এটা তো জানো যে অভাব যখন ঘরের দরজায় এসে হাজির হয় প্রেম ভালোবাসা তখন জানালা দিয়ে পালায়। এটাই হয় সব সময়। এর চেয়ে বরং এভাবেই আমাদের সম্পর্ক শেষ হোক। তোমার সাথে কাটানো আমি আমার জীবনের সেরা সময়গুলো মনে রাখি। এটাই কি ভাল নয়?
নীতু তখন কাঁদতে শুরু করল। একটা সময়ে সে আমাকে জড়িয়ে ধরেই হুহু করে কেঁদে উঠল। আমার তখন মনে হল নীতু চোখে আমার জন্য করুণা ছিল না। সেটা মায়া আর ভালোবাসাই ছিল। মনটা সিক্ত হল। অন্তত একজন মানুষ এই দুনিয়াতে রয়েছে যে কিনা সত্যিই আমাকে ভালোবাসে। এই ভালোবাসার মানুষটাও আজকে আমার থেকে দুরে চলে যাবে। আজকের পর হয়তো এই মেয়েটার সাথে আমার আর দেখা হবে না। সে অন্য কারো হয়ে যাবে!
আমার সাথে সারাজীবনই এমনটাই হয়ে এসেছে। আমি সব সময়ই পরাজিত হয়ে এসেছি। পরিবারের মানুষের কাছে, বন্ধু-বান্ধব বা অন্য সব জায়গাতেই। আমি কেবল পরাজিতই হয়ে এসেছি। আজকেও আমি আরেকবার পরাজিত হলাম।
নীতুর চলে যাওয়ার পর আমি ওর চলে যাওয়া পথের দিকে কিছু সময় তাকিয়ে রইলাম কেবল। আমার মনে হল আমার জীবিত থাকার শেষ আশাটুকু আমাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে। সত্যি বলতে আমার আর এই পৃথিবীতে জীবিত থাকার কোন কারণ আমি খুজে পাচ্ছি না। আমি ঠিক করলাম এবার আমার এই বিদায় নেব। আমি জানি আমার চলে যাওয়ার ফলে কোন কিছুই হবে না। কেউ আমার জন্য কাঁদবে না। আমার জন্য চিন্তা করবে না। সম্ভবত কেউ দোয়াও করবে না।
আমি শেষবারের মত নূর বিরিয়ানী হাউজ থেকে কাচ্চি খেলাম এক প্লেট। সাথে একটা আলাদা মুরগির রোস্ট নিলাম।
খাওয়া শেষ করে বিল মিটিয়ে বেরিয়ে এলাম। সন্ধ্যা নেমে এসেছে। আমি কোলাহল পূর্ণ রাস্তায় শেষ বারের মত হাটতে লাগলাম। রিকশা, গাড়ির হর্ন, মানুষজনের ব্যস্ততা — সবকিছু আমার কানে কেমন যেন দূরের মনে হচ্ছিল, যেন আমি এই শহরের অংশ আর নই। আমি হাঁটতে থাকি, আজকে আমার কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য নেই। মাথার ভেতর একটাই চিন্তা ঘুরছিল — আজ রাতেই সব শেষ করে দেব। কীভাবে করব সেটা এখনও ঠিক করিনি, কিন্তু মনে মনে জানতাম আজ রাতটাই শেষ রাত। আজকের পরে আর নতুন ভোর আমার জীবনে আসবে না।
হাঁটতে হাঁটতে রমনা পার্কে চলে এলাম। এই পার্কটা আমার সব সময়ই পছন্দের ছিল। ঢাকাতে আসার পর সময় পেলেই আমি এই পার্কের চলে আসতাম। ঘন্টার পর ঘন্টা আমি এখানেই বসে থাকতাম। সন্ধ্যার পরে এখানে অনেক মানুষ আসে হাততে। তবে আমি জানি ঠিক জায়গা গুলো মানুষ যায় না বিশেষ। আমি তেমন একটা বেঞ্চে গিয়ে বসলাম, চোখ বন্ধ করে ভাবতে লাগলাম আজকে কীভাবে কাজটা আমি করব! কিভাবে সব কিছুর থেকে নিজেকে মুক্ত করব!
-এখানে একটু বসতে পারি??
কণ্ঠস্বরটা শুনে চোখ মেলে তাকালাম। বেঞ্চের আরেক প্রান্তে একজন মেয়ে বসে আছে। আমি একটু অবাকই হলাম বটে। মেয়েটা এতো নিশ্চুপ ভাবে এসেছে যে আমি টেরই পাই নি। কিন্তু একটু দুরের হাটার রাস্তায় যখন কেউ হেটে যাচ্ছিল সেটা আমি ঠিকই বুঝতে পারছিলাম। আমি মেয়েটার দিকে আরেকবার ভাল করে তাকানোর চেষ্টা করলাম। মেয়েটার পরণে একটা ধবধবে সাদা কামিজ। সাথে একটা সাদা লেগিংস পরেছে। বয়স আন্দাজ করা মুশকিল — দেখে মনে হল যে আমার বয়সীই হবে। তার চোখদুটো কেমন যেন গভীর, অন্ধকারেও যেন আলো ঠিকরে বের হচ্ছে।
আমি বললাম, এটা পাব্লিক প্লেস। বসতেই পারেন। আর আপনি অলরেডি বসেই পরেছেন।
মেয়েটা হাসল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার সাথে কিছু সময় কথা বলা যাবে?
আমি একটু সতর্ক হবার চেষ্টা করলাম। মেয়েটা আবার ছিনতাইকারী নয়তো। দেখা গেল তার সঙ্গীরা আশে পাশেই আছে। আমাকে কথার ফাঁকে ফুসলিয়ে আমার সব কিছু নিয়ে নিবে। তারপরেই মনে হল হলেই বা কী! যে মানুষ আজকে রাতে এই দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তার এতো চিন্তার দরকার কী!
মেয়েটি আবারও বলল, তোমার হাতে সময় আছে?
বললাম, বলুন কী বলবেন!
মেয়েটি আবারও হাসল। তার হাসিতে কেমন একটা স্নিগ্ধতা আছে। আমি আমার আগের মনভাব থেকে সরে এলাম। কেন জানি মনে হল এই মেয়েতা ছিনতাইকারী হতে পারে না। সে বলল, জীবন খুব মূল্যবান, এটা জানো? এই পৃথিবীতে সব থেকে মূল্যবার হচ্ছে এই জীবন, বেঁচে থাকা। এর থেকে বড় ব্যাপার আর কিছু নেই।
আমি একটু নড়ে চড়ে বসলাম। সত্যি বলতে কি মেয়েটির মুখ থেকে আমি এই কথা শুনবো সেটা আশা করি নি।
মেয়েটি বলল, তুমি যা করতে যাচ্ছো সেটা ঠিক হচ্ছে না!
এবার আমি সত্যিই চমকে গেলাম। আমি কী করতে যাচ্ছি সেটা আমি ছাড়া আর কারো জানার কথা না। এই মেয়ে কিভাবে জানল? এটা তো কারো জানার কথা না! আমি বললাম, আপনি কী বলছেন এসব?
মেয়েটা আবারও হাসল। তার হাসি দেখে আমার মনে হল যে সে আমার সব কিছু জানে। আমি বললাম, আপনি কে বলুন তো?
-আমি কে সেটা জরুরী ব্যাপার না।
-তাহলে আমার ব্যাপারে আপনি কীভাবে জানেন? আমাকে চেনেন?
-হ্যা আবার না। সেটা বাদ দাও। আমি তোমাকে যা বললাম, যা করতে যাচ্ছো সেটা ঠিক না। ঠিক হচ্ছে না! জীবন বড় সুন্দর।
এবার আমি হাসলাম, তিক্ত হাসি। বললাম, মোটিভেশনাল স্পিচ আমি অনেক শুনেছি এর আগে। আমার বেলাতে এটা কাজ করে না ঠিক। আমার কাছে জীবন সব থেকে সুন্দর নয়!
মেয়েটা বেশ কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আমার মনের ভাব যেন সে বুঝতে চাইছে। একটা সময় বলল, আমি মোটিভেশনাল স্পিচ দিতে আসিনি। একটা প্রস্তাব দিতে পারি।
-কী প্রস্তাব?
-তুমি যে কারণে নিজের মূল্যবার জীবন শেষ করে দিতে চাও, সেসব যদি পাও তবে কি জীবনকে ভালোবাসবে?
আমি ভ্রু কুঁচকে তাকালাম। তবে কিছু বললাম না। আমার চোখের জিজ্ঞাসা আর কৌতুহলে মেয়েটা আমার মনের ভাবটা বুঝতে পারল। বলল, আমি চাই তুই তোমার জীবনকে ভালোবাসো। জীবনকে উপভোগ কর। তুমি জীবনে যে যে জিনিস পাও নি সেই জিনিসের কয়েকটা যদি তুমি পাও তবে কি ভালবাসবে জীবনকে?
আমি একটু চিন্তা করলাম। জীবনে কী কী পাই নি? আসলে জীবনে আমি কিছুই পাই নি। ভালোবাসা অর্থ সুখ কিছুই না। না ভালোবাসা পেয়েছি নীলুর কাছ থেকে তবে সেটা ধরে রাখতে পারি নি। ভালোবাসা ধরে রাখতে যে যে জিনিস দরকার সেই জিনিসগুলো আমার হয় নি। আচ্ছা সত্যি যদি আমি সেই জিনিসগুলো পাই তবে কি জীবনকে এতো দূর্বিষহ মনে হবে না?
মেয়েটি আমার চোখের দিকে সরাসরি তাকাল। আমার কাছে মনে হল যে মেয়েটার চোখের মনি যেন একটু জ্বলে উঠল। সেটার রং যেন একটু বদলে গেল। সে বলল, আমি তোমাকে দিতে পারি। তবে এর বদলে আমাকে কিছু দিতে হবে!
আমি সত্যি বুঝতে পারছিলাম যে মেয়েটা আমাকে কিভাবে এই সব দিতে পারে। তবে আমার কেন জানি মেয়েটার কথা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে হল। আমি বললাম, আমার কিছুর দেওয়ার নেই।
-কে বলল নেই। তোমার কাছে অনেক মূল্যবার জিনিস রয়েছে।
-কী?
-সময়।
-আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
মেয়েটা একটা জোরে নিঃশ্বাস নিল। তারপর বলল, তোমার আয়ুষ্কাল থেকে একটা বছর আমাকে দিতে হবে। শুধু একটা বছর।
আমি প্রথমে ভাবলাম মেয়েটা পাগল, বা হয়তো কোনো অদ্ভুত রসিকতা করছে। কিন্তু তার চোখের সেই স্থিরতা, তার কণ্ঠের সেই দৃঢ়তা আমাকে থামিয়ে দিল। আজ রাতে যে মানুষটা তার পুরো জীবনটাই ছুড়ে ফেলে দিতে চলেছে, তার কাছে একটা বছর কী এমন বড় জিনিস?
আমি জিজ্ঞেস করলাম, আর যদি রাজি না হই?
-তাহলে আমার কিছুই করার নেই। কিন্তু তুমি যেখানে আজকে নিজের জীবন শেষই করে দিতে যাচ্ছো সেখানে এক বছর আমার সাথে ট্রেড করাটা নিশ্চয়ই খারাপ হবে না। তাই না?
মেয়েটা ভুল কিছু বলে নি! আসলেই তো! আমি আর কেন জানি কিছু ভাবলাম না। আর চাইলেই তো আমি যখন তখন নিজের জীবন শেষ করে দিতেই পারি। সেই পথ তো খোলাই থাকছে! আমি বললাম, ঠিক আছে আমি রাজি!
মেয়েটি মৃদু হাসল। তারপর এগিয়ে এলো আমার দিকে। একেবারে আমার কাছে। আমার কাছে আসতেই আমি একটা অদ্ভুত মিষ্টি সুবাস পেলাম। অনেকটা হাসনাহেনা ফুলের মত তবে সেটার থেকে আরেকটু হাককা। সে নিজের মুখ বাড়িয়ে তার ঠোঁটটা আমার কপালে ছোঁয়াল। একটা ঠান্ডা স্রোত যেন আমার শরীরের ভেতর দিয়ে বয়ে গেল।
আমি জানি না এই রকম অনুভূতি আমি এর আগে কোনোদিন পেয়েছিলাম কিনা! আমার পুরো শরীর জুড়ে এক চরম আবেশ ছড়িয়ে পড়ল। মনে হল আমার এখন এখানে ঘুমিয়ে পড়া দরকার। আমি চাইলেও আমি নিজের চোখের পাতা খুলে রাখতে পারছিলাম না। তারপর আমার আর কিছু মনে রইলো না।
যখন আবার চোখ খুললাম তখন দেখি বেঞ্চের পাশে আর কেউ নেই। মেয়েটি সেখানে নেই। দ্রুতি নিজের পকেটে হাত দিলাম। মোবাইলটা রয়েছে। ম্যানিব্যাগটাও!
মোবাইলটা বের করে দেখি আধা ঘন্টার মত সময় পার হয়েছে। আমি সম্ভবত ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আচ্ছা মেয়েটা কি সত্যিই এসেছিল? নাকি স্বপ্ন দেখছিলাম আমি? আমি নিশ্চিত ভাবে বলতে পারব না!
বাসায় ফিরে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। কী আশ্চর্য, এত কিছুর পরেও ঘুম এসে গেল চোখে।
পরদিনটা কেটে গেল একদম সাধারণভাবে। কোনো অলৌকিক কিছু ঘটল না। কোন পরিবর্তণ ঘটলো না। আমি নিজের মনেই হাসলাম। আমি কি না ভাবছিলাম। সম্ভবত আমি স্বপ্নই দেখেছিলাম।
তার পরদিন, মানে সেই রাতের ঠিক দুদিন পরে, দুপুরবেলা হঠাৎ দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ শুনলাম। আমি তখনো বিছানাতেই, অলস দুপুর কাটাচ্ছিলাম। দরজা খুলে দেখি নীতু দাঁড়িয়ে আছে।
আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম। নীতু! তুমি হঠাৎ?
নীতু কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে বলল, আমি তোমার কাছ তলাতেই থাকব! তখন যদি ভালোবাসা জানলা দিয়ে পালায় তখন না হয় ছেড়ে যাবো!
আমি কোনো কথা বলতে পারলাম না। নীতুর পেছনে আমি একটা ব্যাগও আমি দেখতে পেলাম!
তার মানে নীতু আমার কাছে চলে এসেছে। সত্যিই এসেছে?
আমি ওকে কিছু বলতে যাবো তার আগেই আমার ফোনটা বেজে উঠল টেবিলের ওপর। নীতু আর আমি দুজনেই তাকালাম সেদিকে। স্ক্রিনে ভেসে উঠল একটা অচেনা নম্বর।
আমি ফোনটা হাতে নিয়ে একবার নীতুর দিকে তাকালাম, তারপর রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে একজন বলল, আসসালামু আলাইকুম, আমি মিস্টার ইমরানে কথা বলছি?
আমি বিস্মিত কন্ঠে বললাম, হ্যা বলছেন!
-আমি রক্লেট কোম্পানি থেকে বলছি। আপনার সিভিটা আমাদের কাছে বেশ কিছুদিন আগে জমা পড়েছিল। আমরা চাই আপনি আজ বিকেলে আমাদের অফিসে একবার আসুন, একটা ইন্টারভিউর জন্য।
আমি কয়েক সেকেন্ড কথা বলতে পারলাম না। শেষে কোনোরকমে বললাম, জ্বি, অবশ্যই। আমি আসব।
ফোন রেখে নীতুর দিকে তাকালাম। ও অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে? কোন চাকরির ইন্টারভিউ?
আমি ঠিক জানি না কীভাবে ব্যাখ্যা করব বলে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলাম। আমার এখনো ঠিক বিশ্বাস হচ্ছে না যে এটা ঘটছে। তাহলে কি সত্যি? ঐ রাতের ঘটনা সত্যি ছিল? নীতুর এভাবে আমার কাছে আসা তারপরই ইন্টারভিউ কল!
আমি নীতুকে ইন্টারভিউয়ের কলের কথা বললাম। নীতুর চোখে-মুখে খুশি ফুটে উঠল, কিন্তু তার সাথে মিশে ছিল একটা অদ্ভুত বিস্ময়।
বিকেলে ইন্টারভিউ দিতে যাওয়ার আগেই আমার মনে হল যে এই চাকরি আমার হয়ে যাবে। কেউ ঠেকাতে পারবে না। এরপর থেকে আমার উত্থ্যান শুরু।
সত্যিই হল তাই। বিকেলেই আমাকে এপোয়েন্টমেন্ট লেটার দিয়ে দেওয়া হল। সামনের সপ্তাহ থেকেই জয়েনিং। পরদিনই আমি নীতুকে বিয়ে করে ফেললাম।
এরপর থেকে যেন আমার জীবনের প্রতিটা দরজা একে একে খুলতে শুরু করল। অফিসে আমার কাজের প্রশংসা হতে লাগল, প্রমোশন এল আশ্চর্য রকম দ্রুত। প্রথম দিকে নীতুর পরিবার আমাদের বিয়েটা না মানলেও আমার সাফল্যের পরিমান দেখে ঠিকই মেনে নিল। জীবনে সকল সুখ আর সাফল্য যেন আমার কাছে এসে ধরা দিতে শুরু করলো। নীতু প্রায়ই আমাকে বলত যে সেই হচ্ছে আমার জীবনের লাকি চার্ম। সে সেদিন সাহস করে চলেছিল বলেই আমার জীবনে এই সব সাফল্য আসা শুরু করেছে। আমি মনে মনে হাসি!
একবার মনে হয় এটাই সত্য। নীতুর কারণেই আসলে এই সব হচ্ছে। কিন্তু তারপরে মনের ভেতরে সেই মেয়েটার কথা মনে পড়ে। সেই মেয়েটা কে ছিল? সেদিন সত্যিই কি সেই মেয়েটা এসেছিল? আমার জীবনের একটা বছরের বিনিময়ে সে আমাকে সব কিছু দিয়ে গেছে? আমার পক্ষে এই সত্য জানাটা সম্ভব না কোনো ভাবেই। আমার কবে মৃত্যু হবে সেটা আমার জানা নেই। যদি আমি কোন দিন মারাও যাই আমার পক্ষে বোঝা সম্ভব না যে এটাই আমার আসল মৃত্যুর সময় ছিল কিনা বা আরও এক বছর পরে আমার মৃত্যুর কথা ছিল। তাই আমি এটা নিয়ে আর চিন্তা করি না। আমি ধরেই নিয়েছি সেদিন আমি ঘুমিয়েই পরেছিলাম। ঘুমের ভেতরেই আমি স্বপ্ন দেখেছি। আমি সেই একই জায়গাতে আবারও গিয়ে অপেক্ষা করেছি মেয়েটার জন্য। তবে তার সাথে আমার আর কোন দিন দেখা হয় নি।
তবে এই জীবনটাকে আমি বড় বেশি ভালোবাসি। নীতুকে নিয়ে আরও একটা দিন বেশি বাঁচার জন্য আমি যেকোন কিছু করতে পারি! আমার কাছে এখন জীবনের থেকে বেশি সুন্দর আর কিছু নেই। বেঁচে থাকার চেয়ে আনন্দময় ব্যাপার আর কিছু নেই!
ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।
অপু তানভীরের দুটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।
Discover more from অপু তানভীর
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

শুরুতে ভাবলাম এটা হয়তো আরেকটা আত্মহত্যার গল্প, কিন্তু রমনার পার্কের সেই সাদা কামিজের মেয়েটা এসে হিসাবটা পাল্টে দিল।
এক বছরের বিনিময়ে জীবনের সব কিছু ফিরে পাওয়ার বাড়িটা বেশ উপভোগ করলাম, বিশেষ করে নীতুর “ভালোবাসা জানলা দিয়ে পালায়” সংলাপটা।
শেষে ইমরান নিজেই স্বীকার করে নিচ্ছে সেটা হয়তো স্বপ্ন, সেটাই গল্পটাকে সহজ সরল করে রাখল।