আমার সেলিব্রেটি বউ

4.5
(56)

শোবার ঘরে ঢুকে দেখলাম মুনজেরিন বিছানাতে আধশোয়া অবস্থায় বই পড়ছে । ওর কোমরের কিছুটা অংশ বের হয়ে আছে । সেদিকে আমার চোখ চলে গেল । নিজের দৃষ্টি সরিয়ে নিতে গিয়েও কেন জানি নিতে পারলাম না । ঐ কোমরের ফাঁকা অংশ থেকে এতো সহজে চোখ সরানো কোন পুরুষের পক্ষে সহজ না ।
নিজেকে নিজেই বললাম, নিজের বউয়ের দিকে একটু আধটু তাকালে কিছু হয় না । এখানে তাকানোর অধিকার তো আমার আছেই !
আমি ঘরের মাঝখানে আসতেই দেখলাম মুজেরিন উঠে বসলো । আমার দিকে মুখ করে বলল, উপহারের জন্য থ্যাংকস !
আমি একটু হাসলাম । কাল থেকে আমি কেবল এই একটা কথা শোনার জন্যই অপেক্ষা করছি । কখন মুনজেরিন একটু খুশি হবে কিংবা আমাকে ধন্যবাদ দিবে ।
মুনজেরিন বলল, শাড়িটা সুন্দর হয়েছে । কিন্তু তুমি জানো আমি শাড়ি পরি না ।
-জানি ।
-তারপরেও ?
ওর চোখে খানিকটা কৌতুহল । আমি একটু হেসে বললাম, নিজের বউকে যদি শাড়িই না উপহার দিলাম তাহলে কি উপহার দিলাম বল!
মুনজেরিন হাসলো । ওর হাসি দেখে এখনও আমার বুকের মাঝে যে কি ঝড় সৃষ্টি হয় সেটা যদি ওকে বোঝাতে পারতাম !
মুনজেরিন আর কিছু বলল না । আবারও বিছানাতে আধশোয়া অবস্থায় বই পড়তে শুরু করলো । আমি ওর পাশে গিয়ে শুয়ে পড়লাম । প্রতিদিন এমন ভাবেই মুনজেরিন ঘুমানোর আগে একটু বই পড়ে । আমি এই সময়ে মোবাইল টিপি নয়তো ওর দিকে তাকিয়ে থাকি । আমার ওর দিকে তাকিয়ে থাকতে ভাল লাগে । এমন কি সারা রাতই মুনজেরিনের দিকে তাকিয়ে থাকতে পারি। আমার স্বপ্নের নায়িকা সে । আমার এখনও মাঝে মাঝে এই টা বিশ্বাস হয় না যে মুনজেরিন আমার বউ । আমার বিয়ে করা বউ ।

সেলিব্রেটি বলতে আমরা যা বুঝি মুনজেরিন সেই রকম টিভি অভিনেত্রী কিংবা গায়িকাদের মত কেউ ছিল না । কিন্তু তার থেকেও বেশি কিছু ছিল । তাকে দেশের দুনিয়ার মানুষ চেনে । এখনও চেনে খুব ভাল করে । পেশায় মুনজেরিন একজন ডাক্তার । তবে এইখানেই তার কাজ কর্ম সীমাবদ্ধ হয়ে থাকে নি । মূলত প্রথমে তার একটা ইউটিউব চ্যানেল রয়েছে । সেখানে বর্তমানে ২১ লক্ষ্য সাবস্ক্রাইবার । ডাক্তারী পড়া অবস্থাতেই মুনজেরিন মানুষের জন্য বিভিন্ন স্বাস্থ সেবা মূলক ভিডিও বানাতে শুরু করে এবং আস্তে ধীরে সেগুলো প্রথমে ইউটিউব এবং পরে ফেসবুকে জনপ্রিয়তা পেতে শুরু করে । মুনজেরিনের কন্ঠ খুবই ঝকঝকে আর পরিস্কার । মাঝে মাঝে সে আবৃত্তি করতো তার চ্যানেলে । এছাড়া আরও কত রকম হাতের কাজই না সে জানে ।
এছাড়াও তাকে আরও একভাবে মানুষ চেনে । সেটা হচ্ছে মুনজেরিন একজন বাইকার । ওর একটা না দুইটা রেসিং বাইক রয়েছে । আগে সেগুলো সে নিয়মিত চালাতো । কলেজে যেত এগুলোতে চড়েই এবং পরে নিজের কর্ম স্থলেও বাইক চালিয়ে যেত । মাঝে মাঝে নিজের বাইকের ভিডিও বাইক নিয়ে চালানোর ভিডিও ছবি সোস্যাল মিডিয়াতে দিলে সেগুলোও ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ।

এরপর মুনজেরিনকে বিভিন্ন কোম্পানি তাদের প্রোমোশনাল ভিডিওর জন্য হায়ার করতে শুরু করলো । বলতে গেলে সোস্যাল মিডিয়াতে মুনজেরিন একজন খুবই পরিচিত মুখ হয়ে গেল সবার কাছে । আমিও তার লক্ষ ভক্তের ভেতরে একজন ছিলাম । আমার সাথে ওর প্রথম দেখা হল আমাদের কোম্পানির একটা প্রোমোশনাল ভিডিও ওকে সাইন করতে এসেছিলাম । আমি তো আগেই ওর প্রেমে পড়েছিলাম । সরাসরি দেখে একেবারেই গলে গেলাম । আগে তো কেবল তার বাহ্যিক দিকটা দেখে আমি তার প্রেমে পড়েছিলাম

তারপর টুকটাক কথা হত । একদিন সাহস করে নিজের মনের কথা আমি বলেই দিলাম । আমি জানতাম সে গ্রহন করবে না । করেও নি । আমি সেদিন জানতে পারলাম যে তার বয়ফ্রেন্ড আছে । তাও আবার যেন তেন বয়ফ্রেন্ড না, একেবারে বাসায় জানানো বয়ফ্রেন্ড ।

ছেলেও মুনজেরিনের মত ডাক্তার । তবে সে এই দেশে থাকে না । ইংল্যান্ড থাকে । সেখানকার ডাক্তার । অনেক দিন থেকেই ওদের প্রেম চলছে । মুনজেরিন কদিন পরে হয়তো সেখানে চলে যাবে । বাসায় ওদের কথা জানে এবং মেনেও নিয়েছে সব । এমনই তো হওয়ার কথা । মুনজেরিন যেমন পার্ফেক্ট তার বয়ফ্রেন্ডও হওয়া দরকার পার্ফেক্ট এবং তার যোগ্য । আমি তো তার ধারে কাছেও যাই না । তবুও আমি মাঝে মাঝে মুনজেরিনের সাথে কথা বলতাম । তবে এমন ভাবে কথা বলতাম যাতে ও কোন ভাবেই বিরক্ত না হয় । বিরক্ত হয়ে যদি আমাকে ব্লক করে দেয় তাহলে আমার কষ্টের সীমা থাকবে না । আমি কেবল ওর সাথে একটু কথা বলে, একটু চোখের দেখা দেখেই খুশি ।

কিন্তু একদিন সব উলট পালট হয়ে গেল । মুনজেরিন খুব বাজে ভাবে বাইক এক্সিডেন্ট করলো । সারা শরীরের আঘাত তো পেলই সাথে সাথে । ওর বাঁ পা টা খুব খারাপ ভাবে ভেঙ্গে গেল । আমার মনে আছে আমি কতদিন ঐ হাসপাতালে গিয়ে বসে থেকেছি । ওর কেবিনের দরজার সামনে ওর ঘুমন্ত বেদনাক্ত মুখের দিকে তাকিয়ে ব্যথিত হয়েছি। নিজেকে কী যে অপরাধী মনে হয়েছে তখন! বারবার উপরওয়ালার কাছে দোয়া করেছি যেন মুনজেরিন ঠিক হয়ে যায় । ওর যেন কষ্ট কম হয় । আস্তে আস্তে ও সেরে উঠলো ঠিকই তবে ওর পা টা এমন ভাবেই ভেঙ্গেছিলো যে সেটা পুরোপুরি ঠিক হল না । ওকে একটা স্টিক নিতে হল । এবং ঠিক এই সময়েই সব থেকে বড় ধাক্কাটা সে খেল । শারীরিক ভাবে ঠিক হতে না হতেই মুনজেরিন খবর পেল যে তার ভালোবাসার মানুষ তার সাথে ভালোাসার সম্পর্ক শেষ করে দিয়ে অন্য একটা মেয়ের সাথে এঙ্গেইজমেন্ট করে ফেলেছে ।

মুনজেরিনের অবস্থা দেখেই সে এমন কাজ করেছে । ওর পা হয়তো আর কোন দিন ঠিক হবে না । এই জন্যই সে মুনজেরিনকে আর বিয়ে করতে রাজি নয় । তার মত একজন পার্ফেক্ট ছেলে কেন একজন শারীরিক ভাবে ডিসেবল মেয়েকে বিয়ে করবে ! এই ধাক্কাটা মুনজেরিনের জন্য সহজ ছিল না । সে সামলে নিতে পারলো না । এখানেই আসলে আমার আবির্ভাব ।

মুনজেরিন হাসপাতাল থেকে বাসায় গিয়েছে । হাসপাতালে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে । সারাদিন বাসায় বসে থাকে চুপচাপ । আমি সুযোগ পেলেই ওর বাসায় যাই । ওর সামনে বসে থাকি । টুকটাক কথা বলি চলে আসি । একদিন নিজেই ফোন করে আমাকে ওর বাসায় যেতে বলল । আমি যথা সময়ে গিয়ে হাজির হলাম । ওর মা আমাকে ওর ঘরে নিয়ে গেল । এই কয়েক মাসে মুনজেরিন যেন একেবারে বদলে গিয়েছে । ওর চেহারাতে সেই ঔজ্বাল্যো আর নেই । মুখের সেই মিষ্টি হাসি আর দেখাই যায় না ।
আমি প্রথমে কিছু কথা বলার চেষ্টা করলাম । মুনজেরিন চুপ করে জানালার দিকে তাকিয়ে রইলো । তখন বিকেল শেষ হয়ে সন্ধ্যা নামছে । মুনজেরিন হঠাৎ বলল, রাকিব, আমাকে একটু বারান্দাতে নিয়ে যাবেন?
আমি ওর বিছানার সামনে এলাম । মুনজেরিন খুব স্বাভাবিক ভাবে আমার হাত ধরলো । স্টিকটা নিল না । আমার হাত আর ঘারের উপর ভর দিয়ে হেটে গেল বারান্দাতে ।
আমার কেন জানি তখন খুব বেশি ভাল লাগছিলো । হয়তো মুনজেরিনের হাতে আমার হাত রয়েছে এটাই ছিল সব থেকে বড় কারণ ।
মুনজেরিন বলল, আপনি সেদিন ঠিক কথাই বলেছিলেন।
-কোন কথাটা ?
-ঐ যে আমি সবার চোখে পার্ফেক্ট বলেই সবাই আমাকে পছন্দ করতো । এই দেখুন আমি এখন আর মোটেই পার্ফেক্ট নই । পা ভেঙ্গে খোড়া হয়ে গেছি । ঠিক মত চলতে পারি না । মুখের কাছে দেখি কাটা দাগ !
আমার মনে আছে কোনদিন আমি কথাটা বলেছিলাম । ওর বাইখ এক্সিডেন্টের দিন দুয়েক আগে । তাকে বলেছিলাম যে চেহারা খুব গূরত্বপূর্ন একটা ব্যাপার । মানুষ কেবল পা্র্ফেক্ট টাকে পছন্দ করে অন্য কিছু তাদের আকর্ষণ করে । কোন কারণে যদি সেই পার্ফেকশনটা চলে যায় তাহলে তাদের সেই ভালো লাগার আকর্ষণটাও চলে যায় । মুনজেরিন অবশ্য আমার সাথে একমত হয় নি । খানিকটা কথা কাটাকাটি হয়েছিলো । সে জোর দিয়েই বলেছিলো যে মানুষ যাকে ভালোবাসে তাকে ছেড়ে যায় না । প

আমি মুনজেরিনের কন্ঠে একটা বেদনা অনুভব করলাম । নিজের কাছের সেই অপরাধবোধটা আমার আবারও বেড়ে গেল । আমি বললাম, কথাটা মোটেই ঠিক না । আপনাকে এখনও সবাি পছন্দ করে । মানুষ আপনাকে আপনার চেহারা কিংবা শারীরিক সৌন্দর্য্যের জন্য আপন করে নেয় নি, নিয়েছে আপনার কাজের জন্য ।
আমি একটু চুপ করলাম । অনুভব করলাম মুনজেরিন তখনও বাইরের দিকেই তাকিয়ে রয়েছে । আমি আবার বলা শুরু করলাম, আমি মানছি যে সুন্দর চেহারা দৈহিক গঠন মানুষকে আকর্ষন করে কিন্তু বিশ্বাস করুন এই আকর্ষণ বেশি দিন থাকে না । মানুষ একজনের প্রতি ভালোবাসা টিকে থাকার জন্য সেই মানুষের ব্যক্তিত্ব কর্ম অনেক গুরুত্বপূর্ন ।
-চেহারা থেকেও?
-হ্যা চেহারা থেকেও ।
মুনজেরিন হাসলো । তারপর বলল, আপনি যে কথা বলেছিলেন সেটাই কিন্তু হয়েছে । আমার পার্ফেকশন চলে যাওয়ায় সায়ন চলে গেছে ।
আমি বললাম, কারণ সায়ন কোনদিন আপনাকে ভালোবাসে নি । সে আপনার পার্ফেকশনকে ভালোবেসেছে আপনাকে না ।
-সবাই তো তাই বাসে ।
-না সবাই তাই করে না ।
-আপনি?
-আমি আপনাকে ভালোবাসি । আপনার ভাল মন্দ সব কিছু !
-যদি বলি চলুন বিয়ে করি । করবেন ?
আমি একটা সেকেন্ড দেরি করলাম না । বলল, চলুন। এখনই ।
-পরে পস্তাবেন না? আবেগে বসবতি হয়ে মনে হবে না একটা ডিসেবল মেয়েকে বিয়ে কেন করলাম ?
-কোনদিন মনে হবে না ।
এই লাইনটা এতো দৃঢ় ভাবে বললাম যে মুনজেরিন যেন একটু কেঁপে উঠলো । তবে কিছু বলল না । একভাবে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে রইলো ।

তারপরের সপ্তাহেই মুনজেরিনের সাথে আমার বিয়ে হয়ে যায় । কোন অনুষ্ঠান ছিল না । কেবল ছোট করে ঘোরোয়া ভাবে বিয়ে ।

-লাইট বন্ধ করে দিবো?
মুনজেরিনের কথায় ওর দিকে ফিরে তাকালাম । এতো সময়ে আমি এসবই ভাবছিলাম। আমি বললাম, আমি দিচ্ছি । তুমি শুয়ে পড় ।
তারপর একটু চুপ করে থেকে বললাম, একটা কথা বলবো?
-হুম বল ।
-আর হাসপাতালে যাবে না?
-নাহ !
-কেন ?
-জানি না । আসলে আমার ভেতরে আর আগেই কিছু নেই । নিজের উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেছি । আমার নিজের উপরেই যখন নিজের ভরশা নেই আমি কোন সাহসে অন্যকে চিকিৎসা করবো। আমি জানি এই কথা শুনলে তোমার খারাপ লাগবে তবে আমি সায়নের উপরে খুব বেশি ভরশা করেছিলাম । আর সেটা এমন পর্যায়ে চলে গিয়েছিলো যে ওকে আমি আামর স্তম্ভ বানিয়ে ফেলেছিলাম । আমার ভিত । সেটাই যখন ভেঙ্গে গেল তখন আমার সব কিছু উঠলো । আবার কবে নিজের উপর আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবো আমি জানি না । আদৌও পাবো কি না তাও জানি না !

দুই
আমি মুনজেরিনের চিৎকার শুনতে পেলাম । স্টিকের ঠকঠক আওয়াজটা দ্রুত এগিয়ে আসতে শুরু করেছে রান্না ঘরের দিকে । আমি নিজের হাতের দিকে তাকিয়ে রয়েছি । সেখান থেকে সমানে রক্ত বের হচ্ছে হাত কেটে গেছে আমার । ধারালো ছুরিটা এভাবে হাত থেকে ছুটে অন্য স্থানে লাগবে সেটা টেরই পাই নি ।

-ও মাই গড ! কিভাবে হল !
-কেটে গেছে !
-দেখতেই তো পাচ্ছি কেটে গেছে !

মুনজেরিন আমার হাত পরীক্ষা করতে শুরু করলো । তখনই খেয়াল করে দেখলাম ওর হাতের স্টিকটা নেই । ও নিজের পায়ে দাড়িয়ে । মুনজেরিন আমাকে নিয়ে এসে ডাইনিংয়ের চেয়ারে বসালো । ফার্স্ট এইড কিট ডাইনিংয়ের শোকেজের উপরেই থাকে । সেখান থেকে নামিয়ে যত্ন সহকারে আমার হাতে ব্যান্ডেজ বেঁধে দিল । তারপর আমার দিকে তাকিয়ে রাগত স্বরে বলল, কি এমন ঘোড়ার ডিমের কাজ করতে যাচ্ছিলেন যে এভাবে হাত কেটে গেল ?
আমি একটু হাসলাম । তারপর বললাম, বস আমি নিয়ে আসছি !
-মানে….
-আরে বস না ! নিয়ে আসছি !
এই বলে আমি রান্নাঘরের দিকে হাটা দিলাম । আরও কিছু কাজ করা বাকি । জলবাই কাটতে গিয়েই হাত কেটে গিয়েছিলো । তাকিয়ে দেখি যথেষ্ঠ কাটা হয়েছে । এখন বাকি কাজ করা লাগবে । আরও মিনিট পনের কেটে গেল । তারপর আমি বাটিটা হাতে নিয়ে মুনজেরিনের সামনে রাখলাম ! । বাটির ভেতরে একটা ভর্তা জাতীয় খাবর । বেশি করে কাঁচামরিচ, ধনিয়াপাতা আর লবণ বেঁটে নিয়ে জলপাই থেঁতলে তার সাথে পাটালিগুড় মিশিয়ে এই জিনিস বানানো হয়েছে ।

মুনজেরিন আমার দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে থেকে বলল, এই জিনিস বানিয়েছো ?
-আরে খেয়েই দেখো না । এটা হচ্ছে অমৃত ! আরে খাও খাও !
এই বলে আমি আমার মোবাইল দিয়ে ওর এক্সপ্রেশন ভিডিও করতে শুরু করলাম !

মুনজেরিন একটু মুখে দিল । ওর মুখ দেখেই বুঝতে পারলাম স্বাধটা ওর ভাল লেগেছে । তারপর আরও মুখে দিল ! এরপরেই আসল খেলা শুরু ! কিছু সময়ে রভেতরেই দেখতে পেলাম মুনজেরিনের নাক কপাল ঘেমে একাকার ! একটু বেশি ঝাল হয়েছে । তবে মুনজেরিন কিন্তু খাওয়া বন্ধ করলো না ! বাটির সব টুকু শেষ করে ফেলল । আমি যে ওর মুখের ভাব টুকু সব টা ভিডিও করছি সেটা সে খেয়ালই করলো না ! আমার দিকে না তাকিয়ে বলল, ওফ বাবা এতো ঝাল কেন !
-সুন্দর না?
-ছাই সুন্দর ! কই পানি দাও !
-আরে পানি লাগবে না । এটাই ফিল করো ।

আমি টিস্যু এগিয়ে দিলাম ওর দিকে । ওর নাকে তখনও ঘাম লেগে রয়েছে । একটা রক্তিম আভা যুক্ত হয়েছে সেখানে । আমি মগ্ধ চোখে সেটা দেখতে পেলাম । এই এতোদিন পরে মুনজেরিনের মুখে আমি একটু স্বাভাবিক আচরন দেখতে পেলাম । এতোদিন একটা বিষণ্ণ ভাব লেগেই থাকতো সব সময় ! রিদি আপাকে একটা ধন্যবাদ দিতেই হবে এই রেপিসি দেওয়ার জন্য ।

ঐদিন বিকেল বেলা মুনজেরিনকে বলল, যে খাবারটা খেলে সেটা নিয়ে একটা ভিভিও বানালে কেমন হয়? এমন একটা খাবারের ব্যাপারে অনেকে জানে না ।
দেখলাম মুনজেরিনের মুখটা কেমন যেন মলিন হয়ে গেল । বলল, না
-কেন না?
-আমি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে পারবো না।
-একবার চেষ্টা করা যাক অন্তত ।
-না । আমার দ্বারা হবে না !

আমি মোবাইলের ভিডিওটা বেশ কয়েকবার চালু করে দেখতে লাগলাম । ওর মুখের ঐ ন্যাচারাল এক্সপ্রেশনটা দেখতে এতো চমৎকার লাগছিলো ! তখনই আমার মাথায় একটা বুদ্ধি এল । জানি না মুনজেরিন এতে কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবে তবে একটা ঝুকি নেওয়াই যায় !

আমি মুনজেরিনের কাছ থেকে ওর ল্যাপটপ চেয়ে নিলাম । তারপর সেটা দিয়ে ওর ইউটিউব চ্যানেলে ঢুকলাম । ভাগ্যভাল যে এখন সব লগিং অবস্থাতেই আছে । ওর ঝাল জলপাইয়ে ভর্তা খাওয়ার ভিডিও টা আপলোড করে দিলাম । রাতে আর তেমন কিছু হল না ।

কিন্তু সকাল বেলা আমি আবার যখন ইউ চ্যানেলে ঢুকলাম আমার চোখ কপালে উঠলো । মাত্র এক রাতেই ভিডিওটা প্রায় এক মিলিয়ন ভিউয়ের কাছে চলে গেছে । আর কমেন্টের সংখ্যা প্রায় দশ হাজারের কাছাকাছি । এবং সেটা বাড়ছেই । সবাই তাকে কত মিস করে সে কেমন আছে আরও প্রশ্ন ! আমি ল্যাপটপ টা নিয়ে হাজির হলাম মুনজেরিনের সামনে ! ও তখন রান্না ঘরে বুয়াকে কি যেন বলছিলো ! আমাকে আসতে দেখে বলল, কিছু বলবা? অফিস যাবা কখন?
আমি বললাম, আজকে অফিস যাবো না ।
-কেন ?
-তোমাকে একটা জিনিস দেখাবো ! এসো !
ওকে শোবার ঘরে নিয়ে এলাম। তারপর ওর চ্যানেলটা চালু করে দেখালাম ।

আমাকে কিছু বলতে যাচ্ছিলো তবে থেমে গেল । নিচের ওর ভক্তদের করা কমেন্ট গুলো দেখতে শুরু করেছে । সেগুলোই পড়তে শুরু করলো । একটা সময়ে আমার দিকে তাকালো । তারপর আমাকে অবাক করে দিয়ে আমাকে জড়িয়ে ধরলো । অনুভব করলাম যে ও যেন একটু কাঁপছে । কাঁদছে হয়তো । আমি ওকে আদর করতে করতে বললাম, দেখেছো তোমাকে এখনও কত মানুষ ভালোবাসে । কত মানুষ তোমাকে মনে রেখেছে । তোমার জন্য অপেক্ষা করছে । আর কেবল একজন মানুষের জন্য তুমি ওদের বঞ্চিত করছো !
আমার থেকে মুখ না তুলেই মুনজেরিন বলল, আমার কী করা উচিৎ ?
-যা করতে আগে! তাই কর ! হাসপাতালে যাও, ভিভিও আপলোড দাও, বাইক চালাও ।
-আমি কি পারবো?
-অবশ্যই পারবে ! আমি আছি না তোমার সাথে !
আমি অনুভব করলাম মুনজেরিন যেন আমাকে আরও একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরেছে ।

পরিশিষ্টঃ

পরের সপ্তাহেই মুনজেরিন নতুন একটা শিক্ষা মূলক ভিডিও আপলোড দিলো । আমি সব সময়ই ওর সাথে সাথে ছিলাম । ভিডিও শেষে সে আমাকে টেনে নিয়ে গেল স্ক্রিনে। সবার সাথে পরিচয় করিয়ে দিল ।
মাস খানেকের ভেতরেই আবার হাসপাতালে যাওয়া শুরু করলো । এবং আরও কিছু সময় পরে আবার নতুন করে বাইখ চালাতে শুরু করলো । যদিও রাস্তায় বের হল না এখনই । বাসার পাশের মাঠে চালাতো আবার সেই আত্মবিশ্বাসটা ফিরে আসতে আরও একটু সময় হয়তো লাগবে তবে সেটা নিশ্চিত ফিরে আসবে । এবং প্রতি রাতেই সে আমাকে নতুন ভাবে আদর করতে শুরু করলো । আমার কাছে সে কৃতজ্ঞ । আমার কারণেই নাকি সে হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরে পেয়েছে ।

রাতে হঠাৎ হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙ্গে যায় ! আমি বিছানা থেকে উঠে বাবান্দায় চলে আসি । তাকিয়ে থাকি আকাশের দিকে । একটা তীব্র অপরাধবোধ আমাকে এখনও কুড়ে কুড়ে খাও । সেদিন মুনজেরিনের বাইকটা এমনি এমনি এক্সিডেন্ট করে নি । এর পেছনে আমার হাত ছিল । সেদিন মুনজেরিনের হাসপাতালের গেট দিয়ে ঢুকতে গিয়েই আমি সায়নকে দেখতে পাই । বাইক নিয়ে ভেতরে ঢুকছে । বাইকের নম্বরটা চট করেই চোখের সামনে চলে আসে । আমার তখন কি যে হয়ে যায় আমি নিজেও বলতে পারবো না । দুদিন আগে এই সায়নকে নিয়ে কী এক আত্মবিশ্বাস দেখিয়েছে মুনজেরিন । আমার সেটা মোটেও সহ্য হয় নি । আমি হাসপাতালের ভেতরে না গিয়ে বাইরে বের হয়ে এলাম । কিছু সময়ে এদিক ওদিক খুজতে লাগলাম । পেয়েও গেলাম বাইকের রিপেয়ারিংয়ের দোকানটা ! প্রথমে ওরা যন্ত্র দুইটা দিতে না চাইলেও আধা ঘন্টার জন্য যখন ৫০০ টাকার একটা নোট বের করে দিলাম তখন আর মানা করলো না । ব্যাগটা ঐ দোকানে রেখে একটা কাগজে মুড়ে নিলাম যন্ত্র দুটো তারপর পার্কিংয়ে গিয়ে হাজির হলাম । বাইকটা খুজে বের করতেও খুব একটা সমস্যা হল না । বাইকের ব্রেকের তার ক্ষতিগ্রস্ত করে দিলাম । একেবারে কেটে দিলাম না । তবে কয়েকবার চাপ দিলে ছিড়ে যাবে । আমি বের হয়ে এলাম । কিন্তু তখনও যদি জানতাম যে ঐ বাইকটা আসলে মুনজেরিনেরই। সায়ন মুনজেরিনকে ফিরিয়ে দিতে এসেছিলো, এটা আসলে মুনজেরিনই চালাবে তাহলে কি ঐ কাজটা করতে পারতাম?

মুনজেরিন আস্তে আস্তে আবার আগের মত হয়ে যাচ্ছে । কিন্তু আমার ভেতরের এই অপরাধবোধ কোনদিন যাবে না বুঝি । কোনদিন আমি মুনজেরিনকে এই কথা বলতেও পারবো না । ওকে হারাতে হয় এমন কথা আমার পক্ষে বলা সম্ভব না ।

-রাকিব?
তাকিয়ে দেখি মুনজেরিন আমার পাশে এসে দাড়িয়েছে ।
-এখানে কি?
-ঘুম ভেঙ্গে গেল হঠাৎ !
আমি হঠাৎ ওকে জড়িয়ে ধরলাম । অনুভব করলাম বুকের মাঝে কেমন যেন একটা অনুভুতি হচ্ছে । ভেঙ্গে চুড়ে কান্না আসছে । আমি কোনমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বলল, আই সরি মুন !
-সরি কেন ?
-যদি সামনে কোন দিন আমি কোন অন্যায় করি তাই আগে থেকেই ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি ! তোমাকে কোন ভাবেই আমি হারাতে চাই না । কথা দাও কোনদি আমাকে ছেড়ে যাবে না !
মুনজেরিন হাসলো । তারপর আমার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলল, সবাইকে ছেড়ে দিতে পারি তোমাকে ছারবো না ! বুঝলে ! এখন শান্ত হও তো !

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.5 / 5. Vote count: 56

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

4 thoughts on “আমার সেলিব্রেটি বউ

  1. মোটেও ভাল হয়নি।কাহিনী বিন্যাস,ঘটনা প্রবাহ,শব্দ চয়ন,বর্ণনাভঙ্গি কোনটাই মনোযোগ সহকারে করেননি। আপনার ব্লগের প্রথম দিকের গল্পগুলো পড়ুন। গল্পগুলো হদয়কে নাড়া দেয়।গল্পের চরিত্রগুলো জীবন্ত মনে হয়।

    পারলে গল্পটি পুনরায় লিখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *