3.8
(4)

শুরুর আগের কথা 

মেয়েটা দৌড়াচ্ছে । কতক্ষন ধরে দৌড়াচ্ছে সে বলতে পারবে না । কদিন থেকেই কে কেবল পালিয়েই বেড়াচ্ছে । কার কাছে যাবে কিংবা কাকে সে ঠিক মত বিশ্বাস করতে পারে সেই কথা সে জানে না । এক লোকালয় পার হয়ে অন্য লোকালয়ে চলে এসেছে । দিন পর হয়ে গেছে । সময় জ্ঞান তার অনেক আগেই চলে গেছে । কেবল সে জানে রাত হচ্ছে, সে একটু থামছে বিশ্রামের জন্য আবার রাত থাকতে থাকতে থাকতে আবারও বেরিয়ে পরছে । 

এই কদিনে তার খাওয়া দাওয়ার কোন ঠিক নেই । চেষ্টা করছে মানুষজন এড়িয়ে সামনে এগিয়ে চলতে । কারন খুব ভাল করেই জানে তার পেছনে ঠিক ঠিক মানুষ আসছে । সে যত মানুষের সাথে দেখা করবে কিংবা যত বেশি মানুষ তাকে দেখতে তারা তত বেশি তার কথা জেনে যাবে । তাই খাওয়া দাওয়ার জন্য কোথাও থামছে না । খেত খামার থেকে কিছু চুরি করে নিচ্ছে । প্রথম বারের মত করতে বেশ কষ্ট হচ্ছিলো কিন্তু সেটা না করে উপায় নেই । প্রয়োজন মানুষকে অনেক কিছু শেখায় । মেয়েটিকেও এই কদিনে অনেক কিছু শিখিয়েছে । কিন্তু এই শেখাটা তাকে কতক্ষন টিকিয়ে রাখতে পারবে সেটা সে জানে না ।

কেবল মনে হচ্ছে এখন তাকে সামনে দৌড়াতে হবে । তার পেছনে ছুটে আসা মানুষ গুলোর হাত থেকে বাঁচার জন্য তাকে যত দুরে পারা যায় তত দুরে চলে যেতে হবে । কোন ভাবেই তাদের হাতে ধরা পরা চলবে না !
কিন্তু মেয়েটা শেষ পর্যন্ত ধরা পরেই গেল । চারজন শক্ত সমর্থ্য মানুষ যখন তাকে চারিদিক থেকে ঘিরে ধরলো তখন প্রথমে অবিশ্বাস তারপর হতাশা তাকে পেয়ে বসলো । একদিন এই সময় আসবে সে জানতো কিন্তু এতো তাড়াতাড়ি চলে আসবে সে ভাবতে পারে নি । কিন্তু তার জন্য আরও অন্য কিছু অপেক্ষা করছিলো ।

সেখানে রাতের বেলা ঘুমিয়েছিল সেখানেই ধরা পরে যায় লোক গুলোর কাছে । সে বিশ্রামের জন্য থাকলেও তার পেছনে ছুটে আসা মানুষ গুলো কোন বিশ্রাম নেয় নি। তাই একটু একটু করে তারা এগিয়ে এসেছে তার কাছে । 
পরাজিত সৈনিকের মত করে তাদের হাতে সমর্পন করার সময় মেয়েটি দেখতে পেল রাতের আধার ভেদ করে একজন তাদের দিকে এগিয়ে আসছে । সেই লোকটা কে দেখে চারজন মানুষই যেন আরও একটু টানটান হয়ে দাড়ালো । স্পষ্টই বুঝা যাচ্ছে এই লোকটাই তাদের নেতা । এই মানুষটাই হয়তো এসবের পেছনে রয়েছে ।

লোকটা আরও একটু এগিয়ে এল । অস্পষ্ট চাঁদের আলোতে মেয়েটির চোখ যখন পড়লো মেয়েটি সাথে সাথে তাকে চিনতে পারলো । তাকে না চেনার কোন কথা নয় । কিন্তু সেটা চেনার পরপরই মেয়েটির চেহারায় একটা তীব্র বিস্ময় দেখা দিল । কালো মোচের নিচে হাসিটার দিকে তাকিয়ে থেকে অবাক বিশ্ময়ে মেয়েটি বলল
-আপনি ?
লোকটা যেন মেয়েটির বিস্মিত ভাব দেখে আরও মজা পেল । হাসির মাত্রটা আরও বেড়ে গেল সাথে সাথে। 
মেয়েটি আবারও বলল
-আপনি !
মুহুর্ত পরেই লোকটির হাসি থেমে গেল । সেখানে দেখা গেল একটা কঠিন মুখোভাব । গম্ভীর কন্ঠে বলল
-তোমার পালানোর জায়গা নেই । তুমি খুব ভাল করেই জানো ! শুধু শুধু আমাদের কষ্ট দিলে । অথচ চাইলেই এটা বেদনাবীহিন একটা প্রক্রিয়া হতে পারতো কিন্তু তুমি আমার কথা না শুনে ঐ ডায়নিটার কথা শুনেছো । তোমাকে সে নিরাপত্তা দিতে পারে নি । পারবেও না । আমার কাছে তোমাকে আসতেই হত । এটা তোমার নিয়তি !

মেয়েটি তখনও তাকিয়ে আছে লোকটার দিকে । তার এখন সামনে দাড়ানো মানুষটার কথা বিশ্বাস হচ্ছে না । এমন টা হতে পারে না । লোকটা আর কিছু বলল না । সোজা আবার যেদিক দিয়ে এসেছিলো সেদিকে হাটা দিল । মেয়েটি তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো । চিৎকার করে একটা শব্দ বলতে তার খুব ইচ্ছে করছে । কিন্তু যখনই সে লোকটাকে ডাকতে যাবো তখনই ভারী কিছু দিয়ে তার পেছন থেকে তার মাথায় আঘাত করলো কেউ । মেয়েটি জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লো ।



এক
—–
 

আবন্তি আরেকবার সামনের দিকে তাকালো । সন্ধ্যা প্রায় হয়ে এসেছে । এখনও পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে আসে নি । তবে টুপ করে অন্ধকার নামবে যে কোন সময় । শীতের সময়টাই এমন । দিন গুলো একদম ছোট ছোট ছোট যে কখন যে দিনের আলো শেষ হয়ে যায় সেটা বোঝা মুশকিল ।

আবন্তির গাড়িটা আরেকটু সামনে এগোলেই পাওয়া যাবে । কারপার্কিং টা এদিকেই । কিন্তু আবন্তির মন ওকে বারবার সাবধান করে দিচ্ছে যেন ঐ দিকে না যেতে । বারবার মনে হচ্ছে এসবের থেকে যত দুরে পারো চলে যাও । সামনেই তার জন্য কঠিন বিপদ অপেক্ষা করছে ।
এসবের শুরু আজকে কদিন থেকেই । একটা অপরিচিত নাম্বারে তার নাম্বারে একটা ছোট মেসেজ এসে হাজির ।
আবন্তি তুমি কঠিন বিপদের মধ্যে আছো
কেবল এই একটা লাইন । আর কোন কথা লেখা নেই । একটু পরেই সে একই নাম্বারে ফোন করে কিন্তু ফোন বন্ধ । কেউ তার সাথে মশকরা করেছে মনে করে সে আর কিছু করলো না । তবে একটু যে চিন্তা হল তা না । কারন ওর নাম্বার কারো কাছে নেই, এমন কি ওর ক্লাসের কারো কাছেই এই নাম্বার নেই । এমন কি ওর কোন বন্ধুবান্ধবের কাছেও না ! আরও ভাল করে বলতে গেলে বন্ধু বলতে যা বোঝায় এমন কেউ কোন দিন আবন্তির ছিল না ।

অদ্ভুত কারনেই ওর বাবার কড়া নির্দেশ যেন কোন মানুষকে ওর নাম্বারটা না দেওয়া হয় । ক্লাসের যে কোন প্রয়োজনে ওদের ম্যানেজারের নাম্বাটা দেওয়া । কারো সাথে পরিচয় হোক সেটা আবন্তির বাবা মোটেই পছন্দ করে না । ছোট বেলা থেকেই ওর কোন বন্ধু ছিল না । ওর বাবার কাছেই কতবার মার খেতে হয়েছে কেবল ক্লাসে অন্য কারো সাথে কথা বলার জন্য । কিছু জানতে চাইলে ওর বাবা কেবল বলতো যে তাদের বংশের মেয়েদের বাইরে বের হওয়া নিষেধ । তবুও তিনি তাকে ঘরের ভেতর বন্দী করে রাখেন নি বরং তাকে বাইরে যেতে দিয়েছেন । কিন্তু সে যদি এরকম কাজ করতেও থাকে তাহলে তিনি তার স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিবেন । তারপর থেকে আবন্তি ক্লাসে মানুষের সাথে মেশা বন্ধ করে দেয় । গাড়িতে করে স্কুলে যেত আবার ফিরে আসতো । মাঝে মাঝে গাড়িতে করেই ঘুরে বেড়াতো । ড্রাইভারকে বলা ছিল যাতে করে সে সেখানে যেতে চায় তাকে যেন সেখানে নিয়ে যাওয়া হয় কিন্তু কোন ভাবেই যেন একা একা কোথাও না যায় !

আবন্তি তাই করতো । মাঝে মাঝেই গাড়িতে করে ঘুরে বেড়াতো । বাসায় এসে বাবার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাতো যেদিন একটু বেশি দেরি হয়ে যেত তবে তার বাবা কিছু বলতো না । আরেকটা কাজ করে আবন্তির সময় কারতো সেটা হচ্ছে বই পড়ে । বাইরে বের হতে না দিলেও ওদের বিশাল বড় একটা লাইব্রেরী আছে । আবন্তির বেশির ভাগ সময়ই কাটেই এই লাইব্রেরী থেকে বই নিয়ে পড়েই । তাই যখনই ওর নাম্বার যখন অপরিচিত কারো থেকে মেসেজ আসলো তখন একটু অবাকই হয়েছিলো । বার কয়েক ফোন দিয়েও মেসেজ দাতাকে পাওয়া যেত না । তবে মেসেজটা সে রাখে নি । মুছে ফেলেছে । কারন ওর ফোন ওর বাবা নিয়মিত চেক করতো । বাবার হাতে ধরা পরলে হয়তো ফোনটা ওর হাত ছাড়া হয়ে যাবে!

আজকে মেসেজটা আসার পররপই আবন্তি সেই নাম্বার কল করলো । এবং আশ্চার্য ভাবে আবিস্কার করলো যে আজকে ঠিকই ফোন ঢুকেছে । কয়েক সেকেন্ড পরে ফোনটা রিসিভও হল ।
-হ্যালো !
ওপাশ থেকে কোন আওয়াজ হল না ।
আবন্তি আবারও বলল
-হ্যালো?
-আবন্তি ?
ফ্যাকাশে কন্ঠের কেউ বলে উঠলো ওপাশ থেকে, মহিলার কন্ঠ । আওয়াজ শুনে মনে হল তার বয়স বেশ ভালই হবে । আবন্তি আবারও বলল
-হ্যালো !
-আমার কথা মন দিয়ে শুনো !
-তার আগে আপনি বলেন আপনি কে ?
-আমি তোমার ভাল চাই । তোমাকে বাঁচাতে চাই ।
-কে আপনি ?
-শুনো আমি কে সেটা তুমি এখন চিনবে না । কেবল তোমাকে বলি তোমাকে এখনই ওখান থেকে পালাতে হবে ।
-আপনি কি বলছেন এসব ? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না । আর আমি কেন পালাবো ?
-তুমি বুঝতে পারছো না তুমি কি রকম বিপদের ভেতরে আছো । তোমার আসে পাশের কাউকে তুমি বিশ্বাস করতে পারো না মনে রেখো কাউকে না । তোমার সামনে কঠিন বিপদ । কঠিন বিপদ ।

ব্যস এই লাইন গুলো বলেই ফোনের লাইনটা কেটে গেল । ফোন রেখে আবন্তি কিছু সময় কি করবে তাও বুঝতে পারছিলো না । ফোনের ওপাসে ভদ্রমহিলার কথা বিশ্বাস করার কোন কারন নেই তবুও কেন যেন তার কথাটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছিলো । সেমিনার লাইব্রেরীতে বসে রইলো অনেক টা সময় । এক সময় লক্ষ্য করলো যে দিনের আলো প্রায় শেষ হয়ে যাচ্ছে । বাসায় ফেরা দরকার ।
ড্রাইভারকে বেশ কয়েকবার ফোন দিয়েও কোন উত্তর পেল না । এমনটা সাধারনত হয় না । তাহলে আজকে কি ঘুমিয়ে গেল ড্রাইভার ! লাইব্রেরী থেকে উঠে হাটা দিল ওদের ভার্সিটির কার পার্কিংয়ের দিকে ।

এই কার পার্কিং এলাকাটা একেবারে ভার্সিটির এক পাশে । এমনিতেই এইখানে লোকজন খুব একটা আসে না । এখনও শীতের সন্ধ্যা এখন দুর দুরান্তে কাউকে দেখা গেল না । একেবারে শেষ মাথায় ওর গাড়িটা রয়েছে দাড়িয়ে । আর একটা সাদা রংয়ের গাড়ি দেখা যাচ্ছে । আর কোন গাড়ি নেই । তবে একটা বাইক রয়েছে কালো রংয়ের । আবন্তি জানে বাইকটা কার ! ওদের ক্লাসের সাব্বিরের বাইক । যদিও কোন দিন ওদের মধ্যে কথা হয় নি তবুও সাব্বির সম্পর্কে ও কয়েকটা কথা জানে । মাঝে মাঝে গাড়ির গাছে আসতে গিয়ে সাব্বিরের সাথে দেখা হয়ে যায় ।

আবন্তি আরও একটু এগিয়ে এল ওর গাড়ির দিকে, ড্রাইভারকে গাড়ির সামনেই বসে থাকতে দেখা যাচ্ছে । লোকটাকে প্রায়ই এমন করে বসে থাকতে দেখে একভাবে । মাঝে মাঝে মনে হয় এভাবে বসে বসে হয়তো ঘুমায় কিন্তু আবন্তি যখনই কাছে যায় দেখে এক ভাবে সামনের দিকে তাকিয়ে আছে । ওর দরজার কাছে আসতেই দরজা খুলে বের হয়ে আসে ।
দরজা খুলে দেয় । আজকেও ড্রাইভার করে ওভাবেই বসে থাকতে দেখলো । কিন্তু যখনই গাড়ির খুব কাছে চলে এসেছে ঠিক সেই সময়েই একটা অদ্ভুদ দৃশ্য দেখলো । তখনই মনে হল ফোনের ওপাশের ঐ মহিলার কথা ওর অবশ্যই শোনার দরকার ছিল । ওর পালানোর দরকার দরকার ছিল ফোন পাওয়ার পরপরই । আবন্তি দেখলো অন্যান্য দিনের মত আজকেও ড্রাইভার গাড়ির সামনের সিটে বসে আছে তবে আজকে তার ঘাড়টা একটা কাত করা । গলার এক পাশে গভীর ক্ষত হয়ে আছে । সেখানে থেকে রক্ত ঝড়ছে । ড্রাইভারের গলা যে খুব আগে কাটা হয় নি সেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে ।

এই সন্ধ্যার আলোতেও রক্তের ফোয়ারা চিনতে আবন্তিরর মোটেও কষ্ট হল হল না । একটা তীব্র চিৎকার বের হতে গিয়েও বের হল না । যেই ওদের ড্রাইভারকে খুন করেছে সে নিশ্চয় কেবল ড্রাইভারকে খুন করার জন্য আসে নি, সামান্য ড্রাইভারকে কেউ খুন করতে কেন আসবে ? এসেছে ওকে মারার কিংবা ধরে নিয়ে যাওয়ার জন্য । ওর এখনই এখান থেকে পালানো দরকার, যে কোন ভাবেই ক্যাম্পাসের লোকজনের সামনে যেতে পারলেই তারা ওকে কিছু করতে পারবে না । এখনই পালানো দরকার !
এই চিন্তা করেই আবন্তি ঘুরে দাড়ালো এবং তখনই বুঝলো ওর দেরি হয়ে গেছে । এই নির্জন পার্কিং এলাকায় আসা উচিৎ হয় নি ।
ড্রাইভার যখনই ফোন ধরে নি তখনই ওর বুঝে যাওয়া উচিৎ ছিল ।
আবন্তি দেখলো দুজন লোক ওর দিকে এগিয়ে আসছে । একজনের হাতের বড় ছুড়িটা চিনতে আবন্তির মোটেও কষ্ট হল না । এটা দিয়েই নিশ্চয়ই একটু আগে ড্রাইভার কে ওরা হত্যা করেছে । এখন ওর পালা । মেঘলা একটা একটা চিৎকার দিতে চাইলো কিন্তু গলা দিয়ে একটা আওয়াজও বের হল না । কেবল নিজের পরিনতির দিকে তাকিয়ে রইলো । ছুরি হাতে লোক দুটো ওর প্রায় কাছে পৌছে গেছে ।


দুই
—-


লোক দুটোর একজন একটু বেশি লম্বা আর স্বাস্থ্যবান । সেই আগে এসে আবন্তির মুখ চেপে ধরলো । তারপর এমন ভাবে সামনে এগিয়ে ধরলো যেন ওর গলাটা সামনের দিকে একটু এগিয়ে থাকে । আবন্তির বুঝতে কষ্ট হল না যে ওর দিন শেষ হয়ে এসেছে । ফোনের ঐ মহিলা ঠিকই বলেছিলেন । ওর সামনে কঠিন বিপদ । এবং সেই বিপদের ভেতরে ও ইচ্ছে করে এসে ধরা দিয়েছে ।
তুলনা মূলক খাটো লোকটার হাতে ছুরিটা ধরা । সেটা নিয়ে লোকটা আবন্তির দিকে এগিয়ে এল । তারপর মুখটা বিকৃত করে বলল
-আজকে এই পৃথিবী থেকে এক শয়তানের মৃত্যু হবে । তার রাজত্ব শেষ হবে ।
আবন্তি কোন কথা বলতে পারলো না । ও কেবল চোখ বড় বড় করে বড় ছুরিটার দিকে দিকে আছে । ও পশু পাখি জবাই একদম দেখতে পারে না । টিভিতে এমন কিছু হলে সে টিভিট চ্যানেল পাল্টিয়ে দেয় । বইয়ে এমন বর্ণনা থাকলে সেটা পড়ে না । আর আজকে ওর নিজের সাথেই এমন হচ্ছে ।
কিন্তু ওর অপরাধ কি ?
কি এমন করেছে ও ! কারো সাথে ও কোন দিন মেশেই নি যে কারো উপর কোন অন্যায় করবে সে ! তাহলে এই লোক গুলো তাকে মারতে চায় কেন ?
-জামি কাজ শেষ কর ! এখানে থাকা নিরাপদ না । 
লম্বা লোকটা বলল । 
জামি নামের লোকটা ছুরি নিয়ে আরও একটু এগিয়ে এল আর ঠিক তখনও ধপ করে আওয়াজ হল । মনে হল অন কিছুর সাথে কিছু একটা জোরে ধাক্কা খেয়েছে ।

আবন্তি দেখল জামি নামের লোকটা ঠিক ওর সামনেই মুখ থুবড়ে পড়ে গেল । লম্বা লোকটা অবাক হয়ে কয়েক মুহুর্ত তাকিয়ে রইলো সঙ্গীর দিকে । এই ফাঁকে আবন্তির দেহকে একটু ঢিল দিয়ে ফেলল । ঠিক এই সুযোগটাই আবন্তির দরকার ছিল । নিজেকে ছাড়িয়ে সোজা সামনের দিকে দৌড় দিল । আবন্তিকে ধরতে যাবে ঠিক তখনই একটা মাঝারি সাইজের ইট তার মাথায় এসে লাগলো । সাথে সাথেই তার মাথাটা টা দুলে উঠলো ।
আবন্তি তাকিয়ে দেখলো ওর ক্লাসের সাব্বির সামনে দাড়িয়ে । খুব দ্রুত ওর কাছে এসে ওর হাত ধরলো । তারপর বলল
-চল । আমাকে এখনই এখান থেকে সরে পড়তে হবে !
-আমার ড্রাইভার …..
-যে গেছে সে গেছে । তোমাকে বেঁচে থাকতে হবে !

আবন্তি কিছু বুঝতে পারছিলো না । তবে সাব্বিরের কথা বার্তা কেমন যেন লাগলো ওর কাছে ! আবন্তিকে নিয়ে প্রায় জোর করেই সাব্বির নিজের বাইকে উঠে পড়লো । তারপর বাইক এক টানে দিয়ে ক্যাম্পাস থেকে বের হয়ে এল ।
আবন্তি তখনও নিজেকে সুস্থির করতে পারে নি । তবে বাইকের পেছনে বসে থাকতে থাকতে ওর নিজেকে খানিকটা সামলে নিল । যখন মাথাটা একটু ঠান্ডা হয়ে এল তখন প্রথম যে কথাটা মাথায় এল সেটা হল ও ওদের বাসার রাস্তায় নেই । অন্য কোন অচেনা পথে এগোচ্ছে ।
সাব্বিরকে বলল
-আমরা কোথায় যাচ্ছি ?
-নিরাপদ জায়গাতে ?
-আমাদের বাসায় চল । ওখানে সব থেকে নিরাপদ !
-ভুল । ওটা তোমার জন্য সব থেকে বিপদের জায়গা !
-মানে ? কি বলছো এসব ?
-ঠিক বলছি । তোমাকে সাবধান করা হয়েছিল । মনে নেই ? কিন্তু তুমি শোন নাই !
আবন্তির বুঝতে কষ্ট হল না যে ওকে যে ফোন করতো সাব্বির তাকে চেনে । কিন্তু কিভাবে ? আর মানুষ ওকে মারতে কেন চায় ? ওর বাবা একজন ক্ষমতাবান মানুষ এটা আবন্তি খুব ভাল করে জানে । বাবার উপর প্রতিশোধ নিতে কি কেউ তাকে খুন করতে চাচ্ছে ? এটা ছাড়া আর কোন ব্যাখ্যা নেই ওর কাছে । কিন্তু সাব্বির কেন বলছে যে ওর নিজের বাসা ওর কাছে সব থেকে বিপদের জায়গা ?
এমনটা বলার পেছনে কারন নি ?
-তুমি কি বলছো ? আমার বাবার বাসা কেন আমার জন্য বিপদের জায়গা হবে ?
-আবন্তি বিশ্বাস কর, তোমার জন্য বিপদের জায়গা অনেক গুলো আছে তবে সব থেকে বড় বিপদটা তোমার নিজের বাসায়, এবং সেটা তোমার বাবার কায়সার আহমেদের কাছ থেকে !
বাইকের গতি আরও একটু বেড়েছে । বাইকটা মুন্সি গঙ্গের ভেতরে ঢুকে পড়েছে । আবন্তি দেখলো একটা বড় পাচিল ঘেরা বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়লো । গেট দিয়ে ঢুকতেই সাব্বির গেটের দারোয়ানকে বলল গেট বন্ধ করে দিতে । আর কয়েকজন ছুটে এল আসে পাশ থেকে । ওদের সাথে সাব্বির কি যে বলল । ওর সাব্বিরের কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়ে যে যার কাজে চলে গেল । সাব্বির ওর দিকে তাকিয়ে বলল
-তোমার ফোনটা কোথায় ?
আবন্তি বলল ব্যাগের ভেতরে ছিল । ব্যাগটা তো পার্কিং লটে ফেলে এসেছি ।
-গুড ! চল ভেতরে । 
-সাব্বির আমি তোমাকে ঠিম মত চিনিও না । তুমি বলছো আমার বাবা আমার জন্য সব থেকে বেশি বিপদ জনক । একটু আগে আমার ড্রাইভার কে বা কারা খুন করেছে । আমি কিছু বুঝতে পারছি না । আমাকে তুমি পুলিশের কাছে না নিয়ে গিয়ে এখানে নিয়ে এসেছো । আমি কাকে বিশ্বাস করবো ?
সাব্বির বলল
-বিশ্বাস কর আমি তোমার ক্ষতি করবো না । ইনফ্যাক্ট তোমাকে বাঁচানোই আমার মিশন । এই জন্যই আমি তোমার ক্যাম্পাসে ভর্তি হয়েছি । তোমাকে চোখে চোখে রাখার জন্য !
আবন্তি খানিকটা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইলো সাব্বিরের দিকে । 
-আমাকে খুলে বলবে এখানে কি হচ্ছে ?
-তোমাকে সব খুলে বলা হবে !
আবন্তি ঘুরে বাড়ির সদর দরজার দিকে তাকালো । সেখানে একটা নারী মুর্তি এসে থেমেছে । স্পষ্ট চেহারা দেখা যাচ্ছে না তবে তার বেশ বয়স যে হয়েছে সেটা বুঝতে আবন্তির কষ্ট হল না । আর সেই সাথে এও মনে হল আজকে সকালে সে যার সাথে কথা বলেছে সেটা এই বৃদ্ধ মহিলা ছাড়া আর কেউ নন !
বৃদ্ধ মহিলা বললেন
-সাব্বির আবন্তিকে ভেতরে নিয়ে এস । আজকে ওর উপর দিয়ে অনেক ধকল গেছে । কিছু খেয়ে ও বিশ্রাম নিক । আজকের রাতটা ওর জন্য অনেক লম্বা রাত হবে । অনেক কথা ওর জানার আছে !
আবন্তি কিছু বলতে গিয়েও বলল না । বৃদ্ধ মহিলার কন্ঠে ছিল একটা আছে যেটা উপেক্ষা করার উপায় নেই । চুপচাপ তার নির্দেশ মেনে নিল ওরা । তারপর তার পেছন পেছন ঘরে প্রবেশ করলো ।



তিন
—–


লোকটা জীবনে এতো ভয় এর আগে কোন দিন পায় নি । সামনে শান্ত ভাবে বসে থাকা মানুষটার শীতল চোখ যেন তার বুকের ভেতরটা ছিড়ে ফেলতে চাইছে । কায়েস আহমেদ শান্ত কন্ঠে বললেন
-যখন কবিরকে মেরে ফেলা হল, তখন তুমি কোথায় ছিলে ?

কায়েস আহমেদের কন্ঠ শুনে সে আবারও নিজের ভয়টা আঁচ করতে পারলো । আজকে সে ঠিক ঠিক বুঝতে পারলো কেন সবাই কায়েক আহমেদ কে এতো ভয় পায় । ভয়ের চোটে সে ঠিক মত কথাই বলতে পারছে না । বারবার মনে হচ্ছে এখন থেকে পালিয়ে যেতে । কিন্তু খুব ভাল করেই জানে পালিয়ে সে খুব দুরে যেতে পারবে না । তাকে ঠিকই খুজে বের করা হবে । 

তাকে একটা কাজ দেওয়া হয়েছিলো । সেই জন্য মাসে মাসে ভাল পরিমান টাকাও পেত । এতো দিন সে কোন ভাবেই বুঝতে পারে নি কেন এই সামান্য কাজের জন্য তাকে এতো টাকা দেওয়া হচ্ছে । কোন ঝামেলা ছিল না । বাইকে করে কেবল কায়েস আহমেদের মেয়ে যেখানে যেখানে যায় সেখানে সেখানে যাওয়া । তার বিপদ হলে তাকে বাঁচানো । গত তিন বছর ধরেই সে এই কাজটা করছে । কোন দিন কোন সমস্যা হয় নি । প্রথম প্রথম সে খুব সজাগ থাকলেও আস্তে সেখানে ঢিলেমী দেখা দেয় । কোন কোন দিন সে গাড়ির পেছনে যেতও না । 

কিন্তু খুব ঝামেলার কিছু হয়ে গেছে । আবন্তি অর্থ্যাৎ কায়েস আহমেদের মেয়েকে কেউ তুলে নিয়ে গেছে । কবিরের গলা কেটে নিয়ে গেছে তাকে । সে এখনও বেঁচে আছে কি না সেটা এখনও সে জানে না । কেউ জানে না । 
কায়েস আহমেদ আবার বলল
-কোথায় ছিলে তুমি ?
-আমি চা খেতে গিয়েছিলাম ।

কথাটা বলা মাত্রই একটা কিছু খুব জোরে লোকটার বুকে আঘাত করলো । লোকটা সেই ধাক্কার খেয়ে সোজা পেছনের দেওয়ালে গিয়ে পড়লো ছিটকে । মৃত্যুর আগে কেবল অবাক হয়ে দেখলো কায়েস আহমেদ নিজের জায়গা ছেড়ে একদম নড়ে নি । কেবল হাতটা দিয়ে কিছুকে ধাক্কা মারার মত করে রেখেছে । অবাক চোখেই লোকটা নিজের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলো । 



কায়েক আহমেদ তীব্র ঘৃণার চোখে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছু সময় । ইচ্ছে করছে আবারও তাকে জীবিত করে আবারও তাকে মেয়ে ফেলে । যে অপরাধ সে করেছে তার জন্য তাকে একবার শাস্তি দিয়ে মন শান্ত হবে না । বারবার খুন করতে মন চাইছে তাকে । 

কয়েক মিনিট পরে আর একজন লোক এসে কায়েস আহমেদকে নিচু স্বরে কিছু বলল । কায়েস আহমেদ বললেন
-ঠিক আছে তাকে বসতে বল । আর এটা পরিস্কার কর ! 
লোকটা মাথা সামান্য কাত করে সম্মতি জানিয়ে চলে বাইরে । বাইরে উত্তরা থানার ওসি সাহেব এসে অপেক্ষা করছে । 


চার
—-


আবন্তি কিছুটা সময় বৃদ্ধ মহিলার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো । বৃদ্ধার নাম গুলসানারা খাতুন । একটু আগে বলা কথাটা তার ঠিক হজম করতে কষ্ট হচ্ছে । মনে হচ্ছে মহিলা কোন ভাবেই সত্য বলতে পারেন না । কিংবা এটা হতে পারে না কোন ভাবেই হতে পারেন না । 
গুলসানারা বললেন
-কি বিশ্বাস হচ্ছে না ?
চোখে কেমন একটা ঠান্ডা আভা ! দেখে বোঝার কোন উপায় নেই যেন সে মিথ্যা বলছে । আবন্তি বলল
-কিন্তু আপনি কিভাবে আমার বোন হন ? এটা কোন ভাবেই সম্ভব না !
-কারন আমি অনেক বেশি বৃদ্ধ আর তোমার বাবা মানে আমাদের বাবা খুব ইয়াং এখনও, এই জন্য ?
-অবশ্যই ! 

আবন্তি একটু আগে রাতের খাবার খেয়েছে । তবে সাব্বিরের কাছ থেকে শুনেছে এখানে নাকি থাকা যাবে না । এই জায়গাটার খোজ তারা পেয়েও যেতে পারে । ওকে আরও দুইতিন দিন পালিয়ে থাকতে হবে । এ কয় দিন পালিয়ে থাকতে পারলেই আর কোন সমস্যা হবার কথা না । তার জীবনের আর কো সংঙ্কা নেই । 

আবন্তি এদের কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না । কিন্তু আবার না বিশ্বাস না করেও পারছে না । নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে সাব্বির ওকে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছে । চাইলেই সে সেখানেই ওকে মেরে ফেলতে পারতো । কিংবা ওদের হাতে তুলে দিয়ে চলেআসতো পারতো । কিন্তু সেটা সে করে নি । বরং তাকে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছে ।

আচ্ছা এদের কি অন্য কোন ইচ্ছে আছে ? আবন্তি আরও কিছুটা সময় ওদের উপর বিশ্বাস রাখার কথা ভাবলো । আগে ওকে সব কিছু শুনতে হবে । কি হচ্ছে কিংবা ওর কিসের বিপদ এসব ওকে জানতে হবে ! তারপর কোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে ! 

তখনই গুলসানারা নামের সেই রহস্যময় বৃদ্ধ মহিলাটা ওকে জানালো সে সম্পর্কে ওর বোন হয় । প্রথমে ভেবেছিলো হয়তো কোন আত্বীয় হবে । ও খুশিই হয়েছিল । কারন ওর বাবা ওকে কোন আত্বীয় স্বজনের সাথে মিশতে দেয় না । এমনি কি ও জানেও না ওর কোন আত্মীয় আছে কি না । কিন্তু যখন জানতে পারলো গুলসানা ওর বাবার অর্থ্যাৎ কায়েস আহমেদের মেয়ে তখন ওর চোখ গুলো বড় বড় হয়ে গিয়েছিল । কেবল অবিশ্বাস ভরা চোখে তাকিয়ে রইলো বৃদ্ধার দিকে । 

গুলসানারা বললেন
-হ্যা । আমরা একই বাবার সন্তান । 
-কিন্তু …..
-তোমার বাবার কত বয়স হবে বলে তোমার মনে হয় ?
-এই চল্লিশ পয়তাল্লিশ । আর আপনার কম করেও হলেও ৬৫/৭০ হবে । 
-আমার বয়স ৭৬ বছর !
-তাহলে আপনি কিভাবে বলেন যে আপনি আমার বাবার মেয়ে । দিস ইজ ইনসেইন !
-আমি বলছি । তাহলেই বুঝতে পারবে ! তার আগে আমার কয়েকটা প্রশ্নের জবাব দেও । তুমি নিশ্চয়ই এখনও পাক পবিত্র আছো, তাই না ?
-মানে ? আপনি কি বলতে চাইছেন বুঝি নি ?
-তোমাকে কোন ছেলে এখন স্পর্শ করে নি । তাই না ?
-হ্যা ।
-এবং এটার ব্যাপারে তোমার বাবার খুব সজাগ, তাই নয় কি ?
-হ্যা । কিন্তু …….
-তোমার কি একবারও মনে হয় নি তোমার বাবা একটু অস্বাভাবিক ভাবেই এটা নিয়ে চিন্তিত তোমাকে নিয়ে । অন্য বাবাদের মত না !

আবন্তি কিছু বলতে গিয়েও বলল না । এটা সত্যিই যে স্বাভাবিক জীবন তার কোন কালেই ছিল না । কিন্তু তাই বলে !! নাহ এটা হতে পারে না ! 

গুলসানারা বলল
-তোমার বাবা মুলাকের অনুসারী !
-মুলাক ! 

সাব্বির এতো সময় পাশে চুপ করে বসে ছিল । একটা ল্যাপটপ কি যেন করছিল । ল্যাপটপ টা আবন্তির দিকে বাড়িয়ে দিল । সেখানে মুলাককে নিয়ে একটা আর্টিকেল লেখা । আবন্তি কোন কথা না বলে চুপচাপ পড়তে লাগলো । পড়া শেষ করে ওর মাথাটা খানিকটা ঝিমঝিম করতে লাগলো । এমন কিছু যে হতে পারে কিংবা আছে এই পৃথিবীতে ওর ধারনার বাইরে ছিল । 

অনেক অপদেবতার মতই মুলাকের অনুসারী আছে এই পৃথিবীতে । তবে সংখ্যাতে তা অনেক কম । মুলাক তার অনুসারীদের অনন্ত যৌবন দান করে এবং শারীরিক শক্তি দান করে তবে সেটার জন্য তাদের কিছু কাজ করতে হবে । মুলাককে খুশি করতে হয় । এবং সেটা করতে হয় নিজেদের কন্যা সন্তানকে তার নামে বলি দেওয়া মাধ্যমে । প্রতি ২১-২৪ বছর পরপর নির্দিষ্ট একটা সময়ে মুলাক এই পৃথিবীতে নেমে আসে । তখনই সে তাদের অনুসারীদের কাছে স্যাকরিফাইস চায় । স্যাকরিফাইস মানে হচ্ছে অনুসারিদের ভার্জিন কন্যা সন্তান । যার বয়স ১৮-২১ এর ভেতরে হতে হবে । যারা সেটা দিতে পারে তাদেরকে সে নতুন করে শক্তি দেয় এবং যারা পারে না তাদেরকে দেওয়া শক্তি কেড়ে নেয় । এ বছর মুলাকের এই পৃথিবীতে নেমে আসার সময় হয়ে গেছে । এবং সেটা আজ থেকে এক দিন পরে । 

আবন্তি কি বলবে কিছু বুঝতে পারলো না । কেবল অবাক হয়ে একবার সাব্বিরের দিকে আরেকবার বৃদ্ধা মহিলার দিকে তাকিয়ে রইলো । গুনশানারা বললেন
-আমিও ঠিক তোমার মত অবস্থায় ছিলাম । আমাকে ঠিক তোমার মত সাবধানেই মানুষ করা হচ্ছিলো । এখন যেমন তুমি বাইরে যেতে পারছো আমার সেই অনুমুতিটুকুও ছিল না । আমাকে সারাদিন বাসার ভেতরেই থাকতে হত । সেই সময় আমাদের বাড়ির ঠিক পাশেই একটা বড় মাঠ ছিল । খেলার মাঠ না, ফসলের মাঠ । সেখানে একটা ছেলের কাজ করতে আসতো প্রতিদিন । তার সাথে আমার চোখাচোখি হত । একটা সময় বুঝতে পারলাম আমার ছেলেটাকে অসম্ভব ভাল লাগতে শুরু করেছে । সেই ছেলেটাই সাহস করে মাঝে মাঝেই আমাদের বাসার ভেতরে ঢুকে আমার সাথে দেখা করতো যখন বাবা বাসায় থাকতো না । এবং এক বৃষ্টির রাতে ছেলেটা আমার ঘরে ঢুকে পরে । তারপর যা হবার তাই হয় । আমি তখনও জানি না যে এই ঘটনার কারনে আমি প্রাণে বেঁচে যাই । ঘটনা আমি লুকিয়ে রাখতে চাইলেও বাবা কিভাবে যেন সেটা জেনে যায় । কারো চোখে পড়ে গিয়েছিল । আমাকে বাদ দিয়ে তখন আমার ছোট বোন কে বেছে নেওয়া হয় ! সেই ছোট বোনকে আমি কোন দিন দেখিও নি । অন্য কোথাও ছিল সে । আমাকে এবং আমার মাকে বাসা থেকে বের করে দেওয়া হয় । আমি কিংবা আমার মা আর কোন দিন তার দেখা পায় নি । আমি কোন দিন কিছু জানতে পারে নি ।


এই কথা গুলো বলে গুলসানারা কিছু সময় চুপ করে রইলেন । তারপর আবার বলা শুরু করলেন 
-তারপর অনেক দিন তার কোন খোজ পায় নি আমি । এরপরই “রোহার মেচালী” দলের লোক জনের সাথে আমার দেখা হয় । আরও ভাল করে বললে তারাই আমাকে খুজে নেয় । আমার কাছ থেকে অনেক কথা শোনে এবং আমাকে আমার বাবার আসল সত্যটা জানায় । তোমার মত আমিও অবিশ্বাস করেছিলাম তারপর বিশ্বাস করতে বাধ্য হই । “রোহার মেচালী” দলের লোকজনদের প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে মুলাক এবং তার অনুসারীদের ধ্বংশ করা । কিন্তু অনুসারীরা যারা শক্তি এবং অমরত্ব পেয়েছে তাদেরকে কোন ভাবেই ঘায়েল করা সম্ভব না । এক মাত্র উপায় হচ্ছে তাদের এই স্যাকরিফাইসের রিচুয়্যালকে ব্যর্থ করে দেওয়া । তাহলেই তারা শক্তিহীন হয়ে পড়বে ! 
-এই জন্যই কি আমাকে মারতে এসেছিলো ওরা ?

-হ্যা । তোমার বাবা প্রতিবারই খুব সাবধান থাকতেন । প্রতিবার মুলাকের চলে যাওয়ার পরপরই সে দুই তিনটা করে বিয়ে করে রাখতো । যাতে আমার মত যদি একটা হাত ছাড়া হয়ে যায় কিংবা কেউ যদি মারা পরে তাহলে যেন অন্য কাউকে দিয়ে কাজ চালানো যায় । কিন্তু এবার তার কপাল খারাপ !
-কি রকম ?
-এইবার সে বেশ কয়েকটা মেয়ের সংস্পর্সে এসেছে । তার বেশ কয়েকটা সন্তানও হয়েছে তবে সবাই ছেলে । এক মাত্র মেয়ে তুমি । তাই সে তোমার ব্যাপারে এতো কেয়ারফুল ! কারন তোমাকে যদি সে সময় মত কাছে না পায় তাহলে তার কিছুই করার থাকবে না ! 

আবন্তি আর কোন কথা না বলে চুপ করে বসে রইলো । সে আর কিছু বলার মত কোন কিছু খুজে পাচ্ছে না । ঠিক মত কিছু বিশ্বাসও করতে পারছে না আবার অবিশ্বাসও করতে পারছে না । এরা যা বলছে সেটা কোন ভাবেই বিশ্বাস করার মত না কিন্তু তাকে যে হত্যা চেষ্টা করা হয়েছে সেটা তো আর মিথ্যা না । আর পুরোটা জীবন ধরে তার বাবা তাকে যেভাকে কড়া নজরদারীর ভেতরে রেখেছে সেটারও ব্যাখ্যাও এই গল্প দিয়ে বুঝা যায় । 

আর ওরা যদি মিথ্যা বলে তাহলেও খুব বেশি কিছু যায় আসে না । একটা কথা যে পরিস্কার যে ওর বাবার কাছ থেকে যদি ওর বিপদের আশংকা থাকেও সেটা দুদিনের ভেতরেই কেটে যাবে তখন সে মুক্ত হয়ে যাবে । এখন এদের কাছ থেকে অন্য কোথাও যাওয়া মানে হচ্ছে বিপদে পরা । এক তো সেই গলাকাটা গ্রুপ যারা ওকে মারতে চায় অন্যটা ওর বাবা যে ওকে দুদিন পরে কোন শয়তানের উদ্দেশ্য বলি দিবে । এর থেকে এখানে থাকাই ভাল । আবন্তি এখানে থাকারই সিদ্ধান্ত নিল । 

ঠিক তখনই বাইরে গুলির আওয়াজ হল ! আবন্তি তাকিয়ে দেখে সাব্বির উঠে দাড়িয়ে পড়েছে ততক্ষনে !


পাঁচ
—-


মোটে এগারোজন মানুষ পুরো বাড়িটাকে ঘিরে ফেলেছে । কায়েস আহমেদ গাড়িতে বসে আছেন । সব কিছু ব্যবস্থা করা হয়েছে । গোলাগুলির আওয়াজ হলেও এখানকার পুলিশ ঘন্টাখানেকের আগে এখানে আসবে না । সেরকমই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে । 
প্রথমে যখন আবন্তিকে নিয়ে যাওয়া হয় কায়েস আহমেদের মাথা ঠিক মত কাজ করছিলো না । তিনি তখনও জানেন না যে আবন্তি বেঁচে আছে কি মারা গেছে । তার কোন ধারনাও ছিল না তাকে কোথায় নিচে যাওয়া হতে পারে । ঠিক তখনই আশার আলো দেখতে পেলেন । 

ক্রাইম সিনে আবন্তির হ্যান্ড ব্যাগ পাওয়া যায় সেখানে তার মোবাইলটাও ছিল । সেই মোবাইলেই একটা অপরিচিত নাম্বার পাওয়া যায় যেটা ওকে ফোন করেছিলো বিকেলে । সেই ফোনের সুত্র ধরেই এই বাসার খোজে পাওয়া গেছে । উত্তরা থানার ওসি খুব সাহায্য করেছে । অবশ্য এর জন্য সে বড় রকমের পুরস্কারও পেয়েছে । সে নিজে ফোর্স পাঠাতে চেয়েছিলো কিন্তু সেটার আর দরকার হবে না বলে দিয়েছে । এখানে এটা নিজে দেখবে । 

তাই তো নিজের দলের সব থেকে দক্ষ ১২ জনকে নিয়ে আনা হয়েছে এই বাড়ির সামনে । একজন তার পাশে বসে আছে । হাতে একটা ওয়াকিটকি । কায়েস আহমেদের দিকে তাকিয়ে বলল
-স্যার আমরা রেডি !
-সবাইকে সাবধান করে দাও আবন্তির গায়ে যেন একটু আচড়ও না পড়ে । ঠিক আছে । আর কার কি হল সেটা দেখার দরকার নেই । 
-ওকে স্যার ! 

তারপর লোকটা ওয়াকিটকি বাড়ি আক্রমনের নির্দেশ দিল ! 



পুরো বাসাটা যেন যুদ্ধ ক্ষেত্রে পরিনত হয়েছে । কত সময় ধরে গোলাগুলি হচ্ছে সেটা আবন্তি নিজেও জানে না । তবে ওর মনে হচ্ছে অনন্ত কাল ধরে এই ঘরে বন্দী আছে । ঘরটা এই বাড়ির নিচে অবস্থিত । গুলসানারা খাতুন তাদেরকে এখানে নামিয়ে রেখে উপর থেকে আটকে রেখেছেন । তারাও ভেতর থেকে দরজাটা আটকে রেখেছে । বেস মজবুত দরজা । খুলতে সময় লাগবে ।

আবন্তি সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে বলল
-আমরা ধরা পরে যাবো তাই না ?
সাব্বির কোন কথা বলল না । ওর মুখটা কেমন গম্ভীর হয়ে গেছে । কিছু যেন ভাবছে । তারপর হঠাৎ করেই আবন্তির দিকে তাকালো । এমন ভাবে তাকালো যে আবন্তি সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে গেল । সাব্বির বলল
-তুমি কি জানো আমি তোমার উপর সেই এক বছর ধরে লক্ষ্য রাখছি ! তার আগে অন্য কেউ রাখতো !
আবন্তি মাথা নাড়ালো । 
সাব্বির বলল
-আমাদের আসল উদ্দেশ্য কোন দিনই তোমাকে বাঁচানো ছিল না । আমাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল কেবল তোমার বাবাকে ধ্বংস করা । কিন্তু তোমাকে যখন বাবার পাঠানো লোক গুলো মেরে ফেলতে যাচ্ছিলো তখন আমি সেটা দেখতে পারি নি । তাই তোমাকে বাঁচিয়ে নিয়ে এসেছি ।
আবন্তি কি বলবে খুজে পেল না । 
-এমন কি গুলসানারা খাতুনও জানে না যে আমি “রোহার মেচালী” দলের অনুসারী । আমার বাবা আসলে দলটার প্রধান !
-তুমি কি আমাকে এখন মেরে ফেলবে ?
-আমার তাই উচিৎ ! তোমার বাবা কতটা যে ভয়ংকর সেটা তুমি কোন দিন হয়তো জানতে পারবে না । এবং তুমি বেঁচে থাকা মানে তোমার বাবাকে আরও শক্তি শালী করে তোলা । একটা পর্যায়ে এমন হবে যে সে যা চাইবে তাই করতে পারবে । তাকে কেউ থামাতে পারবে না ! 

এই বলে সাব্বির ওর কাছে এল । ওর হাত দুটো শক্ত করে চেপে ধরলো ! সাব্বির বলল
-আমি যা করতে যাচ্ছি সেটা সবার ভালর জন্য । আশা করি তুমি বুঝতে পারছো ! 

আবন্তি কিছুটা সময় নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো কিন্তু কোন লাভ হল না । সাব্বিরের শক্তি অনেক বেশি । সে কেবল অসহায় ভাবে তাকিয়ে রইলো সাব্বিরের দিকে । 



পুরো বাসাটা কায়েস আহেমেদের নিয়ন্ত্রনে চলে এসেছে । যদিও প্রয়োজের থেকে একটু বেশি সময় লেগেছে । ভেতর থেকে এভাবে প্রতিরোধ করা হবে সেটা কায়েস আহমেদ ভাবতেও পারে নি । তবে এখন নিয়ন্ত্রনে চলে এসেছে । সেটা কোন বিষয় নয় তিনি অবাক হয়ে সামনের বসা বৃদ্ধার দিকে তাকিয়ে আছেন । কয়েক মুহুর্ত লাগলো তার চিনতে । তারপর অবাক হয়ে বলল
-গুলসানারা ?
-চিনতে পেরেছেন তাহলে ?
কায়েস আহমেদ একটু হাসলো । তারপর বলল
-তোমাকে কিভাবে না চিনি ! এখন সোজাসুজি বল আবন্তি কোথায় ? আমি কোন বয়স্ক মানুষের উপর হাত তুলতে চাই না ! 
-বয়স্ক !!! 
গুলসানারা ঘর কাঁপিয়ে হেসে উঠলো । 
-দুইশ বছরের বুড় আমাকে বলে বয়স্ক !!!!!

তারপর হাসতেই থাকলো । কায়েস আহমেদ নিজের রাগকে নিয়ন্ত্রনে রাখলেন । কোন কারন নেই তবুও তিনি গুলসানারা দিকে এগিয়ে গেলেন না । অবশ্য যাওয়ার প্রয়োজনও পড়লো না । তার আগেই একজন এসে বলল যে তারা একটা বেজমেন্টের দরজা খুজে পেয়েছেন । ভেতর থেকে আটকানো । 

কায়েস আহমেদ সেখানে গেলেন । সামনে দাড়িয়ে থাকা সৈনিকটা বলল যে তারা অনেক সময় ধরে চেষ্টা করছে তবে খুলতে পারে নি । দরজাটা বেশ মজবুত । 

কায়েস আহমেদ এগিয়ে গেল । তারপর দরজার সামনে গিয়ে হাত রাখলো । দুজন সৈনিক কেবল অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো যে দরজার উপর কেউ যেন আছড়ে পড়লো । বড় গাছের গুড়ি দিয়ে দরজায় আঘাত করলে দরজা যেমন ভেঙ্গে যেত ঠিক সেই ভাবেই দরজাটা ভেঙ্গে গেল । 

ভেতরে ঢুকতেই কায়েস আহমেদ দেখলে একপাশে আবন্তি চুপ করে বসে আছে । মুখে ভয় নিয়ে । তার থেকে একটু দুরে আরেকটা ছেলে । ছেলেটার হাতে একটা ছুরি ! ছেলেটাকে উঠে দাড়াতে দেখেই কায়েস আহমেদ আবারও নিজের অদৃশ্য শক্তি দিয়ে ছেলেটাকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরলো । তারপর বলল
-আবন্তি ! তুমি ঠিক আছো ?
-হ্যা বাবা !
-গুড । আর কোন ভয় নেই । বাবা তোমাকে নিতে এসেছে । 

তখনও সাব্বিরকে দেওয়ালের সাথে চেপে ধরেই রেখেছেন তিনি । কিভাবে কাজটা করছেন সেটা ঘরে থাকা অন্য কেউ জানে না কিংবা বুঝতে পারছে না । কেবল বুঝতে পারছে সামনে দাড়ানো মানুষটা স্বাধারন কিংবা স্বাভাবিক কেউ নয় । 
আবন্তি তখন বলল
-বাবা ওকে ছেড়ে দিন প্লিজ । ও না থাকলে হয়তো আমি এখন বেঁচে থাকতাম না । ক্যাম্পাসে যখন আমার উপর হামলা হয় তখন ও ই আমাকে ওদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে আসে । 

কায়েস আহমেদ আরও কিছুটা সময় আবন্তির দিকে তাকিয়ে রইলো । বোঝার চেষ্টা করছে তার মেয়ে সত্যি কথা বলছে কি না । অবশ্য এখন আর সমস্যা নেই । সামনের এই ছোকড়ার কোন মূল্য নেই তার কাছে । আবন্তি ঠিক আছে সেটাই তার কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ন । কায়েস আহমেদ সাব্বিরকে ছেড়ে দিল । তারপর আর কোন কথা না বলে আবন্তিকে নিয়ে উপরে চলে এল । 



ছয়


আবন্তি নিজের কাছেই কেবল বলছিল যে ও যা যা জেনে এসেছে তার সব যেন মিথ্যা হয় । ঠিক আছে ও ঠিক স্বাভাবিক জীবন পায় নি । ওর বাবা ওকে একটু বেশি নজরদারীতে রেখেছে কিন্তু তাই বলে এটা কোন ভাবেই সত্য হতে পারে না । কিন্তু বাসায় আসার পর থেকে যখন ওকে নিজের ঘরে আটকে রাখা হল তখন ওর মনে হল ওরা যা যা বলেছে সব সত্যি । পরের সারা দিন ওকে ঘর থেকে একটা বারও বের হতে দেওয়া হল না । চিৎকার চেঁচামিচি করলো কিছু সময় ধরে তবে সেটাতে কোন লাভ হল না । কিছু সময় পরে সেটাও বন্ধ করে দিল । নিজের বিছানায় বসে রইলো চুপ করে । ওর আর কিছু করার নেই । 

পরের দিন ওর বাবা দরজা খুলে যখন ওর রুমে এল তখন আবন্তির শরীরটা বেশ দুর্বল । আগের দিনের ধকল সেই সাথে সারা দিন ও কিছুই খাই নি । ওর বাবার দিকে তাকিয়ে বলল
-ওরা যা যা আমাকে বলেছে সবই সত্যি ?
প্রথমে কায়েস আহমেদ কোন কথা বললেন না । কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলো কেবল । আবন্তি বলল
-অন্তত এটা জানার অধিকার আমার আছে ? পুরো জীবনে আপনি আমাকে নিজের মত করে একটা দিনও চলতে দেন নি এটা বলেন অন্তত !
-হ্যা সত্যি !
-আপনার বয়স কত ?
-হিসাব করি না অনেক দিন । দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় আমার বয়স ১১২ বছর ছিল । তারপর আর হিসাব করা হয় নি ।

আবন্তি আর কোন কথা বলল না । কায়েস আহমেদ বলল
-রেডি হয়ে নাও । গোসল সেরে নাও । আমি চাই না শেষ কয়েকটা মুহুর্ত তোমার উপর আমি জোর জবর্দস্তি করি । সেটাতে তোমার কোন লাভ হবে না । 

দরজাটা আবারও বন্ধ হয়ে গেল । আবন্তির কান্না আসা উচিৎ কিন্তু আবন্তির কান্না এল না । বরং অন্য রকম একটা অনুভুতি হতে লাগলো । সাব্বিরের কথা মনে হল । মনে মনে দোয়া করলো ছেলেটার কথা যেন ঠিক হয় ! এতো সময় ও ওকে যা যা বলেছে সব ঠিক হয়েছে এটাও যেন ঠিক হয় । 



সাত
—-


আবন্তিকে একটা কালো বেদীর উপর শুইয়ে রাখা হয়েছে । তার কোন জ্ঞান নেই । অচেতন হয়ে পড়ে আছে সে । তার হাতের দুটো শরীরের দুদিকে রাখা । তার হাত দুটো যেখানে রাখা হয়েছে সেখান থেকে সরু ড্রেনের চলে গিয়েছে ওর পায়ের কাছে । সেখানে গিয়ে মিশেছে ড্রেন দুটো । আবন্তির দুই হাতের রগ কেটে দেওয়া হয়েছে । সেখানে থেকে রক্ত ড্রেন দিয়ে গড়িয়ে এগিয়ে যাচ্ছে পায়ের কাছের বড় গর্তটাতে । ঠিক ঐ পায়ের কাছেই একটা বড় মুর্তি রাখা হয়েছে । মূর্তিটা মুলাকের । শরীরটা মানুষের আকৃতি হলেও লম্বাতে সেটা ১০/১১ ফুট । শরীরও ঠিক তেমনটা মোটা । মাথাটা অনেকটা মহিষের মত তবে নাকের কাছে একটা লম্বা শিং আছে । 

কায়েস আহমেদ সেই কখন থেকে মন্ত্র পড়েই যাচ্ছে । ঘরটা আবন্তিদের বাসার নিচে অবস্থিত । কম করেও হলেও চার তলা লম্বা । ঘরের চার কোনে মশালের আলো জলছে । আর মৃদ্যু স্বরে ঢোলের আওয়া হচ্ছে যদিও পুরো ঘরের ভেতরে তিনি ছাড়া আর কেউ নেই । স্পিকারে আওয়াজটা আগে থেকেই রেকর্ড করা রয়েছে । 

কায়েস আহমেদ জানে খুব জলদি মুলাকের মুর্তিতে জান ফিরে পাবে । মুর্তিটা নড়াচড়া করে সামনে শোয়ানোআবন্তিকে দেখতে পাবে । তারপর তার হাতের কাটা থেকে গড়িয়ে পড়া রক্তের স্বাদ নিবে । সব শেষে সব টুকু রক্ত শুসে নিয়ে সন্তুষ্টির চোখে তাকাবে কায়েস আহমেদের দিকে । 

হঠাৎ ঘরটা কেঁপে উঠলো । এক সাথে চারটা মশালই নিভে গেল । কায়েজ আহমেদ মন্ত্র পড়েই চলেছেন । তিনি জানেন মুলাক চলে এসেছে । তিনি মুলাকের উপস্থিতি ঠিক টের পাচ্ছে । পুরো শরীরে একটা আলাদা উত্তেজনা কাজ করছে । ঢোলের আওয়াজ যেন আস্তে আস্তে বাড়তে লাগলো সেই সাথে কায়েস আহমেদের মন্ত্র পড়ার আওয়াজও ।

এরপরে আরও বিশ বছর তাকে আবার নতুন করে যৌবন আর শক্তি দেওয়া হবে । আরও ক্ষমতা তার হাতের মুঠোই চলে আসবে ! 
তিনি আস্তে আস্তে সব থেকে শক্তি শালী হয়ে উঠবেন । 

কিন্তু হঠাৎ মনে হল কিছু একটা সমস্যা হয়েছে । 
কিছু একটা ঠিক নেই যেই । আগুন টা আবারও জ্বলে উঠলো । 
মানে মুলাক চলে গেছে ! 
কায়েজ আহমেদ অবাক হয়ে দেখলেন মুলাক তার সামনে পরিবেশিত বলিটা গ্রহন করে নি । আবন্তি সেই আগের মতই আছে । 
কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা না । আবন্তির এখানে থাকার কথা না । 

কি হল !!

হঠাৎই কায়েস আহমেদ নিজের ভেতরে কাঁপন অনুভব করলেন । শক্তিহীন অনুভব করছেন !
এমনটা কেন হল ?
কেমন করে হল !
তিনি তো সব ঠিকই করেছিলেন ? 
তাহলে ?

তিনি সিড়ির দিকে দৌড় দিলেন । তার সারা শরীরে কাঁপন ধরে গেছে । কিন্তু সিড়ির কাছে পৌছাতে পারলেন না । তার আগেই পড়ে গেলেন । তার শরীরের মসৃন ভাবটা দুর হয়ে আস্তে আস্তে বৃদ্ধ মানুষের মত হয়ে যেতে লাগলো । শরীরের পুষ্ট মাংসের জায়গার স্থান নিতে শুরু করলো ভাজ পরা চামড়া । দেখতে দেখতে ৪৫ বছরের মানুষের জাগয়ায় তিনি পরিনত হলেন ১৮৩ বছরের একজন মানুষ ! 

মুলাক তাক যা যা দিয়েছিলো সব কিছু নিয়ে গেছে ! 


আট
—-



আবন্তি চোখ মেলে দেখলে সে হাসপাতালের বেডে শুয়ে হাতে । তার হাতের সাদা ব্যান্ড-এইড বাঁধা । কিছু মনে করতে চেষ্টা করলো কিন্তু কিছু মনে করতে পারলো না । সামনে তাকিয়ে দেখে গুলসানারা বসে আছে । 
-কেমন লাগছে এখন ?
-ভাল । আমি এখানে কেমন করে ?
-সাব্বির তোমাকে এখানে এনেছে । ওরা ঐদিন রাতেই তোমার বাবার বাসা আক্রমন করে । ভেবেছিল খুব কঠিন যুদ্ধ হবে কিন্তু আশ্চর্য ভাবে কোন প্রতিকুলতার মুখোমুখি ওদের হতে হয় নি । তখন বাসা কেবল মাত্র দুজন গার্ড ছিলো । অনেক কষ্টে নিচের ঘরটা খুজে পেয়েছে ।
-তারপর ?
-ওখানে গিয়ে দেখে তুমি একটা বেদীর উপর শুয়ে আছো । তোমার থেকে রক্ত পড়ছে । অনেক খানি রক্ত বের হয়ে গেছিলো । আর কিছু দেরি হলে হয়তো তোমাকে বাচানো যেত না ! 

আবন্তি কিছু না বলে একটু হাসার চেষ্টা করলো । 
গুলসানারা বলল
-ওরা তোমার বাবার লাশ পেয়েছে । সে নাকি মরার আগে একদম কুচকে গিয়েছিলো । দেখে মনে হচ্ছিলো নাকি দুতিনশ বছরের কোন বুড়ো মরে পড়ে আছে ! 

আবন্তি কিছু বলল না ।
-তুমি অবাক হও নি ?
-না !
-তার মানে তুমি জানতে যে যে মারা যাবে ?
-জানতাম ।
-কিভাবে ?

আবন্তি এই কথার জবাব না দিয়ে কেমন চোখে তাকালো ! গুলসানারা কেমন বিভ্রান্ত দেখালো । সে কিছুই বুঝতে পারছে না । আবন্তিকে চুপ করে থাকতে দেখে গুলসানারা আবার বলল
-কি হয়েছিলো এমন ? 

এই কথারও জবাব না দিয়ে আবন্তি কেবল হাসলো । ওর মাথায় তখন অন্য কিছু খেলছে । অন্য এক সময় চলে গেছে ও । ও ঠিক ঠিক জানে কেন মুলাক ওর বাবাকে ত্যাগ করে চলে গেছে । সঠিক সময়ে একটা সঠিক কাজই ওর জীবন বাঁচিয়েছে ! 


(সমাপ্ত)  

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 3.8 / 5. Vote count: 4

No votes so far! Be the first to rate this post.

Related Posts

One thought on “শয়তানের ভোজ

  1. আবন্তি পবিত্র ছিল না। তাই মুলাক বলি গ্রহণ করে নি যার ফলে কায়েস আহমেদ মারা যায়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *