সময়টা রাত পৌনে তিনটার কিছু বেশি। গুলশানের বহুতল অ্যাপার্টমেন্ট বিল্ডিং। টপ ফ্লোরে থাকেন শহরের অন্যতম শীর্ষ ব্যবসায়ী ও সাবেক সংসদ সদস্য চৌধুরী সাব্বির আহমেদ। দিনের বেশির ভাগ সময়ে তিনি নানান কাজে ব্যস্ত থাকলেও রাতের বেলাটা তিনি তার স্টাডি রুমে কাটান। প্রায়ই দিনই তিনি এখানেই ঘুমিয়ে পড়েন যদি না তার স্ত্রীর আলাদা কোন চাহিদা থাকে। তবে সপ্তাহ খানেক হল তার স্ত্রী এবং দুই মেয়ে স্পেন গিয়েছে বেড়াতে। পুরো বাসায় এখন সে একা রয়েছেন। বাসার কাজের লোকেরা সাধারণ রাতে বাসায় থাকে না। সকালে এসে রাতের খাবার তৈরি করে দিয়ে চলে যায়।
চৌধুরী সাব্বির মেহগনি কাঠের বিশাল টেবিলে বসে কিছু ফাইল দেখছিলেন। হুট করেই টেবিলের ওপর রাখা তার আইফোনটা কেঁপে উঠল। স্ক্রিনে হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশন।
অপরিচিত একটা আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে একটা ভয়েস নোট এসেছে। বার্তাটির কোনো টেক্সট বা ক্যাপশন নেই, দৈর্ঘ্য মাত্র ৫১ সেকেন্ড।
সাব্বির আহমেদ চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে নিয়ে মেসেজটা দেখলেন। কোন লিংক নেই তার মানে হচ্ছে এখানে ক্লিক করলে সমস্যায় পড়তে হবে না। তাই নিরাপদেই মেসেজটা চালু করা যায়। তিনি ভয়েস প্লে বাটনে টাচ করলেন।
এক সেকেন্ড নিরবতা। তারপরই ফোনের স্পিকার থেকে ভেসে এলো অদ্ভুত এক শব্দ। কোনো মানুষের কণ্ঠ নয়, কোনো চেনা বাদ্যযন্ত্রের সুরও নয়। বাতাস যেন কোনো প্রাচীন, ফাঁপা বাঁশির ভেতর দিয়ে শাঁ শাঁ করে বয়ে যাচ্ছে, আর তার পেছনে মৃদু এক আলোরণের সুর। সুরটা শুনতে অদ্ভুত করুণ মনে হল, কিন্তু একই সাথে হাড় হিম করা শীতল অনুভূতি হতে লাগল।
সুরটা যেন তার কানের ভেতরে নয়, সরাসরি মস্তিস্কে গিয়ে আঘাত করল। এমন অদ্ভুত অনুভূতি হল যে তার মনে হল ভয়ংকর কিছু যেন এখনই ঘটবে। তার মনে হল এই সুরটা আর বেশি সময় শোনা ঠিক হবে না। কিন্তু তিনি পজ বাটনে চাপ দিয়ে পারলেন না। তার পুরো শরীর যেন অসাড় হয়ে এসেছে। চৌধুরী সাব্বির আহমেদের হাত থেকে ফোনটা ছুটে টেবিলে পড়ে গিয়ে পড়বে তবে সুরটা বন্ধ হল না।। তার মাথার ভেতরটা যেন তীব্র যন্ত্রণায় ঝিমঝিম করে উঠল।
অডিও ফাইলটা মাত্র ৫১ সেকেন্ডের ছিল কিন্তু চৌধুরী সাব্বির আহমেদের মনে হল যেন সেটা যেন অনন্তকাল ধরে চলছে। থামার নাম নেই। তিনি বুঝতে পারলেন না যে একটা সুরের ভেতরে এমন কী থাকতে পারে যে তার মানসিক অবস্থা এমন হবে। তিনি নিজেকে সুস্থির করার চেষ্টা করলেন। যখন মনে হল যে সুরটা তার মাথার নিউরনগুলো সব ছিড়ে দিবে তখনই সুরটা থেমে গেল। সাথে সাথেই সব কিছু যেন আবারও স্বাভাবিক হয়ে গেল। তিনি মেঝেতে পড়ে থাকা ফোনটার দিকে তাকালেন। একটু আগে ঠিক কী হল সেটা তিনি বুঝতে পারলেন না। তিনি একটু কুজো হয়ে ফোনটা তুলতে যাবেন এমন সময়েই অনুভব করলেন যে ঘরে কিছু একটা পরিবর্তন হয়েছে। এতো পরিচিত ঘরটা যেন আর আগের মত নেই। কিছু একটা যেন ঠিক নেই। তিনি চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিলেন। অস্বাভাবিক কিছুই চোখ পড়ল না বটে তবে কেন জানি সেই অচেনা অস্বস্তিকর অনুভূতিটা তাকে ছেড়ে চলে গেল না।
ঘরের এসিটা ২৫ ডিগ্রিতে সেট করা ছিল, কিন্তু আচমকাই তাপমাত্রা হু হু করে নামতে শুরু করল। এসি থেকে নয়, মনে হলো পুরো ঘরের বাতাসটাই জমে বরফ হয়ে আসছে। ভিক্টোরিয়ান আমলের বড় ঘড়িটার পেন্ডুলাম দুলছে, কিন্তু সেখান থেকে কোনো টিকটিক শব্দ আসছে না। অদ্ভুত এক ভারী, থমথমে নীরবতা ছেয়ে গেল ঘরে।
মেঝের ওপর চোখ পড়তেই সাব্বির আহমেদের বুকের ভেতরটা ছ্যাঁৎ করে উঠল।
কার্পেটের ওপর কিছু নেই, অথচ রক্ত হিম করা এক শব্দ—খস—খস—খস।।। যেন প্রকাণ্ড ও অদৃশ্য কিছু একটা কার্পেট ঘষে ঘষে তার দিকেই এগিয়ে আসছে!
-কে? কে ওখানে?
সাব্বির আহমেদ চিৎকার করতে চাইলেন, কিন্তু গলা দিয়ে কেবল এক গোঙানির শব্দ বের হলো।
প্রচণ্ড এক অদৃশ্য ধাক্কা এসে তার বুকে লাগল। ছিটকে গিয়ে পেছনে বইয়ের তাকে আছড়ে পড়লেন তিনি। আর্তচিৎকার করার আগেই অদৃশ্য কোনো থাবা বা হাত তার গলা চেপে ধরল। তিনি বিস্ময়ের সাথে বুঝতে পারলেন যে কিছু একতা তার গলা চেপে ধরেছে। তিনি কাউকে দেখতে পাচ্ছেন না তবে অনুভব করতে পারছেন ঠিক। সামনে গরম নিঃশ্বাস অনুভব বুঝতে পারছেন! কেউ একজন কিংবা কিছু একটা তার ঠিক সামনেই এসে হাজির হয়েছে।
সাব্বির আহমেদ ছটফট করতে লাগলেন, বাতাসে হাত-পা ছুড়তে লাগলেন বাঁচার আকুতিতে। কিন্তু বাতাসে বাতাস ছাড়া আর কিছুই ধরা পড়ছে না!
পরের কয়েক সেকেন্ডে স্টাডি রুমটি পরিণত হলো এক নৃশংস কসাইখানায়।
ধারালো কোনো অদৃশ্য নখ বা ফলার আঘাতে সাব্বির আহমেদের বুক, পেট আর মুখের ওপর ফুটে উঠতে লাগল একের পর এক গভীর ক্ষতচিহ্ন। রক্ত ঠিকরে এসে পড়ল পেছনের দেয়াল আর দামি কার্পেটে।
তার মুখ দিয়ে অমানুষিক চিৎকার বের হতে লাগল কিন্তু সেই চিৎকার কারো কানে পৌছালো না। পড়াশোনা এবং কাজের সুবিধার জন্য চৌধুরী সাব্বির আহমেদ এই স্টাডিরুমটাকে একেবারে সাউন্টপ্রুফ বানিয়েছিলেন। ফলে বাইরে থেকে কোন শব্দ যেমন এই ঘরে প্রবেশ করে না, ঠিক একই ভাবে ঘরের ভেতরের শব্দ বাইরে যায় না।
চৌধুরী সাব্বির আহমেদের দেহটা মেঝের রক্তে রঞ্জিত কার্পেটে আছড়ে পড়ল। এখন আর চিৎকার করার শক্তিটুকু তার নেই। কয়েকবার খিচুনি দিয়ে দেহটা নিথর হয়ে গেল!
বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে, বদ্ধ ঘরে একজন মানুষকে ভয়ংকর কোন প্রাণী নৃশংসভাবে খুন করেছে।
এক
সিআইডি কমিশনার হাফিজ আহমেদ যখন গাড়ি থেকে নামলেন, তখন রিনতির বিরক্তির পারদ তুঙ্গে। রিনতি ঠিক এখনও বুঝতে পারছে না সে এই পুরান ঢাকায় নির্জন গলিতে কী করছে! পুরান ঢাকার এই গলিটা তার এরিয়ার ভেতরে পড়ে না। এখানে তারা কোন অভিযানে আসে নি। এসেছে একজনের সাথে দেখা করতে! একজন ভুতের ওঝার সাথে তাদের কথা বলতে হবে! রিনতির কাছে মনে হচ্ছে জগতে এর থেকে হাস্যকর ব্যাপার আর কিছু হতে পারে না।
এই ভুতের ওঠার কথা সে আগেও শুনেছে। তার ব্যাচমেট নোভা রহমান কাছ থেকে শুনেছে এই রহস্যময় চরিত্রটার কথা। নোভা আগে তার বস হাফিজ আহমেদের সাথে কাজ করত। হাফিজ আহমেদ তখন র্যাবে ছিলেন। এখন তিনি সিআইডি হেড হয়ে এসেছেন। রিনতির তার আন্ডারে কাজ করছে প্রায় বছর খানেক হবে। বস হিসাবে তিনি চমৎকার একজন মানুষ। কিন্তু আজকের তার আচরণ মোটেই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
অবশ্য রিনতি তাকে দোষ দিতে পারল না। গর সাত দিনে মোট তিনটা খুন হয়েছে রাজধানীতে। দেশে প্রতিদিন গড়ে ১০টা খুন হয়। সেই হিসাবে তিন খুন নিয়ে খুব বেশি মাথা ঘামানোর কারণ নেই। তবে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। কারণ হচ্ছে এই তিনটা খুন কোন সাধারণ খুন নয়। প্রথমজন চৌধুরী সাব্বির আহমেদ, সাবেক সংসদ সদস্য এবং বর্তমান ব্যবসায়ী। দ্বিতীয়জন সামিউল কবির, বিখ্যাত চলচিত্র পরিচালক এবং তৃতীয়জন পুলিশের সাবেক ডিআইজি আকবর আলী! তিন মানুষকে ঠিক একই ভাবে খুন করা হয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হচ্ছে খুনগুলো কিভাবে হয়েছে সেটা কেউ বুঝতেই পারছে না। তিন খুনের ভেতরে তিনটাই হয়েছে বদ্ধ ঘরে। দুইটা ছিল ভেতর থেকে বন্ধ। এবং একটা ছিল অফিস। সেটা ভেতর থেকে বন্ধ না হলেও সিসিটিভি লাগানো ছিল সেখানে। সেই সিসিটিভিতে খুনের দৃশ্য ধরাও পড়েছে কিন্তু খুনীকে দেখা যায় নি। দেখলে মনে হবে যে কেউ যত্ন করে সেই খুনীর বডিটা মুছে দিয়েছে। ক্ষতের দৃশ্য ফুটে উঠছে ঠিকই তবে কে সেটা ঘটাচ্ছে সেটা দেখা যাচ্ছে না। ব্যাপারটা রিনতির কাছে খুব অদ্ভুত মনে হচ্ছে।
কোনো কুল কিনারা না করতে পেরে তার বস হাফিজ উদ্দিনের মনের হয়েছে যে এর ভেতরে কিছু অলৌকিক ব্যাপার হয়েছে। এবং এটার সমাধান একজনই করতে পারবে। সেই একজনের সাথে দেখা করতেই রিনতি সহ তিনি হাজির হয়েছে পুরান ঢাকার এই গলিতে।
-স্যার, আমার এখনো মনে হয় আমরা ভুল জায়গায় সময় নষ্ট করছি।
গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে তাকিয়ে নাক সিঁটকালো রিনতি। তবে জায়গাটা তার কাছে যেন একটু বেশি নিরব মনে হল। ঘড়িতে সবে মাত্র সাড়ে বারোটা। ঢাকা শহরের কোন এলাকা এই বারোটার সময়ে এতো নির্জন হয়ে যায় না। একতলা বাড়িটার দিকে তাকাল রিনতি। সাধারণ একটা বাড়ি মনে হচ্ছে। পেছনে সম্ভবত একটা উঠোন মত আছে। বাইরে থেকে দেখলেই সেটা বোঝা যায়। রিনতি নিজের বিরক্তিটা আরেকটু চেপে অপেক্ষা করতে লাগল।
হাফিজ আহমেদ বললেন, আরেকটু অপেক্ষা কর। এখনো সময় হয় নি।
-সময় হয় নি মানে কি স্যার? সে বাসায় নেই?
এই প্রশ্নের উত্তরে হাফিজ আহমেদকে কেমন যেন একটু বিভ্রান্ত মনে হল। তিনি যেন ভাল করেই জানেন যে রাফায়েল এখন এই বাসার ভেতরেই আছে। তবে এখন এই বাসার ভেতরে ঢোকা যাবে না এটাও তিনি জানেন। রাফায়েল তাকে সময় দিয়েছে বারোটা একুশ মিনিটের পরে। এর আগে এই বাসার ভেতরে ঢোকা যাবে না। তিনি রিনতির দিকে তাকালেন। তার মনের ভেতরে একটা অস্বস্তি কাজ করছে ঠিকই। তিনি জানেন তিনি এখানে যে কারণে এসেছেন সেটা কোন ভাবেই অফিশিয়াল রেকর্ডে থাকতে পারে না। নোভা থাকলে ভাল হত, মেয়েটা আগেও এমন কাজ করেছে। এই রিনতি মেয়েটা তার সাথে অল্প কয়েকদিন হল কাজ করছে। তবে মেয়েটা যে প্রতিভাবান সেই বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই। আগের সব কেসে মেয়েটা অসাধারণ কাজ করেছে। সব কিছুই সে সহজেই বুঝে যেত। অপরাধ কিভাবে ঘটানো হয়েছে সেটা রিনতির চোখ এড়িয়ে যেত না। তবে এইবার রিনতি পর্যন্ত কিছু করতে পারছে না। তার আসলে ধারণাই নেই যে খুনী কিভাবে খুন গুলো করেছে। তবে রিনতি একটা ব্যাপার খুজে বের করতে পেরেছে। সেটা হচ্ছে এই তিন জন মানুষই একে অন্যের সাথে সংযুক্ত। একে অন্যকে চিনতেন বেশ ভাল করেই। সেই হিসাবে তাদের এই একই ভাবে খুনের ভেতরে একটা কমন কারণ থাকতে পারে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে খুনী কি কেবল এই তিনজনকে খুন করেই খান্ত দিবে নাকি সামনে আরো কয়েকজন তার হাতের শিকার হবে?
হাফিজ আসমেদ হাতের ঘড়ির দিকে তাকালেন। সময় হয়ে গেছে। এখন ভেতরে ঢোকা যায়! তারপরেও তিনি আরও এক মিনিট অপেক্ষা করলেন। তারপর রিনতির দিকে তাকিয়ে বললেন, চল ভেতরে ঢোকা যাক।
তারপর গাড়ির ড্রাইভার এবং ড্রাইভারের পাশে বসা ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমরা এখানেই অপেক্ষা কর। আমি কাজ শেষ করে বের হচ্ছি একটু পরেই।
ওরা মাথা কাত করে কেবল সম্মতি জানাল।
রিনতি কাঠের দরজাটা নিজ হাত দিয়ে খুলল। আগে সে দরজায় টোকা দিতে যাচ্ছিল কিন্তু তখনই মনে হল দরজা যেন একটু ফাঁক হয়ে গেল। কেউ যেন দরজার পেছন থেকে সেটা ওদের জন্য খুলে দিল। রিনতির মনে হল সে সম্ভবত ভুল দেখেছে। কারণ দরজা যখন সে খুলল তখন সেখানে কাউকে সে দেখতে পেল না। এমন ভাবে যে কেউ সামনে থেকে চলে যেতে পারে সেটা তার ধারণার বাইরে ছিল নাকি কেউ সেখানে ছিলই না? রিনতি ভুল দেখেছে?
ভেতরে পা রাখতেই রিনতির মনে হলো, সে অন্য কোনো জগতে চলে এসেছে। ঘরের ভেতরের অন্ধকারটা একেবারে অন্য রকম। এই অন্ধকার রিনতি আগে অনুভব করে নি। তবে ঘরের ঠিক বিপরীত দিকে একটা দরজা দেখা যাচ্ছে। রিনতির মনে আরেকবার বিরক্তির একটা অনুভূতি দেখা দিল। ঐ লোকটা নিশ্চিত ভাবেই এখানে কোন আলোর কারসাজি করেছে। এমন ভাবে সব কিছু সেট করেছে যেন সব কিছুই আধিভৌতিক মনে হয়। স্টেজে জাদুকর যেমনটা করে থাকেন। এই লোকটাও সেটাই করেছে সম্ভবত।
রিনতির মনে আছে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হল। সে ভেবেছিল ঘরটা সম্ভবত পুরানো স্যাতস্যাতে কোন ঘর হবে তবে এখন এই ঘরের ভেতরে ঢুকে তার মনে ভাব একেবারেই পরিবর্তন হয়ে গেছে। ঘরটা আধুনিক সরঞ্জাম দিয়ে ভর্তি। পুরাণনো এই বাসার ভেতরটা যে এমন হতে পারে সেটা রিনতির ধারণা ছিল না।
সে রাফায়েল নামের মানুষকে দেখতে পেল একটু পরেই। কালো প্যান্ট এবং কালো একটা শার্ট পরে রয়েছে সে। ওদের ঘরের ঢোকার একটু পরেই অন্য একটা দরজা খুলে ভেতরে ঢুকল। হাফিজ আহমেদের দিকে তাকিয়ে বলল, কী খবর মিস্টার আহমেদ। অনেক দিন পরে আবার এখানে এলেন।
রিনতি একটু অবাক হয়েই খেয়াল করল যে তার পরাক্রমশালী বস কেমন যেন একটু অস্বস্তিবোধ করছেন। তিনি কোন কারণে সামনের এই মানুষটাকে ভয় পাচ্ছেন। অন্তত তার সামনে কথা বলতে তার অস্বস্তি লাগছে। এই ব্যাপারটা রিনতির একটু অবাকই লাগল। রিনতি এবার তাকাল রাফায়েলের দিকে। চেহারা দেখলে মনে হবে বয়সে রিনতির থেকে সে ছোটই হবে। রিনতির এখন আঠাস চলছে। এই ছেলের বয়স পঁচিশ ছাব্বিসের বেশির হওয়ার কথা না। এই বয়সের একজনকে কোন পুলিশ কেন এই রকম সমীহ করে চলবে?
সত্যিই কি এই ছেলের মধ্যে অলৌকিক কোন ব্যাপার আছে? রিনত্তি এই সব বিশ্বাস করতে চায় না। নোভার সাথে কথা বলার রিনতি দেখেছে তার মুখের ভাবটাও বদলে গিয়েছিল। এই ছেলের মাঝে আসলেই কি অস্বাভাবিক কোনো ক্ষমতা আছে?
না না। এই রকম কিছুই হতে পারে না। রিনতি প্রায় জোর করেই নিজের মন থেকে এই চিন্তাটা দূর করে দিল। কিন্তু যখন রিনতির চোখ গেল রাফায়েলের দিকে এবং রাফায়েল নিজেও তাকাল রিনতির দিকে তখন হঠাত করেই রিনতির ভেতরটা যেন কেঁপে উঠল? এমন তীক্ষ্ম চোখ আসলেই কি মানুষের হতে পারে? রিনতি জানে না।
-বসুন আপনারা, দাঁড়িয়ে কেন? মিস রিনতি আপনিও বসুন!
হাফিজ আহমেদ বললেন, আমরা একটা দরকারে এসেছি নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন?
রাফায়েল হাসল। তারপর বলল, আমার এখানে কেউ আসলে বেড়াতে আসে না। সবাই দরকারেই আসে। আমি ব্যাপারটা দেখেছি। আপনাদের কেন মনে হচ্ছে এখানে আমার কিছু করার আছে? রিনতি সামাদের মত চৌকস অফিসার যেখানে রয়েছে, সেই এই কেস সমাধান করতে পারবে বলে আমার মনে হয়!
রিনতি আবারও একটু চমকালো। এই রাফায়েল নামের মানুষটাকে সে এর আগে দেখে নি কেবল কথা শুনেছে। তবে এই মানুষ তার সম্পর্কে এমন ভাবে কথা বলছে যেন তার ব্যাপারে সব কিছুই সে জানে।
হাফিজ আহমেদ বললেন, আমরাও তাই ভেবেছিলাম তবে এই শেষ মার্ডারটা হওয়ার পরে আমাদের মনে হয়েছে এটার ভেতরে অন্য কিছু একটা আছে। গত পরশুদিন আমাদের এক সাবেক জিআইজি মারা গেছেন। অন্য দুটো খুন রাতের বেলা হলেও ডিআইজি জসিম মারা গেছেন একেবারে দিনের বেলা। এবং তার হত্যাটা সিসিটিভিতে ধরা পড়েছে।
এবার রাফায়েল একটু ভুরু কুচকে তাকাল। তারপর বলল, সিসিটিভিতে ধরা পড়লে তো আপনাদের খুনীকেও দেখতে পাওয়ার কথা। তাই না?
এবার কথাটা বলল রিনতি। সে বলল, সমস্যাটা এখানেই। সিসিটিভিতে কাউকে দেখা যায় নি।
রাফায়েল বলল, সিসিটিভিতে ঠিক কী দেখা গেছে?
হাফিজ আহমেদ বললেন, কালকের আগে পর্যন্ত আমাদের কাছে পুরো ব্যাপারটা অন্য কিছু মনে হচ্ছিল তবে কালকের পরে মনে হচ্ছে এই ব্যাপারের মধ্যে অস্বাভাবিক কিছু আছে।
তারপর তিনি রিনতির দিকে তাকালেন। চোখের ইশারায় ভিডিও ফুটেজটা রাফায়েলকে দেখাতে বললেন। রিনতি নিজের মোবাইল থেকে ভিডিও ফুটেজটা রাফায়েলের দিকে এগিয়ে দিল। রাফায়েল সেটা হাতে নিয়ে কিছু সময় সেটার দিকে তাকিয়ে রইলো। সেখানে খুনের দৃশ্যটা বেশ স্পষ্ট ভাবেই ফুটে উঠেছে। তবে কেবল মাত্র একজন। কেবল সেখানে ভিক্টিম রয়েছে। তাকে কে আঘাত করছে কে তুলে আছাড় মারছে সেটা দেখা যাচ্ছে না। দৃশ্যটা দেখা শেষ করে ফোনটা আবার রিনতির দিকে বাড়িয়ে দিল সে।
হাফিজ আহমেদ বললেন, কিছু বুঝতে পারছেন?
-এমনটা সাধারণত খুব একটা হয় না। অশরীরিদের সাথে ইলেক্ট্রনিক যন্ত্রের একটা শত্রুতা আছে। এখানে ভিডিওটা একেবারে পরিষ্কার ফুটে উঠেছে। ফোন এসেছিল একটা, খেয়াল করেছেন কি?
রিনতি বলল, হ্যা আমরা ফোনটা চেক করে দেখেছি। একটা নম্বর থেকে মেসেজ এসেছে। তবে কী মেসেজ এসেছে সেটা জানতে পারে নি। ম্যাসেজটা ওয়ানটাইম ভিউ করে পাঠানো হয়েছিল।
রাফায়েল বলল, কোন একটা অডিও পাঠানো হয়েছিল। আপনারা খেয়াল করেছেন কিনা জানি না তবে কিছু একটা ওয়াজ তিনি শুনেছেন ঐ ফাইল থেকে এবং তারপর থেকেই এই অশরীরিটা এসে হাজির হয়েছে।
হাফিজ আহমেদ বললেন, এমন কিছু সম্ভব?
-হ্যা সম্ভবত। ছবি পাঠিয়ে সাধারণ করা যায় না। তবে লেখা পাঠিয়ে যদি কেউ সেটা নিজে জোড়ে জড়ে উচ্চারণ করে পড়ে তবে এমন হতে পারে। কিন্তু এখানে তেমন কিছুই দেখা যায় নি। ভিডিও পাঠায় নি। অডিওই পাঠিয়েছে নিশ্চিত!
এবার রিনতির দিকে তাকিয়ে বলল, অন্য দুই ভিক্টিমের ফোনেও কি এমন কিছু পাওয়া গেছে?
-হ্যা মৃত্যুর আগে তাদের হোয়াটসএপে মেসেজ এসেছিল। তবে নম্বর আলাদা। বিদেশী আনট্রেসেবল নম্বর। সাধারণত হ্যাকারটা এমন ওয়ানটাইন নম্বর ব্যবহার করে থাকে।
রাফায়েল কিছু সময় চুপ করে থেকে বলল, ভিডিও দেখে এখানে নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে যে অশরীরি কিছু এসেছিল। আপনারা আর কোন সুত্র কী বের করতে পেরেছেন? মৃত তিন জন কোনো ভাবে কি একে অন্যের সাথে যুক্ত?
হাফিজ আহমেদ বললেন, একজন সাহেব সংসদ সদস্য একজন এনজিওর বড় কর্তা আর একজন পুলিশের সাবেজ ডিআইজি। একে অন্যের সাথে যোগাযোগ নেই। হুয়ায়ুন কাউয়ুম অর্থ্যাৎ তিনি নেড বাংলাদেশ এনজিও ডিরেক্টরদের একজন তিনি বেশির ভাগ সময়ই দেশের বাইরে থাকেন। মৃত্যুর মাত্র এক সপ্তাহ আগে দেশে এসেছিলেন।
-কোনো যোগাযোগ নেই?
-সাব্বির আহমেদ আর হুয়ায়ুন কাউয়ুমের মাঝে চেনাজানা ছিল। বুঝতেই পারছেন যে একজন সাহেব সংসদ সদস্য অন্যজন এনজিও কর্মকর্তা। তাদের ভেতরে চেনাজানা থাকাটা অস্বাভাবিক না। তবে ডিআইজি জসিসের সাথে তাদের কোন সংযোগ আমরা এখনও বের করতে পারি নি।
রাফায়েলের বাসা থেকে বের হওয়ার পর থেকে রিনতির মাথার ভেতর কেমন একটা তালগোল পাকানো অনুভূতি কাজ করতে লাগল। রিনতির এক মন বলছে যে লোকটা আসলে ভন্ড ছাড়া আর কিছু নয়। তার বসকে এই লোক কিভাবে কাবু করে ফেলল সেটা রিনতি নিজেও ঠিক বুঝতে পারছিল না। তবে এই মানুষটার চোখজোড়ার ভেতরে কিছু যে একটা আছে সেটা রিনতি স্বীকার করেই নিল। কোন মানুষের চোখ আসলে এতো তীক্ষ্ণ হতে পারে না। রিনতির মনে হল যেন এখনো সেই দৃষ্টি তার পিছু ছাড়ছে না। তবে নিজের যুক্তিবাদী মন থেকে সে চিন্তাটা দূর করে দিল। মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল যে এই লোকের কাছ থেকে সে কোন প্রকার সাহায্য নিবে এবং কোন প্রকার সাহায্য করবে না। এই মানুষটার কাছ থেকে সে দুরে থাকবে।
পরের কয়েকটা দিন ধরে তদন্ত পুরোদমে এগোল, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হলো না। তিনটা রহস্যময় খুনের কোনো কমন সুতো রিনতিরা কিছুতেই বের করতে পারল না। তিনজনের অতীত ঘেঁটে আলাদাভাবে এমন কোনো অপরাধ বা শত্রুর খোঁজ মিলল না যা দিয়ে এই নৃশংস খুনের ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। আইটি সেল আর সাইবার ক্রাইম বিভাগও হাত তুলে দিয়েছে। ওই ‘ভিউ ওয়ান্স’ মেসেজগুলো এমন এনক্রিপশনে পাঠানো হয়েছে যে সার্ভারের কোথাও বিন্দুমাত্র ব্যাকআপ ফাইল অবশিষ্ট থাকছে না। কেসটা যেন পুরো এক অন্ধগলিতে গিয়ে আটকে গেল।
কেসটার ব্যাপার উপর থেকে বেশ চাপ আসা শুরু করেছে তবে ওদের হাতে কিছুই নেই। সেদিনও অফিসে বসে রিনতি কেসের ফাইলই দেখছিল। ঠিক এমন সময় তার এক কনস্টেবল এসে জানাল, এক ভদ্রলোক হাফিজ স্যারের সাথে জরুরি ভিত্তিতে দেখা করতে চান। লোকটার নাম আশফাক চৌধুরী। শহরের নামজাদা রিয়েল এস্টেট কোম্পানি ‘গ্র্যান্ড বিল্ডার্স’-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক। দেশের একজন প্রথম সারির শিল্পপতি।
হাফিজ আহমেদ আর রিনতির চেম্বারে আশফাক চৌধুরী যখন এসে বসলেন, তখন তাঁর ফর্সা চেহারাটা একদম ফ্যাকাশে মেরে গেছে। থরথর করে কাঁপছে লোকটার হাত-পা। তাঁর কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে দেখা গেল, যদিও ঘরের এসিটা বেশ কম তাপমাত্রাতেই চালানো ছিল।
হাফিজ আহমেদ এক গ্লাস পানি তাঁর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, আশফাক সাহেব, শান্ত হন। কী হয়েছে বলুন তো?
আশফাক চৌধুরী এক চুমুকে পানিটুকু শেষ করে কাঁপানো গলায় বললেন, আমি… আমি হয়তো পরবর্তী শিকার হতে চলেছি।
রিনতি সোজা হয়ে বসল। মনের ভেতরে একটা তীব্র অনুভূতি সৃষ্টি হয়েছে, কী বলছেন আপনি? আরেকটু পরিষ্কার করে বলুন প্লিজ।
আশফাক চৌধুরী তাঁর পকেট থেকে স্যামসাং ফোনটা বের করে টেবিলের ওপর রাখলেন। বললেন, গত দু দিন ধরে আমার হোয়াটসঅ্যাপে একটা অচেনা আন্তর্জাতিক নম্বর থেকে মেসেজ আসছে। একটা অডিও ফাইল… কোনো টেক্সট বা ক্যাপশন নেই। সাব্বির আহমেদ আমার খুব ভালো পরিচিত ছিলেন। তার মৃত্যুর ব্যাপারটা আমার কাছে খুব অস্বাভাবিক মনে হয়েছে। আমি জানি। তাই ভেতরের খবর আমি বের করার জন্য লোক লাগিয়েছিলাম। সেখান থেকে জানতে পারি যে অচেনা নম্বর থেকে একটা অডিও ফাইল এসেছিল। তারপর আমার ফোনে যখন সেই একই ধরণের অডিও ফাইল আসা শুরু হল তখন আমার মনে হল যে এবার আমার পালা!
রিনতি আর হাফিজ আহমেদ একে অপরের দিকে তাকালেন। রিনতির ভেতরের অলস ভাবটা মুহূর্তের মধ্যে উধাও হয়ে গেল।
-আপনি মেসেজটা খোলেননি?
রিনতি জিজ্ঞেস করল।
-না, আমার ঠিক সাহস হয় নি। আমি ভেবেছিলাম যে না খুললে হয়তো কোন ঝামেলা হবে না। ঝামেলা হয় নি। মিনিট পাঁচেক পরেই মেসেজটা অটো ডিলিট হয়ে গেছে। আমি ভেবেছিলাম আর আসবে না। তবে গতকাল এসেছে, আজ সকালে আবার মেসেজ এসেছে। আলাদা নম্বর থেকে, একই রকম ভয়েস নোট।
ঠিক সেই মুহূর্তেই—টেবিলের ওপর রাখা আশফাক চৌধুরীর ফোনটা মৃদু ভাইব্রেট করে উঠল।
স্ক্রিনে নোটিফিকেশন ভেসে উঠল। নতুন একটা বার্তা। অচেনা বিদেশী নম্বর! বার্তাটির নিচে লেখা—‘Audio (51s) • View once’.
রিনতির হৃৎস্পন্দন একমুহূর্তের জন্য যেন থমকে গেল। এই সেই অভিশপ্ত মেসেজ! যে বার্তাটি শোনার পর মুহূর্তের মধ্যে তিনটা মানুষ লাশ হয়ে গেছে। সেই অডিও ফাইল এখন তাদের চোখের সামনে, ঘরের টেবিলে কাঁপছে। আসলেই এটা সম্ভব? এমন ভাবে কাউকে হত্যা করা সম্ভব? রিনতি এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না। এসবের ভেতরে নিশ্চিত ভাবেই কোনো না কোন বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আছে!
রিনতি কোনো দ্বিতীয় চিন্তা করার সুযোগ পেল না। এভিডেন্স রিট্রিভ করার বা টেকনোলজি দিয়ে অলৌকিক কিছুকে প্রুভ করার একমাত্র উপায় এখন তার চোখের সামনে। মেসেজটা যদি এখন না দেখা হয়, হয়তো এবারও হাতছাড়া হয়ে যাবে মূল সূত্র।
সে হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিজের দিকে টেনে নিল। হাফিজ আহমেদ কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন, হয়তো তিনিও পরিস্থিতিটা সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন।
রিনতি তার ডান হাতের তর্জনী দিয়ে অডিওটির প্লে বাটনটার দিকে হাত বাড়াল। বুকের ভেতর অজানা এক ভয় দোলা দিচ্ছে, হাতটা মৃদু কাঁপছে। তা সত্ত্বেও নিজের ভেতরের ডিটেকটিভ সত্তাটাকে দমাতে পারল না সে।
ঠিক যখনই তার আঙুলের ডগা স্ক্রিনের প্লে বাটনটা স্পর্শ করতে যাবে—একদম এক মিলিমিটার দূরত্বে—ঠিক তখনই তার ঠিক পেছন থেকে অত্যন্ত গম্ভীর আর শীতল এক কণ্ঠস্বর ভেসে এলো:
-ডোন্ট।
কণ্ঠটা এতই স্পষ্ট আর অবিশ্বাস্যভাবে কাছাকাছি মনে হলো যে রিনতির গায়ের লোম খাড়া হয়ে উঠল। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। থামার মতো মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণ তার হাত পেল না। তার আঙুলের চাপটা প্লে বাটনের ওপর পড়েই গেল!
আঙুলের চাপটা প্লে বাটনের ওপর পড়ার সাথে সাথেই ফোনটার স্ক্রিন একমুহূর্তের জন্য লালচে আভায় মিটমিট করে উঠল।
এক সেকেন্ড সব চুপ। তারপরই রিনতির কানের ভেতরে স্পিকার থেকে ভেসে এলো অদ্ভুত একটা সুর। কোনো মানুষ কিংবা চেনা কোনো বাদ্যযন্ত্রের পক্ষে এমন সুর তোলা অসম্ভব। ফাঁপা কোনো বাঁশির ভেতর দিয়ে যেন এক প্রকাণ্ড, ভয়াল বাতাস বয়ে যাচ্ছে, আর তার পেছনে ভেসে আসছে করুণ কিন্তু হাড় হিম করা এক আর্তনাদ!
সুরটা শোনার সাথে সাথেই রিনতির মনে হলো, কেউ যেন প্রকাণ্ড কোনো হাতুড়ি দিয়ে তার মাথার ভেতরে সরাসরি আঘাত করল! একটা প্রচণ্ড ঝাকুনি খেল তার পুরো মস্তিষ্ক। চোখের সামনে চেনা ঘরটা মুহূর্তের জন্য কেমন ঘোলাটে আর বাঁকা হয়ে গেল। রিনতি চিৎকার করে উঠতে চাইল, কিন্তু তার চোয়াল যেন জমে বরফ হয়ে গেছে।
হাত থেকে ফোনটা খসে পড়ল টেবিলটার ওপর। সুরটা তখনও বেজেই চলেছে… থামার কোনো লক্ষণ নেই।
ঘরের ভেতরের এসির যান্ত্রিক শব্দটা হুট করেই বন্দ হয়ে গেল। মুহূর্তের মধ্যে থমথমে এক নীরবতা গ্রাস করল পুরো সিআইডি কমিশনারের রুমটাকে। আর তারপরই ঘরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে নামতে শুরু করল। এসি বন্ধ, অথচ ঘরের বাতাসটাই যেন নিমিষে জমে বরফ হয়ে যাচ্ছে! কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমে থাকা আশফাক চৌধুরী চরম আতঙ্কে সোফা থেকে ছিটকে মেঝেতে পড়ে গেলেন। হাফিজ স্যার নিজের চেয়ারে বসে যেন পাথর হয়ে গেছেন, তাঁর হাত-পা অবশ হয়ে এসেছে। কারো মুখ দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। ঘরে থাকা কেউ কিছু দেখতে পাচ্ছে না বটে, কিন্তু প্রতিটা মানুষ অবিশ্বাস্য এক পৈচাশিক উপস্থিতি অনুভব করতে পারছে। ঘরের মধ্যকার বাতাসটা ভারী হয়ে উঠেছে, যেন প্রকাণ্ড আর হিংস্র কোনো অপশক্তি শূন্যে ডানা মেলে দাঁড়িয়ে আছে তাঁদের ঠিক সামনেই!
রিনতির বুকের ভেতরটায় অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে। এক দিক দিয়ে তার যুক্তবাদি মন চোখের সামনে যা হচ্ছে তা মেনে নিতে পারছে না আবার অন্য দিকে নিজের শরীর মনের সাথে যা হচ্ছে সেটাও মেনে নিতে পারছে না।
এক ফোঁটা বাতাস নিঃশ্বাসে নেওয়ার শক্তিও পাচ্ছে না রিনতি। তার মনে হলো বাতাসের সমস্ত অক্সিজেন একমুহূর্তে টেনে শুষে নেওয়া হয়েছে।
রিনতি কিছু কাউকে দেখতে পাচ্ছে না বটে তবে একটা তীব্র অনুভূতি হচ্ছে তার। তার দিকে কেউ বা কিছু একটা এগিয়ে আসছে। পায়ের আওয়াজ সে শুনতে পাচ্ছে।
শূন্য থেকে প্রচণ্ড এক অদৃশ্য আঘাত বা ধেয়ে আসা অদৃশ্য কোনো থাবা রিনতির বুকের দিকে তেড়ে এলো। মৃত্যুর একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রিনতি বুঝতে পারল যে খুব ভয়ংকর কিছু একটা তার দিকে এগিয়ে আসছে। এটা তার ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় বুঝতে পারল। সে নিজেকে দুরে সরিয়ে নিতে চাইলো বতে তবে তার শরীর সাড়া দিল না। রিনতি বুঝতে পারল যে অন্য তিনটা মানুষের মতই সেও নিজে মরতে চলেছে।
কিন্তু ঠিক সেই শেষ ভগ্নাংশের মুহূর্তে রিনতি অনুভব করল একটা অদৃশ্য নরম উষ্ণ কিছু একটা যেন তার পুরো শরীরটা জড়িয়ে ধরল তারপর এক হেঁচকা টানে পেছনের দিকে সরিয়ে নিয়ে গেল!
রিনতি পিছিয়ে চলে এল একেবারে দেওয়ালের কাছে।
মড়মড়—ঝনঝন
পর মুহূর্তেই পুরো ঘরটা কেঁপে উঠল। যে জায়গাটিতে এক সেকেন্ড আগেও রিনতি দাঁড়িয়ে ছিল, ঠিক তার পেছনের সিআইডির মেহগনি কাঠের বিশাল অফিস টেবিলটার ওপর সেই অদৃশ্য আছাড় আর আঘাতটা গিয়ে পড়ল! মোটা মেহগনি কাঠের টেবিলটা যেন এক প্রকাণ্ড লোহার হাতুড়ির ঘা খেয়ে মাঝখান থেকে ভেঙে চৌচির হয়ে দুভাগ হয়ে গেল! টেবিলের ওপর রাখা ফাইল, কম্পিউটার মনিটর আর গ্লাসগুলো চুরমার হয়ে ঘরের চারকোণে ছিটকে পড়ল।
রিনতির বুকের ভেতর হৃদপিণ্ডটা যেন পাজর ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইল সেই ভেঙে চৌচির হয়ে যাওয়া মেহগনির টেবিলটার দিকে। কী হল সে কিছুই বুঝতে পারছে না।
সামনে কোনো লোক নেই, কোনো ছায়াও নেই… অথচ কাঠের টেবিলটা কীভাবে এমন চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে গেল?
ঠিক তখনই ঘরে আরেকজন মানুষ ঢুকল।
রাফায়েল। রিনতি তার দিকে একবার তাকাল কেবল। মনের ভেতরে এই প্রশ্ন এল না যে এই মানুষটা এখানে ঠিক কেন এসেছে! বরং রিনতির মনে হল যে এইএখন তার এখানেই থাকা উচিৎ। এই মানুষটাই তাকে এই হামলা থেকে রক্ষা করেছে।
রিনতি রাফায়েলের দৃষ্টি অনুসরণ করেই তাকালো সামনের দিকে। সেখানে আসলেই কাউকে দেখা যাচ্ছে না। তবে রাফায়েলের দৃষ্টি দেখে মনে হল যেন সে কিছু দেখতে পাচ্ছে।
রাফায়েল তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনি ঠিক আছেন?
রিনতি কোন জবাব দিতে পারল না। কেবল একটু মাথা ঝাকাল। যদিও সে ঠিক নেই।
এবার রাফায়েল নিজের পকেট থেকে গোল সাদা বল জাতীয় কিছু কিছু একটা বের করল। তারপর শব্দ করে কিছু পড়ল তার পরেই বলটা মেঝেতে আছাড় মেরে ভেঙ্গে ফেলল। তারপরই সব থেকে অবিশ্বাস ঘটনাটা ঘটল। রিনতি দেখতে পেল তার পরিচিত ঘরের চেহারাটা কেমন যেন বদলে গেল। চারিদিকটা যেন অন্ধকার হয়ে এসেছে। এবং রিনতি সেই বিকট দর্শন ভয়াল প্রানীটাকে দেখতে পেল।
রিনতি কেবল চোখ বড় বড় করে সেটার দিকে তাকিয়ে রইলো। এখনও যেন ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না যে সে কী দেখছে! মূল গঠনগত দিক থেকে একজন দীর্ঘদেহের মানুষের মতোই। হাত-পাগুলো মানুষের মতো স্বাভাবিক হলেও আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা, যার মাথায় কাঁচের মতো স্বচ্ছ কিন্তু অত্যন্ত ধারালো নখ।
তবে সবচেয়ে ভয়ংকর ওটার মাথাটা!
মানুষের কাঁধের ওপর কোনো মানুষের মাথা নেই। সেখানে বসানো রয়েছে এক প্রকাণ্ড কোন বন্য প্রাণীর মাথা! তার চোখের কোটর দুটো একদম ফাঁকা আর অন্ধকার। কিছু নেই যেখানে। তারপরেও রিনতির মনে হল যেন সেই অন্ধকার চোখেই সেই তাকিয়ে রয়েছে রিনতির দিকে। চোয়ালটা সামান্য ঝুলে খোলা রয়েছে, আর সেখান থেকে মাঝে মাঝেই খটখট শব্দ করে এক বিকট শীতল নিঃশ্বাস বেরিয়ে আসছে।
রিনতির মনে হল যেন এখনই প্রাণীটা ওকে আক্রমন করবে। বুকের ভেতরে তীব্র একতা ভয় জমতে শুরু করল ওর। কিন্তু অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে প্রাণীটা কিছু সময় তার দিকে তাকিয়ে থেকে পিছু হাটা শুরু করল।
জানলার পাল্লা খোলার মত করে সে ঘরের জানালাটা খুলে সেখান দিয়ে বের হয়ে গেল। সাথে সাথে ঘরের আবহাওয়া আবারও স্বাভাবিক হয়ে গেল।
রিনতির তখনও ঠিক বিশ্বাস হচ্ছিল না যে কী হল এতো সময়। ঘরের ভেতরের সব কিছুই স্বাভাবিক কেবল মাত্র টেবিলটা খন্ড বিখন্ড হয়ে পড়ে আছে। যদি এই টেবিলটা না থাকত তবে কেউ বিশ্বাস করত না যে এতো সময়ে ঘরের ভেতরে কী হল। রিনতিও বিশ্বাস করতো না হয়।
চলবে
(লেখায় কোন অসঙ্গতি চোখে পড়বে বা কোনো পরামর্শ থাকলে কমেন্ট কিংবা ম্যাসেজে জানানোর অনুরোধ রইলো।)
ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।
অপু তানভীরের দুটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।
Discover more from অপু তানভীর
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

গল্পটা পড়তে শুরু করে থামতে পারলাম না। অডিও ফাইল, বদ্ধ ঘরের খুন, আর সিসিটিভিতে খুনিকে না দেখার ব্যাপারটা মিলিয়ে একটা অন্য রকম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। শেষ দৃশ্যে রিনতির সামনে প্রাণীটার চেহারা ফুটে ওঠার পর রোমাঞ্চ আরো ঘিরে ধরলো, তবে রাফায়েলের সেই “ডোন্ট” বলার মুহূর্তটা দারুণ লেগেছে। এতদিনের অপেক্ষার পর রাফায়েলের দেখা পেয়ে দারুন লাগছে। পরের পর্বের অপেক্ষায় রইলাম।
রাফায়েল লিখতে আসলে অনেক সময় লাগে। আমার অন্য সব গল্প সাধারনত আমি এক বসাতেই লিখে ফেলি। মনে যা আসে তাই লেখা যায় কিন্তু রাফায়েল কোনো ভাবেই এক বসাতে লেখা যায় না। বেশ লম্বা সময় লাগে। এতো ধৈর্য্য থাকে না। এই কারণে রাফায়েল লেখা হয় না । এই গল্প এখন অর্ধেকটা পোস্ট করে রাখলাম যাতে লেখার একটা স্পিহা থাকে নয়তো এই বাকি শেষ করতে কত দিন লাগত কে জানে!