একমাত্র পাঠক

4.5
(21)

মোবাইল স্ক্রিনে নোরার নম্বরটা দেখে একটু অবাক হলাম। নোরার নম্বর যদিও আমার মোবাইলে সেভ নেই তবুও ওর নম্বরটা আমি চিনি। এই নম্বর দিয়ে আমাকে এর আগে দুইবার ফোন দিয়েছে। নম্বরটা কোনো কারণে আমার মনে গেধে গেছে। আমি ভেবেছিলাম নোরার সাথে কিংবা ওর বাবার সাথে আমার আর কখন কথা বা দেখা হবে না। ওদের সাথে আমার সব লেনদেন শেষ হয়ে গেছে। আমি আমার মোবাইল থেকে মিস্টার জামিল রায়হানের ফোন নম্বরটা পর্যন্ত ডিলিট করে দিয়েছি।
একবার মনে হল যে ফোনটা আমি না ধরি। কিন্তু সেটা পারলাম না।
-হ্যালো।
-ফয়সাল সাহেব, আপনি কোথায়?
আমি কিছু সময় কী উত্তর দিব সেটা ভাবতে লাগলাম। বললাম, কেন?
-আরে আব্বু আপনাকে বাসায় আসতে বলেছে। আপনি নাকি তার ফোন ধরছেন না?
-তার ফোন ধরার কারণ নেই তো। আমাদের ভেতরের লেনদেন সব শেষ হয়ে গেছে। আমি তো আগেই বলেছি, এই কাজের পর তার সাথে আমার আর কোন কাজ হবে না।
-আরে আপনি এমন কাট্টখোট্টা কেন বলুন তো! আব্বু খুবই খুশি। বইটা খুব হিট করেছে।

হিট শব্দটা কেন জানি আমার পছন্দ হল না। হিট শব্দটা মুভি সিনেমার বেলাতে ভাল মানায় কিন্তু একটা বইয়ের বেলাতে বলা উচিৎ বইটা পাঠিকপ্রিয়তা পেয়েছে। আমি বললাম, হ্যা শুনেছি।
-আপনি খুশি হন নি?
-কেন খুশি হব না?
-এই যে নিজের লেখা বই অন্যের নামে চলছে! এটা তো যে কোন লেখকের জন্য একটা মন খারাপের ব্যাপার, তাই না?

আমি কিছু সময়ের জন্য চুপ করে গেলাম। আসলেই এই লাইনটার বিপরীতে আমার কী বলা উচিৎ আমি জানি না। আমার কি আসলেই মন খারাপ করা উচিৎ?
একবার ভাবলাম জামিল রায়হানের নামের জায়গায় আজকে আমার নিজের নাম থাকতে পারত। আজকে জামিল রায়হানকে সবাই যেমন বাহবা দিচ্ছে, আমি সেই বাহবা পেতে পারতাম!
কিন্তু পরক্ষণেই বাস্তবে ফিরে এলাম। আমি যদি উপন্যারটা নিজের নামে ছাপাতাম তাহলে বইটা এতো মানুষের কাছে পৌছাত কিনা সন্দেহ! আমি আসলে নিজের নামে ছাপাতে চাইলে আদৌও কোনদিন সেটার জন্য কোনো প্রকাশক পেতাম কিনা সন্দেহ আছে! জামিল রায়হানের টাকা পয়সা আছে। তার কানেকশন ভাল। এই কারণেই কাজটা সে করতে পেরেছে। এই জন্য বইটা অনেকের কাছে পৌছিয়েছে! সে বেশ ভালো প্রচার করেছে!
আমি বললাম, আমার মন খারাপের কোন কারণ নেই। আপনার বাবা আমাকে বেশ ভাল পরিমান টাকা দিয়েছে। আর আমি এর আগেও গোস্ট রাইটারের কাজ করেছি।
হ্যা সত্যি কথা যে জামিল রায়হানের আমাকে বেশ ভাল পরিমান টাকা দিয়েছে। দুই লক্ষ টাকা অনেক বড় পরিমান টাকা। আমি এর আগে লিখে এতো টাকা কোনদিন পাই নি। পাওয়ার সম্ভবনাও ছিল না। যদিও আমি এর আগে নিজের লেখা গল্প অন্যকে দেই নি কোন দিন তবে অনুবাদ করেছি অনেক গল্প এবং সেগুলো আমি প্রকাশনার কাছে বিক্রি করে দিয়েছি।

তবে এইবারই প্রথম যে আমি নিজের লেখা মৌলিক একটা উপন্যাস অন্য কাউকে দিয়ে দিলাম। লেখাটা বছর খানেক আগে লিখেছিলাম। তবে কখনই প্রকাশনার জন্য কাউকে পড়তে দেই নি। এমন কি পরিচিত কাউকেও পড়তে দেই নি কোনদিন। এটাই শর্ত ছিল জামিল রায়হানের। এমন একটা লেখা তাকে লিখে দিতে হবে যা আগে কেউ কোন দিন পড়ে নি।

জামিল রায়হানের সাথে আমার পরিচয়টা হঠাৎ করেই। আমার বছর দুয়েক আগে একটা গল্প সংকলনে একটা গল্প বের হয়েছিল। নবীন লেখকদের নিয়ে একটা বই বেরিয়েছিল সেবার। আমি সেখানে একটা গল্প পাঠিয়েছিলাম। সেটা ভাগ্যক্রমে ছাপাও হয়েছিল। কোন টাকা পয়সা দেওয়া হয় নি আমাদের। আমরা নতুন লেখকদের অবশ্য সেই দাবীও ছিল না। গল্প ছাপা হচ্ছে সেটা নিয়েই আমি সন্তুষ্ট ছিলাম। বলা চলে সেটাই প্রথম এবং একমাত্র ছাপা অক্ষরে সেটাই ছিল নিজের লেখা।
তারপরে অবশ্য কিছু অনুবাদ নিয়ে কাজ করেছিলাম তবে সেগুলো কেবল টাকার জন্য।
জামিল রায়হান আমার নিজ উদ্যোগে যোগাযোগ করলেন। সেই বইতেই লেখকের নামের শেষে একটা ইমেল এড্রেস দেওয়া ছিল। প্রথম ইমেলে নিজের পরিচয় জানিয়ে তিনি জানালেন যে আমার লেখা গল্পটা পড়ে তার দারুণ ভালো লেগেছে। সত্যি বলতে কি এই ইমেল পেয়ে আমি খুব একটা উৎচ্ছাস দেখাই নি। ৫০ বছরের কোন পুরুষ লোক আমার গল্প পড়েছে এটার থেকে ১৫ বছরের কোনো মেয়ে আমার গল্প পড়ে অভিভুত হয়েছে, এটাই বুঝি বেশি আনন্দ দেয়। আমি যুবক মানুষ এই দোষ আমার থাকাটা স্বাভাবিক। তাকে ধন্যবাদ জ্ঞান একটা ফিরতি ইমেল পাঠিয়ে দিলাম। ভেবেছিলাম তার সাথে আমার সেখানেই শেষ । তবে পরের দিনই আবারও তার ইমেল এসে হাজির এবং সেখানে সে আমার সাথে দেখা করতে ইচ্ছুক এমন একটা মনভাব ব্যক্ত করলেন।
আমি একটু সন্দেহের চোখে দেখলাম। কোনো জবাব দিলাম না। পরের দিন আবারও একই মেইল এসে হাজির হল। তিনি ধরে ফেললেন যে আমি সম্ভবত তাকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছি না। না পারাটা স্বাভাবিক। তাই আমার বিশ্বাস স্থাপনের জন্য তিনি আমাকে তার অফিসেই আমন্ত্রণ জানালেন। তার অফিসটা মতিঝিলের একটা বিরাট বিল্ডিংয়ে। আমি সেটা চিনি কারণ একবার এই বিল্ডিংয়ে আমি চাকরির ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম। তিনি জানালেন যে রিসিপশনে আমার নাম বলা থাকবে। কালকে যে কোন সময়ে আসলেই চলবে তবে লাঞ্চ আওয়ারে এলে তার সাথে দুপুরের খাবার খাওয়া যাবে এতে তিনি খুশি হবেন।
আমার মন থেকে কেন জানি সন্দেহ দূর হল না। সামান্য একটা গল্প পড়েই একজন আমাকে দুপুরের লাঞ্চ করতে ডাকছে এই ব্যাপারটা সত্যিই আমার হজম হচ্ছিল না। তবে কেন জানি আমি সেখানে হাজির হলাম। তবে দুপুরে নয়, সকালের দিকে। রিসিপশনে আমার নাম বলতেই দেখলাম মেয়েটির চেহারার ভাব বদলে গেল। সে খানিকটা ব্যতিব্যস্ত হয়েই কাকে যেন ফোন করল এবং কিছু সময় পরেই একজন এসে হাজির আমাকে নিয়ে যেতে।

আমাকে বসানো হল ওয়েটিংরুমে। এবং এটা সাধারণ ওয়েটিং রুম নয় সেটা দেখেই বুঝতে পারলাম। প্রতিটা বড় বড় অফিসেই এই রকম দুই রকমের ওয়েটিং রুম থাকে। একটা সাধারণ ভিজিটরদের জন্য এবং অন্যটা ভিআইপিদের জন্য। কিছু সময়ের ভেতরেই কফি এসে হাজির হল এবং মিনিট পাঁচের ভেতরে এসে হাজির হলেন জামিল রায়হান। সুটেডব্যুটে নিপাট ভদ্রলোক। এসেই প্রথমে সরি বললেন। তিনি ভেবেছিলেন আমি সভবত দুপুরের দিকেই আসব। হাতের কাজ শেষ করতে করতে একটু দেরি হয়ে গেল।
আমি একটু অবাকই হচ্ছিলাম। সত্যি বলতে কি এতো ভালো আচরণ আমি তার কাছ থেকে আশা করি নি। আমার মনে আবারও সেই প্রশ্ন উদয় হল। এই লোক আমার কাছ থেকে কী চায়? কেবল মাত্র আমার একটা গল্প পরে নিশ্চিত ভাবেই তিনি আমাকে এখানে ডাকেন নি।

তিনি মূল কথা শুরুর আগে আরও অনেক কথাই জানতে চাইলেন। আমি কোথায় থাকি আর কী করি। আমি আর কী কী লেখালেখি করি এইসব। সামনে বই বের করার প্লান আছে কিনা। এরপরই তিনি আমাকে প্রস্তাবটা দিলেন। ছোটবেলা থেকেই তার মনে ভেতরে লেখক হওয়ার একটা সুপ্ত বাসনা রয়েছে। তিনি ছাপার অক্ষরে নিজের নামটা দেখতে চান। কিন্তু তার লেখার হাত একদমই ভাল না। তিনি কিছু প্রবন্ধ অবশ্য লিখেছেন এবং সেগুলো পত্রিকাতে ছাপাও হয়েছে। তবে সেগুলোর সাহিত্যিক ভ্যালু একেবারে শুণ্য। এখন তিনি একজন গোস্ট রাইটার খুজছেন। আমার লেখা পড়ে তার মনে হয়েছে এই কাজটা আমি করতে পারব। আমার লেখার হাত ভাল। আমি রাজি আছি কিনা! এবং এই কাজের জন্য তিনি বেশ বড় পরিমানের অর্থ দিতে প্রস্তুত।

আমার তখন মনে হয়েছিল যে তখনই অফিস থেকে বের হয়ে যাই কিন্তু তারপরেই মনে হল এই কাজ তো আমি করেছি আগেই। অনুবাদই হোক করেছি তো। টাকার বিনিময়ে কাজটা করলে সমস্যা কী! আমি খুব ভাল করেই জানি যে এই দেশে কারো প্রধান পেশা লেখক হতে পারে না। আর আমাদের মত ছাপোষা মানুষদের জন্য তো আরো নয়! আমি যখন টাকার পরিমানটা জানতে চাইলাম তখন তিনি বললেন মোটামুটি ৫০ হাজার শব্দের একটা উপন্যাস কিংবা গল্প সংকলনের জন্য তিনি দুই লাখ টাকা দিতে রাজি। তবে লেখা তার পছন্দ হতে হবে! তবে উপন্যাস হলে ভাল হয়।
আমি কেন জানি রাজি হয়ে গেলাম। তাকে জানালাম যে আমি লিখে আপনাকে জানাব। যদিও বললাম যে জানাব কিন্তু আসল কথা হচ্ছে আমার নিজের কাছে এমন একটা উপন্যাস লেখা আছে। মোটামুটি ৬০ হাজার শব্দের। এই লেখা যদি দুই লাখ টাকায় বিক্রি করা যায় ক্ষতি কী! আমি খুব ভাল করেই জানি যে এই উপন্যাস নিয়ে যদ আমি কোন প্রকাশকের কাছে যাই, তারা সেটা ছুয়েও দেখবে না। এই রকম হাজার হাজার লেখা প্রতিদিন প্রকাশকদের কাছে জমা হয়! আর যদিও প্রকাশ পায় সেই সাথে কত শর্ত যে যোগ হয়! প্রথম একশ কপি আমার কিনে নিতে হবে, রয়্যালিটির টাকার কথা তো ভুলেই যেতে হবে! সেই তুলনায় দুই লাখ অনেক টাকা।
জামিল রায়হান তখনই আমাকে কিছু টাকা অগ্রিম দিতে চাইলেন। নিতে ইচ্ছে করছিল বটে তবে মানা করে দিলাম। বললাম যে এখনই টাকা দিতে হবে না। আমি আগে লিখি আপনি পড়েন তখন পছন্দ হলে টাকার কথা আলোচনা করা যাবে। আর এমন যে আমি লিখে দিলাম আর আপনার পছন্দ হল না আবার এদিকে আমি যদি টাকা খরচ করে ফেলি তখন বিপদে পড়ব।

আমি এই বলে অফিস থেকে বের হয়ে এলাম। রাস্তা দিয়ে হাটার সময়ে আমার মনটা একটু খারাপই হল। নিজের লেখা মানে নিজের সন্তানের মত। নিজের সন্তানকে এভাবে বিক্রি করে দেব? তবে টাকার পরিমানটাও তো বেশ ভালই। মনটা একটু উদাসই হল বটে। সারাদিন এদিক সেদিক হেটে বেড়ালাম কেবল! রাতের বেলা আবার সেই লেখাটা নিয়ে বসলাম। একটু এদিক ওদিক পরিবর্তন করলাম।
ভেবেছিলাম এক মাস পরে লেখাটা তাকে দিয়ে আসব। তবে পনের দিনের মাথায় লেখাটা নিয়ে আমি তার অফিসে হাজির হলাম। পেন ড্রাইভটা জামিল রায়হানের হাতে তুলে দিলাম। তিনি তখনই এক হাজার টাকার দশটা নোট আমার হাতে তুলে দিলেন। বললেন, এটা আপাতত আমার লেখার কষ্টের পারিশ্রমিক। যদি লেখা পছদন নাও হয় তবে সে উপন্যাস ফেরত দিবে তবে আমার এই টাকা ফেরত দিতে হবে না। আমি টাকা নিয়ে হাসিমুখে হয়ে এলাম অফিস থেকে। যদিও মনের ভেতরে সেই উদাস ভাবটা ছিলই।
আমার ডাক এল ঠিক একদিন পরেই। সেদিন শুক্রবার ছিল। তাই আমি জামিল রায়হানের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। তার দিকে তাকিয়ে মনে হল তার চেহারাটা আনন্দ ঝলমল করছে। তিনি আমাকে আদর করে বসলাম। নাস্তাপানি এসে হাজির হল। এবং দেখতে পেলাম তার স্ত্রী এসে হাজিত হলেন। তিনিও বেশ সম্ভ্রান্ত মহিলা মনে হল। বয়স অন্তত ৪০/৪৫ হবে তবে বেশ ভালই নিজেকে ধরে রেখেছেন। বয়স আরো কম মনে হয় দেখলে।
জামিল রায়হান জানালেন যে তার এই উপন্যাস খুবই পছন্দ হয়েছে। তিনি অনেক উপন্যাস পড়েছেন কিন্তু এমন ভাবে কোন লেখা তাকে আবেকে আব্লুত করতে পারে নি। তিনি এটাই চান।
এরপর আরো আলোচনা হল। তিনি ভাল করেই জিজ্ঞেস করে নিলেন যে এই উপন্যাস যে আমি লিখেছি এটা কাউকে বলা যাবে না। ভুলে যেতে হবে। এই মর্মে একটা ডিড সাইন করতে হবে। আমার সেটাতে কোন আপত্তি ছিল না।

তারপরও আরো কয়েকবারই আমি জামিল রায়হানের বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। তাকে লেখার ব্যাপারে ব্রিফ করলাম। বিশেষ করে কয়েক জায়গায় এমন কিছু টার্ম ব্যবহার করেছি সেগুলোর কিভাবে আনলাম কেন, কোথায় পেলাম সেসব ব্যাপারে তাকে আস্তে ধীরে জানাতে লাগলাম যাতে করে পরে যখন বইটা প্রকাশ হবে তখন কোন প্রশ্নে যেন তাকে বিব্রত না হতে হয়!

নোরার সাথে আমার দেখা হল আরও কয়েকদিন পরে। জামিল রায়হান আমাকে ফোন দিয়ে যেদিন জানালেন যে বই প্রকাশের সব প্রস্তুতি শেষ হয়েছে, সেদিনই নোরার ফোন এল আমার ফোনে। সময়টা ছবি বিকেল বেলা। আমি তখন অফিসের কাজ শেষ করে বের হয়েছি। এমন সময়ে ফোনটা এল। নম্বরটা অপরিচিত। আমি ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শুনতে পেলাম, আপনি কোথায় বলুন তো?
আমি নম্বরটা আবারও দেখলাম। অপরিচিত। মেয়ের কন্ঠ। একটু অবাকই হলাম। মেয়েটা এমন ভাবে কথা বলল যেন আমার পরিচিত সে। আমি বললাম, কে?
কিছু সময় নিরবতা। তারপর মেয়েটা বলল, ও সরি। আমার পরিচয়ই তো দেওয়া হয় নি। আমি জামিল রায়হানের মেয়ে। নোরা রায়হান!
আমি জানতাম জামিল রায়হানের এক মেয়ে আছে। ড্রয়িংরুমে বাবা মা আর মেয়ের ছবিও আমি দেখেছি তবে আমি যে কয়দিন তাদের বাসায় গেছি আমার সাথে তার দেখা হয় নি। একবার আমি টের পেয়েছিলাম যে মেয়েটা বাসাতেই আছে তবে সে আমার সামনে আসে নি। আর আজকে আমাকে সেই মেয়েটা ফোন দিয়েছে? আমার নম্বর সে কোথায় পেল? আর আমাকে কেনই বা সে ফোন দিবে? আমার সাথে তার কাজটা কী?
আমি বললাম, ও আচ্ছা! আমি এই তো সবে মাত্র কাজ সেরে বের হলাম।
-এখন কোথায়?
-আমি? এইতো শান্তিনগর!
ওপাশ থেকে কিছু সময় নিরবতা। তারপর বলল, আচ্ছা ঐদিনে স্কাইভিউ বিল্ডিংটা আছে না? আপনি ওখান থেকে কতদুরে?
আমি বললাম, আমি ঐ বিল্ডিংইয়েই আছি। আমার কাজ এখানেই।
-ও আচ্ছা ! গ্রেট! আপনি ওখানে একটু অপেক্ষা করুন প্লিজ। আমার আসতে খুব বেশি সময় লাগবে না।
আমি তখনও ঠিক কিছু বুঝতে পারছিলাম না। এই মেয়ে আমার সাথে কেন দেখা করতে চাচ্ছে!
নোরা এল একটু পরেই। আমাকে নিয়ে বিল্ডিংয়ের একেবারে উপরের রুফটপ রেস্টুরেন্টে। আমি এই বিল্ডিং কাজ করলেও এই রেস্টুরেন্টে এর আগে আমার আসা হয় নি।
নোরাই খাবার অর্ডার দিল। সে সাথে আমার কাছে সরি বলতে লাগল এই ভাবে আমার সাথে দেখা করতে চাওয়ার কারণে। আমি ভদ্রতা করে জানালাম যে এতে কোনো সমস্যা নেই। আমি তখনও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না যে এই মেয়ে আসলে আমার কাছে কী চায়?
কিছু সময় পরে নিজ থেকেই প্রশ্নটা করল। বলল, আমার আব্বুকে খুব ভাল মানুষ মনে হচ্ছে কী আপনার?
আমি একটু অবাক হয়ে জানতে চাইলাম, এই প্রশ্ন হঠাৎ?
-না মানে এই যে উনি টাকা দিয়ে আপনার লেখা নিজের নামে ছাপাচ্ছেন?
-টাকা দিয়ে! এই শব্দের পরে আর কোন কথা থাকে? যদি উনি আমাকে ঠকিয়ে বা না জানিয়ে আমার লেখা মেরে দিতেন তবে খারাপ মানুষ বলতাম কিন্তু সেটা তো করেন নি। আমার সাথে আলোচনা করে আমার সম্মতি নিয়েই করেছেন। এবং সত্যি বলতে কি আপনার আব্বু আমাকে যতটাকা দিয়েছে আমি যদি নিজের নামেও বইটা ছাপাতাম এতো টাকা পেতাম না। পাওয়ার সম্ভবনাও ছিল না। বই আদৌও ছাপাতে পারতাম কিনা কেন জানে!
নোরা কিছু সময় চুপ করে তারপর বলল, আসলে এটা আব্বুর একটা অপূর্ণ ইচ্ছে বলতে পারেন। আব্বু প্রচুর বই পড়েন, সেই সাথে তার ভেতরে একটা লেখক হওয়ার বাসনা সেই ছোট বেলা থেকে কাজ করে। ক্লাস এইচে থাকতে একবার তার একটা ছোট গল্প স্কুল ম্যাগাজিনে ছেপেছিল। সেই থেকে এই লেখক হওয়ার ইচ্ছে তার মাথার ভেতরে ঢুকেছে আর বের হয় নি। তবে সত্যি বলতে কি লেখক হওয়ার যে গুণ তার ভেতরে নেই। একদমই নেই।
তারপর দেখলাম নোরা কিছু সময় আরো চুপ করে রইলো। তারপর আবারও বলা শুধু করল, আসলে নিজের বাবা তো তাই তার অন্যায় কাজটাকে আমি প্রশ্রয় দিতে চাই। এই জন্য আমি আপনার কাছে ক্ষমা প্রার্থী।
এরপর সে সত্যি সত্যি হাত জোড় করল আমার সামনে। আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, আরে আরে করেন কী! এসবের কোন দরকার নেই। সত্যিই নেই। উনি কোনো ভাবেই আমার কাছে অপরাধী নন! প্লিজ আপনি এমন করে বলবেন না।
সেদিন আরও কিছু সময় কথা হল। নোরা আমাকে বাসায় পৌছে পর্যন্ত দিতে চাইল। আমি সবিনয়ে মানা করে নিজের পথে হাটা দিলাম।
তারপর আরও কয়েকবার নোরা আমাকে ফোন করেছিল। বই হাতে পেয়ে তার বাবা কী পরিমান খুশি হয়েছে এসব!

বইমেলাতে বইটা খুব ভাল ভাবে চলল। এতোটা ভাল হবে সেটা আমি নিজেও আশা করি নি। সম্ভবত জামিল রায়হান নিজেও আশা করেন নি। তার কয়েকটা ইন্টারভিউ আমার চোখে পড়ল। বাংলা সাহিত্যি এক উজ্জল নক্ষের আবির্ভাব হয়েছে এই টাইপের কথা বার্তা শোনা গেল।

আমি আরও দুইদিন পরে হাজির হলাম জামিল রায়হানের বাসায়। আমি মোটামুটি ধারণা করতে পারি যে জামিল রায়হান কেন আমাকে আবারও দেখা করতে বলেছেন। তিনি আমাকে আরও একটা উপন্যাস লিখে দিতে যে বলবেন সেই ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। তবে সিন্ধান্ত তাকে আগেই জানিয়ে দিয়েছিলাম তার জন্য আমি কেবল একটা বইই লিখে দিব।
আমি যখন বাসায় হাজির হলাম তখন জানতে পারলাম যে জামিল রায়হান বাসায় নেই। নোরা আমাকে নিয়ে ছাদে চলে গেল। একটু পরে সেই জানাল যে তার বাবা নয় সেই আমার সাথে দেখা করতে চেয়েছে। আমি একটু অবাক হলাম। নোরা বলল, আমি ভেবেছিলাম আপনার উপন্যাসটা আমি পড়ব না।
-তারপর?
-কিন্তু তারপর কী মনে করে পড়া শুরু করলাম। আমার বন্ধু-বান্ধবরা সবাই বইটা পড়েছে। ওদের ভেতরে কয়েকজন সিরিয়াস পাঠক আছে আর আমি নিজেও টুকটাক বই পড়ি। আব্বুর কাছ থেকে পাওয়া অভ্যাস। ওরা সবাই এতো প্রশংসা করল বইটার। এবং সেগুলো মেকি আসল একদম!
-শেষ পর্যন্ত পড়লেন?
-হ্যা।
-তারপর?
-আপনি মেহজাবিনের সাথে এমনটা কেন করলেন? কী এমন ক্ষতি হত ওকে যদি নাদিমের কাছে পাঠানে? কেমন করলেন?
মেহজাবিন হচ্ছে উপন্যাসের নায়িকার চরিত্র। শেষে মেয়েটা তার ভালোবাসার মানুষকে পায় না।
আমি হেসে বললাম, যদি নাদিমের কাছে পাঠিয়ে দিলাম তবে কাহিনীটা এমন ভাবে কি মানুষের মনে দাগ কাটতো? আসলে মানুষ্য জীবনের প্রায় সবটাই কেবল ট্রাজেডিই আর ট্রাজেডি। এই কারণে যখন আমরা যখন এমন ট্রাজেডির গল্প পড়ি তখন আমরা সেই ঘটনার সাথে কোন না কোন ভাবে মিলিয়ে দেখার চেষ্টা করে। তারপর মিল খুজে বের করে। সব কষ্টের মিলই আসলে একই রকম। না পাওয়ার কষ্ট।
-আমি এই বই পড়ে গত কয়েকদিন রাতে শান্তিমত ঘুমাতে পারি নি। আপনি এই কাহিনীতে মেহজাবিন আর নাদিমকে এক করবেন!
আমি একটু অবাক হয়ে তাকিয়ে তাকালাম। নোরার চোখেমুখে এক অদ্ভুত নেশা দেখতে পেলাম আমি। আমি বললাম, আরে কী আশ্চর্য এমন হয় নাকি!
-আমি জানি না কিছুই। আপনি এই গল্পের শেশটা আনন্দময় করবেন কেবল আমার জন্য।
আমি যতই মানা করি নোরা যেন কিছুইতেই বুঝতে চায় না। শেষ পর্যন্ত আমাকে রাজি হতে হল। কথা দিলাম যে কয়েকদিনের মধ্যে আমি সেটা লেখার চেষ্টা করব।

তারপর সত্যিই কয়েকদিনের চেষ্টায় আমি গল্পের একটা সুখকর সমাপ্তি লিখে নোরাকে পাঠিয়ে দিলাম। ঠিক এক সপ্তাহ পরে নোরার আবারও আমাকে দেখা করতে বলল।
আবার যখন দেখা হল তখন দেখতে পেলাম নোরার চোখ মুখ আনন্দে ঝলমল করছে। আমাকে একটা বই এগিয়ে দিলেন। আমি বইটা হাতে নিয়ে একটু চমকে গেলাম। কারণ বইয়ের নাম আমার সেই বইয়ের নামে যেটা আমি নোরার বাবাকে দিয়েছিলাম। কিন্তু অবাক হওয়ার কারণ হচ্ছে বইয়ের লেখকের নামে আমার নাম। আমি খানিকটা বিস্ময় ভাব নিয়ে নোরার দিকে তাকালাম। নোরা হাসি হাসি মুখ করে বলল, খুলে দেখুন ভেতরটা। শেষ পৃষ্ঠায় দেখুন।
আমি শেষটা খুলে আরো অবাক হলাম। শেষ পাতায় মেহজাবিন আর নাদিমের একটা সুখের সমাপ্তি হয়েছে। আমি যেটা পরে নোরাকে লিখে দিয়েছিলাম। নোরা আমার বিস্ময় ভাবটা উপভোগ করে বলল, এই বইটা এই পৃথিবীতে কেবল মাত্র একটাই আছে। এবং সেটা আমার কাছেই। একেবারে আসল লেখকের নাম সহ!
আমি আসলে কী বলব বুঝতেই পারলাম না। তবে মনের ভেতরে অদ্ভুত আনন্দ হচ্ছে। এই আনন্দের উৎস আমি জানি না।

পরিশিষ্ট
নোরার সাথে আমার বিয়ে ঠিক হল আর মাস ছয়েক পরে। নোরা আমার প্রেমে পড়েছিল সেটা আমি বুঝতেই পারছিলাম। আর নোরা এমন একটা মেয়ে তার থেকে দুরে থাকা আমার পক্ষেও সম্ভব হল না। কদিন আমরা বেশ ভাল প্রেম করলাম। ওকে নায়িকা বানিয়ে আমি কেবল গল্প লিখতাম যার পাঠিকা ছিল কেবল সেই। গল্পে নিজেকে পেয়ে সে আনন্দে আটখানা হয়ে যেত। এভাবে কয়েকটা গল্প জমে গেলে সে আগের মতই গল্পগুলো প্রিন্ট করিয়ে বই বানিয়ে ফেলল। এভাবেই চলতে লাগল কিছু দিন।
তারপর যা হবার তাই হল। নোরার বাবা জেনে গেল। তবে তিনি অদ্ভুত ভাবে অমত দিলেন না। আমার মত একজনের সাথে মেয়ের বিয়ে দিতে রাজিও হয়ে গেলেন! ব্যাপারটা আমার কেন জানি ঠিক হজম হচ্ছিল না। কিন্তু তখন আমার কেন জানি মনে হল নোরা সম্ভবত ব্লাকমেইলিং করেছে তাকে তারা। বিয়েতে রাজি না হলে নোরা এই বই প্রকাশের ব্যাপারটা বাইরে বলে দিবে! এমনটা আমি নিশ্চিত ভাবে যদিও বলতে পারব না তবে এর থেকে ভাল ব্যাখ্যা আর কিছু হতে পারে না।
যদিও আমি কথা দিয়েছিলাম জামিল রায়হানের জন্য আমি আর বই লিখব না তবে সেটা সম্ভব হল না। আমি আরেকটা লিখলাম তার জন্য । সেটাও ট্রাজেডির গল্প। গল্পে নায়ককে মেরেই ফেললাম। তবে আরেকটা সুখের ভার্শনও লিখলাম যেখানে শেষ পর্যন্ত নায়ক ফিরে পায় জীবন। নায়িকার সাথে বিয়ে হয়ে সুখে শান্তিতে বসবাস করে। সেটাও ছাপা হল। তবে মাত্র এক কপি। কেবল মাত্র একজনের কাছেই সেই কপিটি রয়েছে। আর এই একজন কাছে আমার বই থাকলেই আমি খুশি!

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা রকমারী বা ফেসবুকে থেকে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.5 / 5. Vote count: 21

No votes so far! Be the first to rate this post.


Discover more from অপু তানভীর

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

One Comment on “একমাত্র পাঠক”

Comments are closed.