এডেল

oputanvir
4.6
(11)

আমার মনের ভেতরে একটা ভয়ংকর চিন্তা আসতে লাগল। যখন দেখতে পেলাম একজন যাত্রী বাদে সব যাত্রী একে একে নেমে গেল তখন আমি আমি সত্যিই সেই যাত্রীর জন্য কিছুটা সংঙ্কিতবোধ করলাম। আমার থেকে মাত্র দুই সিট দুরে মেয়েটা একা বসে আছে। তার চোখ মোবাইলের দিকে। অন্য দিকে তার কোন খেয়াল নেই। অন্য সব যাত্রী যে নেমে গেছে সেই দিকেও তার খেয়াল নেই। সে আপন মনে মোবাইল টিপে যাচ্ছে। আমি কিছুটা অবাক হয়েই দেখলাম যে নতুন কোন যাত্রী আর উঠল না। একজন যাত্রী উঠতে গেল তবে গেটের কাছে হেলপার তাকে উঠতে দিল না। এটা দেখে আমার মনে সন্দেহ আরও একটু বাড়ল। আমি সত্যিই এবার মেয়েটার জন্য একটু চিন্তিত হয়ে উঠলাম।
আমার বাসে কম যাতায়াত করি। বেশির ভাগ সময়েই সাইকেলে করে ক্যাম্পাসে বা পড়াতে যাই। তবে আজকে একটু মতিঝিল যেতে হয়েছিল কাজে। সেখানে সাইকেল নিয়ে যাওয়ার উপায় ছিল না। তাই সাইকেল নেই নি আজ। রাতের বেলা একেবারে পড়িয়ে তারপর বাসায় ফিরছি বাসে করে। একটু রাত হয়ে গিয়েছে ফিরতে ফিরতে। তাই বাসে একতু ভীড় কম। তবে যখন বাসটা বারো নম্বর বাসস্ট্যান্ডে এসে থামল তখন দেখতে পেলাম যে একে একে সব যাত্রীই নেমে গেল কেবল একজন যাত্রী বাদ দিয়ে। একটা মাত্র মেয়ে। মেয়েটার বয়স আমার মতই হবে। কিংবা আমার থেকে কম। সে আপন মনে মোবাইল স্ক্রল করে চলেছে। অন্য দিকে তার কোনো খোজ নেই। আমি খেয়াল করে দেখেছিলাম মেয়েটা ভাড়া দেওয়ার সময় বলেছিল যে ঘাটারচর যাবে। এই বাসের একেবারে শেষ স্টপেজ। আমি নামব তার আগে, ব্রিজের গোড়ায়। এই মেয়ে এই প্যরো রাস্তা একা একা যাবে এটা ভাবতেই মনের ভেতরে একটু ভয় এসে জড় হল। এখন বাসের ভেতরে এই ঘটনা প্রায়ই ঘটছে। কোনো মেয়েকে একা পেয়ে বাসের হেলপার ড্রাইভার মিলে জোর জবরদস্তি করতে। এই মেয়েটার সাথেও যদি এমন কিছু হয় তখন?
আমার স্টপেজ চলে আসছে। আমাকে এখনই কিছু করতে হবে। আমি নিজের সিট থেকে উঠে দাঁড়ালাম। তাকিয়ে দেখি হেলপার আমার দিকে কেমন চোখে তাকাল। তবে আমি সেদিকে পাত্তা দিলাম না। আমি মেয়েটার পাশের টিকে গিয়ে বসলাম। মেয়েটা তখনও মোবাইলেই ব্যস্ত। আমি বসার পরেও আমার দিকে খেয়াল দিল না। আমি তখন বললাম, এই যে শুনছেন?
এবার মেয়েটা আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল। তার চোখে কিছুটা কৌতুহল কিছুতা বিরক্তি। মুখে কিছু না বললেও তার চোখের ভাষা বলছে যে কী চাই আপনার!
আমি বললাম, আমি এই সামনে নেমে যাবো।
-তো!
-আপনি হয়তো খেয়াল করেন নি যে বাসে আর কেউ নেই। এরপর ব্রিজের পর পুরো রাস্তাটা একটু নির্জন। জানেনই তো!
এবার দেখলাম মেয়েটা চারিদিকে তাকাল। তারপর আমার দিকে আবার ফিরে তাকাল। আমি বললাম, আমি আমার সাথে ব্রিজের কাছে নেমে যান। পরে অন্য বাসে, মানে যেই মাসে লোকজন আছে এমন বাসে উঠবেন!
এবার দেখলাম মেয়েটা একটু অবাক হল। তারপর মেয়েটার মুখে একটু হাসি ফুটে উঠল। এই হাসির ধরণ আমি ঠিক ধরতে পারলাম না। আমি বললাম, প্লিজ ব্যাপারটা সিরিয়াস। যদি দুর্ঘটনা ঘটে যায় বলে যায় না।
মেয়েটা বলল, আপনি আমাকে চেনেনও না অথচ আমার জন্য চিন্তা করছেন এতো!
আমি এই কথার কী জবাব দিব সেটা বুঝতে পারলাম না। আমি বললাম, আমি যদি এখন নেমে যাই তবে পরে পুরো রাত আমার মাথায় এই চিন্তা থাকবে যে আপনার সাথে কোনো খারাপ কিছু ঘটেনি, আপনি ঠিক মত বাসায় পৌছাতে পেরেছিলেন তো! এই চিন্তা আমাকে রাতে শান্তি দিবে না।
মেয়েটা এবার হাসল। তারপর বলল, তারমানে নিজের জন্যই করছেন এটা, আমার জন্য নয়।
আমি এই প্রশ্নের উত্তরও দিলাম না। মেয়েটা বলল, চিন্তা নেই। আপনি নিশ্চিন্তে নেমে যায়। আমার কিছু হবে না।
আমি মেয়েটার চোখে মুখে কোন ভয় দেখতে পেলাম না বা অন্য কোন চিন্তাও নেই। একটু মেজাজ গরম হল! মেয়েটা কি সামনের আসন্ন বিপদ দেখতে পাচ্ছে না। আমি বলছি না যে কোনো বিপদ হবেই তবে হওয়ার সম্ভবনা তো আছে! একটু সাবধান হলে সমস্যা কী!
এসব ভাবতে ভাবতেই দেখলাম আমার স্টপেজ চলে এল। কন্ডাক্টর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনের স্টপ চইলা আইছে। নামেন!
আমার কাছে মনে হল কন্ডাক্টর আমাকে যেন হুকুম করছে নেমে যাওয়ার জন্য। আমি তখনই সিদ্ধান্ত নিলাম যে নামব না। আমি এই বাসে করে ঘাটারচরে যাব তারপর আবার ফিরে আসব। যা থাকে কপালে। আমি পকেট থেকে আরও দশটাকার একটা নোট কন্ডাক্টরের দিকে বাড়িয়ে দিলাম। বললাম, আমি ঘাটারচর পর্যন্ত যাবো
আমি কন্ডাক্টরের চোখে মুখে একতা হিংস্র ভাব দেখতে পেলাম। আমার কাছে মনে হল যেন লোকটার চোখে চরম একটা রাগের ছায়া দেখতে পেলাম। যেন কিছুটা একটা হাত ছাড়া হয়ে গেছে সেটাই। আর আমিই হচ্ছি সেই কারণ। আমার দিকে তাকিয়ে রইলো লোকটা। আমার মনে একটা ভয় এল। তবে আমি একই জায়গায় একই ভাবে বসে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম হাতে নোটটা নিয়ে।
দেখলাম কিছু সময় পরে সে এগিয়ে এসে আমার হাত থেকে নোটটা নিল তারপর আবারও হেলপারের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দুজন মিলে কী যেন কথা বলতে লাগল আস্তে আস্তে।
মেয়েটা আমার পাশ থেকে বলল, আপনার আবার এতোদুর যাওয়ার দরকার ছিল না।
-না ঠিক আছে। আসলে আমি নিজে শান্তি পেতাম না। নিজের শান্তির জন্যই যাচ্ছি বলতে পারেন।
মেয়েটা হাসল। তারপর নিজের হাত বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। বলল, আমার এডেল।
আমি একটু অবাক হলাম মেয়েটার নাম শুনে। আমাদের দেশের এই নাম সাধারণত দেখা যায়না। এডেল কোন বিদেশী মেয়েদের নাম হতে পারে। মেয়েটার চেহারাও বিদেশীদের মত না।
মেয়েটা যেন আমার মুখের ভাব বুঝতে পারল। বলল, ভাবছেন দেশী মানুষের বিদেশী নাম কেন! আসলে আমার নাম আদালিয়া। আমার জন্ম এই দেশে না। জন্মের পরপরই আমার মা মারা যায়। সেই সময়ে বাবা কোথায় ছিলেন কেউ বলতে পারে না। তিনি গায়েব ছিলেন। সেখান থেকে আমাকে সরকারি ফস্টারকেয়ারে পাঠানো হয়। সেখানে আমি বছর দুয়েক ছিলাম। তারপর আমার বাবা কোথা যেন আবার উদয় হয়। আমাকে সেখান থেকে নিয়ে আসে।
আমি একটু হাসলাম। আসলে কী বলব সেটা খুজে পেলাম না। দেখলাম মেয়েটা আরও অনেক কথা বলল। তারপর এক সময় দেখলাম মেয়েটা উঠে দাঁড়াল। বলল, এখন নেমে যাওয়ার সময় হয়েছে। আপনি চাইলে এখানে আমার সাথে নেমে যেতে পারেন আবার ঘাটারচর পর্যন্ত যেতে পারেন। তবে এখানেই নেমে যাওয়ার ভাল। কী বলেন!
আমি বললাম, হ্যা চলুন নামা যাক!
আমি মনে মনে একটু ভয় পাচ্ছিলাম যে হয়তো এরা আমাদের নামতে দিবে না। তিন জন রয়েছে ওরা। দুইজন যদি আমাকে চেপে ধরে আমি আসলে ওদের সাথে পেরে উঠব না। তবে শেষ পর্যন্ত দেখলাম ওরা তেমন কিছুই করল না। বাস থামাল কোনো ঝামেলা ছাড়াই। আমি আর এডেল নেমে পড়লাম। বাসটা আমাদের রেখে সামনে এগিয়ে গেল।
আমি বাসটার চলে যাওয়া দেখলাম। এডেল এবার পাশ থেকে বলল, এবার রাতে শান্তিমত ঘুম তো আসবে, তাই না?
আমি একটু হাসলাম। তারপর বললাম, হ্যা এবার আসবে।
-আমি আপনার মত মানুষ কমই দেখেছি। আপনার জায়গায় অন্য কেউ হলে হয়তো এসব নিয়ে চিন্তাই করতো না। এখনও যে এমন মানুষ যে কিনা অন্যের নিরাপত্তা নিয়ে ভাবে, চিন্তিত হয় এটা ভেবে ভাল লাগছে।
আমি কিছু বললাম না। এডেল বলল, এবার তাহলে আপনি নিশ্চিন্তে বাসায় ফেরত যেতে পারেন। আমিও যাই।
-আচ্ছা। সাবধানে যাবেন।
এডেল হাসল। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। দেখলাম রাস্তা থেকে একটা গলির ভেতরে এডেল ঢুকে পড়ল। আমি আরও কিছু সময় দাঁড়িয়ে থেকে তারপর রাস্তা পার হলাম। তারপর আবার ব্রিজের দিকে হাটা দিলাম। কোনো বাস বা অটো না আসলেও সমস্যা নেই। আমি হেটেই চলে যেতে পারব।

দুই
আমি কিছুটা অবাক হয়েই মনিটরের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলাম। ছবিতে আমি দুইজন মানুষকে দেখতে পাচ্ছি। এই দুইজন মানুষকে গতকাল রাতে হত্যা করা হয়েছে তাদের পুরুষাঙ্গ কেটে। এরা বাসের কন্ডাক্টর এবং হেলপার। গতকাল রাতে তাদের কে বা কারা হত্যা করেছে। আমার অবাক হওয়ার কারণ হচ্ছে এই দুজন মানুষ আমার পরিচিত। গতকাল রাতে আমি মেয়েটার যে বাসে ছিলাম এই দুইজনও সেই বাসেই ছিল। সেই বাসের বাস কন্ডাক্টর আর হেলপার। এই দুইমানুষকে আমি গতকাল দেখেছি।
এরা কিভাবে মরল?
কে মারল এদের?
একটা তীব্র অস্বস্তি এসে ভর করল আমার মনে? আচ্ছা ঐ ড্রাইভার কোথায়? সেও তো ছিল বাসের ভেতরে। তাহলে তার খবর কী?
আমি সংবাদটা আবারও পড়লাম। এবং আরো কয়েকটা অনলাইন পত্রিকায় খবরটা খুজে খুজে পড়লাম। প্রতিটা সংবাদে মোটামুটি একই কথা। সংবাদের মূল কথা হচ্ছে গতকাল রাত সাড়ে এগারোটার দিকে মজদুর পরিবরহনের তিন কর্মী ট্রিপ শেষ করে বাস রেখে পাশের চায়ের দোকানে কিছু সময় আড্ডা দেয়। পরে বাসের ড্রাইবার তার বাসার দিকে চলে যায়। হেলপার আর কন্ডাক্টর আরও কিছু সময় বসে থাকার পরে তারাও রওয়ানা দেয় নিজেদের বাসার দিকে। তখন ঘড়িতে সাড়ে এগারোটা কি বারোটা বাজে। এটা চায়ের দোকানদারের ভাষ্য। সেই আর বাসায় পৌছায় নি। পথের মধ্যে কোথাও খুনী তাদের খুন করেছে। লাশ ফেলে রেখেছে রাস্তার পাশেই। লাশ আবিস্কৃত হয়েছে রাত তিনটার দিকে।
আমি আর বাকি সংবাদ পড়লাম না। আমি আসলে কিছু বুঝতে পারছি না। এই দুইজনকে কারা মারল আর কেনই বা মারল?
আমার কেন জানি মনে শান্তি লাগছিল না। কেন যে এমনটা আমার মনে হচ্ছিল সেটা আমি নিজেও জানি না। এই রকম খুন আমাদের দেশে খুব স্বাভাবিক ব্যাপার হয়ে গেছে। কিন্তু তারপরেও আমার কাছে কেন যে এমন লাগছে সেটা আমি জানি না। একদিন পরে কেসের আরেকটা ফলোআপ দেখতে পেলাম অনলাইনে। একটা সিসিটিভি ফুটেজ। একটা দোকানের সিসিটিভিতে দেখা যাচ্ছে ঐ হেলপার আর কন্ডাক্টর একটা মেয়ের পিছু পিছু হাটছে। অন্ধকারে মেয়েটার চেহারা দেখা যাচ্ছে না। কেবল সে হেটে যাচ্ছে এমন দৃশ্য ধরা পড়েছে পেছন থেকে। এই মেয়েটাকে এইভাবে চেনার কোন কথা না। কেউ চিনতে পারবে না তবে আমি মেয়েটাকে চিনে ফেললাম। কারণ মেয়েটাকে আমি দেখেছি। আমার মনে কোনো সন্দেহ নেই সেদিন রাতের বেলা আমি যে মেয়েটাকে বাসে দেখেছিলাম, যে মেয়েটার জন্য আমি এতোদিন বাসে করে গিয়েছিলাম, যে মেয়েটার পাশে বসেছিলাম এই মেয়েটা সেই মেয়েটা। এডেল।
যদিও কেবল এই ভিডিও ফুটেজ দিয়ে কিছুই প্রমাণিত হয় না যে এডেলই এই দুইজনকে খুন করেছে কিন্তু তারপরেও আমার কেন জানি মনে হল যে এই দুজনের মৃত্যুর জন্য ঐ মেয়েটাই দায়ী! আমি বলতে পারব না কেন তবুও মনে হল। ঐদিন মেয়েটার মুখ এক অদ্ভুত হাসি আমি দেখেছিলাম। এখন সেই হাসিটা আমার বড় চোখে বাঁধছে।

তিন
আমি হয়তো এডেল নামের মেয়েটাকে ভুলেই যেতাম। তবে ভুলতে পারলাম না। কারণ ঠিক একই ঘটনা ঘটলো আবারো। নিজের ঘরে বসে ফোনে নিউজফিড স্ক্রল করছিলাম। একটা শিরোনামে এসে আমার আঙুল থেমে গেল।
“রাজধানীর উপকণ্ঠে আরও যুবকের লাশ উদ্ধার।”
আমি পুরো সংবাদটা পড়লাম। নিহতের নাম মিলন। বয়স ত্রিশের আশেপাশে। একটা সিএনজি গ্যারেজে কাজ করে। লাশ পাওয়া গেছে নির্জন একটা মাঠের পাশে, ঠিক আগের দুজনের মতোই। সংবাদের নিচের দিকে এসে আমার চোখ আটকে গেল। মিলনের নামে আগে ধর্ষণের মামলা ছিল। মামলাটা হয়েছিল এক গার্মেন্টস কর্মীকে নিয়ে। মেয়েটা পরে আত্মহত্যা করেছিল। মামলা এগোয়নি। সাক্ষী পাওয়া যায়নি। পরে সে জামিনে বেরিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিল।
আমি চায়ের কাপটা টেবিলে রেখে দিলাম। চা তখন ঠান্ডা হয়ে গেছে।
সেদিন বিকেলেই আরেকটা ফুটেজ ছড়িয়ে পড়ল। একটা ফার্মেসির সিসিটিভি। রাত এগারোটার দিকে মিলন রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। তার থেকে কিছুটা আগে একটা মেয়ে। হাতে মোবাইল, মাথা নিচু, যেন কিছুই খেয়াল করছে না। ঠিক সেদিনের মতো। আমি ফুটেজটা তিনবার দেখলাম। তারপর চতুর্থবার।
মেয়েটা হাঁটছিল খুব ধীরে। এমন ধীরে, যেন সে চাইছে কেউ তার পিছু নিক।
এই জিনিসটা আমাকে সবচেয়ে বেশি অস্থির করল। সে শিকার ছিল না। সে টোপ ছিল।

ঠিক এক সপ্তাহ পরে আরেকটা খুন হল। সব কিছু একই রকম। আমি এবার সত্যিই স্থির থাকতে পারলাম না। আমার মনে আর কোন সন্দেহ রইলো না যে এই সব খুনের পেছনে এই মেয়েটার হাত রয়েছে। কেবল আমার একার নয়, পুলিশেরও একই ধারণা হল। একই রকম খুনের পাশে মেয়েটাকে প্রতিবার দেখা যাচ্ছে।
পুলিশ মেয়েটাকে খুঁজতে শুরু করল। টিভির টকশোতে একজন অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তা বললেন, মেয়েটা হয়তো সাক্ষী, হয়তো সহযোগী। তবে তাকে খুঁজে পাওয়া অত কঠিন হওয়ার কথা না। মেয়েটাকে খুজে পাওয়া গেলেই সব রহস্যের সমাধান হবে। তবে কঠিনই হল মেয়েটাকে খোজ বের করা! দিনের পর দিন পার হতে লাগল, মেয়েটাকে পাওয়া গেল না। তবে খুন থামল না। এবং প্রতি খুনের পরই একটা ব্যাপার পরিষ্কার হতে লাগল যে এই খুনী কেবল মাত্র ধর্ষকদের খুন করছে। কয়েকদিনের মধ্যেই মেয়েটা যেন রীতিমত হিরো হয়ে গেল!

আমি একদিন থানাতে গিয়ে হাজির হলাম। একদিন সত্যিই গেলাম। মেয়েটার ব্যাপারে সেদিন যা ঘটেছিল সেটা এসআইকে জানালাম। ওসি সাহেব আমার দিকে অদ্ভুত চোখে তাকালেন। কিছু সময় ভুরু কুচকে তাকিয়ে থেকে তার কপাল সোজা হল। তারপর বললেন, আপনি নিশ্চিত যে নাম এডেল? আদালিয়া?
-জি।
-বিদেশী!
-সে তো তাই বলেছিল। তবে চেহারা দেখে আমার বিদেশী মনে হয় নি।
এসআই সাহেব চেয়ারে হেলান দিলেন। বললেন, আমার মনে হয় না এই মেয়ে আপনাকে সত্য নাম বলেছে! যাক অন্তত একজনকে পাওয়া গেল যে মেয়েটাকে সরাসরি দেখেছে। আপনি নিশ্চিত তো এই সেই মেয়ে!
-আমি শতভাগ নিশ্চিত!
-আচ্ছা। স্কেচ আর্টিস্টকে বলতে পারবেন?
আমি কিছু সময় চুপ করে থেকে বললাম, নিশ্চিত ভাবে বলতে পারব না। তবে দেখলে অবশ্যই চিনতে পারব।
আমার কথা শুনে এসআই সাহেব বিস্মিত হলেন না। তিনি যেন জানতেনই আমি এই উত্তর দিব। তিনি আমাকে চলে যেতে বললেন। জানালেন যে পরে দরকার হলে ডাকা হবে।
থানা থেকে বেরিয়ে আমি অনেকক্ষণ রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। সেদিন প্রথমবারের মতো আমার মনে হল, মেয়েটা আমাকে যা বলেছিল তার সবই হয়তো বানানো গল্প ছিল।
তবু আমি একটা জিনিস ভুলতে পারছিলাম না। ঘাটারচরে সেদিন রাতে বাসের ভেতর আমি যে ভয়টা পেয়েছিলাম, সেটা সত্যি ছিল। আর মেয়েটা যে আমাকে বলেছিল, “আপনার মতো মানুষ আমি কমই দেখেছি,” সেটাও কি সত্যি ছিল?
আমি জানি না।

চার
আরো কয়েকমাস পার হয়ে গেল। খুন হল আরো দুটো। আরো দুই ধর্ষক মারা গেল একই ভাবে। পুলিশ কোনো কিনারাই করতে পারল না। এর মাঝে আমি একবার গিয়ে স্কেচ আঁকার চেষ্টা করে এলাম থানা থেকে। তবে কিছুই কাজ হল না।
এরপর খুনের খবর ধীরে ধীরে পত্রিকার ভেতরের পাতায় চলে গেল। আমরা মানুষরা এমনই। একটা ঘটনা যত রক্তাক্তই হোক, নতুন কোনো ঘটনা এলে তাকে ভুলে যাই।
আমার জীবন আবার আগের মত হয়ে গেল। একই ভাবে চলতে লাগল।
এরই মাঝে এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটল। সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার। ডিপার্টমেন্টে ঢুকতেই দেখলাম করিডোরে জটলা। সবার মুখ থমথমে। আমার ব্যাচমেট রিমি আমাকে দেখে প্রায় কেঁদে ফেলল।
-শুনেছিস?
-কী হয়েছে?
সে ফিসফিস করে যা বলল তার সারমর্ম হচ্ছে, আমাদের ক্যাম্পাসের একটা মেয়েকে রুলিং পার্টির চারজন ছাত্রনেতা ধর্ষণ করেছে। মেয়েটা অন্য ডিপার্টমেন্টে পড়ে। দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। মেয়েটা এখন হাসপাতালে।
আমি আর কিছু শুনতে চাইনি।
পরের দুদিন ক্যাম্পাস জুড়ে একটা অদ্ভুত নীরবতা ছিল। প্রতিবাদের মিছিল হল, কিন্তু ছোট। ফেসবুকে লেখালেখি হল বটে তবে কোন কাজ হল না। অভিযুক্তদের সবাই চেনে। তাদের ক্ষমতা কতদূর সেটা সবাই জানে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলল তদন্ত কমিটি হয়েছে। আমরা সবাই জানতাম যে এসব কমিটি করে কী করে। ওরা ক্যাম্পাসে আগের মতোই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। আমার পুরো শরীর কাঁপছিল অক্ষম রাগে। একদিন পরেই দেখলাম একজন তো পোস্টও দিয়েছিল ফেসবুকে যে ছাত্রনেতাদের বদনাম করতে এসব ষড়যন্ত্র করা হচ্ছে।

সেদিন সন্ধ্যায় আমি লাইব্রেরি থেকে বেরোলাম। হালকা অন্ধকার নেমেছে। আমি সাইকেলটা ধরে হাঁটছিলাম। আমার মনের ভেতরে কেবল একটা চিন্তাই আসছিল, ঐ মেয়েটার জন্য আমি কী করতে পারি? কিছুই না। আমার কিছুই করার ক্ষমতা নেই।
হঠাৎ মনে হল, পুকুর পাড়ের বেঞ্চে কেউ বসে আছে।
আমি থেমে গেলাম। আমার পুরো শরীর যেন কেঁঁপে উঠল। মেয়েটাকে আমি পেছন থেকেই চিনতে পারলাম।
মেয়েটা এক ভাবে পুকুরের পানির দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ঘুরিয়ে আমার দিকে তাকাল।
এডেল।
আমার মনে হল যে এডেল যেন জানতো আমি আসব। তার মুখে সেই হাসি আমি সাথে সাথে চিনতে পারলাম। এডেল শান্ত গলায় বলল, আরে, আপনি এখানে পড়েন, আমাকে তো বলেননি।
আমি সাইকেলের হ্যান্ডেল শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম। অনেক কষ্টে বললাম, তুমি কে?
-আপনি তো জানেন আমি কে। এডেল।
আমার মুখ দিয়ে আর কোনো কথা বের হল না। আমি একই ভাবে দাঁড়িয়ে রইলাম।
তারপর সে উঠে দাঁড়াল। বলল, চলুন, আপনাকে কিছু দেখাব। আপনি তো ভাবেন অন্যের জন্য। আজ নিজের চোখে দেখুন।
আমি যাব না বলতে চাইলাম। কিন্তু আমার পা আমার কথা শুনল না। সাইকেলটা সেখানেই পড়ে রইলো।
এডেল আমার আগে আগে হাঁটতে লাগল। সেই ধীর পায়ে, ঠিক ফুটেজের মতো।
ক্যাম্পাসের পেছন দিকটায় পুরোনো একটা মাঠ আছে। বাতি নেই, লোকজন যায় না। সেখানে পৌঁছে আমি দূর থেকে কয়েকটা ছায়া দেখতে পেলাম। সিগারেটের আগুন জ্বলছে। হাসির শব্দ আসছে। তাদের গলা চিনতে আমার কষ্ট হল না। এরাই সেই চারজন।
আমার মনে তখন ভয়ংকর একটা সম্ভবনা দেখা দিল। আমার পুরো শরীর যেন অবশ হয়ে এল। আমি কোনো মতে বললাম, তুমি কী করতে চাও?
এডেল হাসল। সেদিনের সেই অদ্ভুত সেই হাসি। সেই হাসিতে যেন বলছে, জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ! তারপর সে এগিয়ে গেল চারজনের দিকে।
আমি পেছন থেকে ডাকতে গেলাম, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বেরোল না। দেখলাম এডেল আস্তে আস্তে হেঁটে যাচ্ছে ওদের দিকে।
কিছু দূর এগিয়ে যেতেই চারজনের একজন এডেলকে দেখতেপেল। সাথে সাথে বলে উঠল, কী রে, আজকে দেখু মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!
তারা উঠে দাঁড়াল। আমি তাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম কেবল!

আমার পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। আমার কেবল মনে হল যে আমি এখন ভয়ংকর কিছু দেখতে পাবো। আমি জানি না কী দেখব তবে দেখব এটাই আমার মনে হল। চারদিকের বাতাস হঠাৎ ভারী হয়ে এল। কোথা থেকে যেন একটা ঠান্ডা স্রোত বইতে শুরু করল, যদিও গাছের একটা পাতাও নড়ছিল না।
ছেলেগুলোর হাসি থেমে গেল। আমি যদিও এডলকে সামনে থেকে দেখতে পাচ্ছি না তবে আমার মনে হল যে ওরা এডেলের চেহারার ভেতরে কিছু পেয়েছে। কারণ ওদের চেহারার ভাব আমি পরিবর্তিত হতে দেখলাম! একজন দুই পা পিছিয়ে গেল। আরেকজন চিৎকার করার চেষ্টা করল, কিন্তু তার মুখ থেকে আওয়াজ বেরোল না।
এডেলের গলা এবার অন্যরকম শোনাল। নিচু, কিন্তু চারদিক থেকে একসাথে আসছে, যেন মাটি, গাছ, বাতাস সবাই একসাথে কথা বলছে। কিছু যেন একটা বলছে। কোন মন্ত্র পড়ার মত! আমি সেদিকে তাকিয়ে রইলাম কেবল!
ছেলেগুলো ছুটে পালাতে চাইল। তবে পারল না। আমার মনে হল তাদের পা যেন মাটির সাথে গেঁথে গেছে। কিছুতেই তারা নড়তে পারছে না।
এডেল এক পা এগিয়ে গেল!
আমি চোখ বন্ধ করতে চাইলাম। পারলাম না।
আমি কিছু শব্দ শুনলাম। ছেলেগুলোর মুখ দিয়ে বের হচ্ছে। আমার মনে ওদের চারজনেরই অবর্ণনীয় কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু সে তূলনায় মুখ দিয়ে কোন আওয়াজ বের হচ্ছে না। এডল একভাবে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। আর কিছুই করছে না সে।
তারপর সব শান্ত হয়ে গেল।
বাতাস থেমে গেল। চাঁদের আলো ফিরে এল। আমি হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়েছিলাম, কখন বসেছি টেরও পাইনি। আমার হাত কাঁপছিল।
একটু পরে অনুভব করলাম যে এডেল আমার সামনে এসে দাঁড়াল। সে আমার পাশে হাঁটু গেড়ে বসল। সে নরম গলায় বলল, আপনি ভয় পেয়েছেন?
আমি কিছু বলতে পারলাম না।
-ভয় পাবেন না। আপনি অন্যায় কিছু করেন নি। আমাকে কেবল তারাই ভয় পায় যারা মেয়েদের সাথে অন্যায় করে।
সে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে অন্ধকারের দিকে এগোল। সে বলল, আপনি যা দেখলেন, কাউকে বলবেন না। বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না।
-তুমি ঐ ছেলেগুলোর সাথে কী করলে?
-কিছুই করি নি। ওরা যা করেছে ঐ মেয়েটার সাথে সেইটা কেবল ওদের অনুভব করিয়েছি। ভয় পাবেন না। যে যেটুকু অন্যায় করবে তার শাস্তি সেই পরিমান পাবে। আজকের পরে ওরা আর কোনো মেয়ের সাথে কিছু করতে পারবে না।
এডেল একটু থামল। তারপর বলল, আপনাকে একটা অনুরোধ করতে পারি?
-হ্যা বল!
-যে মেয়েটা হাসপাতালে আছে, তার কাছে যান। শুধু বলবেন, তার প্রতি অন্যায়কারীদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে।
-আর তুমি? তুমি কি আবার আসবে?
এডেল সেই প্রথম রাতের মত হাসি দিল।
-যতদিন দরকার হবে।
তারপর সে অন্ধকারে মিশে গেল।

আমি অনেকক্ষণ সেখানে বসে রইলাম। একটু পরেই আমি গোঙ্গানোর আওয়াজ শুনতে পেলাম। ছেলেগুলো ভয়ানক বেদনায় কাতরাচ্ছে। একবার মনে হল যে ওদের কাছে যাই কিংবা ডাক্তার ডাকি কিন্তু পরক্ষণের মনে হল কী দরকার! আমি ফেরার পথ ধরলাম। সাইকেলটা নিয়ে বাসার দিকে রওয়ানা দিলাম।

পরদিন ক্যাম্পাসে এসে বাকিটুকু জানতে পারলাম। গতকাল রাতে কে বা কারা নাকি ঐ চারজনের উপর হামলা করেছিল। তাদের চারজনেরই পুরুসাঙ্গ চেপে ছিড়ে দিয়েছে। জীবনে আর কোন দিন সেটা ঠিক হবে না। নপুংশক হয়ে গেছে ওরা আজীবনের জন্য!
অনেকেই এটা নিয়ে কথা বলছিল কাউকে ঠিক দুঃখিত হতে দেখলাম না।
সেদিন বিকেলে আমি হাসপাতালে গেলাম। মেয়েটার বেডের পাশে একজন নার্স ছাড়া কেউ ছিল না। আমি দাঁড়িয়ে ইতস্তত করছিলাম। তারপর আস্তে আস্তে বললাম, তোমার প্রতি অন্যায়কারীদের শাস্তি দেওয়া হয়েছে।

মেয়েটা অনেকক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি নিশ্চিত সেই চারজনের খবর এই মেয়েটার কাছেও পৌছে গেছে। সে জানে সব। তারপর তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল, কিন্তু সে কিছু বলল না। শুধু আস্তে করে মাথা নাড়ল।
হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে আমি অনেকক্ষণ রাস্তায় হাঁটলাম। আমার মনের ভেতরে ঘুরে ফিরে এডেলের কথা আসতে লাগল। আমি নিশ্চিত ঐ চারজনের জ্ঞান ফিরলে তারা এডেলের বর্ণনা পুলিশকে দিবে। তবে আমি এটাও নিশ্চিত জানি যে এডেলকে পুলিশ খুজে পাবে না। তবে এডেল আবারও আসবে। যখনই কেউ অন্যায় করে পার পেয়ে যাবে তখন তাকে শাস্তি দেওয়ার জন্য এডেল আবারও আসবে।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের দুটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা রকমারী বা ফেসবুকে থেকে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.6 / 5. Vote count: 11

No votes so far! Be the first to rate this post.


Discover more from অপু তানভীর

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *