আমার কথা শুনে মৌমিতা আমার দিকে ফিরে তাকাল। ওর চোখে একটা বিস্ময়ের ভাব দেখতে পেলাম। সে আমার কাছ থেকে এই কথা আশা করে নি। তাই আরেকবার আমার মুখ থেকেই কথাটা শুনতে চাইল। বলল, কী বললেন? সত্যি?
আমি এবার মৌমিতার দিক থেকে আমার চোখ সরিয়ে নিলাম। বাইরের রাস্তার দিকে তাকালাম। আমাদের গাড়িটা সবেমাত্র পান্থপথ সিগনাল পার হচ্ছে। আরও অনেকটা পথ আমাদের পার করতে হবে। তাই সময় কাটানোর জন্য এই গল্পটা মৌমিতা বলাই যেতে পারে। আমি বললাম, শতভাগ সত্য। নাইরা, মানে বর্তমানের নাইরা চৌধুরী আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল।
এই কথা সত্যিই যদি আমি বলি অনেকেই বিশ্বাস করবে না যে এই রকম একজন জনপ্রিয় অনলাইন ইনফ্লুয়েন্সার এক সময়ে আমার প্রেমিকা ছিল।
মৌমিতা বলল, যাহ গুল মারছেন?
আমি এবার আমার মোবাইল বের করলাম। নাইরার সাথে আমার কয়েকটা ছবি তখনও আমার গুগল ফটোস এ ছিল। আমি সেই ছবি খুজে খুজে বের করলাম। তারপর সেই একটা ছবি মৌমিতার সামনে তুলে ধরলাম।
মোবাইলের ছবিটার দিকে মৌমিতা বেশ কিছু সময় তাকিয়ে রইল। তার চোখে এখনও বিস্ময় কাজ করছে। আমার দিকে ফোনটা ফেরত দিতে দিতে বলল, এই কারণেই ওদের সামনে গেলেন না?
-হ্যা। আসলে একটু অস্বস্তি লাগছিল। তাই আর গেলাম না।
মৌমিতা কিছু যেন ভাবল। পুরো ব্যাপারটা যেন সে তার মাথার ভেতরে আরেকবার ভেবে নিল। আমি বললাম, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে থেকেই নাইরা আমার প্রেমিকা ছিল। আগে আমরা একই এলাকাতে থাকতাম। সেখানে থেকেই প্রেম। আমার থেকে দুই বছরের জুনিয়র ছিল। আমাদের প্রেমটা মূলত শুরু হয়েছিল ও যখন আমাদের এলাকা থেকে চলে যায় তখন। আগে চোখের সামনে ছিল, সব দেখা হত, কথা তাই তখন কিছু মনে হয়। কিন্তু যখন চলে গেল তখন মনে হতে লাগল যেন কিছ একটা নেই আমার চোখের সামনে। একই ব্যাপার নাইরা নিজেও অনুভব করেছিল। তারপর থেকেই আমাদের প্রেম শুরু হয়। দুই বছর ছুটিয়ে প্রেম করেছি। প্রতিদিন ক্লাস করেই আমি ওর কলেজের সামনে চলে যেতাম। ও কলেজ থেকে বের হয়ে আমার সাথে ঘন্টা দুয়েক ঘুরে বেড়াত তারপর বাসায় যেত। এভাবেই চলেছে।
নাইরা আমার বিশ্ববিদ্যালয়েই ভর্তি হয়েছিল। তখন থেকে প্রেমটা আরও বেশি হয়। তবে থেকে অন্য গল্প শুরু। নাইরা তখন ইনস্টাগ্রামে রিলস বানাতে শুরু করে। কয়েকটা রিলস বেশ ভাইরাল হয়ে যায়। বছর দুয়েকের ভেতরে এক মিলিয়ন ফলোয়ার হয়ে যায় ওর। তখন থেকেই নানান কাজ আসা শুরু করে। নতুন নতুন মানুষের সাথে পরিচয় হয়। ভিডিও বানানোর জন্য নতুন জায়গায় যাওয়া শুরু করে। সেখানে সময় দিতে থাকে ফলে আমার সাথে দেখা সাক্ষাত কমে যায়। আমি পাশ করে বের হয়ে যাওয়ার পর যোগাযোগটা যেন আরও কমে যায়। তারপর…
আমি এই পর্যন্ত বলে চুপ করলাম। মৌমিতা বলল, তারপর?
-তারপর আর কী! অনলাইনে এক পুরুষ মডেলের সাথে আমি ওর প্রেমের গুঞ্জন শুনলাম। যদিও আমি ওকে বিশ্বাস করতাম। এই টুকু ভরসা ছিল যে ও আমার সাথে চিট করবে না। যদিও সেই গুঞ্জন সত্য কিনা পরে আর বের হয় নি। তবে এর কিছুদিন পরে নাইরা আমার সাথে ব্রেকআপ করে। অবশ্য আমি আগে থেকেই বুঝতে পেরেছিলাম যে আমাদের ভেতরে সুর কেটে গেছে। তাই মানসিক প্রস্তুতি ছিল। তবুও জানতে চাইলাম কারণ। সে মিথ্যা বলল না। জানাল যে আমাদের জগতটা এখন একেবারে আলাদা হয়ে গেছে। আমরা সাথে থাকলে বরং আমাদের ভেতরে ঝামেলা হবে। সে চায় না আমাদের সম্পর্কটা তিক্ততা দিয়ে শেষ হোক।
নাইরা সেদিন আসলে সত্যই বলেছিল। আমাদের জগতটা সেই সময়ে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। আমাদের আর কোন ভাবে এক সাথে থাকার উপায় ছিল না। সেই থাকাটা সুখের হত না। সেই হিসাবে এভাবে আলাদা হয়ে যাওয়াই ভাল ছিল।
মৌমিতা আমার দিকে আরও কিছু সময় তাকিয়ে রইলো। তারপর বলল, কিন্তু তাই বলে এই ভাবে সম্পর্ক নষ্ট করে দিবেন? এতোদিনের ভালোবাসার সম্পর্ক?
-নষ্ট আসলে ধীরে ধীরে হয়েছে। এমনটা হওয়া স্বাভাবিক।
মৌমিতার মন খারাপ দেখলাম। মুখ গোমড়া করে সে বসে রইলো। ওর ভাব দেখে মনে হচ্ছিল নাইরার সাথে আমার সম্পর্ক নষ্ট হওয়াতে ওরই মন খারাপ হয়েছে বেশি।
আরও কয়েকবার আমাকে যেতে হল স্যুটিংয়ে। আমি বরাবরই চেষ্টা করছিলাম যেন নাইরার সাথে আমার দেখা না হয় তবে শেষ রক্ষা হল না। নাইরার সাথে আমাকে মুখোমুখি হতেই হল। আমাকে যেন মৌমিতা অনেকটা জোর করেই নাইরার সামনে নিয়ে গেল। এবং নাইরা আমাকে দেখল।
আমার মনে একটা ক্ষীণ ধারণা ছিল যে নাইরা হয়তো আমাকে দেখে না চেনার ভাব করবে। অন্তত সবার সামনে আমাকে না চেনার চেষ্টা করবে তবে আমাকে দেখে ওর মুখের ভাব যেভাবে পরিবর্তন হল সেটা দেখে আমার মনে হল যে আমার কথা নাইরা এখনও ভাবে। এমনটা মনে হওয়ার আসলে কোনো কারণ হয়তো নেই কিন্তু তারপরেও আমার এটাই মনে হল। আমি কিছু বলার আগেই নাইরা বলল, তুমি এখানে চাকরি কর?
আমি হাসলাম। মাথা ঝাকিয়ে বললাম, হ্যা গত তিন বছর ধরে এখানেই আছি!
মৌমিতা আমার পাশেই ছিল। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি উনাকে চেনো নাকি?
আমি মৌমিতার কথার টোন শুনে একটু অবাকই হলাম। মৌমিতা আমাকে তুমি করে বলছে। কিন্তু সে তো আমাকে আপনি করেই বলে। এবং তারপর মৌমিতা যা করল সেটাতে আমি সত্যিই অবাক হয়ে গেলাম। সে খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার দিকে ঘেঁষে এল। ওর আচরণ দেখে বাইরে থেকে যে কেউ মনে করবে যে আমরা প্রেমিক প্রেমিকা। এবং নাইরা নিজেও সেটা খেয়াল করে দেখল। আমি মৌমিতার দিকে চোখের ইশারায় কিছু বলতে গেলাম। ও আসলে কী করছে সেটা জানতে চাইলাম চোখের ইশারাতে তবে মৌমিতা সেটা না বোঝার ভান করল তারপর বলল, সত্যি তোমার সাথে পরিচয় আছে?
আমি বলল, আমরা একই এলাকাতে থাকতাম আগে। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় একই ছিল!
এবার মৌমিতা যেন আরো অবাক হয়েছে এমন ভাব করে আরও আমার দিকে এগিয়ে এল। আমার বাম হাতটা ধরল। আমি সত্যি অবাক হলাম। তবে নাইরার চেহারার দিকে তাকিয়ে আমার মনে হল মৌমিতার এই আচরণ ওর ভাল লাগছে না। অন্তত ওর চেহারার ভাব দেখে আমি তাই বুঝতে পারলাম।
এই পুরো ব্যাপার ওর শুটিংয়ে প্রভাব ফেলল। সেদিন আর ঠিকমত শুটিং হল না। একটু আগে আগেই যেন প্যাকআপ হয়ে গেল। আমি দেখতে পেলাম যে নাইরা কেমন যে হনহন করে নিজের গাড়ির দিকে হেটে গেল।
আমরা যখন আবার গাড়িতে করে অফিসের দিকে যাচ্ছিলাম তখন মৌমিতাকে দেখলাম হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনার ঐ এক্স এতোখানি রিএক্ট করবে ভাবতে পারি নি। দেখলেন আর শুটিংয়ে মনই দিতে পারল না।
আমি নিজেও খানিকটা অবাকই হলাম নাইরার আচরণে। মৌমিতা বলল, আসলে মেয়েরা এই জেলাসিটা কোনদিনই মন থেকে মুছতে পারে না। আমি হলেও পারতাম না। মানে আমার কোন এক্সকে যদি আমি অন্য কোনো মেয়ের সাথে দেখি তবে সেটা আমার মোতেই সহ্য হবে না।
আমি বললাম, আপনি এভাবে কাজটা না করলেও পারতেন।
-আরে আপনার একটা ফেভারই করলাম বলতে পারেন!
আমি না বুঝতে পেরে বললাম, কী করম?
-আরে নাইরা যদি আপনাকে সিঙ্গেল দেখত এবং শুনতো যে আপনি এখনো বিয়ে করেন নি বা সিঙ্গেল আছেন তবে ওর মনে মনে একটা সুখানুভূতি পেত। এটা আমি তাকে পেতে দিলাম না।
আমি মৌমিতার পাগলামি দেখে হাসব না কাঁদব বুঝতে পারছিলাম না। তবে মৌমিতা যে মিথ্যা বলে নি সেটা বুঝতে আমার কষ্ট হল না। সত্যিই যদি নাইরা আমাকে সিঙ্গেল দেখত তবে সে নিশ্চিত ভাবেই সুখানুভূতি পেতই।
কিন্তু ঝামেলা বাধল পরের দিন । অফিসে এসেই টের পেলাম যে কিছু একটা ঝামেলা হয়েছে। কিছু সময় পরে মৌমিতা এসে জানাল যে নাইরা নাকি আর শুটিং করতে রাজি নয়। ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে সে এই প্রজেক্ট থেকে নিজেকে সরিয়ে নিতে চাচ্ছে। একই সাথে এর জন্য যত টাকা ক্ষতি হয়েছে সেটা সে দিয়ে দিবে। মার্কেটিং ম্যানেজার সাহেব এটা নিয়ে বেশ ক্ষেপা। কয়েকবার চেষ্টা করেছে নাইরার সাথে যোগাযোগের কিন্তু সম্ভব হয় নি। আসলে কেউ জানে না। তবে আমি আর মৌমিতা ঠিকই জানি যে নাইরা আসলে কেন এমনটা করছে।
দুপুরের দিকে ঘটল আরেকটা ঘটনা। আমার ডাক পড়ল ম্যানেজারের ঘরে। নাইরা যে আমার পূর্ব পরিচিত ছিল, আমরা একই এলাকাতে থাকতাম এই খবর কিভাবে জানি ম্যানেজারের কানে চলে গেছে। ম্যানেজার সাহেব আমাকে ডেকে বললেন আমি যেন যে কোন ভাবেই নাইরা রাজি করাই। এখনই যেন ওর বাসায় গিয়ে হাজির হই। আমি যতই বোঝাতে চাইলাম কিন্তু কাজ হল না। ম্যানেজার সাহেব জানালেন যে নাইরাকে লাগবেই। অন্য কাউকে দিয়ে এই কাজ করালে হবে না। অর্ধেক কাজ যেখানে হয়ে গেছে, নতুন আবার শুটিং করতে গেলে অনেক দেরি হয়ে যাবে।
বাধ্য হয়ে আমাকে রাজি হতে হল। মৌমিতার দিকে দিকে বলল, সে ম্যানেজার স্যারকে কিছুই বলে নি। সত্যি কথা বলছে সে।
আমি নিজের ডেস্কে বসেবসে ভাবতে লাগলাম যে কিভাবে আমি নাইরাকে রাজি করাব? আমার কথা কি সে শুনবে?
নাইরার এসিস্ট্যান্টের নাম্বার আমার কাছে ছিল। সেই নম্বরেই আমি ফোন দিলাম প্রথমে। প্রথমবার ফোন না ধরলেও দ্বিতীয়বারে সে ফোন ধরল। আমি আমার অফিসের পরিচয় তাকে দিলাম না। আমি কেবল তাকে আমার নাম বললাম তারপর বললাম যেন নাইরা আমাকে ফোন করে।
আমাকে খানিকটা অবাক করে দিয়েই মিনিট খানেকের ভেতরেই আমার ফোনে ফোন এসে হাজির। অবাক হলাম এই ভেবে যে নাইরা সেই আগের নম্বরটাই এখনো ব্যবহার করে। ওর নম্বরটা এখনো আমি সেভ করেই রেখে দিয়েছিলাম। কেন রেখেছিলাম সেটা আমি নিজেও জানি না।
ফোন ধরতেই নাইরা ওপাশ থেকে কোন কথা বলল না। কিছু সময় আমরা দুইজনই চুপ করে রইলাম। তারপর নাইরা বলল, কেন ফোন দিয়েছো?
-তুমি জানো আমি কেন ফোন দিয়েছি?
-দেখো আমার পক্ষে কাজটা করা আর সম্ভব হবে না। আমি তো বলেছি যত আর্থিক ক্ষতি হবে সেটা পরিশোধ করব।
-আর্থিক ক্ষতির ব্যাপার না। তুমি জানো অলরেডি প্রমোশনে তোমার ছবি চলে গেছে। এখন যদি কাজটা না হয় তবে কোম্পানির রেপুটেশনের ব্যাপারটার কী হবে সেটা একবার ভেবে দেখেছো কী!
আমি একটু চুপ করলাম। তারপর বললাম, তুমি যদি সত্যিই না কর কাজটা তবে এটা নিয়ে কোম্পানী একটা তদন্ত হবে। কেন এমনটা হল সেটা খুজে বের করা হবে। আমি যেহেতু এটার দায়িত্বে ছিলাম সব দায়ভার আমার উপরে এসেই হাজির হবে!
আমি এই লাইন টুকু বলে চুপ করে রইলাম। এটা যদিও ঠিক না পুরোপুরি। তারপরেও একটু মিথ্যা বললাম। আমি দেখলাম নাইরাও চুপ করে রয়েছে। সম্ভবত ভাবছে কী করবে! বিশেষ করে আমার চাকরি চলে যেতে পারে এই ভাবনাটা ওকে ভাবাচ্ছে! আমি আগেই বলেছি আমাদের ভেতরে তিক্ততা দিয়ে সম্পর্ক নষ্ট হয় নি। আমি যেমন ওর খারাপ চাই নি, নাইরাও আমার খারাপ চাইবে না আশা করি। অন্তত সিদ্ধান্তের কারণে আমার ক্ষতি হবে এমনটা সে কোনদিনও চাইবে না বলেই আমার বিশ্বাস।
তারপরেই আমি মৌমিতার কথাটা বললাম। আমি বললাম, আমি সত্যিই জানি না যে তোমার হঠাৎ করে কী এমন হল যে তুমি এমন করলে। তবে একটা কথা আমি তোমাকে বলি যে মৌমিতা আমার গার্লফ্রেন্ড না। ওর বয়ফ্রেন্ড আছে।
আবারও ওপাশ থেকে নিরবতা। তারপর নাইরা যে কথা বলল সেটা শুনে আমি কিছুটা অবাকই হয়ে গেলাম। সে বলল, তাহলে ঐ মেয়েটা ওমন আচরণ কেন করলো আমার সামনে!
আমি হেসে ফেললাম। বললাম, তুমি যদি আমার চেহারার দিকে তাকাতে তবে বুঝতে যে আমি নিজেও অবাক হয়েছি ওর আচরণে। আসলে ও তোমাকে জেলাস ফিল করাতে চাইছিল। ওর ভাষ্যমতে মেয়েরা তাদের প্রাক্তনের পাশেও অন্য মেয়েকে সহ্য করতে পারে না। এটাই সে দেখতে চাইছিল!
আমি নাইরার চেহারা দেখতে পাচ্ছি না তবে ওর চেহারার ভাব আমি অনুমান করতে পারছি। আমি নিশ্চিত যে নাইরা এখন সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না। অনেকটা সময় চুপ করে থেকে নাইরা বলল, তুমি এখনো বিয়ে কর নি কেন?
আমি আবারও হেসে ফেললাম। বললাম, বিয়ের প্রশ্ন কোথা থেকে এল এর ভেতরে?
-এই বয়সে তো সবাই বিয়ে করে ফেলে?
-তুমি তো করো নি।
-আমার কথা আলাদা। এই লাইনের মানুষজন এতো সহজে বিয়ে করে না। এটা তো তুমি জানো, জানো না? তুমি কেন বিয়ে কর নি?
আমি কিছু সময় চুপ করে রইলাম। তারপর বললাম, তুমি আসলে কী শুনতে চাচ্ছো? তোমাকে হারিয়ে আমি কষ্টে আছি এবং সেই কষ্টের কারণে বিয়ে করি নি এমন কিছু? দেখো আমি তোমাকে ভালোবাসতাম, এটা মিথ্যা না। আমার সেই ভালোবাসার ভেতরে কোনো খাদ ছিল না। আবার আমি তোমার ফেইম, পপুলারিটির জন্যও তোমাকে ভালোবাসি নি। এটা নিশ্চয়ই তুমি জানো?
নাইরা মৃদু স্বরে বলল, হুম!
-তারপর আমাদের ভেতরে সম্পর্কটা কাজ করে নি। কাজ নাই করতে পারে। আমরা আলাদা হয়ে গেছি। তোমাকে হারিয়ে কষ্টে ছিলাম? অবশ্যই। এটাতে কোনো ডিনায়াল নেই। মাঝে মাঝে সেই দুঃখবোধ আমাকে এখনো কষ্ট দেয়। এটাও সত্য কিন্তু তার মানে কিন্তু এটা না যে আমি তোমাকে ছাড়া বাঁচব না তোমাকে ছাড়া আর কাউকে বিয়ে করব না ব্যাপারটা এমনও না। এখনও আমার কাউকেই মনে ধরে নি এই জন্য বিয়ে করি নি।
আমাদের মাঝে আরো বেশ কিছু সময় কথা হল। তারপর নাইরা জানাল যে কাজটা সে করবে। আমি যেন আমার ম্যানেজারকে সেটা জানিয়ে দেই।
পরের আরো দুইদিন শুটিং হল। এবং কাজ সব শেষ হয়ে গেল কোন ঝামেলা ছাড়াই। আমি আর শুটিং স্পটে যেতে চাইছিলাম না তবে ম্যানেজার সাহেব আমাকে অনেকটা জোর করে সেখানে পাঠালেন। তার বক্তব্য ছিল যে এইসব বড় বড় নায়িকাদের কখন যে কী মনমেজাজের পরিবর্তন হয় সেটার কোন ঠিক নেই, তাই আমি যেন সেটে থেকে সেটা সামাল দেই। বাধ্য হয়ে আমাকে শুটিংয়ের সেটে গিয়ে হাজির থাকতে হয়েছে।
তবে অস্বীকার করব না যে অফিসের কাজ কর্ম বাদ দিয়ে সেট বসে থাকতে খুব একটা খারাপ লাগছিল না। বিশেষ করে নাইরা শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে আমার সাথে এসে গল্প করছিল। ওর সাথে কথা বলতে ভালই লাগছিল আমার। শুটিং শেষ হয়ে গেলে একটু মন খারাপই হল।
আবার অফিসের কাজে ফেরত যেতে হবে এটা যেমন কারণ ছিল সেই একই সাথে এভাবে আর নাইরার সাথে দেখা সাক্ষাত হবে না, এভাবে গল্প করা হবে না। সে হয়তো আবার নিজের কাজে নিজের জগতে ফেরত যাবে। নাইরা যেমনটা বলেছিল যে আমাদের দুইজনের জগতটা আলাদা। আমরা এই প্রোজেটের পরে নিজ নিজ জগতে ফেরত যাবে।
কিন্তু আমাদের নিজেদের জগতে আর ফেরত যাওয়া হল না। ঝামেলা একটা বেধেই গেল!
শুটিংয়ের সেটে আমার আর নাইরার গল্প করাটা অনেকেই চোখে পড়েছিল। তবে তার ভেতরে কয়েকজন সাংবাদিকো ছিল যারা আমাদের এই গল্প করার ছবি তুলে রেখেছিল। এবং তাদের ভেতরেই একজন কিভাবে জানি জেনে গেল যে আমি নাইরার এক সময়কার প্রেমিক ছিলাম। কেবল তাই নয়, আমাদের সেই সময়ে তোলা কিছু ছবিও কিভাবে জানি খুজে পেল।
ব্যস! আর কী লাগে!
রসালো সংবাদ পরিবেশ শুরু হয়ে গেল।
নানান রকম কথা শুরু হয়ে গেল। এবং এই সংবাদগুলর বেশির ভাগটাই নাইরাকে খারাপ হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছিল। আমাকে খারাপ হিসাবে উপস্থান করে আসলে লাভ নেই কারণ আমি সাধারণ মানুষ। নাইরা যেহেতু বিখ্যাত ওকে নিয়ে আজেবাজে ভাবে সংবাদ উপস্থাপন করলে সংবাদের কাটতি বেশি হবে, বেশি ভিউ হবে। এখনকার সাংবাদিকদের কাছ থেকে এর থেকে আর কী বা আশা করা যায়!
আমি কেবল নাইরার কথা ভাবছিলাম। ওর ক্যারিয়ারের উপর এটার কী রকম প্রভাব পড়বে সেটা আমি বুঝতে পারছিলাম না।
আমি কয়েকবার নাইরার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করছিলাম। ওকে বলতে চাচ্ছিলাম যে, যা হচ্ছে সেটার জন্য আমি দুঃখিত। আমি কোন ভাবেই চাই নি ব্যাপারটা এমন ভাবে প্রকাশ পাক। কিন্তু নাইরার সাথে যোগাযোগই করতে পারলাম না। ওর নম্বর কয়েকবার ফোন দিলেও সেটা বন্ধ পেলাম। ওর এসিস্ট্যান্টকে ফোন দিলে সে জানাল যে নাইরার সাথে তার কোনো যোগাযোগ নেই। সংবাদ প্রকাশের পর থেকে নাইরা নাকি অন্য কোথাও চলে গেছে।
সপ্তাহ খানেক পরে আমি নাইরার সাথে যোগাযোগ করতে পারলাম। নাইরার এসিস্ট্যান্ট আমার ফোনে একটা ছোট মেসেজ পাঠিয়ে একটা জায়গাতে যেতে বলল। নাইরা নাকি আমাকে সেখানে যেতে বলেছে। আমি সেই ঠিকানা মোতাবেগ জায়গাতে গিয়ে হাজির হলাম।
জায়গাটা আটিবাজারের কাছে। ঢাকার এতো কাছে হলেও জায়গাটা আমার কাছে গ্রামের মত মনে হল। সেই গ্রামের ভেতরে বেশ চমৎকার একটা বাগান বাড়ি। গেটের কাছে আসতেই দেখলাম দারোয়ান গেট খুলে দিল। ভেতরের আরেকজন লোক এসে আমাকে জানালো যে নাইরা ম্যাডান পুকুর পাড়ে বসে আছে। আমি যেন সেখানেই যাই।
আমি সেই পুকুর পাড়ে গিয়ে হাজির হলাম। গিয়ে দেখি সানবাধানো পুকুরপাড়ের সিড়ির উপরে বসে নাইরা আপন মনে বই পড়ছে। ওর পরনে একটা সাদা টিশার্ট আর সর্টস। আমাকে আসতে দেখেই সে একটু হাসল। তারপর আবারও বইয়ের পাতায় মন দিল।
ওর চেহারা দেখে কিছুটা অবাকই হলাম। আমি ভেবেছিলাল নাইরা হয়তো বেশ গম্ভীর থাকবে তবে এখানে ওকে এভাবে আরাম করে বই পড়তে দেখে আমি কিছুটা কনফিউজড হয়ে গেলাম।
আমি সিড়ি দিয়ে নেমে ওর পাশ গিয়ে বসলাম। তারপর বললাম, কী খবর তোমার?
নাইরা বলল, ভাল। দেখছো না, জায়গাটা কী চমৎকার?
-তুমি দেখি বেশ আরামেই আছো? তোমাকে নিয়ে এতো কথা হচ্ছে সেসব নিয়ে কোন চিন্তাই নেই!
বইটা এক পাশে নামিয়ে রেখে নাইরা বলল, এই জায়গায় আসলে আমি সাধারণত বাইরের জগত থেকে একদম আলাদা থাকি। এই বাসায় কোন স্মার্ট ফোন নেই।
-সত্যিই নেই?
-নাহ। কোন স্মার্ট ফোন নেই, টিভি নেই। একটা ল্যান্ডলাইন ফোন আছে কেবল। যখন আমার কোন ইমার্জেন্সি হয় তখন আমি কামালকে ফোন দিই। সেই সব ব্যবস্থা করে। বাকিটা সময় আমি এখানে একাই থাকি। এই পুকুর পাড়ে বসে বসে বই পড়ি। এখানে একটা লাইব্রেরী আছে।
আমি বলল, তুমি জানো তোমার আর আমাকে নিয়ে কী হচ্ছে?
নাইরা একটু হাসল তারপর বলল, হ্যা জানি যদিও জানি না ঠিক কতখানি রংচং মেখেছে। আমি তার আগেই এখানে চলে এসেছি।
আমি বলল, আমি বুঝতে পারছি না আমাদের সেই তখনকার ছবিগুলো ঐবেটার কাছে গেল কিভাবে! আমি সব ছবিই অনলি মি করেছি নয়তো ডিলিট করে দিয়েছি।
নাইরা আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি দিয়েছি!
আমি একটু ধাক্কার মত খেলাম যেন। মনে হল যেন আমি ঠিকমত শুনতে পাই নি। বললাম, কী বললে?
নাইরা খুব স্বাভাবিক কন্ঠে বলল, আমিই দিয়েছি ছবি গুলো ওকে।
আমি মুখ হা করে বললাম, কেন?
নাইরা বলল, আমার মনে হয়েছে তুমি যে আমার প্রেমিক ছিলে, তুমি যে সত্যিই আমাকে ভালোবাসতে সেটা সবাইকে জানানো দরকার। আমি আমার নিজের স্বার্থের জন্য তোমাকে ছেড়ে চলে গেছি যেখানে আমি কিছুই ছিলাম তখন তুমি আমাকে ভালোবাসতে। আমি অপরাধী। চাইলেই আমি তোমার সাথে জীবন পার করতে পারতাম! এই আফসোসটা আমার সারা জীবন রয়ে যাবে!
আমি অবাক হয়ে নাইরার দিকে তাকিয়ে রইলাম। আমার তখনই মনে হল মেয়েটা আমাকে এখনও ভালোবাসে?
সতিই কি বাসে?
-সফলতা মানে যদি হয় প্রিয় মানুষকে দুরে সরিয়ে দেওয়া তবে সেই সফলতা আমি পেয়েছি কিন্তু অবাক করার ব্যাপার দেখো আমার এখন এই সফলতাই গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আমার বারবার কেবল মনে হয় যদি……
নাইরা কথাটা শেষ করতে পারল না তার আগেই সেই লোকটা এসে বলল, আফামনি খাবার দিছি। আসেন!
ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।
অপু তানভীরের দুটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।
Discover more from অপু তানভীর
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

Interesting read, and it hits a familiar nerve for many beauty pros juggling fame, relationships, and work drama. The way the project world collides with personal life is relatable for barbershops and salons chasing client trust. In Suplery we believe in a single dashboard for suppliers and brands, plus real-time stock and easy wholesale pricing to keep your business smooth even when drama unfolds. If you’re running a studio from skincare to waxing, a shared cart and auto order predictions can save you time and protect margins. Consider how a platform like Suplery could streamline inventory, communications, and on-time product delivery while you focus on clients.