মীরার সাথে আমার কথা বলা শুরু হয়েছিল সম্ভবত এই কারণে যে আমি আর সে একই এলাকাতে থাকতাম। আমি যদি অন্য এলাকাতে থাকতাম তবে সম্ভবত আমাদের মাঝে কোনদিন কথাই হত না। কথা বলার কোন কারণও ছিল না। অফিসে প্রথম যেদিন আমি যোগ দিলাম, সেদিন আমাদের ম্যানেজার সাহেব আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন যে আমি কোথায় থাকি। আমি মোহাম্মাদপুর বলতেই তিনি সাথে সাথে জানালেন যে মীরা নামের একজন আছে অফিসে, সেও মোহাম্মাদপুরেই থাকে। তার পরের সপ্তাহে ম্যানেজার সাহেবই আমাদের পরিচয় করিয়ে দিলেন। এবং সেদিনই আমাদের দেখা হল মেট্রোতে। আমরা একই মেট্রোতে করে ফার্মগেট পর্যন্ত এলাম। এবার সেখান থেকে বাসায় যাওয়ার সময় আমরা দুইজনই একটু অস্বস্তিতে পড়লাম।
মীরার সাথে আমার সেদিনই প্রথম কথা হল, তাই প্রথমদিনই একই রিক্সায় ওঠাটা আমাদের দুইজনের জন্যই অস্বস্তির ব্যাপার। তবে মীরা সম্ভবত লজ্জা আর অস্বস্তির কারণে সেটা আমাকে বলতে পারছিল না। আমিই তাকে সেই সমস্যা থেকে উদ্ধার করলাম। তাকে বললাম যে আমাকে একটু অন্য জায়গায় যেতে হবে। কাল অফিসে দেখা হবে। এই বলে তার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমি আনন্দ সিনেমা হলের দিকে হাটা দিলাম। একবার যখন পেছন ফিরে তাকালাম তখন আমি ওর চোখে স্বস্তি দেখতে পেয়েছিলাম।
এভাবেই আমাদের প্রায় দিনই কথাবার্তা হত। আমি চেষ্টা করতাম মীরার সাথে না যাওয়ার। কারণ সে আমার সাথে রিক্সায় চড়তে অস্বস্তি পাবে এটা আমি চাইতাম না। তবে অফিসে আমার কথা বার্তা হত। মাঝে মাঝে যাওয়ার পথে আমাদের দেখা হয়ে যেত। এরপরেই একদিন সেই ঘটনা ঘটল।
রাত আড়াইটার সময় মীরা ফোন এসে হাজির আমার কাছে। আমি ঘুম ভেঙ্গে মীরার ফোন পেয়ে একটু অবাক হলাম। আমার ঘুম পাতলা তাই এক বার রিং হতেই আমার ঘুম ভেঙ্গে যায়। আমি ফোন রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে মীরার কান্না জড়িত কন্ঠ শুনতে পেলাম। সে আমাকে যা বলল তার অর্থ হচ্ছে তার মায়ের শরীর খারাপ হয়ে গেছে। সে খুব অসহায় বোধ করছে।
আমি তাকে জানালাম যে আমি আসছি তার বাসার সামনে।
আমি মিনিট দশের ভেতরেই মীরার বাসার সামনে গিয়ে হাজির হলাম। ততক্ষণে দেখতে পেলাম যে এম্বুল্যান্স চলে এসেছে। আমি দ্রুত উপরে চলে গেলাম। মীরার আম্মুকে নামাতে সাহায্য করলাম। তারপর হাসপাতালে।
সকাল আটটার দিকে মীরার মায়ের অবস্থা একটু স্টেবল হল। বলাই বাহুল্য যে মীরা সেদিন অফিস গেল না। আমিও থেকে গেলাম তার সাথে। যদিও মীরা আমাকে বলল অফিস চলে যেতে আমি থেকেই গেলাম। তাকে জানালাম যে একদিন অফিস না গেলে কিছুই হবে না। আমি মীরার চোখে একটা কৃতজ্ঞতা দেখতে পেলাম। মূলত সেদিনের পর থেকেই মীরার সাথে আমার বন্ধুত্ব শুরু হল। অবশ্য সেদিনই আমি মীরার বয়ফ্রেন্ডের ব্যাপারে জানতে পারলাম। সেদিন বিকেলের কিছু পরে মীরার বয়ফ্রেন্ড এসে হাজির হল হাসপাতালে। আমার সাথে পরিচয় হল। তার নাম ইফতি আহমেদ। আমার মনে হল যে এখন আর আমার এখানে থাকার দরকার নেই। বাকি সময়টা ওরাই থাকুক। আমি সেখান থেকে বিদায় নিয়ে বাসায় চলে এলাম। রাতে অবশ্য আবার নিজেই মীরার জন্য খাবার নিয়ে গেলাম। কেন নিয়ে গেলাম সেটা আমি নিজেই জানি না। আমার কেন জানি মনে হল যে ইফতি সাহেব মীরার সাথে বেশি সময় থাকবে না। এমনটা ভাবার কারণ হচ্ছে রাতের বেলা মীরার মায়ের শরীর খারাপ হয়েছে। আমি নিশ্চিত মীরা তাকে জানিয়েছে। তার বাসা কোথায় সেটা আমার জানা নেই। হয়তো সেই রাতের বেলা তার আসা সম্ভব ছিল না কিন্তু অফিসে যাওয়ার আগে একবার অন্তত সে চাইলেই দেখা করে যেতে পারত। সেটা সে করে নি। এসেছে একেবারে অফিস করেই। এই কারণেই আমার মনে হল যে ইফতি সাহেব বেশি সময় থাকবে না।
আমি যখন খাবার নিয়ে হাজির হলাম হাসপাতালে তখন সত্যিই দেখতে পেলাম যে ইফতি চলে গেছে। মীরা একা বসে আছে মায়ের কাছে। আমাকে দেখে ওর চোখে উজ্জ্বল হয়ে এল। আমি কাছে গিয়ে বললাম, আমাকে ফোন দেন নি কেন? রাতে যদি আমি না আসতাম তাহলে?
মীরা লজ্জিত কন্ঠে বলল, আপনাকে আর কষ্ট দিতে ইচ্ছে করে নি। আপনি এমনিতেও অনেক কষ্ট করছেন।
রাতে খাওয়া দাওয়া শেষ করে মীরা আমাকে চলে যেতে বললেও আমি গেলাম না। পুরো রাতটা আমরা হাসপাতালেই রয়ে গেলাম। পরদিন সকালে আমি মীরার জন্য সকালের নাস্তার ব্যবস্থা করে তারপর অফিসে এসে হাজির হলাম। মীরা আরও দুইদিন পর থেকে অফিসে আসা শুরু করল। বলাই বাহুল্য আমাদের মাঝে কথাবার্তা দেখা শোনার পরিমান বেড়ে গেল। এবার থেকে অফিসে যাওয়া এবং আসাটা একই সাথে হতে লাগল। আমি মাঝে মাঝে মীরার বাসায় যেতাম। মীমার মা আমাকে বেশ পছন্দ করতেন। বিশেষ করে যে কোন প্রয়োজনে আমি গিয়ে হাজির হতাম তাদের বাসায়। আমার আম্মাও মাঝে মাঝে গিয়ে হাজির হতেন মীরাদের বাসায়। এভাবে কিছু দিনের ভেতরেই আমাদের সম্পর্কের উন্নতি হল বেশ। তবে আমি এটা সব সময় মনে রাখতাম যে মীরার একজন প্রেমিক আছে এবং কদিন পরে তাদের বিয়ে হবে। তবে সেটাও অনেকটাই বদলে গেল মীরার মায়ের হঠাৎ করে মারা যাওয়ার ফলে।
সেদিনও ঠিক একই ভাবে রাতের বেলাই মীরার ফোন এসেছিল। অবশ্য সেদিন রাত বেশি হয় নি। সাড়ে দশটার মত বেজেছিল ঘড়িতে। সবে মাত্র রাতের খাবার খেয়ে উঠেছি তখনই মীরার ফোন এসে হাজির। তার মায়ের শরীর আবারও খারাপ করছে। আমি দ্রুত মীরার বাসায় গিয়ে হাজির হলাম। এম্বুলেন্স আসতে সময় লাগল না। এম্বুলেন্স যখন হাসপাতালের দিকে ছুটে চলছিল তখন মীরা আর আমি মীরার মায়ের মায়ের পাশেই বসে ছিলাম। হঠাৎ এক সময়ে মীরার মা একটু চোখ মেলে তাকালেন। একবার তার মেয়ের দিকে তারপর আমার দিকে ফিরলেন। তারপর অনেকটা ক্ষীণ গলায় তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, বাবারে আমার মাইয়াডারে একটু দেইখা রাইখো! ওর আর কেউ রইলো না এই জগতে!
আমি কিছু সময় কোন কথাই বলতে পারলাম না। তারপর তার হাত ধরে বললাম, খালাম্মা আপনি কোন চিন্তা করেবন না তো! এম্বুলেন্সটা দ্রুত এগিয়ে চলল হাসপাতালের দিকে।
মীরার মা মারা গেলেন ভোর রাতের দিকে। তিনি আগেও একবার স্ট্রোক করেছিলেন। এইবারের স্ট্রোকের ধকল তাই সহ্য করতে পারেন নি। মীরা নিশ্চুপ ভাবে মায়ের বেডের পাশে বসে রইল। আমি চুপচাপ কেবল মীরার পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। এখানে আর কিছুই করার ছিল না।
পরের দুইটা দিন আসলে কিভাবে কেটে গেল টের পেলাম না। দুপুরের আগেই লাশ রিলিজ নিয়ে আমরা এম্বুলেন্সে করে মীরার গ্রামের বাড়ির দিকে রওয়ানা দিলাম। আমার মা এসেছিলেন হাসপালে। আমি আর মীরা দুজন এম্বুলেন্সে উঠে বসলাম।
অবাক করার ব্যাপার হচ্ছে ঢাকাতে মীরার কোন আত্মীয় স্বজন নেই। কয়েকজন বন্ধুবান্ধব আছে যাদের আমি আগে দেখেছি। তারা হাসপাতালে এসেছিল। আমাদের অফিসের কয়েকজন এসে হাজির হল। তবে আমি আর মীরা কেবল এম্বুলেন্সে উঠলাম। মীরাদের গ্রামের বাড়ি মুন্সিগঞ্জে। খুব বেশি দুরে নয়।
লাস দাফন করতে করতে বিকেল পার হয়ে গেল। মীরার গ্রামের বাড়িতে মীরার এক মামা থাকেন। আর দুই খালা ছিলেন আশে পাশেই। তারা এসেছিলেন। আমি ভেবেছিলাম রাতটা সে তার গ্রামের বাড়িতে থাকবে তবে আমাকে অবাক করে দিয়েই মীরা ঢাকায় ফিরে আসতে চাইলো। ওর মামা খালারা অবশ্য থাকতে বলেছিল তবে মীরা শুনল না। আমাকে নিয়ে আবার ঢাকার পথেই রওয়ানা দিল। আমরা যখন ঢাকাতে এসে হাজির হলাম তখন রাত প্রায় এগারোটা বাজে। আমি মীরার বাসায় ঢুকলাম ওর সাথে। সত্যি বলতে কি মীরাকে আমি একা রাখতে চাইছিলাম না।
মীরা গোসলে ঢুকলে আমি আমি বাসায় এসে হাজির হলাম। মীরার জন্য খাবার নিয়ে আবারও এসে হাজির হলাম মীরার বাসায়। মীরা ততক্ষণে গোসল থেকে বের হয়েছে। আমি বললাম, এবার খেয়ে নাও। সারাদিনে কিছুই খাও নি!
আমি ভেবেছিলাম মীরা হয়তো মানা করবে। তবে ও সম্মতি জানাল। আমিও বসলাম ওর সাথে। তখনই ব্যাপারটা ওর কাছে জানতে চাইলাম। বললাম, ইফতি সাহেবকে জানাও নি?
মীরা বলল, মেসেজ করেছি। ও অফিসের কাজে সিলেট গেছে। এই জন্য আর ফোন করি নি।
মীরা চুপচাপ খেয়ে চলল। তারপর হঠাত বলল, আজকে এই বাসায় থাকবে একটু! আমার একা একা ভয় করবে!
আমি হাসলাম। তারপর বললাম, তুমি না বললেও আমি থাকতাম।
মীরা বলল, একটা অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো?
-কী?
-তুমি যখন বাইরে গেলে আমি গোসলে ঢুকলাম, পুরো বাসায় আমি একা। তখন হঠাৎ আমার মনে হল মা যেন ঐ রুমের ভেতরে আছে। ভয়ের একটা শিহরন বয়ে গেল।
আমি বললাম, এমনটা হওয়া স্বাভাবিক।
-কী অদ্ভুত না? আমার মাকেই আমার ভয় লাগছে এখন!
-আমরা সবাই মৃত মানুষকে ঠিক নিতে পারি না। এমনটা স্বাভাবিক। গা ছমছম করে।
মীরা আমার কথা শুনে আমার দিকে কেমন চোখে তাকাল। রাতের বেলা আমরা দীর্ঘ সময় ড্রয়িং রুমেই বসে রইলাম। আমি মীরার কথা শুনছিলাম। মীরা ওর মায়ের সাথে কাটানো ছোট ছোট কথা বলতে লাগল। আমাকে জানালো কিভাবে তার বাবার মৃত্যু হল তারপর সে আর তার মা কিভাবে একে অন্যকে আঁকড়ে ধরে ছিল এখন আর ওর কেউ রইলো না। এভাবে কথা বলতে বলতে মিমি এক সময় ঘুমিয়ে পড়ল। আমি তখন ওর পাশেই বসে ছিলাম। একবার আমার মনে হল ওকে নিয়ে শোবার ঘরে শুইয়ে দিই কিন্তু পরে সেটা আর করলাম না। সোফাতেই আরাম করিয়ে শুইয়ে দিলাম।
তবে আমি নিজেও শোবার ঘরে গেলাম না। সত্যি বলতে কি একা ঘরে থাকতে আমার নিজেও খানিকটা অস্বস্তি লাগছিল, একটু গা ছমছম করছিল। আমি তাই পাশের সোফাতেই হেলান দিয়ে শুয়ে পড়লাম।
পরের দিনটাও আমি মীরার সাথেই কাটিয়ে দিলাম। সকালের নাস্তা কিনে আনার শুরু করে দুপুরের খাবার সব এল আমাদের বাসা থেকে। বিকেল বেলা মীরাকে নিয়ে বের হলাম। মনে হল বাইরে বের হলে ওর মনটা বুঝি একটু ভাল হবে।
মীরা শান্তই ছিল। নিজেকে অনেকটাই সামলে নিয়েছে সে। তাবাকের ক্যাফে বসে কফি খেলাম দুজন। চারিদিকে অনেক মানুষের ভীড়। সেই ভীড়ের ভেতরেই সবাই যে যার মত কথা বলছে, আড্ডা দিচ্ছে। মীরা এক সময় বলল, আমাকে এই রকম শান্ত দেখে অবাক লাগছে না তোমার?
-একটু যে লাগছে না সেটা না। তবে আমরা অনেকেই এমন আচরণ করতে পারি।
-আমি আসলে জানতামই এমন কিছু হবে। দিনের পর দিন এই দৃশ্য আমার চোখের সামনে এই দৃশ্য কল্পনা করেছি। বাবার মৃত্য্যর পর থেকেই এই ভাবনা আমার চলেই আসতো। মায়ের যখন প্রথমবার এটাক হল তখন থেকে এই ভাবনাটা যেন আরো বেশি বেশি করে আসতো।
আমি কিছু সময় কোন কথা বললাম না। আরো ভাল করে বললে কী উত্তর দেব সেটার কোন জবাব ছিল না আমার কাছে। মায়ের মৃত্যুর এই দৃশ্য ওর মাথার ভেতরে বারবার এসে হাজির হয়েছে। বারবার সে এই কষ্ট অনুভব করেছে। এটা মীরার জন্য যে কতটা কষ্টের ছিলস এটা সম্ভবত আমার পক্ষে জানা সম্ভব না।
মীরার জন্য আমার হঠাৎ কষ্ট হতে শুরু করল। মেয়েটা একেবারে একা হয়ে গেল। এখন মেয়েটার পাশে কারো থাকা দরকার ছিল। ইফতি নামের সেই লোকটার উপর আমার কেন জানি প্রচন্ড রাগ হল। অন্তত এই সময়ে তার মীরার পাশে থাকার দরকার ছিল। বেটা বদমাইশটা গেল কই?
ইফতির সাথে আমার দেখা হল পরদিন সকালেই। আমি সেদিনও মীরার বাসাতেই ছিলাম। সকালে ঘুম ভাঙ্গল কলিংবেলের আওয়াজে। আমি নিজেই দরজা খুলে দিলাম। এবং সেখানেই ইফতিকে দেখতে পেলাম দাঁড়িয়ে। আমাকে দেখে সে কিছুটা বিস্মিত হয়। সম্ভবত আমাকে সে এখানে আশা করে নি। অবিশ্বাস ভরা চোখে কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। কী বলবে সেটা সম্ভবত খুজে পাচ্ছে না। আমিই আগে কথা বললাম, বললাম আসুন।
দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ালাম। সে চুপচাপ ঘরে প্রবেশ করল। আমি বললাম, মীরা সম্ভবত এখনও ঘুমাচ্ছে।
আমি হাত দিতে মীরার শোবার ঘর দেখিয়ে দিলাম। ইফতি কিছু সময় ঘরের মাঝে দাঁড়িয়ে রইলো। আমি তাকে সেখানে রেখে অন্য ঘরটার দিকে পা বাড়ালাম। এই ঘরের ওয়াশরুমটাই আমি ব্যবহার করছিলাম। তাই এখানেই ঢুকলাম। ফ্রেশ হয়ে যখন বের হয়ে এলাম তখন ডাইনিং রুমের দেখতে পেলাম ওদের দুজনকে। দুজনের মুখই গম্ভীর। আমার দিকে মীরা তাকিয়ে বলল, অফিসে দেখা হবে।
আমি একটু হেসে বের হয়ে নিজের বাসার দিকে হাটা দিলাম। সত্যি বলতে কী আমি জানি ওদের ভেতরে এখন কী কথা হবে। আম যদি ইফতির জায়গায় থাকতাম আমিও এই ব্যাপারটা মোটেই পছন্দ করতাম না। যতই মা মারা যাক আমি যদি দেখতাম যে আমার প্রেমিকার বাসায় তার কোন ছেলে বন্ধু থাকছে আর কোন মানুষ সেখানে নেই তখন ব্যাপারটা আমার ভাল লাগত না।
আজকে একাই অফিসে গেলাম। আমার ছুটি শেষ। মীরার আরো দিন দুয়েক ছুটি আমিই নিয়ে দিয়েছিলাম। মেয়েটা আরো একটু শোখ সামলে নেওয়ার সময় নিক। তবে আমাকে একটু অবাক করে দিয়েই মীরা অফিসে এসে হাজির হল। আমাকে জানালো যে বাসায় একা একা থাকলেই বরং মায়ের কথা বেশি মনে পড়বে। লাঞ্চ আওয়ার পর্যন্ত মীরা সত্যিই কাজে ব্যস্ত হল। আমার সাথে কোন কথা হল না। আমার মনের ভেতরে কেমন একটা অস্বস্তি হচ্ছিল। আসলে ইফতি সাহেবের চোখের সেই দৃষ্টি আমার চোখের সামনে ভাসছিল। আমি কিছুতেই সেটা মন থেকে দূর করতে পারছিলাম না।
লাঞ্চ আওয়ারে মীরার সাথে ক্যাফেতে বসলাম। চুপচাপ কিছু সময় খাওয়ার পরেই মীরা বলল, আমি তোমার কাছে সরি!
আমি একটু অবাক হয়েই বললাম, সরি কেন?
মীরা আমার দিকে একটু মুখ তুলে তাকাল তারপর আবারও নিজের খাবারের দিকে মন দিল। তারপর চোখ না তুলেই সে বলল, আমি আমার জন্য তোমাকে ব্যবহার করেছি।
-কী রকম?
-আমি তোমাকে আমার বাসায় থাকতে বলেছিলাম মনে আছে?
-হ্যা। এটার জন্য সরি কেন?
-হ্যা প্রথম দিন আমার ভয় করছিল সত্যি তবে সেটা পরেরদিনই কেটে গিয়েছিল। আমি তোমাকে তারপরেও থাকতে বলেছিলাম কারণ…
আমি কিছু জিজ্ঞেস করতে গিয়েও করলাম না। চুপ করে থাকার সিদ্ধান্ত নিলাম। আমার মনে হল যে মীরা নিজেই সব কিছু বলবে। মীরা বলল, আমি তোমাকে থাকতে বলেছিলাম এই কারণে যেন ইফতি তোমাকে দেখে।
আমি বললাম, মানে? দেখে বলতে?
-দেখে মানে হচ্ছে তোমাকে আমাকে যেন একই ঘরে দেখে। ও যেন জানতে পারে যেন আমরা রাতে একই বাসায় ছিলাম। আমরা কেবল দুজন!
এই বলে মীরা কিছু সময় চুপ করে রইলো। মীরা হাতের চামচটা দিয়ে খাবারের প্লেটটা নাড়াচাড়া করতে লাগল। আসলে মীরা ঠিক কী বোঝাতে চাইছিল সেটা আমি ঠিকই বুঝতে পারছিলাম। ইফতির চোখে আমি সেই দৃষ্টি দেখেছি। আমি অবাক হচ্ছি এটা ভেবে যে মীরা এটাই চেয়েছে, এভাবেই আমাকে আর ওকে তার প্রেমিকের সামনে উপস্থাপন করতে চেয়েছে। কিন্তু কেন?
আমার মনের কথা বুঝতে পেরে মীরা বলল, আসলে ইফতি আমার কাছ থেকে মুক্তি চাচ্ছিল। চাকরি পাওয়ার পর থেকেই ইফতির ভেতরে একটা পরিবর্তন আমি লক্ষ্য করা শুরু করি। তারপর ওর মেয়ে বসের সাথে কিছু চলছে। সেটা আমি জানি। জেনেও এতোদিন আমি চুপ থেকেছি। কেন কিছু বলি নি সেটা আমি জানি না। এতো দিনের সম্পর্ক এই কারণেই হয়তো। জানোই তো মেয়েরা সহজে একটা সম্পর্ক শেষ করতে চায় না। এক সময়ে আমি ইফতির থেকে তীব্র অবহেলা পেতে শুরু করি। আমাদের সপ্তাহে তো দুরে থাকুক কয়েক মাসেও একবার দেখা হত না। অথচ আমাদের অফিস কিন্তু খুব বেশি দুরে না। চাইলেই অফিস শেষ করে আমর আদেখা করতে পারি। কিন্তু ……
মীরা চুপ করে গেল হঠাৎ। আমি আমিও চুপই রইলাম। মীরা তারপর বলল, যাক সেসব কথা বাদ দিই। মূল কথা হল ও আমার প্রতি সব আগ্রহ হারিয়য়ে ফেলেছিল। কিন্তু সম্ভবত আমাকে না বলতে পারছিল না কোন কারণে। আমিও এটা দেখেও না দেখার ভাব করে ছিলাম। মনে করেছিলাম যে একদিন সে ফিরে আসবে আবারও আমার কাছে, আমার উপর আবারও আগ্রহ তৈরি হবে। তবে মায়ের এটাকটা হওয়ার পরে ইফতির কোল্ড আচরন দেখে আমি বুঝে গিয়েছিলাম সেটা আর হবে না। তারপর গত কয়েকদিন ইফতি যেমনটা করেছে সেটা তো তুমিই দেখলেই।
-ব্রেক কি করে ফেলেছো?
-হ্যা। তবে ওকে মুক্তি দিয়েছি। আমি বলেছি যে আমি তোমার সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে গেছি। গত কয়েক মাসে তুমি আমাকে যেভাবে সাপোর্ট দিয়েছো ব্যাপারটা ঘটে গেছে।
আমি আবার কী বলব খুজে পেলাম না। চুপ করেই রইলাম। মীরা বলল, সরি এভাবে তোমাকে ব্যবহার করার জন্য।
-মেনশন নট। হ্যাপি টু হেল্প। তোমার সাথে সময় আমার ভাল কেটেছে সত্যি। সো কোন চিন্তা নেই। সরি বলার কোনো দরকারই নেই।
মীরা এরপরের কয়েকদিন সামলে নিল। শোক কাটিয়ে কাজ কর্মে মন দিল। আমি ওর সাথে আরও বেশি বেশি সময় কাটাতে শুরু করলাম। ঘটনা ঘটল আরও মাস দুয়েক পরে। সেদিন রাত দশটার দিকে হঠাত মীরার ফোন এসে হাজির। ও আমাকে তখনই ওর বাসায় যেতে বলল। আমার মনে হল যে সম্ভবত মীরা কোনো বিপদে পড়েছে। আমি তখনই প্রায় দৌড়ে গিয়ে হাজির হলাম ওর বাসায়। দ্রুত কয়েকবার কলিংবেল বাজালাম। মীরা খুলে দিল একটু পরে।
ওকে দেখে একটু শান্তি পেলাম। ওর কোন বিপদ হয় নি। আমার হাত ধরল সে। তারপর আমাকে টেনে নিয়ে গেল ঘরের ভেতরে। ড্রয়িংরুমে ঢুকেই একটু চমকালাম। কারণ সেখানে ইফতি বসে আছে। তবে মীরা কিন্তু আমার হাত ছাড়ল না। সে ইফতিকে বলল, ফোন দিয়েছি আর দৌড়ে চলে এসেছে। দেখ থ্রিকোয়াটার পরেই চলে এসেছে।
ইফতি বলল, আমি বিশ্বাস করি না যে তোমাদের ভেতরে কিছু চলছে। তুমি আমাকে জ্বালানোর জন্যই এটা করেছো আমি জানি। কোনো তুমি এমন কিছু করতে পারো না। আমি তোমাকে চিনি না?
মীরা বলল তাই?
এরপর মীরা যে কাজটা করল সেটার জন্য আমি কিংবা ইফতি কেউ প্রস্তুত ছিল না। সম্ভবত মীরাও কোনো দিন ভাবে নি যে সে এমন কোন কাজ করতে পারবে। আমার জড়িয়ে ধরেই শক্ত করে আমার ঠোটে চুমু খেল। চুমু খাওয়ার ভেতরেই আমি বুঝতে পারলাম যে ইফতি সাহেব ঘর থেকে বের হয়ে গেল। কিন্তু মীরা তখনও আমার ঠোট থেকে নিজেকে মুক্ত করলো না। বরং আরো গভীর ভাবে চুমু খেল।
যখন আমার কাছ থেকে মুক্ত হল তখন ওর চোখে আমি লজ্জা দেখতে পেলাম একটু। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি বস আমি একটু আসছি।
এই বলেই সে ভেতরে চলে গেল।
আমি বসে বসে ভাবতে লাগলাম যে কী হল। অবশ্য মীরার আসতে সময় লাগল না। ওর চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম যে মীরা চোখে মুখে পানি দিয়ে এসেছে। সম্ভবত নিজেকে সম্ভবত শান্ত করতে পানি দিয়েছে।
আমার পাশে বসতে বসতে মীরা বলল, অবাক হয়েছো খুব?
-তা তো একটু হয়েছি।
-আমিও অবাক হয়েছি। যখন বুঝতে পারলাম যে আমার ইফতির প্রতি কোন অনুভূতি নেই। অনেক দিন থেকেই নেই। আমি এতোদিন বুঝতে পারি নি। আজকে যখন আবার দুজনের মাঝে চুজ করার অপশন এল তখন মনে হল যে আমি তোমাকে চাই?
আমি কিছুই বুঝতে পারলাম না। মীরাই অবশ্য নিজ থেকে বাকি টুকু বলা শুরু করল।
-একটু আগে ইফতি এসে কী জানালো জানো?
-কী?
-সে জানালো যে সে চাকরিটা ছেড়ে দিবে। আমাকে আবার ফেরত চায়। সে জানে যে তোমার সাথে আমার কিছুই নেই। আমি নাকি ওমন মেয়েই না। তারপর সে সব স্বীকার করে নিল। তার বসের সাথে প্রেমের কথাটাও। তবে সেটা থেকে সে ফিরে এসেছে। এখন আমাকে যতদ্রুত সম্ভবত বিয়ে করতে চায়। জানো এক মুহুর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল যে ওকে সত্যিটা বলে দিলেই আমি আবারও ওকে পেয়ে যাব কিন্তু তারপরেই তোমার কথা আমার মনে হল। সেই প্রথমদিন রিক্সা করে যাওয়ার সময় আমার অস্বস্তি হবে বলে তুমি কাজ আছে বলে অন্য দিকে চলে গেলে এটা দৃশ্যটা থেকে শুরু করে রাতের পর রাত যখন আমি হাসপাতালে ছিলাম মায়ের কাছে তুমি আমার পাশে ছিলে। আমার সামনে থেকে জানো সব কিছু গায়েব হয়ে গেল। এমন কি ইফতি পর্যন্তও। কেবল তুমি ছিলে। আমি জানি তুমি আমাকে ভালোবাসবে কিনা, হয়তো শুধু বন্ধুত্ব কিংবা মানুষ হওয়ার দরুণই তুমি আমার পাশে ছিলে তবে আমি আমার বাকি জীবনটা তোমার সাথে কাটাতে চাই।
ওইদিন রাতে অবস্য আর আমার বাসায় ফিরে হল না। কেন হল না সেটা আপনারা নিজেরাই বুঝে নিতে পারেন।
ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।
অপু তানভীরের দুটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।
Discover more from অপু তানভীর
Subscribe to get the latest posts sent to your email.
