ঋতু

5
(2)

সপ্তম শ্রেণীতে পড়ার সময় বায়োলজি ক্লাসে ব্যাঙ কাটাছেঁড়া করা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আমি একটা ফন্দি এঁটেছিলাম। আমাদের শিক্ষিকা মিসেস গ্রেবারকে গিয়ে বললাম যে আমি হিন্দু, আর আমাদের ধর্মে জীবহত্যা নিষিদ্ধ।

তিনি আমার কথায় কান না দিয়ে  বললেন, “নিজের ডেস্কে গিয়ে বস।”

সেইবার ল্যাব পার্টনার হিসাবে ঋতু জুটে গেল। ঋতুর কথায় কোনো বিদেশি টান ছিল না আর দুপুরের খাবারের সময় সে শ্বেতাঙ্গদের সাথেই বসত—তবুও জীববিজ্ঞানে সে-ই সবচেয়ে বেশি নম্বর পেত। আমার মনে হতো মেয়েটা নিজেকে আমার চেয়ে বড় কিছু ভাবে; তা সত্ত্বেও সে যে আমার ল্যাব পার্টনার হয়েছিল, এতে আমি মনে মনে খুশিই হয়েছিলাম।

ব্যাঙটা ছিল বেশ শক্ত আর দেখতে কিম্ভুতকিমাকার। ধূসর রঙের দেহটা থেকে ফরমালিনের কটু গন্ধ বেরোচ্ছিল। ল্যাবরেটরির মূল কাজ, অর্থাৎ কাটাকুটি শুরু করার আগে আমাদের কতগুলো চিত্র চিহ্নিত করতে হতো, যাতে বোঝা যায় যে আমরা ব্যাঙের শরীরের প্রাথমিক গঠনগুলো চিনি। তাছাড়া মৃত প্রাণীটার নানারকম মাপজোখ নেওয়ারও দরকার ছিল। ঋতু নিজেই খাতা-কলমের কাজগুলো করতে লাগল। আমি বারবার তাকে জিজ্ঞেস করছিলাম কোন অঙ্গটা কী, একপর্যায়ে সে নিজেই অঙ্গগুলো বের করতে শুরু করল আর আমার হাতে স্কেলটা ধরিয়ে দিল। সত্যি বলতে, বিভিন্ন অংশের মাপ কীভাবে নিতে হয় তা আমার মোটেও জানা ছিল না। এক সময় বিরক্ত হয়ে সে বলেই ফেলল, “তুমি কি কিছুই করতে পারো না? সব কিছু আমিই করব?”

মিসেস গ্রেবার ক্লাসের সবার কাজের অগ্রগতি দেখতে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন। ততক্ষণে ঋতু ব্যাঙের অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলো—হৃৎপিণ্ড, কিডনি, পাকস্থলী—বোর্ডের ওপর পিন দিয়ে আটকে ফেলেছে; ঠিক যেমনটা বইয়ের ছবিতে দেখায়। মিসেস গ্রেবার এসে ঋতুকে জিজ্ঞেস করলেন, কে কোন কাজটা করেছে? আমি আর ঋতু দুজনেই তখন দাঁড়িয়ে। আমি চট করে বলে উঠলাম যে মাপজোখগুলো আমি করেছি। ঋতু নিচের দিকে তাকিয়ে রইল, কোনো কথা বলল না।

“এটা কি সত্যি?” মিসেস গ্রেবার জিজ্ঞেস করলেন।

ঋতু এবারও চুপ করে রইল।

আমাদের সামনে দাঁড়িয়েই মিসেস গ্রেবার পুরো ক্লাসের উদ্দেশ্যে উচ্চস্বরে বললেন, “শোনো সবাই, ল্যাবের কাজে দুজনকেই সমান সমান খাটতে হবে। কাজটা ফিফটি-ফিফটি হওয়া চাই।” ক্লাসের সবাই আমাদের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল যেন তারা সবাই বুঝে গেছে যে আসল কাজগুলো সব ঋতুই করেছে আর আমি শুধু শুধু ওর ঘাড়ে বসে পার পেতে চাচ্ছি। মনের ভেতর তীব্র ক্ষোভ নিয়ে আমি মনে মনে ওদের দুজনের পিন্ডি চটকাতে শুরু করলাম।

ঋতুর সাথে হয়তো আমার আর কোনোদিনই কথা হতো না, যদি না তিন বছর পর হাইস্কুলে জেসনের সাথে আমার বন্ধুত্ব হতো। জেসন বেশ জনপ্রিয় ছিল। আমি তার পেছন পেছন চ্যালার মত ঘুরতাম। জেসনের কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে আমি প্রায়ই বানিয়ে বানিয়ে নানারকম গল্প বলতাম। যেমন: টাইসন উ নাকি তার বাবা-মাকে ‘মাম্মি’ আর ‘ড্যাডি’ বলে ডাকে, কিংবা আমাদের গণিত শিক্ষকের মুখ থেকে আমি নাকি মদের গন্ধ পেয়েছি। এই মানুষগুলোকে জেসন একদম পছন্দ করত না।

হাইস্কুলে পড়ার সময় জেসন সাথে ঋতুর প্রেম শুরু হয়। জেসনের মাধ্যমেই আমি জানতে পারি যে ঋতুর বাবা ট্যাক্সি চালায়। তিনি ছিলেন সেইসব সনাতনী ভারতীয় পুরুষদের একজন যারা বিশ্বাস করেন যে শরীরে একটা ছোট কাঠের ফালি বা ফোটাঁ বিঁধলে তা রক্তস্রোতের মাধ্যমে বাহিত হয়ে সোজা হার্টে গিয়ে মানুষকে মেরে ফেলতে পারে। ঋতুর বাবা যখন জানতে পারলেন যে জেসন আর ঋতু প্রেম করছে, তিনি সরাসরি জেসনের বাড়িতে ফোন করলেন। জেসনের মায়ের কাছ থেকে ফোনটা নিজের হাতে নিয়ে জেসনকে সাফ জানিয়ে দিলেন—যদি সে তার মেয়ের সাথে আর কখনো মেলামেশা করে, তবে তিনি তাকে টুকরো টুকরো করে কেটে কুকুরকে খাইয়ে দেবেন।

পরের দিন জেসন যখন আমাকে এই গল্পটা বলছিল, তখন আমার কাছে ব্যাপারটা অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল। আমার বিশ্বাসই হচ্ছিল না যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ কীভাবে একজন কিশোরকে ফোন করে এমন হুমকি দিতে পারে!

ঋতুর বাবাকে আমি মাঝেমধ্যে মন্দিরে দেখতাম। মিস্টার শাহ ছিলেন খাটো আর চওড়া গড়নের মানুষ, তাঁর হাতের কবজি থেকে কনুই পর্যন্ত অংশটা ছিল বেশ স্থূল। মন্দিরের ঘরের ঠিক পেছনের দিকটায় তিনি এসে দাঁড়াতেন, আর তাঁর শরীর থেকে কড়া সুবাসের কোলোনের গন্ধ আসত। 

আমার চেনা-জানা বন্ধুদের মধ্যে জেসন আর ঋতুই ছিল প্রথম জুটি, যারা শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়েছিল। স্কুল ছুটির পর ওরা জেসনের বাড়িতে গিয়ে দেখা করত। কারণ জেসনের বাবা-মা দুজনেই চাকরি করতেন, তাই কোন সমস্যা হত না। জেসন আমাকে বলেছিল যে, সেক্সের পর সে আর ঋতু প্রায়ই বিছানায় বসে তাস খেলত। কখনো কখনো মাঝরাতে ঋতু নিজের ঘরের জানালা গলে বাইরে বেরিয়ে আসত জেসনের সাথে দেখা করার জন্য, আর তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাত ধরে হেঁটে বেড়াত। আমার মনে হতো ঋতুর কোনো শ্বেতাঙ্গ ছেলের সাথে প্রেম করার মধ্যে একটা অনুচিত বা অশোভন ব্যাপার আছে। অথচ এই কথা ভাবার সময়েই আমি মনে মনে জানতাম, কোনো শ্বেতাঙ্গ মেয়ে যদি আমার সাথে প্রেম করত, তবে আমি সানন্দেই তা লুফে নিতাম।

আমাদের ক্লাসের যে তিনজন শিক্ষার্থী যৌথভাবে ‘ভ্যালিডিক্টোরিয়ান’ (সর্বোচ্চ নম্বরধারী বিদায়ী ছাত্র) হয়েছিল, ঋতু ছিল তাদের একজন। তাছাড়া সে স্কুলের সংবাদপত্র আর ইয়ারবুকের কাজের সাথেও যুক্ত ছিল। 

ঋতু যে প্রিন্সটন ইউনিভার্সিটিতে পড়ার সুযোগ পাবে, এতে অবাক হওয়ার মতো কিছু ছিল না। জেসন আইভি লীগের সবকটি কলেজ থেকেই প্রত্যাখ্যাত হলো, তবে ইউনিভার্সিটি অব মিশিগানে তার জায়গা হয়ে গেল। মিস্টার শাহ তাকে ‘ডাম্বি’ বলে ডাকতেন। ততদিনে ঋতুর বাবা-মা অবশ্য ওদের প্রেমটা মেনে নিয়েছেন; তবে মিস্টার শাহ ঋতুকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন যে, সে কেবল প্রিন্সটন, হার্ভার্ড কিংবা ইয়েল ইউনিভার্সিটিতে পড়া কোনো ছেলেকেই বিয়ে করতে পারবে।

১৯৮৯ সালের কথা, যখন আমরা আমাদের প্রথম ক্রিসমাসের ছুটিতে বাড়িতে ফিরেছিলাম; ঠিক তখনই ঋতু ওদের বাড়ির বেসমেন্টে গিয়ে গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। এর আগে আমার চেনা লোকেদের মধ্যে শুধু আমার দাদা-দাদি আর নানা-নানিই মারা গিয়েছিলেন, আর তারা থাকতেন ভারতে। তাঁদের সাথে আমার দেখা হয়েছিল হাতে গোনা মাত্র কয়েকবার, তাই তাঁদের চলে যাওয়াটা আমার কাছে এমন ছিল যেন তাঁরা কোনোদিন বাস্তব পৃথিবীতে ছিলেনই না।

ঋতু মারা যাওয়ার পর, জেসন প্রায় প্রতিদিন ওদের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা-মায়ের সাথে দেখা করত। একদিন আমিও তার সাথে যাওয়ার জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। যে মেয়েটি নিজে নিজে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে, তার বাড়ি যাওয়াটার মধ্যে এক ধরনের অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল। আমি মনে মনে ভাবলাম, ঋতুর বাবা-মায়ের কাছে ওয়ার্ডসওয়ার্থের ‘আই ওয়ান্ডারড লোনলি এজ আ ক্লাউড’ কবিতাটার অন্তর্নিহিত অর্থ ব্যাখ্যা করব। আসলে, ঋতু ক্রিসমাসের ছুটিতে তার এক বন্ধুকে চিঠিতে এই কবিতাটা লিখে পাঠিয়েছিল, আর সেই বন্ধুই কবিতাটা মিস্টার ও মিসেস শাহকে দেখায়। ঋতুর মা জেসনকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, এই কবিতাটা কি আত্মহত্যার কথা বলে? জেসন বলেছিল, সে ঠিক জানে না।

গাড়িতে যাওয়ার সময় জেসন আমাকে বলল যে, ঋতু কোনো ছেলের সাথে শারীরিক সম্পর্কে লিপ্ত হয়েছে—এমনটা যখন মিস্টার শাহ প্রথম সন্দেহ করতে শুরু করেন, তখন তিনি মেয়েকে বলেছিলেন, “তাহলে তো তোর সাথে আমারও শোয়া উচিত।” 

কথাটা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম। মিস্টার শাহ ঋতুকে মারধর করতে পারেন—এমনটা আমি কল্পনা করতে পারতাম; কিন্তু এই মুখের ভাষা আর মানসিকতার হিংস্রতা ছিল একেবারেই অন্য স্তরের। জেসনের গাড়ির সামনের কাচটা নোংরা হয়ে ঝাপসা হয়ে ছিল, আর বিকালের ম্রিয়মাণ রোদ সেই কাচ ভেদ করে এক কুয়াশাময় আলো তৈরি করছিল।

আমি ভেবেছিলাম ওদের বাড়িটা হয়তো নিঝুম, স্তব্ধ হয়ে থাকবে; কিন্তু গিয়ে দেখলাম রান্নাঘরে একটা আর বসার ঘরে আরেকটা টিভি চলছে, দুটিতেই আলাদা আলাদা হিন্দি সিনেমা হচ্ছিল। ঘর জুড়ে অনেক মাছিও উড়ছিল। ঋতুর মা চুলার পাশে দাঁড়িয়ে পাকোড়া ভাজছিলেন, আর ঋতুর বাবা রান্নাঘরের টেবিলে বসে ছিলেন—দাড়ি না কামানো মুখ, বুকের সাদা লোম জামার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল। রান্না করতে করতেই মিসেস শাহ মাঝেমধ্যে কাঁধটা একটু উঁচিয়ে চোখের জল মুছে নিচ্ছিলেন। 

কিছুক্ষণ পর মিসেস শাহ এসে টেবিলের পাশে আমার মুখোমুখি বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার পড়াশোনা কেমন চলছে?” আমি বললাম যে ভালোই চলছে। তারপর আমি আমার পেছনের পকেট থেকে ওয়ার্ডসওয়ার্থের সেই কবিতাটার একটা ফটোকপি বের করলাম। 

“আমি কবিতাটা আমার এক প্রফেসরকে দেখিয়েছিলাম,” আমি তাকে বললাম, “তিনি বললেন যে এটা আসলে আত্মহত্যার কথাই বলে।” কথাটা আমি এইজন্যই বললাম যাতে আমি যে ব্যাখ্যাটা দিতে যাচ্ছি, তার দায়ভার অন্য কারও ঘাড়ে চাপানো যায়। “আপনি কি চান আমি এটা একটু বুঝিয়ে বলি?” 

ঋতুর মা কোনো কথা বললেন না। তাঁর চুলগুলো পেছনে খোঁপা করে বাঁধা। মুখটা ছোট আর গোলগাল দেখতে।

আমি লাইনের ওপর আঙুল বোলাতে বোলাতে পড়তে লাগলাম—আই ওয়ান্ডারড লোনলি এজ আ ক্লাউড (মেঘের মতো আমি একাকী ভেসে বেড়াচ্ছিলাম)। এখানে কবি নিজের একাকীত্বের কথা বলছেন। আপনি যদি একটা মেঘ হন, তবে এই পৃথিবীর সাথে আপনার কোনো বাঁধন থাকে না। ঋতু হয়তো নিজেকে খুব একা অনুভব করছিল আর এই পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে চেয়েছিল। হোয়েন অল অ্যাট ওয়ান্স আই স আ ক্রাউড, / আ হোস্ট, অব গোল্ডেন ড্যাফোডিলস (যখন হঠাৎ আমি একদল, সোনালী ড্যাফোডিল ফুলের মেলা দেখলাম)। এই যে ‘হোস্ট’ শব্দটা, খ্রিস্টানরা এটা যিশুখ্রিস্টের পবিত্র মৃতদেহ বা ত্যাগের প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করে। আর ড্যাফোডিল ফুল তো বেশিদিন বাঁচে না। তারা আসে আর ঝরে যায়। এখানে তারা দুলছে। তারা আসলে বিদায় জানাচ্ছে। হয়তো ঋতুও এভাবে বিদায় জানাচ্ছিল।

আমি মনে মনে ভাবছিলাম, আমার কথা কি বোকা বোকা শোনাচ্ছে? মিসেস শাহ-এর চোখ দুটো ছলছল করে উঠল। আমি দেখলাম ঋতুর বাবাও আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমি কাগজের পাতাটা ঘুরিয়ে তাঁর দিকে ধরলাম, যাতে আমি যে লাইনগুলোর কথা বলছি তা তিনি দেখতে পান। ফর অফট, হোয়েন অন মাই কাউচ আই লাই / ইন ভেকেন্ট অর ইন পেন্সিভ মুড (কারণ প্রায়শই, যখন আমি শূন্য বা বিষণ্ন মনে আমার শয্যায় শুয়ে থাকি)। এখানে লেখক কল্পনা করছেন যে তিনি যখন মারা যাবেন, তখন তাঁর মনে কী চিন্তা খেলা করবে।

“তুমি আমাদের বিরক্ত করছ কেন?” মিস্টার শাহ হঠাৎ চড়া গলায় হুঙ্কার দিয়ে উঠলেন। আমি একেবারে হকচকিয়ে গেলাম। “তুমি ফোন করে আমাদের আজেবাজে কথা বলে বিরক্ত কর? তুমিই সে?” তিনি ঠিক কী বলতে চাচ্ছিলেন তা আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না।

“চল, উঠি,” জেসন দাঁড়িয়ে পড়ে বলল।

আমরা বাড়ি থেকে বেরিয়ে এলাম। গাড়ির ভেতরটা তখন ভীষণ ঠান্ডা। “লোকটা একটা আস্ত শয়তান,” আমি বিড়বিড় করে বললাম।

“চুপ কর তো,” জেসন ঝাঁঝিয়ে উঠল।

পরবর্তী বছরগুলোতে, ঋতুদের বাড়ি যাওয়ার সেই স্মৃতিটা যখনই হঠাৎ আমার মনে পড়ত, লজ্জায় আমার পুরো শরীর অপমানে রি রি করে উঠত। প্রথম প্রথম আমি শুধু মিস্টার শাহ-এর কাছে বকুনি খাওয়ার কথা ভেবেই লজ্জা পেতাম। কিন্তু পরে, আমি নিজের কৃতকর্মের কথা ভেবে তীব্র অনুশোচনায় দগ্ধ হতাম—যে বাবা-মা এইমাত্র তাদের সন্তানকে হারিয়েছে, তাদের ঘরে ঢুকে আমি এমন একটা কবিতার অদ্ভুত আর মনগড়া ব্যাখ্যা দিচ্ছিলাম যা আমি নিজেই ভালো করে বুঝি না!

এই তো সেদিন নিউ ইয়র্কের মিটপ্যাকিং ডিস্ট্রিক্টে জেসনের সাথে আমার হঠাৎ দেখা হয়ে গেল। সে-ই আমাকে চিনতে পারল। “মুখ চেনার ব্যাপারে আমার স্মৃতিশক্তি বেশ ভালো,” সে বলল। আমরা একটা ক্যাফেতে ঢুকে একসাথে বসলাম। জেসন এখন লস অ্যাঞ্জেলেসের একটা রিয়েল এস্টেট কোম্পানিতে কাজ করছে। আমি তাকে আমার নিজের খবর জানালাম, তারপর জিজ্ঞেস করলাম, আমাদের সেই ঋতুর বাবা-মায়ের বাড়ি যাওয়ার কথা তার মনে আছে কি না। সে বলল যে তার মনে নেই; সেই সময়টায় তার মাথায় এত উল্টোপাল্টা চিন্তা আর মানসিক চাপ ছিল যে অনেক কিছুই তার মনে নেই। আমি জিজ্ঞেস করলাম, সে কি এখন আর কখনো ঋতুর কথা ভাবে? “উঁহু, তেমন একটা না।” সে উল্টো আমাকে জিজ্ঞেস করল যে আমি ভাবি কি না। আমি বললাম, হ্যাঁ ভাবি। তখন সে জানতে চাইল, “কেন?” আমি শুধু কাঁধ ঝাঁকালাম। 

আমার বাবা-মা এখনো উডব্রিজেই থাকেন, তাই নিয়মিতই আমার সেখানে যাওয়া হয়। ঋতুরা যে বাড়িটায় থাকত সেটা এখন আর নেই, চারপাশের বাড়িগুলোও হারিয়ে গেছে; সেখানটায় এখন একটা কাল-ডি-স্যাক (রাস্তার কানাগলি) তৈরি হয়েছে। যখনই আমি সেই মোড়টা পার হই, আমার মনে প্রশ্ন জাগে—আমার মতো আর কেউ কি কখনো ঋতুর কথা ভাবে? সেই মেয়েটার কথা, যে মাঝরাতে জানালা গলে বাইরে বেরিয়ে আসত তার প্রেমিকের সাথে হাত ধরে হাঁটবে বলে; যে কত নিখুঁতভাবে ল্যাবরেটরির সেই ব্যাঙটাকে ব্যবচ্ছেদ করেছিল; আর তার আলাদা করে রাখা অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলোকে দেখতে ঠিক যেন কোনো দামি রত্ন কিংবা ফুলের পাপড়ির মতো লাগছিল!

গল্পের মূল লেখক আখিল শর্মা। গল্পটি নিউইয়োর্কার ফ্ল্যাশ ফিকশন বিভাগে প্রকাশির হয়েছিল। মূল ইংরেজি গল্পটা এখানে পাবেন।

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা রকমারী বা ফেসবুকে থেকে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 5 / 5. Vote count: 2

No votes so far! Be the first to rate this post.


Discover more from অপু তানভীর

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *