রিমি কিছুটা অবিশ্বাসের চোখে তাকিয়ে রইলো তার বান্ধবী নওসিনের দিকে। রিমির মনে হল নওসিন বুঝি তার সাথে ঠোট্টা করছে কিন্তু তার চেহারা দেখে মনে হল না যে সে ঠোট্টা করছে। রিমি তারপরেও বলল, তুই সিরিয়াস?
নওসিন বলল, একদম সিরিয়াস। আমি নিশ্চিত না হলে বলতাম না।
-কিভাবে নিশ্চিত হলি শুনি?
নওসিন নিজের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে ছিল। তারপর বলল, নওরিনের বিয়ে!
রিমি আরেকটু অবাক হয়ে তাকাল নওসিনের দিকে। নওরিন হচ্ছে নওসিএর বড়বোন। নওরিনের জীবনে একটা বড় দুর্ঘটনা ঘটেছিল। এরপর থেকে যখনই বিয়ে আসতো সেটা ভেঙ্গে যেত। সেই নওরিনের বিয়ে হয়েছে কয়েক মাস আগে। রিমি নিজেও সেই বিয়েতে গিয়েছিল। রিমি বলল, তুই বলতে চাস ঐ ছেলের সাথে প্রেম করেছে বলেই এমন হয়েছে?
নওসিন বলল, দেখ তুই বিশ্বাস না করিস এটা তোর ব্যাপার কিন্তু আমি বিশ্বাস করি এবং মানি। এছাড়া আমি অন্তত আর তিন জনের সাথে কথা বলেছি। তাদের সবার সাথেই এই একই জিনিস ঘটেছে। তুই যখন এতো হতাশ হচ্ছিস তখন তুই একবার চেষ্টা করেই দেখ। সমস্যা কী? না হলে না হবে! আর যদি বিশ্বাস নাই থাকে তবে করিস না। আমি কেবল তোকে একটা উপায় বলে দিলাম!
এই বলে সে রিমিকে একটা ফোন নম্বর টেক্সট করে দিল।
রিমি আপন মনে নম্বরটার দিকে তাকিয়ে হাসল। এমন একটা ব্যাপার বিশ্বাস করার আসলে কোন কারণ নেই। এমন কিছু কখনই সত্য হতে পারে না। সত্য হওয়ার কোন কারণ নেই।
বাসায় এসেও কয়েকবার ভাবল ব্যাপারটা নিয়ে। নওসিনের মতে যদি এই ছেলেটার সাথে সে প্রেম করে তবে একটা সৌভাগ্য তার সামনে এসে হাজির হবে। কী হাস্যকর একটা ব্যাপার। নওসিনের মতে মানুষ অনেক কিছু করতে পারে না কিংবা তার কাছে সেই কাঙ্খিত সৌভাগ্য আসে না কারণ একটা বাধা তার সামনে এসে দাঁড়ায়। এই ছেলেটা নাকি সেই বাধা ডিঙ্গিয়ে দেয়। তার সাথে প্রেম করলেই এমনটা হয়। একবার ভালোবাসি বললেই হল। সব বাঁধা অতিক্রম করে সেই সৌভাগ্য তার সামনে এসে হাজির হয়! আসলেই কি এমনটা হয় কোন দিন?
অবশ্য একজন যখন পানিতে ডুবে মরতে যায় তখন সে যা পায় তাই ধরে বাঁচতে চায়। এমন কি খড়কুটো পেলেও সেটা ধরতে চায়। রিমির নিজেরও হয়েছে তেমন দশা। এখন ওর একটা চাকরির খুব বেশি দরকার। নয়তো এখনই তাকে বিয়ে করে ফেলতে হবে। এটাই তার বাবা শর্ত দিয়েছে। সময় আছে আর মাত্র মাস তিন মাস। তার বাবা তাকে শর্ত দিয়েছিল যে পড়ালেখা শেষ করার এক বছরের মধ্যে তাকে চাকরি পেতে হবে নয়তো তার বাবার পছন্দের মত ছেলেকে বিয়ে করতে হবে। রিমি সেটা মেনে নিয়েছিল। সেই সময় আস্তে আস্তে পার হয়ে যাচ্ছে। হাতে আর মাত্র তিন মাস সময় আছে। এর ভেতরে তাকে একটা ভাল মানের চাকরি যোগার করতে হবে।
রিমি নিজের মাথা থেকে ছেলেটার চিন্তা দূর করে দিল। কদিন পরেই একটা পরীক্ষা রয়েছে। সরকার চাকরি। নবম গ্রেডের। এই চাকরিটা যদি কপালে জুটে যেত তবে আর কিছুর দরকার পরতো না। তাই সে অন্য সব কিছু ভুলে মন দিয়ে পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে লাগল। কিন্তু কদিন পরেই বুঝতে পারল যে এই পরীক্ষাতেও ঠিক আগের মত হবে। আসলে বাইরে এতো পরিমান প্রতিযোগিতা যে রিমি তাদের সাথে পেরে উঠবে না। আসলে একে একে বেশ কয়েকটা পরীক্ষাতে ভাল না করার ফলে রিমির মনের আত্মবিশ্বাস গিয়েছে। এই কারণে তার মনে হচ্ছে যে সে আসলে পারবে না। তখনই মনে হল ছেলেটার কথা। মনে মনে ভাবল যে একবার চেষ্টা করে দেখলে সমস্যা কী!
এমনতো ব্যাপার না যে জীবনে সে প্রেম করে নি। এই কদিনের জন্য আরেকটা প্রেম করলে সমস্যা কী!
একটু দ্বিধা নিয়েই সে নম্বরটাতে ফোন দিল। রিং হতে থাকল। একবার দুই বার তিনবার! তারপর এক সময় লাইন কেটে গেল। ছেলেটা ফোন ধরল না। আরেকবার ফোন দিতে গিয়েও দিল না। প্রথমবার ফোন না ধরায় রিমি যেন আবারও বাস্তবে ফিরে এল। কী একটা কাজ করতে যাচ্ছিল। নিজের উপরেই খানিকটা বিরক্ত হল। ভাগ্য ভাল যে ছেলেটা ফোন ধরে নি। যদি ফোন ধরতো তবে সে ছেলেটাকে কী বলত?
হ্যালো আমি আপনার সাথে প্রেম করতে চাই। আপনার সাথে প্রেম করলেই নাকি সবার ভাগ্য খুলে যায়!
কী হাস্যকর শোনাচ্ছে ব্যাপারটা !
রিমি ঠিক করল যে এখনই যে ছেলেটার নম্বর ব্লক করে দেবে। এই নম্বরে সে আর ফোন করতে চায় না। কিন্তু সেই সুযোগ আর হল না। যখন নম্বরটা ব্লক করতে যাবে ঠিক তার আগেই ফোনটা বেজে উঠল। রিমির নম্বরটা চিনতে কষ্ট হল না। সে কয়েক মুহুর্ত চিন্তা করল। একবার মনে হল ফোনটা ধরবে না কিন্তু আবার মনে হল সে নিজেই তো দিয়েছে তাহলে কেন ধরবে না? আর একবার কথা বললে কী এমন সমস্যা হবে!
-হ্যালো!
রিমি হ্যালো শোনার পরও কিছু সময় চুপ করে রইলো। ছেলেটা আবারও বলল, হ্যালো!
-হ্যালো।
-আপনি দিয়েছিলেন। আম ধরতে পারি নি।
ছেলেটার কন্ঠ এমন ছিল যেন ছেলেটা ফোনটা ধরতে পারে নি এই জন্য সে বেশ অনুতপ্ত। এমন একটা কন্ঠ শুনে রিমির মনে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হল! মনে হল যেন ছেলে তার অনেক দিনের চেনা। অনেক দিনের আপন কেউ। এমন একটা অদ্ভুত অনুভূতি হওহার কারণ রিমি জানে না।
রিমি বলল, না আসলে ঠিক আছে। আমি বরং রাখি।
ফোনের ওপাশ থেকে একটু হাসির শব্দ হল। ছেলেটা বলল, আপনি সম্ভবত একটু লজ্জা পাচ্ছেন বা দ্বিধা করছেন কথাটা বলতে। তাই না?
রিমি এবার একটু লজ্জা পেল। আসলেই ব্যাপারটা তো একটু লজ্জা পাওয়ার মতই ব্যাপার। একজন মানুষের সাথে প্রেম করার ব্যাপারটার ভেতরে একটা লজ্জার ব্যাপার রয়েছে সেখানে একেবারে অপরিচিত একজন মানুষকে ফোন করে প্রথমবারেই তার সাথে প্রেম করতে চাওয়ার ব্যাপারটা অবশ্যই লজ্জার এবং অস্বস্তির।
ছেলেটা বলল, আপনার লজ্জা পাওয়ার কারন নেই। আপনি চিন্তা করবেন না। আমার সাথে এমনটা হয়ে আসছে। মানষ মানে মেয়েরা একেবারে প্রথম পরিচয়েই আমাকে ভালোবাসি বসে আসছে। আমার ব্যাপারটা মজাই লাগে।
এবার রিমি একটু যেন সহজ হল। আসলে প্রথমে কিভাবে সে ছেলেটাকে এই কথাটা জিজ্ঞেস করবে সেটাই ভাবছিল। ছেলেটাই যখন নিজ থেকে বলে দিল তখন ব্যাপারটা সামনের দিকে এগিয়ে নেওয়া যায়।
রিমি তখন প্রশ্নটা করল। সে জানতে চাইল, সত্যি কি কাজ হয়?
-আপনার কী মনে হয়? কাজ হয় না?
-না মানে আমি তো আর জানি না।
-এই পর্যন্ত ৩৪ জনের জন্য কাজ হয়েছে। আমার মোট ৩৫টা প্রেমিকা হয়েছে।
-একজনের বেলায় কাজ হল না কেন?
-সম্ভবত সেই মেয়েটি আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসে নি, তাই হয় নি।
-তার মানে আপনাকে সত্যি সত্যি ভালোবাসতে হবে?
-হ্যা।ভালোবাসা দিয়ে পাহাড় পর্যন্ত নড়ানো যায় আর সামান্য বিপদ পার করা যাবে না এমন তো না। তাই সত্যিই যদি আপনি সৌভাগ্য চান তবে আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসতে হবে। আমি আপনার জন্য এই কাজ করতে পারব। আপনি চিন্তা করবেন না।
ফোন রেখে রিমির মনে অদ্ভুত এক অনুভূতি হতে লাগল। এইভাবে সে একজন প্রেমিক যাবে? এখন থেকে নিহান নামের এই ছেলেটা তার প্রেমিক।
এরপর থেকেই নিয়মিত নিহানের সাথে রিমির নিয়মিত যোগাযোগ হতে লাগল। অবশ্য প্রথম প্রথম কেবল ফোনেই কথা আর টেক্সট দেওয়া নেওয়া হতে লাগল। একেবারে সত্যিকারের প্রেমিকের মতই নিহান ওর সাথে আচরণ করতে লাগল। রিমির ব্যাপারটা খারাপ লাগল না। যেদিন প্রথম প্রথম ওদের দেখা হল, রিমি বেশ সেজেগুজেই গেল। নিহানকে দেখে রিমির মনের ভেতরে অদ্ভুত একটা অনুভূতি হতে শুরু করল। কেন করল সেটা রিমি নিজেও জানে না।
এই মানুষটার প্রতি তার অনুভূতি তৈরি হওয়ার কথা না। তারপরেও হচ্ছে। এইভাবে কারো প্রেমে পড়া যায় না। তবে রিমি যেটা অনুভব করতে পারছে যে নিহানের প্রতি তার অনুভূতিটা মিথ্যা বা লোক দেখানো নয়। এই ছেলেটার প্রতি সে সত্যিই ভালোবাসা অনুভূব করছে। কেন যে এমন হচ্ছে সেটা রিমি বুঝতে পারছে না।
এরপর থেকে রিমি ঘন ঘন নিহানের সাথে দেখা করতে লাগল। প্রায় বিকেলেই সে নিহানকে নিজের টিউশনির বাসার সামনে আসতে বলত। টিউশিনি শেষ করতে করতে রিমির বিকেল হত। সেখান থেকে বের হয়ে নিহানের সাথে ঘুরতে বের হত। কখনো রিক্সায় বা কখনো হেটে। ব্যস্ত রাস্তায় অরা এদিক ওদিক হাটতো।
রিমি প্রায়ই লক্ষ্য করতো যে নিহানের শরীর খারাপ থাকত। প্রায়ই ঠান্ডা বা জ্বর হত। তবে সেটা সেরে উঠতে সময় লাগত না। তবে একদিন একটা ভয়ংকর ব্যাপার ঘটে গেল। ঠিক রিমির ভাইভার আগের দিন। নিহান গাড়ির সাথে এক্সিডেন্ট করে হাত ভেঙ্গে ফেলল। রিমিকে অবশ্য নিহান কিছুই জানালো না সেই ঘটনা। রিমি জানতে পারল ভাইভা থেকে বের হওয়ার পরে। তার ভাইভা অসম্ভব ভাল হয়েছে। রিমি প্রায় নিশ্চিত যে এই চাকরিটা তার হয়েই যাবে। সে যখন নিহানের সাথে দেখা করতে গেল তখন দেখতে পেল যে নিহানের হাত ভেঙ্গে গেল।
রিমি অনুভব করল যে ওর বুকের ভেতরে একতা কষ্ট যেন মোচড় দিয়ে উঠেছে। এই অনুভূতি একেবারে সত্যি। রিমির চোখ দিয়ে আপনা-আপনি পানি বের হয়ে এল। বলা যায় সবার সামনেই রিমি নিহানকে জড়িয়ে ধরল। রাগত কন্ঠে বলল, আমাকে কেন জানাও নি?
-আরেক কাল না তোমার ভাইভা ছিল! আমি চাচ্ছিলাম যেন তোমার কোনো টেনশন কাজ না করে। একবার ভাবো তো যদি আমার এই দুর্ঘটনার কথা জানতে তাহলে কি ঠিকমত ভাইভা দিতে পারতে?
-না পারলে না পারতাম!
-আরে এই ভাবে বললে হয় নাকি!
-তুমি খুব খারাপ! খুব। তোমার সাথে ব্রেক আপ ব্রেক আপ।
যদিও ব্রেকআপ বলল তবে আরো যেন একটু বেশি শক্ত করে জড়িয়ে ধরল নিহানকে। এর পরের কয়েকদিন রিমি বলতে গেলে প্রায় সব সময়ই নিহানের সাথেই রইলো। ওর দেখা শুনা করতে লাগল। হাতে করে খাইয়ে দিতে লাগল।
তারপর ঠিক এক মাসের মাথায় রিমির চাকরি হয়ে গেল। রিমি অবিশ্বাস্য চোখে রেজাল্টের দিকে তাকিয়ে ছিল। সে ভাবতেই পারছিল না যে সরকারি চাকরিটা হয়ে যাবে।
কিন্তু কেন জানি রিমির চাকরি নিয়ে খুব বেশি আনন্দিত হতে পারল না। কারণ রিমি জানে চাকরি হয়ে যাওয়া মানেই হচ্ছে নিহানের সাথে ব্রেকআপ করার সময় চলে আসা। নিহান একেবারে শুরুতেই এই কথাটা তাকে বলেছিল। বলা যায় এটাই ছিল তার একমাত্র শর্তর
কিন্তু রিমি কিছুতেই সেটা মানতে রাজি হল না। সে নিহানের সাথে কিছুতেই সম্পর্ক নষ্ট করবে না। সে ঠিক করে নিল যে নিহানের সাথে সে সম্পর্ক চালিয়ে যাবে এবং সত্যি বলতে কি নিহানকে সে বিয়ে করার কথাও ভাবছিল। চাকরি যেহেতু হয়েছে এখন সে এই কাজটা করতেই পারে! কিন্তু রিমি সেই সুযোগ পেল না। নিহানের সাথে রিমির আর দেখাই হল না। রিমি কয়েকবার নিহানকে ফোন করার চেষ্টা করল কিন্তু কাজ হল না। একেবারে যখন নিহানের ভাড়ার বাসায় গিয়ে হাজির হল দেখল সেই বাসা তালা মারা। বাড়িওয়ালা জানালো যে নিহান বাসা ছেড়ে দিয়েছে গতকাল। রিমি কিছুতেই বিশ্বাস করতে পারছিল না ব্যাপারটা। নিহান কোন ভাবে আগেই জেনে গেছে ওর চাকরির ব্যাপারটা এবং এটাও টের পেয়ে গেছে যে রিমি ওর সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতে রাজি হবে না তাই আগে থেকেই সে রিমির জীবন থেকে গায়েব হয়ে গেছে। কিন্তু কেন!
পরের দুই তিন মাস রিমি পাগলের মত নিহানকে খুজে বের করার চেষ্টা করল কিন্তু কাজ হল না। নিহানের কোন খোজ সে বের করতে পারল না। নওসিনের কাছে গেল তারপর তার বোন নওরিনের কাছে গেল কিন্তু নিহানের ব্যাপারে আলাদা কোন খবর সে বের করতে পারল না।
দুই
তারপর এক সময়ে এভাবেই দিন পার হতে লাগল। রিমির মনে হয়েছিল যে নিহানকে বুঝি সে সময়ের সাথে ভুলে যেতে পারবে তবে নিহানকে সে ভুলতে পারল না। এবং এই মাত্র অল্প কয়েকদিনের ভালোবাসা থেকে নিজেকে বের করতেও পারল না। নিহান তার মনের ভেতরে একটা আলাদা অনুভূতি নিয়ে বসে রইলো। আর রিমি অন্য কাউকে সেই আসনে বসাতেও পারল না। নিহানই কেবল বসে রইলো সেখানে। প্রায় দুই বছর পরে নিহানের ব্যাপারটা আবারও তার সামনে এল।
একদিন অফিসে বসে কাজ করছিল তখন পিয়ন এসে জানালো যে একটা মেয়ে তার সাথে দেখা করতে চায়। কার্ডের নামটা দেখল রিমি। আরিয়ানা পারবিন। এই মেয়েকে সে চেনে বলে মনে হল না। তারপরেও নামের শেষের পদবি দেখে মানা করতে পারল না। ভেতরে নিয়ে আসতে বলল।
আরিয়ানা নামের মেয়েটা ঘরে ঢুকে একটু হাসল। তারপর ওর দিকে তাকিয়ে বলল, তুমি আমাকে চিনবে না। তবে আমরা দুজনের ভেতরে খুব বড় একটা মিল আছে!
প্রথম দর্শনে তুমি বলে সম্মোধনটা রিমির কাছে একটু যেন অদ্ভুত মনে হল। তবে মেয়েটা তার বয়সীই হবে। রিমি তবুও কিছুতা দ্বিধা নিয়েই তাকিয়ে রইলো আরিয়ানার দিকে। আরিয়ানা চেয়ারে বসতে বসতে বলল, অবাক হচ্ছো?
-কিছুটা! আমাদের ভেতরে কিভাবে মিল আছে!
আরিয়ানা কিছুটা সময় চুপ করে থেকে বলল, আমরা দুজনই একজন মানুষকে ভালোবাসি! এবং কিছুতেই তাকে মন থেকে বের করতে পারছি না।
রিমির মনে হল ওর বুকের ভেতরে কেউ যেন ছুরি চালিয়ে দিল! এই মেয়েটা নিহানকে ভালোবাসে। তার মানে কি এই মেয়েটাও নিহানের প্রেমিকা ছিল।
-তুমিও নিহানকে …।
-হ্যা। আমিও। ওর ৩৬জনটা প্রেমের ভেতরে আমরাই একমাত্র দুইজন যারা এখনও ওকে মন থেকে বের করতে পারি নি। বাকি সবাই আস্তে আস্তে নিজেদের জীবন নিয়ে বিজি হয়ে গেছে।
-তুমি নিহানের খোজ জানো?
-না জানি না। সম্ভবত জানবো না! ও সম্ভবত হারিয়ে গেছে। আর ফিরে পাবো না আমরা!
রিমি আবার হতাশ হল।
-তবে আমি নিহান সম্পর্কে অনেক কিছুই জানি। আর কেন জানি মনে হয় যে তোমার ব্যাপারটা জানা দরকার। এই কারণেই আমি তোমার কাছে এসেছি।
-কী জানা দরকার?
-তুমি নিশ্চয়ই তীব্র ভাবেই নিহানের সাথে জীবন পার করতে চাও। তাই না?
-হ্যা। যে কোন কিছুই বিনিময়েই!
-তবে এটা আসলে নিহানের জন্য ভালো কিছু হবে না।
-কেন এই কথা বলছো?
-কারণ তুমি যতই নিহানের সাথে থাকবে ওর জন্য নানান রকম বিপদ ডেকে আনবে!
রিমি কিছুতা বোকার মত তাকিয়ে রইলো আরিয়ানার দিকে। সে বলল, আমি ঠিক বুঝতে পারছি না।
আরিয়ানা বলল, আচ্ছা বল দেখি তুমি যখন অর সাথে ছিলে তখন কিছুটা অস্বাভাবিক ব্যাপার খেয়াল করেছো?
-কী রকম অস্বাভাবিক?
-ও প্রায়ই অসুস্থ থাকতো। ঠান্ডা জ্বর লেগেই থাকত। তাই না?
-হ্যা। হ্যা! এটা তুমি কিভাবে জানলে!
-ওগুলো তোমার কারণে হত!
রিমি যেন আকাশ থেকে পড়ল। বলল, মানে?
-মানে হচ্ছে তোমার উপরে থাকা বিপদ বা দুর্ভাগ্য নিহানের উপরে গিয়ে পড়ত। নিহান হচ্ছে অনেকটা ম্যাগনেটের মত। ম্যাগনেট কী করে? আশে পাশের সব চৌম্বক পদার্থ নিজের দিকে টেনে নেয়, নিহানও তাই করতো। তোমার সকল বিপদ আর দুর্ভাগ্য নিজের দিকে টেনে নিত। এটাই ওর অভিশাপ!
রিমি অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে রইলো আরিয়ানার দিকে! তার মানে যেদিন নিহানের হাত ভেঙ্গেছিল সেটা হয়েছিল অর চাকরির ফাঁরা কাটটে!
আরিয়ানা বলল, নিশ্চয়ই শেষ বার নিহানের বড় কিছু হয়েছিল?
-ওর হাত ভেঙ্গে গিয়েছিল! এই জন্য আমি এই চাকরি পেয়েছি!
-হ্যা। তুমি যতই ওর কাছে থাকবে ওর নানান বিপদ আসতে থাকবে। তোমার সকল বিপদ একলা ওর উপরে গিয়ে পড়বে।
দুজনই চুপ করে রইলো কিছুটা সময়। এরপর আরিয়ানা বলল, আমি যেদিন থেকে এটা জানতে পেরেছি সেদিন থেকেই নিহানকে খোজা বন্ধ করে দিয়েছি ওর সাথে থাকতে চাওয়ার ইচ্ছেটা দূর করেছি। ওর ভালোর জন্যই। আশা করি তুমিও তাই করবে! আমি এই জন্য খুজে বের করার চেষ্টা করছি কারা কারা নিহানের প্রেমিকা ছিল।
আরও কিছু সময় থাকল আরিয়ানা। তারপর চলে গেল। রিমি নিজের চেয়ারেই বসে থাকল। নিজের মনের ভেতরে একটু শান্তি অনুভূতি হচ্ছে ওর এখন। এতোদিন নিহানকে সে খুব করে দোষ দিত। ওকে ছেড়ে যাওয়ার জন্য ওর প্রতি রাগ ছিল খুব তবে এখন আর সেই রাগটা নেই।
তবে নিহানকে কাছে পাক বা না পাক রিমি নিহানকেই ভালোবেসে যাবে আজীবন। হয়তো নতুন কেউ আসবে জীবনে তবে ভালোবাসার মানুষ হিসাবে নিহান একটা আলাদা জায়গা দখল করে রাখবে রিমির মনে!
ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।
অপু তানভীরের দুটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।
Discover more from অপু তানভীর
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

শুরুতে ভেবেছিলাম এটা হয়তো সাধারণ প্রেমের গল্প, কিন্তু আরিয়ানার মুখ থেকে সত্যিটা বেরিয়ে আসার পর পুরো ব্যাপারটাই অন্য রকম লাগল। নিহানের ওই নীরব আত্মত্যাগের জায়গাটা বেশ সময় ধরে মনে থাকবে।
গল্পটা পড়ে ভালো লাগল।
সত্যি বলতে কি যখন গল্পটা শুরু করেছিলাম তখন গল্পটা এইদিকে নিয়ে যাবো ভাবি নি। অন্য ভাবে শেষ করার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এইভাবে শেষ হল।