প্রিয়ন্তি বিয়ে করতে চায় না

4.9
(18)

রেস্টুরেন্টের কোলাহল আজকে প্রিয়ন্তির কাছে অসহ্য লাগছে। সামনেই ওর সব থেকে পছন্দের এক্সপ্রেসোর কফি রাখা তারপরেও অন্য কোন চিন্তা যেন ওকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। কিছুই যেন ভাবছে না সে। মাথার ভেতরটা অস্থির হয়ে আছে। কোন কিছুই সে শান্ত ভাবে চিন্তা করতে পারছে না। দুপুরের মায়ের হাতে খাওয়া চড়টা যেন এখনও ঘুরে ফিরে আসছে।
ঘরে বসে কিছু সময় কান্না করেছে। সব কিছু ছেড়ে ছুড়ে দিয়ে চলে যেতে ইচ্ছে করেছে কিন্তু একটা সময় পরে প্রিয়ন্তি ঠিকই বুঝতে পেরেছে যে ওর আসলে কিছুই করার নেই। এই দেশের মেয়েদের কিছু সীমাবদ্ধতা আছে যা বেশির ভাগ মেয়েই কোন দিন পার করতে পারে না। প্রিয়ন্তি তাই দুপুরের তীব্র জেদ ধরে রাখার পরেও এখন এই বিকেল বেলা ঠিকই দেখা করতে এসছে বাবার ঠিক করা পাত্রের সাথে। পাত্র এখনও আসে নি। অফিস শেষ করে আসবে।
-তোমার কফি ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে !
প্রিয়ন্তি চোখ তুলে তাকাল। মানুষটাকে সে আগে একবার দেখেছে। গত সপ্তাহে শাহেদ তার বাবা মা সহ প্রিয়ন্তিদের বাসায় এসেছিল। সেখানেই পারিবারিক ভাবে দেখা সাক্ষাত হয়েছে। পরে তাদের বিয়ের কথা বার্তা মোটামুটি পাঁকা হয়ে গেছে। যদিও প্রিয়ন্তির এই বিয়েতে মোটেই মত নেই। সে এখন কোন ভাবেই বিয়ে করতে চায় না। সবে মাত্র অনার্স থার্ড ইয়ারে উঠেছে সে। এখনই তার বিয়ে করার কোন ইচ্ছে নেই।
কিন্তু প্রিয়ন্তির কোন ইচ্ছে এখানে কাজে দিবে না। ওর বাবা মায়ের যখন ইচ্ছে তখন প্রিয়ন্তির ইচ্ছের কোন মূল্য নেই সেটা সে খুব ভাল করেই জানে। দেখা যাবে এই সামনের মাসের ভেতরেই ওর বিয়ে হয়ে যাবে। ও কোন ভাবেই সেটা মানা করতে পারবে না।
প্রিয়ন্তি কোন কথা বলল না। চুপ চাপ কাপে চুমুক দিল। চুমুক দিয়ে মন ভাল হয়ে গেল। এই ব্যাপারটা প্রিয়ন্তির ভেতরে আছে। কফিতে চুমুক দিলেই ওর মন ভাল হতে শুরু করে। যে কোন বিরক্তির কারণ মন থেকে দ্রুত চলে যায়। প্রিয়ন্তি আরেকটা চুমুক দিল। তখনও সে শাহেদের সাথে একটা কথাও বলে নি। শাহেদ চুপ করে ওর কফি খাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রিয়ন্তি শাহেদের চোখের মুগ্ধতার ব্যাপারটা খেয়াল করল ।
তারপরই শাহেদ প্রশ্নটা করল । বলল, তুমি বিয়ে করতে চাও না?
-এই প্রশ্ন কেন জানতে চাচ্ছেন?
-জানতে চাওয়া কি স্বাভাবিক না? বিয়েতে মত নেই তোমার?
-এই দেশে বিয়েদের মেয়েদের মতের খুব একটা দাম নেই। বিশেষ করে ছেলে যখন মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানীতে ভাল চাকরি করে বছর বছরে দেশে বিদেশে বেড়াতে যায় তখন তো আরও নেই।
শাহেদ প্রিয়ন্তির গলার উত্তাপটা বেশ ভালই বুঝতে পারল । তারপর বলল, তার মানে বিয়েতে মত নেই। কারণটা কি জানতে পারি?
-কোন কি দরকার আছে বলুন?
-আছে। আমাকে অপছন্দ নাকি অন্য কাউকে পছন্দ?
-কোনটাই না।
-তাহলে?
-তাহলে কারণ হচ্ছে আমি এখন বিয়ে করতে চাই না। জাস্ট চাই না। এটাই কি সব থেকে বড় কারণ হতে পারে না? আমি কাউকে ভালোবাসি না। অন্য কাউকে পছন্দও করি না। আপনাকে চিনিও না আপনাকে অপছন্দ হওয়ার কোন কারণ নেই । আপনি দেখতে শুনতে ভাল, ভাল চাকরি করেন, যে কোন মেয়েই আপনাকে পছন্দ করবে, হয়তো আর বছর দুয়েক পরে এই বিয়ের প্রস্তাব এলে আমিও রাজি হয়ে যেতাম। কিন্তু এখন আমি বিয়ে করতে চাই না। এই কারণটা কি যথেষ্ঠ?
শাহেদ আবারও চুপ করে রইল । কোন কথা বলল না। প্রিয়ন্তি আবার বলল, আপনি কি বলতে ডেকেছেন সেটা বলুন।
শাহেদ শান্ত কন্ঠে বলল, এটাই জানতে এসেছিলাম। মনে হচ্ছে যে আমার উত্তর আমি পেয়ে গেছি। চিন্তা কর না। ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমাকে তোমার বিয়ে করতে হবে না। আমি বাসায় গিয়ে মানা করে দিব।
প্রিয়ন্ত এবার একটু চমকালো। এটা সে কিছুতেই আশা করে নি। শাহেদের দিকে সে ভাল করে এবার তাকাল। এর আগের সে শাহেদের দিকে কেবল বিরক্তি আর অসন্তুষ্টি নিয়ে তাকিয়ে ছিল তবে আজকে সে তাকাল অন্য ভাবে। অন্য চোখে। প্রিয়ন্তির মনে হল যে ছেলেটা আসলে একেবারে মন্দ নয়। সত্যি বছর দুয়েক পরে যদি শাহেদ প্রস্তাব নিয়ে আসত তবে সে রাজি হয়ে যেত।
শাহেদ বলল, দেখ আমি লুকাবো না কিছু তোমার কাছ থেকে। তোমাকে আমার অসম্ভব পছন্দ হয়েছে। কেবল আমারই আমার বাবা মা দুজনই তোমাকে খুব পছন্দ করেছে। এই কারণে যাতে তুমি অন্য কোথাও হারিয়ে না যাও তাই তাড়াহুড়া করে আমরা এগিয়েছি।
প্রিয়ন্তির কাছে হারিয়ে যাওয়া শব্দটা অদ্ভুত মনে হল। শাহেদ বলল, তবে তার মানে মানে এই না যে তোমার ইচ্ছের বিরুদ্ধে আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই। তবে একটা প্রস্তাব কি দিতে পারি?
প্রিয়ন্তি বুঝতে পারছে যে শাহেদের ব্যবহার ইতিমধ্যেই ওর মনের ভাব নমনীয় করে দিয়েছে। প্রিয়ন্তি বলল, কী প্রস্তাব?
শাহেদ একটু দম নিল। তারপর বলল, যেহেতু তুমি অন্য কাউকে পছন্দ কর না আর আমাকে অপছন্দও হয় নি তাহলে এমন কি হতে পারে যে এখন আমাদের কেবল এঙ্গেইজমেন্ট হয়ে থাকল। তারপর যখন তোমার পড়াশোনা শেষ হবে, বা তোমার যখন মনে হবে যে এখন বিয়ে করা যায় তখন আমাদের বিয়ে হল।
এবার প্রিয়ন্তি শাহেদের চোখের দিকে তাকাল ভাল করে। প্রিয়ন্তির মনে হল শাহেদ নামের মানুষটা তার প্রেমে হাবুডুবু খাচ্ছে! একটু অবাক না হয়ে পারল না সে। কারণ একেবারে বিশ্বসুন্দরী যাকে বলে প্রিয়ন্তি সেটা নয়। চলনসই বলা চলে। স্কুল কলেজে সে প্রেমের কয়েকটা প্রস্তাব যে পায় নি সেটা বলবে না তবে এভাবে হাবুডুবুর খাওয়ার মত কিছু ছিল না। কিন্তু তারপরেও এই মানুষটা কেন তার প্রেমে পড়ল এভাবে?
প্রিয়ন্তি বলল, আপনার প্রস্তাব আমি ভেবে দেখতে পারি তবে একটা শর্তে?
-কী শর্ত বল?
-আপনি আমার প্রেমে পড়লেন কেন?
প্রশ্নটা শুনে শাহেদ একটু যেন চমকে উঠল। প্রিয়ন্তির কাছ থেকে এমন সরাসরি প্রশ্ন সে সম্ভবত আশা করে নি। প্রিয়ন্তি আবারও বলল, আমি জানতে চাইছি আপনি এভাবে আমার প্রেমে পড়লেন? আমি এমন আহামরি সুন্দরী না যে প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাবেন যে একেবারে আমাকে ছাড়া চলবেই না। তাই না? সত্যি করে বলেন দেখি!
শাহেদ আরও কিছু সময় চুপ করে থেকে বলল, আসলে … কিভাবে উত্তর দিবো আমি জানি না। এটাকে প্রেম বলে নাকি অন্য কিছু বলে সেটাও জানি না। তোমাকে আমি দেখেছিলাম মাস ছয়েক আগে। আমি শাহবাগের জ্যামের বসে ছিলাম। তুমি সম্ভবত ক্যাম্পাসে যাচ্ছিলে। সেই সময় শাহবাগের ওখানে একটা কুকুরের পায়ের উপর দিয়ে একটা গাড়ি চলে যায়। কুকুরটা খুব চিৎকার করছিল। সেই সময়ে ক্যাম্পাসের বাস থেকে একজন তরুনী নেমে আসে। দ্রুত কুকুরটাকে কোলে নিয়ে বার্ডেমের দিকে দৌড়ায়। অদ্ভুত এক দৃশ্য। আশে পাশের অনেকেই সেটা দেখছিল অনেকে হাসছিল বটে। কুকুরের জন্য এতো দরদের দরকার কী! বার্ডেমে যখন জানালো যে এখানে কুকুরের চিকিৎসা হবে না, পশু হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে তখন সেই সেই মেয়েটি খুব হতাশ হয়। শেষে বাধ্য হয়ে পাশের দোকান থেকে ওষুধ কিনে নিজেই সেটা কুকুরটার পায়ে ব্যান্ড-এইড বেধে দিচ্ছিল। সেই মেয়েটির মুখের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল যেন সে সত্যিই কুকুর কষ্টে কষ্ট পাচ্ছে।

শাহেদ এই কথাগুলো বলে একটু থামল। তারপর বলল, একবার ভাবো তো! যে মেয়েটির মনে সামান্য কুকুরের জন্য এতো ভালোবাসা এতো মায়া, সে তার ভালোবাসার মানুষদের জন্য কী করবে! সেদিন রাতে আমি কিছুতেই ঘুমাতে পারিনি। বারবার কেবল সে মায়াময় ছলছল চোখের মেয়েটির কথা ভেবেছি। তারপর থেকে একটা এমন দিন নেই যে আমি মেয়েটিকে মনে করি নি। আমি কতবার যে ঢাবির ক্যাম্পাসে গিয়ে ঘুরে বেরিয়েছি কেবল এই আশাতে এই মেয়েটিকে আরেকবার আমি দেখতে পাবো! দিনের পর দিন আমি এই কাজ করেছি কিন্তু দেখা যায় নি। আমি ভেবেছিলাম যে হয়তো মেয়েটির সাথে আমার আর দেখাই হবে না। কিন্তু তারপরেই মেয়েটিকে আমি আবারও দেখতে পেলাম। আমাদের অফিসেই তার বাবার সাথে সেই মেয়েটি এসে হাজির! কী অদ্ভুত মানুষের ভাগ্য!

প্রিয়ন্তি চোখ তুলে তাকালো শাহেদের দিকে। শাহেদ চোখ কী তীব্র অনুভূতি সে দেখতে পাচ্ছে কোন মেয়ের পক্ষে সেই ভালোবাসা উপেক্ষা করা সম্ভব না। শাহেদ আবার বলল, আমাকে তুমি যতদিন অপেক্ষা করতে বলবে আমি করব। দুই বছর, ৫ বছর যতদিন।

প্রিয়ন্তির মনে অদ্ভুত একটা অনুভূতি এসে হাজির হল। এমন ভাবে সত্যি মানুষ মানুষের প্রেমে পড়তে পারে? এমন ভাবে কেউ কারো জন্য অপেক্ষা করতে পারে? প্রিয়ন্তির মনের ভেতরের পরিবর্তণটা সে নিজেও খুব ভাল করে টের পাচ্ছিল। এখানে আসার আগে কী বিরক্তিই নিয়েই না সে এসেছিল কিন্তু এখন সামনে বসা এই মানুষটাকে তার বড় আপন মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে বাকি জীবনটা এই মানুষটার সাথে কাটিয়ে দেওয়া যায়! সত্যিই যায়!

শাহেদ একেবারে প্রিয়ন্তিকে বাসা পর্যন্ত পৌছিয়ে দিয়ে গেল। যখন শাহেদ চলে যাচ্ছিল তখন প্রিয়ন্তি তাকে ডাক দিল।
-শুনছেন?
-বল!
-এখন এঙ্গেইজমেন্ট না চাইলে আপনি আকদ করে রাখতে পারেন! তবে পড়া শেষ করে তবেই অনুষ্ঠান হবে এর আগে না কিন্তু!

কথাটা বলতে গিয়ে প্রিয়ন্তির কান যেন গরম হয়ে গেল। বিকেলেই সে কঠিন কন্ঠে মানুষটাকে বলেছিল যে এখন সে কিছুতেই বিয়ে করতে চায় না অথচ এখন নির্লজ্জের মত বলছে আকদ করে রাখতে! এতো লজ্জা লাগল! প্রিয়ন্তি আর দাঁড়াল না সেখানে। এক ছুটে বাড়ির ভেতরে ঢুকে গেল। প্রিয়ন্তি যদি আরেকটু সময় দাঁড়িয়ে থাকত তবে দেখত যে শাহেদ আনন্দে এল লাফ দিয়ে উঠেছে।

মানুষের মন বড় অদ্ভুত! কখন কার প্রেমে পড়ে যায় কেউ তা বলতে পারে না! কে কখন বড় আপন হয়ে যায় কেউ বলতে পারে না।

 ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের দুটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা রকমারী বা ফেসবুকে থেকে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.9 / 5. Vote count: 18

No votes so far! Be the first to rate this post.


Discover more from অপু তানভীর

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →

2 Comments on “প্রিয়ন্তি বিয়ে করতে চায় না”

  1. প্রিয়ন্তির দ্বিধা-দোলাচল আর শাহেদের সেই কুকুরের গল্পটা সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে গেল। আপনার লেখার মধ্যে এই রকম নরম অনুভূতিগুলো খুব সুন্দরভাবে ফুটে ওঠে। ভালো লাগলো অনেক, আরও লিখুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *