বিল্ডিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে আমি আর রিমি দুজনেই কিছু সময় কী যেন ভাবলাম। আমি জানি না রিমি মনের কী ভাবনা কাজ করছে তবে আমার কাছে অদ্ভুত এক বিষন্নতা ভর করে রইলো। যে কোন সম্পর্ক নষ্ট হলে সেটা কারোই ভাল লাগার কথা না। শেষ হয়ে যাওয়ার আগে নিজেদের ভেতরকার সেই আনন্দময় মুহুর্তগুলো বারবার মনে পড়তে থাকে। এই জন্য মানুষ যখন ডিভোর্স পেপারে সাইন করতে যায় তখন তাদের মন বিষন্ন হয়।
আমি আরেকবার রিমির দিকে তাকালাম। রিমির মনে আসলে এখন কী চলছে সেটা আমার জানার কথা না। হয়তো আমার মই সেও খানিকটা বিষন্ন অথবা ওর মনে একটা আনন্দ কাজ করছে যে শেষ পর্যন্ত আমার কাছ থেকে সে মক্তি পাচ্ছে। চিরোতরে মুক্তি পাচ্ছে। আমার আর কোন স্মৃতিই তার মনে থাকবে না। না ভাল না খারাপ। আমি একেবারে রিমির জীবন থেকে হারিয়ে যাবো। ঠিক একই ভাবে রিমিও আমার জীবন থেকে একেবারে হারিয়ে যাবে। রিমি নামের কোন মেয়ের সাথে আমার পরিচয় ছিল এই ব্যাপারটা আমার আর মনে থাকবে না। ওর সাথে করা ঝগড়ার কথাগুলোও আমার আর মনে থাকবে না। রাতের শান্তির ঘুম আর নষ্ট হবে না।
আমি রিমির দিকে তাকিয়ে বললাম, চল তাহলে যাওয়া যাক!
রিমি শান্ত কন্ঠে বলল, হ্যা চল। দেরি করে লাভ নেই।
আমরা দুজনেই দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করলাম। আমাদের দুজনেরই আজকে এই সময়ে এপোয়েন্টমেন্ট নেওয়া আছে এই সেন্টারে। প্রয়োজনীয় অনুমতিপত্র আমরা আগেই নেওয়া হয়েছি। তাই আজকে কোন ঝামেলা হবে না। রিশিপশনে গিয়ে দুজনে নিজেদের এপোয়েন্টমেন্টের কথা বললেই আমাদের দুজনকে দুইটা কার্ড দেওয়া হল। কার্ডে আলাদা আলাদা রুম নম্বর দেওয়া। আমাদের এখন এই রুম গিয়ে হাজির হতে হবে। তারপরই প্রক্রিয়া শুরু হবে।
আমরা আবারও করিডোর দিয়ে ধীরে পায়ে হাটতে শুরু করলাম। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে আরেকটু বেশি সময় ধরে রিমির পাশে হাটি। এটাই ওর সাথে আমার শেষ হাটা। এরপরে আর হয়তো কখনই রিমির পাশে আমার হাটাই হবে না। করিডোরের এক স্থানে এসেই দুই দিকে ভাগ হয়ে গেছে। এবার আমাদের আলাদা হয়ে যেতে হবে।
আমি একটু থমকে দাঁড়ালাম। শেষবারর মত রিমিকে আমার কী বলা উচিৎ?
আবার দেখা হবে?
না, আবার তো দেখা হবে না। আবার যাতে না দেখা হয় এই জন্যই আমরা এখানে এসেছি।
তাহলে কী বলব?
ভালো থাকো? সুখে থেকো?
আমি কিছু বলতে যাব তার আগেই আমাকে কিছুটা অবাক করে দিয়েই রিমি আমাকে জড়িয়ে ধরল। বেশ শক্ত করেই। তারপর জড়িয়ে ধরা অবস্থাতেই রিমি বলল, আমাদের জুটিটাই ভাল ছিল না। কিন্তু তারপরেও তোমার সাথে অনেক চমৎকার সময় আমি কাটিয়েছি। এতোগুলো দিন আমরা এক সাথে ছিলাম।
রিমি কিছু সময় বিরতি দিল। তারপর আবারও বলল, ভালো থেকো। আর হয়তো আমাকে চিনবে না আমাকে! আমিও চিনব না তোমাকে!
রিমি আর কিছু বলল না। তারপর আমাকে ছেড়ে দিয়ে করিডোরের অন্য দিকে বের হয়ে রওয়ানা দিল। আমি সেখানেই দাঁড়িয়ে রইলাম আরো কিছু সময়। আমার মনের ভেতরে আবারও সেই বিষন্নতা খেলা করতে লাগল। রিমি করিডোরের শেষ মাথার দরজায় ঢোকার আগে একবার ফিরে তাকালো আমার দিকে। আমার দিকে তাকিয়ে একটু হাসল। তারপর হাত নাড়ল। শেষ বিদায়।
আমিও হাত নাড়লাম। তারপর দেখতে পেলাম রিমি দরজা খুজে ভেতরে ঢুকে পড়ল।
সাদা এপ্রোন পরা মেয়েটি আমার মাথার ভেতরে হেলমেট পরাতে পরাতে বলল, একটু মাথা ধরতে পারে, মাথাটা ভারভার ফিল হবে তবে চিন্তার কোনো কারণ নেই। সব ঠিক থাকবে।
আমি বললাম, আমি বললাম কত সময় লাগবে?
-এই ধরুন ঘন্টা চারেক সর্বোচ্চ। তবে কমও লাগতে পারে। এটা মূলত নির্ভর করে যে আপনি মানুষটার সাথে কতদিন ধরে পরিচিত। যত বেশি দিন ধরে পিরিচিত তত বেশি স্মৃতি তত বেশি সময়। আমাদের হিসাব মত কেউ যদি শৈশবের পরিচিত কারো স্মৃতি মন থেকে পুরোপুরি মুছে আলাদা করতে চায় তবে প্রায় বারো ঘন্টার মত সময় লাগে। আপনি যেহেতু ৫ বছর ধরে চিনেন মিস রিমিকে তাই হিসাব মত তিন ঘন্টার মত সময় লাগবে সর্বোচ্চ। ইমোশনাল এটাচমেন্ট বেশি হয়ে আরেকটু বেশি সময় লাগে!
আমি চুপ করে রইলাম। আর শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম রিমির কথা। আসলেই এটাই বুঝি রিমিকে নিয়ে আমার শেষ ভাবনা। ওকে এক সময়ে কত কিছুই না ভাবতাম! কত কথাই না ছিল বলার।
আমার এখনও ওকে প্রথমবারের মত চুমু খাওয়ার কথা মনে আছে! তখন সবে মাত্র আমাদের সম্পর্কটা শুরু হয়েছে। হাত ধরতেই আমাদের অস্বস্তি লাগত। রিক্সা করে যখন এদিক সেদিক ঘুরে বেড়াতাম হাতের উপর হাত পড়তেই কেমন একটা শিহরণ বয়ে যেত পুরো শরীর জুড়ে। সেই সময়ে প্রথম ওকে চুমু খেয়েছিলাম। সেদিন খুব বৃষ্টি হচ্ছিল। রিক্সায় হুড তুলে আমরা কোন মতে বৃষ্টি থেকে বাঁচার চেষ্টা করছিলাম কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হচ্ছিল না। আমরা একে অন্যে আরো কাছে চলে এসেছিলাম। শরীরের খুব কাছে। এক পর্যায়ে রিমির মুখটা আমার মুখের কাছে চলে এল। আমি কিছুতেই নিজেকে ধরে রাখতে পারলাম না। চট করেই ওর গালে একটা চুমু খেয়ে ফেললাম!
রিমি সেদিন প্রবল অবাক হয়েছিল। তীব্র এক লজ্জাবোধ এসে গ্রাস করল ওকে। কিন্তু তারপরেই কপট রাগ করার চেষ্টা করল তবে খুব একটা কাজ হল না। আমি স্পষ্টই বুঝতে পারছিলাম যে ওর এই চুমু খাওয়ার ব্যাপারটা খারাপ লাগে নি। লজ্জামিশ্রিত ভাল লাগা ছেয়ে গেছে ওর মনে। সেদিনের রিমির সেই চেহারা আমার মনে আজও মনে আছে। আমি চোখ বন্ধ করে রিমির সেই চেহারাটা আরেকবার মনে করার চেষ্টা করলাম! সেই লজ্জা সেই হাসি আর সেই অস্বস্তি!
আমার চিন্তায় বাঁধ সাধল সাদা এপ্রোন পরা মেয়েটি।
-তাহলে শুরু করা যাক!
-না। বন্ধ করুন!
আমি মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়ে দেখলাম মেয়েটা কিছুটা অবাক চোখে তাকিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে এমন পর্যায়ে এসে সাধারণত কেউ আর ফিরে যায় না। মেয়েটি আবার বলল, আপনি মেমোটি ইরেজ করতে চান না?
-না। চাই না। বন্ধু করুন। খুলে দিন?
-সত্যি?
-হ্যা।
-দেখুন আপনি যে ফি দিয়েছেন সেটা কিন্তু ফিরে পাবেন না। একই সাথে আবারও যদি এপ্লাই করতে চান তবে কিন্তু এতো সহজে অনুমতি নাও পেতে পারেন! বুঝতে পারছেন কি ব্যাপারটা?
-হ্যা।
-আচ্ছা আপনি একটু ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করে দেখুন।
-আর কোন কিছু ভাবা ভাবি নেই। আমি এটা করতে চাই না। এখনই খুলে ফেলুন !
মেয়েটি আরও কিছু সময় আমার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর আমার মাথা থেকে হেলমেটটা খুলে ফেলতে শুরু করল। আমি আবারও রিমির চিন্তা করতে লাগলাম! রিমিকে আমি ভুলতে চাই না। কিছুতেই চাই না।
দুই
একটা সময় ছিল যখন মানুষ চাইলেও নিজের কষ্টের স্মৃতি মুছে ফেলতে পারত না। সেই স্মৃতি নিয়েই তাকে আজীবন বেঁচে থাকতে হত। প্রেম বিচ্ছেদ, বিবাহ বিচ্ছেন, কোন দূর্ঘটনার ট্রমা, লজ্জাজনজ ঘটনা সব কিছুর স্মৃতি তাকে বহন করতে হত। কিন্তু তারপর বিজ্ঞান এমন এক উন্নতির পর্যায়ে গিয়ে হাজির হয়েছে যে এখন চাইলেই মানুষ সেই স্মৃতি নিজের মন থেকে মুছে ফেলতে পারে।
মস্তিষ্কে একটা মানুষের স্মৃতি কোনো একক ফাইলের মতো জমা থাকে না। হাজারো ঘটনা, গন্ধ, শব্দ, জায়গার সাথে জড়িয়ে থাকে একটা নেটওয়ার্কের মত সৃষ্টি করে। মেমোরি ইরেজ প্রযুক্তিটা পুরো ব্রেন স্ক্যান করে প্যাটার্ন ম্যাচিং-এর মাধ্যমে “সেই নির্দিষ্ট মানুষের সাথে সংযুক্ত সব নিউরাল ট্যাগ” খুঁজে বের করে তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এভাবেই সেই ঘটনা কিংবা সেই মানুষের স্মৃতি মানুষের মন থেকে হারিয়ে যায়।
প্রথম প্রথম একটা দরকারী কিছু মাধ্যমে ব্যবহার করা হত। বিশেষ করে বড় ধরণের দূর্ঘটাণার স্মৃতি মুছতে ব্যবহার করা হত। কিন্তু আস্তে আস্তে যখন প্রযুক্ত আরও আধুনিক হল তখন তখন এই ব্যাপারটা কেবল দূর্ঘটনাজনিত স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ রইলো না। এমন যে কোন স্মৃতি যা মানুষ মনে রাখতে চায়না তার ক্ষেত্রেই এই প্রযুক্তি প্রয়োগ হওয়া শুরু হল।
তাই আমরাও এসেছিলাম এই প্রযুক্তি সাহায্য নিতে। আমরা দুজনকে দুজনের স্মৃতি থেকে পুরোপুরি ভাবে মুছে ফেলতে চাইছিলাম। আমরা এমনটা চাইছিলাম যেন যদি সামনে কোনদিন আমাদের আবার দেখা হয় তবে যেন আমরা এমন একটা ভাব করি বা এমন মনে হয় যেন আমরা কেউ কাউকে চিনি না। আমরা চাইছিলাম না যে আমাদের আবারও সেই পুরানো কষ্টগুলো দেখা দেয় আমাদের মাঝে!
কিন্তু আমি পারলাম না। আমি রিমিকে আমার মন থেকে, আমার মস্তিস্ক থেকে আমি রিমিকে ভুলে যেতে চাই না। সত্যিই চাই না। রিমির সাথে গত দুই বছর খুব বাজে গিয়েছে আমার। প্রেমিক প্রেমিকাদের ভেতরে যত রকমের সমস্যা হতে পারে আমাদের মাঝে সব হয়েছে। এমন কি একবার আমি ওর গালে চড় পর্যন্ত মেরেছিলাম। আমার চোখে সব দোষ রিমির আবার রিমির চোখেসব দোষ আসলে আমার। তবে এই কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে দোষ কেবল ওর একার ছিল না। আমার দোষ ছিল। আমি একটা পর্যায়ে এসে খুব বেশি অসহিষ্ণ হয়ে গিয়েছিলাম।
কিন্তু যখন আমরা আলাদা হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম তখন থেকেই মনের ভেতরে কেবল রিমির দোষগুলো নয় আমাদের এক সাথে কাটানো ভালো সময়গুলোর কথাই কেবল মনে হতে লাগল। আমার মনে হতে লাগল। আমি জানি না যে রিমির কেমন মনে হচ্ছে তবে আমার মনে হচ্ছিল। তবে আমি আবার রিমির সাথে ফেরত যাওয়ার কথা ভাবছিলাম না। কারণ জানি যে আবার যদি আমরা এক হই তবে আবারও আমাদের একই রকম সমস্যা সৃষ্টি হবে।
আমি তাই রিমিকে নিজের মন থেকে না মুছে দিয়েই চলে এলাম। রিমির সাথে আমি আর দেখা করতে যায় নি। যাওয়ার কোন কারণও নেই কারণ রিমি নিশ্চিত ভাবে আমাকে মুছে ফেলেছে। আমাকে সে আর চিনবে না। সে আমার কথা মনে করবে না, আমাকে মনে রাখবে না। আমি তার সামনে যদি দাঁড়াও তার আচরণ হবে অচেনা মানুষের মত। এটা আমাকে কষ্ট দিবে।
রিমির সাথে যদি আমার ছোট বেলা থেকে পরিচয় থাকত তবে মেমোরি ডিলিটের পরবর্তি জীবনে বেশ ঝামেলায় পড়তে হত আমাকে। আমার সাথে রিমির দেখা হয়ে যেত এখানে সেখানে। তবে আশার কথা হচ্ছে রিমি আর আমার পরিচয় হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে। সব থেকে ভাল কথা হচ্ছে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এক না। আমি পাব্লিকে পড়লেও রিমি পড়েছে প্রাইভেটে। আমাদের পরিচয় হয়েছিল শিল্পকলায় নাটক দেখতে গিয়ে। আমার ঠিক পাশের সিটেই রিমি বসেছিল। নাটক দেখায় একপর্যায়ে রিমির হাতের পানির বোতল থেকে আমার শরীরে পানি ফেলে দেয় ও। নিজেই সরি বলে খুব। যখন আমরা নাটক দেখে বের হলাম তখন আরেক দফা সরি বলল। আমি তাকে জানিয়েছিলাম যে কোন ব্যাপারটা। এই রকম ঝামেলা হতেই পারে।
পরের সপ্তাহে রিমির সাথে আমার আবারও দেখা হল। সেদিনও আমরা নাটক দেখতেই গিয়েছিলাম। বেইলি রোডের মহিলাসমিতি অডিটোরিয়ামে ছিল নাটকটা। নাটক দেখার পরে দেখলাম রিমি নিজেই এগিয়ে এল আমার দিকে। সেখান থেকেই আমাদের কথাবার্তা শুরু। এরপর আমরা মাঝে মাঝে এক সাথে নাটক দেখতে শুরু করলাম। তারপর সেখান থেকে মুভি ঘোরাঘুরি এবং ট্যুরে যাওয়া। আমাদের সম্পর্কটা এগিয়ে যেতে শুরু করল দ্রুত। এক সময়ে সেটা ভালোবাসায় রূপ নিল।
প্রথম দুই বছর আমাদের বেশ সুন্দর দিন কেটেছে। সব কিছু স্বপ্নের মত ছিল। তৃতীয় বছরটা একটু একটু ঝামেলা শুরু হতে শুরু করল। ততদিনে আমি পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢুকে পড়েছি। ছাত্রজীবন থেকে চাকরি জীবনে প্রবেশ করলে অনেক কিছুই পরিবর্তন হতে শুরু করে। এই পরিবর্তনই ঝামেলা শুরু করতে লাগল। আগের মত আর দেখা সাক্ষাত হত না, আগের মত আর এনার্জিও থাকত না। এক পর্যায়ে আমাদের মাঝে ঝগড়া হতে লাগল। বেশ ভাল পরিমানের ঝগড়া। অফিস থেকে ফিরে এসে কে বা প্রতিদিন ঝগড়া করতে পছন্দ করে? অথবা ছুটির দিনে ঘুরতে গিয়ে কথা কাটাকাটি হয়ে পুরো ছুটিটাই মাটি করতে কে চায় ! এই ভাবে চলল আরো দুইটা বছর। তারপরই আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমাদের আর আসলে এক সাথে থাকার কোন মানে নেই। আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া ভাল এবং এই ক্ষত যেন আমাদের পরবর্তী জীবনে প্রভাব না ফেলে তাই আমাদের এক সাথে থাকার স্মৃতি মুছে ফেলাই সব থেকে বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
তিন
ব্রেকআপের পর সত্যি বলতে কী জীবন বেশ ভালই কাটতে লাগল। সারাদিন কাজ কর্ম করে বাসায় আসার পর খেয়ে দেয়ে শান্তিতে ঘুম দিতে লাগলাম। ছুটির দিনগুলোতে অবশ্য একটু মন খারপা হত। কাজের মধ্য ব্যস্ত থাকলে আমার এতোটা খারাপ লাগত না। সারাদিন ব্যস্ত থাকলে রিমির কথা মন মনে পড়ত কিন্তু যখন ছুটির দিনগুলোতে যখন কিছু করার থাকত না তখন রিমির কথা মনে পড়ত। মাঝে মাঝে ভাবতাম সেদিন যদি কাজটা করে ফেলতাম তবে আজকে এমন করে রিমির কথা আমার মনে হত না।
তবে সেই সাথে আরেকটা কাজও আমি মাঝে মাঝে করতাম। সেটা হচ্ছে রিমিকে স্টক করা। ওর প্রোফাইল নিয়মিত ভাবে আমি ভিজিট করতাম। সেখানে আমার কোন ছবি ছিল না। রিমি মেমোরি ডিলিট সেন্টারে যাওয়ার আগেই সব ছবি ডিলিট করে দিয়েছিল। আমিও তাই করেছিলাম। এছাড়া ফোনে থাকা সব ছবিও ডিলিট করেছিল সম্ভবত। এমনটা করা স্বাভাবিক। নয়তো মেমোরি ডিলিট করার পরে দেখা গেল নিজের ফোনে আমার সাথে ছবি পেয়ে অবাক হবে, এই ছেলেটা কে সেটা ভাববে। এছাড়া আমরা একে ওন্যকে নিজেদের ফ্রেন্ডলিস্ট থেকেও রিমুভ করে দিয়েছিলাম। সকল চ্যাট হিস্ট্রিও ডিলিট করে দিয়েছিলাম। এছাড়া এমন সব কমন জায়গা যা আমাদেরকে এক করেছিল সেসব জায়গা থেকে আমরা আলাদা হয়ে গিয়েছিলাম। তারপরেও আমি নিয়মিত ওর প্রোফাইলে যেতাম। ওকে দেখতাম। ও কী করছে বা কী ছবি পোস্ট করছে সেটা দেখতে ভাল লাগত।
মাঝে মাঝে আমি ওর অফিসের সামনে গিয়ে হাজির হতাম। অফিস থেকে বের হয়ে কিছুটা সময় ওর পিছু নিতাম। তবে বেশি সময় ধরে না। হয়তো সে কিছু সন্দেহ করতে পারে তাই খুব কম যেতাম। এভাবেই দিন কাটতে লাগল আমার। রিমি কতই না আনন্দে আছে।
তবে একদিন আবারও আমাদের মুখোমুখো দেখা হয়ে গেল। এবং সেদিনই আমার মনে একটা অদ্ভুত সন্দেহ বাসা বাঁধল। আমাদের দেখা হল সেই একই জায়গাতে যেখানে আমাদের প্রথম দেখা হয়েছিল। ন্যাশনাল থিয়েটারের সামনে। আমি টিকেট কেটে হলের দিকে পা বাঁড়াতেই দেখতে পেলাম রিমি দাঁড়িয়ে আছে। সেও আজকে নাটক দেখতে এসেছে।
আসাটা স্বাভাবিক। সে আগে থেকেই তো নাটক দেখত তাই এখানে আসতেই পারে। তবে আমাদের যখন চোখাচোখি হল তখন আমার কেন জানি মনে হল রিমি আমাকে চিনতে পেরেছে। এমনটা মনে হওয়ার পেছনে কী কারণ থাকতে পারে আমার জানা নেই। তবে মনে হল কেবল!
সম্ভবত এমন হতে পারে আমার চেহারার কিছু ফ্ল্যাশ মেমরি এখনও রিমির মনে রয়ে গেছে। এই কারণেই এমন হচ্ছে। অর চোখে আমি সেই পরিচিত ভাবটা দেখেছি। আর মন থেকে তো মেমোরি একেবারে মুছে ফেলার কোন উপায় নেই। প্রযুক্তি কেবল সেই মানুষের স্মৃতি ট্যাগ খুঁজে বের করে তাদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। স্মৃতির স্থানে স্মৃতিই থাকে। এই কারণেই সম্ভবত এমনটা হয়েছে।
আমি মনযোগ দিয়ে নাটক দেখতে পারলাম না। বারবার চোখ আমার রিমির দিকে চলে যাচ্ছিল। আমি শেষ পর্যন্ত নাটক পুরোটুকু শেষ না করে বের হয়ে এলাম। আর মনে মনে ঠিক করলাম যে আর নাটক দেখতে আমি যাবো না বা এমন কোন জায়গাতে আমি যাবো না যেখানে রিমির সাথে আমার দেখা হতে পারে!
কিন্তু শেষ রক্ষা হল না। আমি যখন হল থেকে বের সিড়ি দিয়ে নামতে যাবো তখনই পেছন থেকে একটা ডাক শুনতে পেলাম! আমার নাম ধরে যদিও ডাকা হয় নি তবে আমার ডাকটা চিনতে মোটেও কষ্ট হল না।
-এক্সকিউজ মি ! শুনছেন?
আমি স্থির হয়ে গেলাম। রিমি আমাকে ডাকছে!
আমি না দাঁড়িয়ে পারলাম না। রিমি আমার সামনে এসে দাঁড়াল। তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আপনাকে কি আমি চিনি? মানে চেহারাটা এমন পরিচিত কেন মনে হচ্ছে বলেন তো?
আমার এখন কী বলা উচিৎ? আমি জানি না। আমি একটু অস্বস্তি নিয়ে বললাম, আপনি হয়তো আমার মত কাউকে চিনেন বা চিনতেন। তার সাথে আমাকে গুলিয়ে ফেলছেন!
রিমি কিছুটা সময় বিভ্রান্ত চোখে আমার দিকে তাকিয়ে রইলো। আমাকে যেন চেনার চেষ্টা করছে সে।
রিমি বলল, আপনি সত্যি আমাকে চিনেন না?
আমি মাথা নাড়ালাম। রিমি এবার নিজের ফোন বের করে একটা ছবি দেখাল। আমি চমকে উঠলাম। ছবিটা আমার আর রিমির। এই নাট্যশালাতেই তোলা! আমাদের দুই নম্বর ডেটে আমর এখানেই এসেছিলাম নাটক দেখতে। সেদিন রিমি তুলেছিল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। তবে কি রিমির কাছে এই ছবিটা রয়ে গেছে!
আমি রিমির চোখের দিকে আবার তাকালাম। তবে এইবার রিমির চেহারায় ভাব অনেকটাই বদলে গেছে। ওর চোখে একটা পরিচিত ভাব ফুটে উঠেছে। এরপর রিমি যা বলল তাতে আমি আকাশ থেকে পড়লাম! রিমি বলল, মেমোরি ডিলেট না করেই দেখছি আমাকে ভুলে গেছো!
আমি মুখ হা করে কিছু সময় তাকিয়ে রইলাম। কোন মতে বললাম, মানে?
আমি আমার নিজের কানকে যেন বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। মানে হচ্ছে রিমি নিজেও আমাকে মুছে দেয় নি? সত্যি কি?
রিমি আমার চোখের বস্ময় ভাব দেখে বলল, হ্যা আমিও পারি নি। তোমার সব কিছু আমি মুছে ফেলতে পারি নি। ভেবেছিলাম তুমি মুছে দিয়ে চলে গেছ। আমার কাছ থেকে মুক্তি তো তুমিই চেয়েছিলে!
-শুধু আমি মুক্তি চেয়েছিলাম? তুমি ……
আমি বলতে গিয়েও আমার থেমে গেলাম। এখন এসবের সময় নয়। রিমি আবার বলল, আমি ভেবেছিলাম তোমার জীবন থেকে আমি বোধহয় মুছেই গেছি। মাঝে মাঝে তোমার প্রোফাইলে যেতাম। তারপর ঘুরে চলে আসতাম। তারপর একদিন একটা লিংক এল সামনে। কে কে ফেসবুক প্রোফাইল ভিজিট করছে সেটা দেখার লিংক। কী যেন মনে হল কৌতুহল থেকে লিংকে গিয়ে সাইনআপ করলাম। এবং যে নামগুলো আমি দেখলাম সেটাতে আমি অবাক হয়ে গেলাম। তোমার প্রোফাইল দেখাচ্ছে সেখানে। এভাবে পরপর সাতদিন দেখেছি, প্রতিদিন তুমি আমার প্রোফাইলে এসেছে। কিন্তু সপ্তাহ খানেক আগে যখন অফিসের বাইরে তোমাকে দেখতে পেলাম তখন আমি মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গেলাম যে আমার মত তুমি নিজেও আমাকে মুছে ফেলো নি। তাই না?
আমি কিছু বলতে পারলাম না। বুকের ভেতরে অদ্ভুত একটা আনন্দময় অনুভূতি হচ্ছিল। এই অনুভূতির কোন তুলনা নেই। আমি কিছু বলতে যাব তার আগেই রিমি আমাকে জড়িয়ে ধরল। নাটক এখনও চলছে তাই এখন এই দিকতা ফাঁকা। নয়তো দুই নারীপুরুষ একে অন্যকে জড়িয়ে ধরে আছে এই দৃশ্য এই দেশে মোটেই ভালো চোখে দেখা হত না।
পরিশিষ্ট
বলাই বাহুল্য এরপর কী হল আর আলাদা ভাবে বলে দেওয়া লাগবে না। আমরা আবারও এক সাথে হয়ে গেলাম। আবারও আমাদের মাঝে ঝগড়া শুরু হল। তবে এইবার আমরা দুজনেই এই একটা একটা ব্যাপার ঠিকই মনে রাখলাম যে যেকোন মূল্যেই আমরা দুজন দুজনকে ভুলে যেতে চাই না। আমরা চাই না আমরা দুজন থেকে আলাদা হয়ে যাই। এইটা মনে হতেই আমরা আবার এক হয়ে যেতাম! বাসায় কথা বার্তা চলছে এবং খুব জলদি আমরা বিয়েও করে ফেলব।
হয়তো সামনের জীবনে আবারও এমন সময় আসবে যখন আমরা আবারও আলাদা হয়ে যেতে চাইব তবে আমরা ঠিক করেছি যে আমাদের স্মৃতি কিছুতেই মুছে ফেলব না। আমরা আমাদের মনে রাখব। আমরা আমাদের খারাপ স্মৃতিগুলো ভুলে একত্রে কাটানো আনন্দময় স্মৃতিগুলো মনে রাখব।
ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।
অপু তানভীরের দুটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।
Discover more from অপু তানভীর
Subscribe to get the latest posts sent to your email.

গল্পের ভেতরে যে টানাপোড়েন আর ভালোবাসার উষ্ণতা ছিল, তা একদম মন ছুঁয়ে গেছে। এমন সুন্দর একটি উপহারের জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।
অনেক দিন পর আপনাকে ব্লগে দেখা গেল!
অসুস্থতা মাঝে মাঝে কাবু করে ফেলে। তখন চাইলেও পিসিতে বসা হয় না। তবে গল্পগুলো নিয়মিতই পড়েছি, প্রতিটা গল্পই তাদের নিজেদের মতোই ভালো লেগেছে।
এখন সুস্থ আছেন তো? সুস্থ থাকাই সব থেকে বড় কথা! ভাল ও সুস্থ থাকুন এই কামনা করি ।