আমাদের অপূর্ণ গল্পগুলো

4.5
(21)

দুপুরের খাওয়ার সময়ে নাইরার আচরণ আমার কাছে একটু অবাকই লাগল। নাইরার আসলেই বাইরের জগত সম্পর্কে কোন চিন্তাই নেই। সে এখানে যেন একেবারে আলাদা একটা জগতে বসবাস করছে। এই সময়ে নাইরাকে নিয়ে বাইরে যে কত আলোচনা হয়েছে সেটা নিয়ে নাইরাকে একবারও প্রশ্ন করতে দেখলাম না।
আমি পুরো বাড়িটা একবার ঘুরে দেখলাম। দুইতলা ছোট একটা বাসা। নিচতলাটা ছাদ দেওয়া হলেও উপরতলায় টিন দেওয়া। নাইরা জানালো যে বৃষ্টির আওয়াজ শোনার জন্যই উপরে ছাদ না দিয়ে টিন দেওয়া হয়েছে। নিচ তলে এবং উপর তলা দুই তলায় নাইরার শোবার ঘর আছে। যখন যেখানে ইচ্ছে। লাইব্রেরী নিচ তলাতেই। সেখানে কম করে হলেও হাজার দুয়েক বই আছে।
বিকেলের দিকে আবার যখন আমরা পুকুর পাড়ে বসে বসে গল্প করছিলাম তখন আরেকজন লোক এসে হাজির হল বাসায়। মাঝ বয়সী লোকটাকে দেখে নাইরা খুব একটা খুশি হল বলে মনে হল না। সম্ভবত সে বিনা দাওয়াতেই এখানে এসে হাজির হয়েছে। আমাকে দেখে লোকটা একটু যেন অবাকই হয়েছে। নাইরা লোকটার দিকে তাকিয়ে বলল, কী ব্যাপার মিন্টু ভাই, আপনি হঠাৎ এখানে?
-স্যার আপনার খোজ নিতে পাঠাল?
-আমি তো বলেছি যে আপনার স্যারের মুভি আমি করব না, বলি নি?
-স্যার আপনাকে সরি বলেছন। ঐদিনের আচরণের জন্য স্যার সরি বলেছেন।
-সরি বলেছেন তাও অন্যকে দিয়ে?
আমি নাইরার কন্ঠে এক ধরণের উপহার শুনতে পেলাম। নাইরা আমার দিকে একবার তাকিয়ে তারপর আবারও মিন্টু নামের লোকটার দিকে তাকাল। তারপর বলল, আপনার স্যারকে এখানে আসতে বলেন। আমার সামনে হাটু গেড়ে বসে যদি মাফ চাইতে পারে তবেই তাকে ক্ষমা করব এবং মুভিতে অভিনয় করার কথা ভাবব। এর আগে না। নয়তো অন্য কাউকে নেওয়ার চিন্তা করেন।
আমি দেখলাম লোকটা একটু অসহায়েরমত আমাদের দিকে একটু তাকিয়ে রইলো। তারপর যখন বুঝতে পারল যে নাইরা মোটেও ঠোট্টা করছে তখন সে ঘুরে হাটা দিল। আমি দেখত পেলাম সে পকেট থেকে ফোন বের করে কাউকে যেন ফোন করছে। আমি সেদিকে তাকিয়ে থেকে বললাম, এই লোকটা কেন?
নাইরা কিছুটা তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে বলল, ওটা সায়েব রহমানের পিএস।
নামটা আমার কাছে কিছুটা পরিচিত মনে হল। তবে তখনো আমি নিশ্চিত ছিলাম না। আমি বললাম, কোন সায়েব রহমান?
রকটেল গ্রুপের মালিকের ছেলে। বর্তমান এমডি সে।
সাথে সাথে আমি সায়েব রহমানকে চিনে ফেললাম। আমার চোখের অবাক হওয়ার ভাবটা দেখে নাইরা যেন মজা পেল। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, কেন তাকে আর আমাকে নিয়ে জড়িয়ে স্ক্যান্ডেল শোনো নি তুমি?
-না তো!
নাইরা যেন আমার কথায় একটু কষ্ট পেল। তারপর বলল, তার মানে আমাকে পুরোপুরি জীবন থেকে বাদই দিয়ে দিয়েছো!
আমি এই প্রশ্নের জবাবে আসলে কী বলব সেটা খুজে পেলাম না। বললাম, আসলে বাদ না। বুকসেলফের মাঝখানে আমরা সাধারণ সেই সব বইগুলো রাখি যেগুলো আমরা নিয়মিত পড়ি। যে বইগুলো আমাদের পড়া হয় না সেগুলো ধীরে ধীরে সেলফের এক কোণায় চলে যায়। তোমার স্মৃতিগুলোও ঠিক একই ভাবে এক পাশে সরে গেছে। জীবন বাবুর সেই কবিতা পড় নি? কে হায় হৃদয় খুড়ে বেদানা জাগাতে ভালোবাসে!
আমার এই কথা শুনে নাইরা আমার দিকে কেমন চোখে তাকিয়ে রইলো কিছু সময়। আমার মনে হল সে বুঝি সত্যিই আমাকে হারিয়ে কষ্টে আছে! সত্যিই কি আছে? চাইলেই কি এতো দিনে সে আমার কাছে ফিরে আসতে পারত না?
আমি নাইরার আচরণের কোন আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। সে হঠাৎ করে এমন আচরণ কেন করছে?

বিকেলটা আমাদের বেশ ভাল ভাবেই কাটল। আমরা দুজন গ্রামের রাস্তায় হাটতে বের হলাম। ওর বাসাটা একেবারে গ্রামের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। সাইরার এই বাড়ি পর্যন্ত একটা গাড়ি চলা রাস্তা রয়েছে। তবে সেটা গ্রামের ঢোকার মূল রাস্তা না। গ্রামের রাস্তা অন্য দিক দিয়ে। সাইরা নিজের জন্য এই রাস্তা আলাদা ভাবে তৈরি করে নিয়েছে। বাড়ির পেছন দিকে বেশ কয়েকটা পুকুর রয়েছে। তারপর গ্রামের এলাকা শুরু। একটা সরু রাস্তা চলে গেছে গ্রামের দিকে।। রাস্তার দুই ধারে ধানের ক্ষেত। আমরা সেই ধানক্ষেতের মাঝ দিয়েই অনেকটা পথ হেটে গেলাম।
আমার কাছে সব কিছু কেমন স্বপ্নের মত মনে হচ্ছিল। আমি এইভাবে আবারও নাইরার সাথে কথা বলছি, হেটে বেড়াচ্ছি, নাইরার এমন আচরণ করা সব কিছুই আমার কাছে একটু অদ্ভুতই মনে হচ্ছে। এতোদিন পরে নাইরা কেন আবার এমন আচরণ করছে?
কারণটা আমি টের পেলাম একটু পরেই। নাইরা নিজেই আমার কাছে সেটা স্বীকার করল। আমরা হাটতে হাটতে গিয়ে একটা আইলের পাশে বসলাম। কিছু সময় চুপ করে থেকে নাইরা নিজেই শুরু করল।
-তোমার অবাক লাগছে তাই না?
-কোন ব্যাপারটা?
-এই এতো গুলো বছর পরে তোমার সাথে আমার আবার দেখা হওয়া তারপর আমার আবারও এই রকম আচরণ?
-সত্যি বলতে কি, একটু যে অবাক লাগছে না সেতা আমি বলব না।
-তোমার আমার উপরে রাগ লাগে না? ঘৃণা হয় না আমাকে?
-রাগ? ঘৃণা? কেন?
-এই যে তোমার সাথে আমি সেই সময়ে ঐ রকম আচরণ করেছিলাম?
আমি কিছু সময় ব্যাপারটা নিয়ে একটু ভাবলাম। তারপর বললাম, রাগ বা ঘৃণা না। আসলে তুমি তো সত্যিই বলেছিলে। আমাদের জগত আলাদা হয়ে গেছে। সেই হিসাবে এক সাথে যদি আমরা থাকতাম তাহলেই বরং সমস্যা হত বেশি।
নাইরা আমার উত্তর শুনে অবাক হল না। সে যেন জানতোই যে আমি ঠিক এই কথাই বলব। সে বলল, কাউকে ভালোবাসা মানে কি কেবল আরামে আর ঝামেলাহীন থাকা? একসাথে স্ট্রাগল করা মানেই কি ভালোবাসা নয়? যদি কারো সাথে ভালো থাকব না বলে তার হাতটা ছেড়ে দিবো?

আমি বলতে চাইলাম যে এই সব কথা কেবল গল্প উপন্যাসেই ভাল শোনায়। কিন্তু বাস্তবে মানুষ ভাল থাকতে চায়। ভাল থাকাই তার কাছে সব থেকে বড় ব্যাপার। এর থেকে বড় আর কিছু নেই। এই কারণেই আমাদের আলাদা হয়ে যাওয়া। নাইরা যেন আমার মনের কথাই টের পেল। সে বলল, হ্যা জানি, কথাটা গল্প উপন্যাসের মত শোনাচ্ছে তবে আমি এই এতোটা সময় পার করে বুঝেছি যে আমি জীবনের সব কিছুর বিনিময়েও তোমার সাথেই থাকতেই চাই। এই উপলব্ধিটা আমি প্রতিনিয়তি বুঝতে পেরেছি। তারপর ……
আমি বললাম, তারপর?
-তারপর আমি যখন ঐদিন তোমাকে ঐ মেয়েটার সাথে দেখলাম! মেয়েটা এমন একটা অভিনয় করল আমি সেদিন আর নিজেকে ধরে রাখতে পারি নি। সত্যি আমি তোমার পাশে অন্য কাউকে সহ্য করতে পারছিলাম না। আমি সত্যিই পারছিলাম না।
নাইরা বেশ কিছু সময় চুপ করে রইলো। আমি জানতে চাইলাম, যদি সেদিন মৌমিতা ওমন না করতো তবে কি তোমার কিছু মনে হত?
নাইরা সাথে সাথেই জবাব দিল না। তবে এক সময় সে স্বিকার করে নিল। সে বলল, তখন হয়তো আমি কিছু মনে করতাম না। হয়তো তুমি এখানেও থাকতে না।
রাতের খাওয়ার পরে আরও কিছুটা সময় আমরা পুকুর পাড়ে বসে রইলাম। ফুরফুরে বাতাসে নাইরার পাশে বসে থাকাটা আমার কাছে সত্যি অবিশ্বাস্যই মনে হচ্ছিল বটে।
রাতের বেলাঘুমানোর সময় নাইরা খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার সাথেই ঘুমাতে এল। আমাদের সেই অতীতের সম্পর্কের সময়ে আমাদের মাঝে কয়েকবার ঘনিষ্ঠতা হয়েছিল। একবার নাইরা আমার সাথে লুকিয়ে কক্সবাজার গিয়েছিল। সেইবারই মূলত আমরা দুজনে কাছাকছি চলে এসেছিলাম। আজকের সেই সময়ের কথাই মনে পড়ল। সেই একই আদিমতায় আমরা আবার একে অন্যকে ভালোবাসতে শুরু করলাম।

আরো দুটোদিন আমরা নাইরার বাগানবাড়িতেই রয়ে গেলাম। তারপর আবারও ঢাকাতে ফেরত গেলাম নিজ নিজ কাজের ক্ষেত্রে। বলাই বাহুল্য আমাদের মাঝে আবারও সেই আগের সম্পর্ক চালু হয়ে গেল। নাইরা ফিরে আসার সময়ে আমাকে বলেছিল যে এইবার সে এক সাথে থাকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে। আগেরবারের মত চেষ্টা না করেই সব ছেড়ে দিবে না। তার কাছে এখন এই সম্পর্কটাই সব থেকে বেশি প্রায়োরিটি পাবে।
নাইরা যে মিথ্যা বলছিল না সেটা আমি টের পেলাম দিন দুয়েক পড়ে। একদিন হঠাৎ করেই আমার ডাক পড়ল এমডির রুমে। আমি একটু অবাক না হয়ে পাড়লাম না। আমার দৌড় সর্বোচ্চ আমাদের ডিপার্টমেন্ট হেডের কেবিন পর্যন্ত। এর বাইরে আমাকে যেতে হয় না। আমার মাথার উপরে সুপারভাইজার আছে। সেই সব সামলে নেয়। আজকে আমাকে একেবারে সরাসরি এমডির রুমে ডাক দিলো কেন!
আমি একটু ভয়ে ভয়ে রুমে গিয়ে হাজির হলাম। রুমে গিয়ে হাজির হতেই বুঝতে পারলাম যে আমাদের এমডি সাহেব আমাকে নিজের জন্য ডাক দেয় নি। সে অন্য একজনের জন্য আমাকে ডেকে এনেছে। সেই একজনটা হচ্ছে সায়েব রহমান। রকটেল গ্রুপের এমডি। আমি এই মানুষটাকে কয়েকবার দেখেছি দূর থেকে। আজকে একেবারে সরাসরি আমার জন্য এই লোক এসে হাজির হয়েছে। এবং কেন হাজির হয়েছে সেতাও আমার বুঝতে কষ্ট হল না। এই লোকের পিএস সেদিন নাইরার বাগান বাড়িতে হাজির হয়েছিল।

আমি সায়েব রহমানের সামনে গিয়ে বসলাম। সে আমাকে কিছু সময় পর্যবেক্ষণ করল। আমাকে কিছুর সাথে মেলানোর চেষ্টা করছে যেন। ইতিমধ্যে আমাকে আর আর নাইরাকে নিয়ে পত্রিকাতে বেশ কয়েকটা খবর প্রকাশ পেয়েছে। আমার দিকে তাকিয়ে থেকে সায়েব রহমান বললেন, তোমাকে কেন ডেকেছি সেতা নিশ্চয়ই অনুমান করতে পারছো?
আমি একটু মাথা নাড়লাম। আমি খুব ভাল করেই অনুমান করতে পারছি।
তিনি বললেন, নাইরার সাথে পরিচয় তাহলে সেই কলেজ জীবন থেকে?
আমি বললাম, জী তারও আগে। ও যখন স্কুলে পড়ত তখন আমাদের এলাকাতে এসে থাকতে শুরু করে। তখন থেকেই ওকে চিনি। তারপর আমাদের মাঝে পরিচয় হয় আরেকটু পরে।
-মাঝে কিছু দিন যোগাযোগ ছিল না?
-হ্যা। কয়েক বছর আগে ওরা বাসা বদলে গুলশানে বাসা নেয়। তারপর থেকেই…
-এখন আবার যোগাযোগ শুরু হয়েছে?
এই প্রশ্নটা সায়েব রহমান এমন ভাবে করলেন যেন আমি আবার তার সাথে প্রেম শুরু করেছি কিনা সেটা জানতে চাইছেন। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে এই লোকটার সাথে নাইরার কিছু ছিল? আসলেই কী?
বড়লোকদের সাথে নাটক সিনেমার নায়িকাদের সম্পর্কে থাকাটা বিচিত্র না। এই লোকেরও কি সেই রকম ছিল ছিল না আছে?
আমি বললাম, আসলে আমি বুঝতে পারছি না আপনি ঠিক কী জানতে চাইছেন?
সায়েব রহমান একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসলেন। তারপর বললেন না মানে আমি আসলে জানতে চাইছি যে তোমার কথা নাইরা শুনবে কিনা!
-হঠাত এই কথা?
-তোমাকে হয়তো সে বলে নি, নাইরার সাথে আমাদের একটা প্রোজেক্ট হওয়ার কথা ছিল। সব কিছু ঠিক ছিল। তারপর হঠাত করেই সে বেঁকে বসে এবং প্রোজেক্ট থেকে নিজেকে সরিয়ে নেয়। আমরা অনেকবারি তার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছি, তাকে প্রায় দ্বিগুণ অর্থ অফার করেছি কিন্তু সে কিছুতেই রাজি হচ্ছে না। অন্য কাউকে কাস্ট করতেই পারি কিন্তু সত্যি বলতে কি নাইরা এটা আর কেউ এটাকে পুরোপুরি ভাবে করতেই পারবে না। বুঝতেই পারছো, ওকে দরকার আমাদের!

আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই আমার সেদিনের নাইরার কথা মনে হল। সেদিন পিএসের কথা মনে হল, ‘স্যার আপনাকে সরি বলেছন। ঐদিনের আচরণের জন্য স্যার সরি বলেছেন’। স্যার মানে হচ্ছে সায়েব রহমান। এই লোক কিছু একটা করেছিলেন যার কারণে নাইরা বেঁকে বসেছে। আমি বললাম, নাইরা এমনি এমনিই বেঁকে বসল? কোনো কারণ ছাড়াই?
আমার এই প্রশ্ন শুনতেই সায়েব রহমানের মুখের ভাবটা একটু পরিবর্তিত হল। সে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আসলে আমাদের মাঝে একটু মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং হয়েছিল এই কারণেই।
-কী মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং?
-সেটা আসলে তোমার না জানলেও চলবে। তোমার কাছে যেটা আমি বলতে এসেছি, তুমি কি একটু নাইরাকে বলবে মুভিতে কাজ করার জন্য। এটা অনেক বড় প্রোজেট। ওর নিজের ক্যারিয়ারেরজন্য খুবই বড় একটা সাফল্য আসবে। বুঝতে পারছো। তোমার জন্যও ভাল হবে। তোমার এমডি কিন্তু আমার খুব ভাল বন্ধু। বুঝতে পারছো!
আমি একভাবে সায়েব রহমানের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। তার চেহারায় একটা অপরাধ লুকানোর ভাব ! আমার কিছু বলার আগে এবার কথা বলল, আমাদের এমডি স্যার। তিনি বলল, সাব্বির দেখো একটু পরে। তোমার কথা শুনবে আশা করি। বুঝতেই পারছো?
-স্যার আমি হয়তো বলতে পারি। কিন্তু আমার কথা সে শুনবে এমন নিশ্চয়তা আমি দিতে পারছি না।
সায়েব রহমান একটু যেন উত্তেজিত হয়ে গেলেন। তিনি বললেন, আরে কেন শুনবে না। অবশ্যই শুনবে! একটু ভাল করে বললেই শুনবে! তুমি বুঝতে পারছো না যে কত বড় প্রোজেক্ট। সে নিজের ক্যারিয়ারের কথা কেন ভাবছে না!
আমি একবার সায়েব রহমানের মুখের দিকে তাকালাম তারপর তাকালাম এমডি স্যারের দিকে। তিনি যেন আমার মনের ভাবটা বুঝতে পারলেন। তিনি সায়েব রহমানকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আচ্চছা সাব্বির বলবে। এতো চিন্তা কর না। আগে বলেই দেখুক!

আমার আর এখানে কোন কাজ নেই। আমি বিদায় নিয়ে রুম থেকে বের হয়ে এলাম। ডেস্কে বসে নাইরাকে একটা টেক্সট করলাম। আজকে দেখা করতে পারবে কিনা সেটা জানতে চাইলাম। সকালে নাইরা আমাকে টেক্সট করে জানিয়েছিল যে শুটিংয়ে যাচ্ছে। তাই মনে হয়েছিল টেক্সটের উত্তর পরে আসবে। তবে আমাকে অবাক করে দিয়েই সরাসরি ফোন এসে হাজির হল। আমি রিসিভ করলেই নাইরা বলল, দেখা করতে চাও? রাতে?
-হ্যা যদি সম্ভব হয়?
-এখন দেখা করতে পারবে?
-এখন?
-হ্যা। আমি ঠিক তোমার অফিসের সামনে। একটু আগেই কাজ শেষ হয়ে গেল কাজ। বাসার দিকে না গিয়ে মনে হল তোমাকে একটু দেখে যাই। এই যে তোমার অফিসের লিফটে উঠছি।
আমি একটু অবাক হলাম। এবং সাথে সাথেই মনে হল যে কিছু একটা ঝামেলা হবে। কারণ সায়েব রহমান অফিসে আছে। আমি নাইরাকে বলতে চাইলাম যে সায়েব রহমান নামের মানুষটা এখন অফিসে আছে। কিন্তু সেটা বলা র আগেই নাইরা ফোন কেটে দিল।
আমি দ্রুত ডেস্ক থেকে বের হয়ে অফিসের লিফটের দিকে হাজির হলাম। আমার মূল লক্ষ্য হচ্ছে নাইরা দ্রুত নিজের ডেস্কে নিয়ে যাবে যাতে ওদের দেখা না হয়। তবে শেষ রক্ষা হল না।
নাইরা যখন অফিসের রিসেপশনে এল ঠিক এই সময়েই সায়েব রহমান বাইরে বের হচ্ছিল। ওদের দেখা হয়ে গেল। আমার আসলে কিছুই করার ছিল না। নাইরা কিছু সময় সায়েব রহমানের দিকে তাকিয়ে । আমি দেখতে পেলাম নাইরার মুখ শক্ত হয়ে গেল মুহুর্তেই। সে আমার দিকে একবার তাকাল।
আমি কিছু বলতে যাবো তার আগেই দেখলাম, সায়েব রহমান বলল, আরে নাইরা যে! তোমার বন্ধুর সাথে একটু আগেই কথা হল। তোমার সাথে এতো জলদি দেখা হবে ভাবি নি।
নাইরা আবারও আমার দিকে তাকাল। তারপর সায়েব রহমানের দিকে তাকিয়ে বলল, আমি ভাবি নি যে আপনার সাথে দেখা হবে এখানে! তবে এখানে আপনার সাথে দেখা করতে আসি নি।
সায়েব রহমান খুব ক্যাজুয়ালি নাইরার এগিয়ে গেল। তারপর বলল, দেখা যখন হয়েই গেল তখন আসো একটু কথা বলা যাক। আমাদের আপকামিং প্রোজেক্ট নিয়ে কথাটা এখানেই সেরে ফেলি!
এই বলে সে নাইরার কাধে হাত দিতে গেল। আমি কেন জানি ঠিক এই সময়ে দুজনের মাঝে এসে দাঁড়ালাম। অনেকটা দেয়ালের মত। আমার এই আচরণ দেখে সায়েব রহমান একটু যেন অবাক হল, একটু বিরক্তও হল। আমি বললাম, আপনার পিএসকে বলা হয়েছিল তো এই ব্যাপারে! আপনি শোনেন নি?
-হোয়াট?
আমি বললাম, আপনার পিএস আপনাকে বলে নি? ওর সাথে কাজ করতে হলে কী করতে হবে?
আমি দেখতে পেলাম মুহুর্তের ভেতরে সায়েব রহমানের মুখের ভাব বদলে গেল। সেখানে একটা হিংস্র ভাব ফুটে উঠল। সে আমার দিকে তাকিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, তুমি জানো এই জন্য তোমার কী অবস্থা হতে পারে?
-জানি।
নাইরা বলল, আপনার পিএস আপনাকে সত্যিই বলে নি? আমি বলব আবার?
এবার যেন সায়েব রহমান নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ হারালেন কিছুটা। তিনি বললেন, তুমি তোমার লিমিট ক্রস করো না। তোমার ক্যারিয়ান কিন্তু শেষ করে দিব!
এই কথা শুনে নাইরা যেন খুব মজা পেল। সে বলল, ওইদিন কী কথা বলেছিলেন আমার কাছে কিন্তু সব রেকর্ডিং আছে। শুনতে চান?
এবার দেখলাম সায়েব রহমানের মুখের ভাবটা আবারও বদলে গেল। সেখানে কিছুটা দ্বিধা আর ভয় এসে জড় হয়েছে। নাইরা আবার বলল, আর ক্যারিয়ারের ভয় দেখাচ্ছেন! ক্যারিয়ারের গুল্লি মারি। অনেক আগেই সিদ্ধান্ত নিয়েছি যে আর কোন নতুন প্রোজেক্টে কাজ করব না। আপনাদের মত মানুষগুলোর আসে পাশে আর থাকব না। বুঝতে পেরেছেন?

এই বলে সে তাকাল আমার দিকে। তারপর বলল, তোমার কেবিন কোন দিকে?
আমি হাত দিয়ে দেখালাম। নাইরা সেদিকে হাটা দিল। আমি তার পেছন পেছন হাটা দিলাম। সায়েব রহমানকে দেখবেন সেখানেই কিছু সময় বিমুঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।

আমার মনে একটা ভয় ছিল যে আমাদের এমডি স্যার হয়তো আমাকে এই ব্যাপারটার জন্য বকা দিবে কিংবা আমাকে চাকরি থেকে বের করে দিতে পারে তবে তেমন কিছুই হল না। নাইরা যখন আমার সামনে বসে কথা বলছিল তখন আমাদের অফিসের অনেকেই এসে নাইরার সাথে ছবি তুলছিল। এক সময় আমাদের আবারও এমডি স্যারের রুমে ডাক পড়ল। আমি ভেবেছিলাম যে সায়েব রহমান বুঝি থাকবে। তবে সেখানে কেবল এমডি স্যারই ছিলেন। তিনি নাইরার সাথে হাসি মুখে কথা বললেন। আমাদের সাথে যে কাজটা নাইরা করেছে সেটার জন্য ধন্যবাদ দিলেন। বললেন সামনের আরো কয়েকটা বিজ্ঞাপনের জন্য নাইরে চাই। নাইরা হাসি মুখে হ্যা হ্যা করল। তারপর এমডি স্যার সায়েব রহমানের প্রসঙ্গ তুলল। আমি ভেবেছিলাম যে নাইরা বুঝি রেগে যাবে। তবে সে রাগল না। সে নিজের মোবাওল বের করে একটা কল রেকর্ডিং চালু করল।
রেকডিংটা শুনে আমার নিজের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সায়েব রহমান নাইরাকে অনৈতিক প্রস্তাব দিচ্ছে। আরো বলছে যে যদি রাজি না হয় তবে তার ক্যারিয়ার ঠিকমত চলবে না।
নাইরা বলল, এবার এমন মানুষের হয়ে কাজ করা সম্ভব?
এমডি স্যার কিছুটা লজ্জিত হলেন। তার জানা ছিল না যে এমন কিছু ঘটেছে। তিনি আর এই ব্যাপারে কিছু বলবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করলেন।

পরিশিষ্টঃ
এই ঘটনার ঠিক মাস খানেক পরেই নাইরা সেই কল রেকডিংটা ফাঁস করল। এবং সাথে সাথে সাথে সমালোচনার ঝড় উঠল। বলাই বাহুল্য সায়েব রহমানের সেই প্রোজেক্টটা ক্যান্সেল হয়ে গেল। অনেক মেয়ে আর্টিস্ট ঠিক একই রকম অভিযোগ করে পোস্ট দিতে লাগল। বলা যায় সায়েব রহমানের মুখ দেখানোর উপায় রইলো না। সপ্তাহ খানেক পরেই জানতে পারলাম যে তিনি বিদেশ পালিয়ে গেছেন!

নাইরা যদিও বলেছিল যে আর নতুন কাজ হাতে নিবে না। কিন্তু আমার অনুরোধে সেই সিদ্ধান্ত থেকে সরে এল। তবে কাজের পরিমান সে ইচ্ছে করে কমিয়ে দিল। আমি অফিস শেষ করে সুযোগ পেলেই তার শুটিং স্পটে এসে হাজির হতাম। একই ভাবে সে আগে ভাগে কাজ শেষ হলেই আমার অফিসে এসে হাজির হত। এই ভাবেই আমার প্রেম আমারও চলতে শুরু করল। আমাদের গল্প এক সময়ে অপূর্ণ ছিল বটে। এখনো সেটা অপূর্ণ অবস্থাতেই আছে। তবে সেটা পূর্ণতার দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা দুজনেই সেটার জন্য এক সাথে কাজ করে যাওয়ার প্রতিজ্ঞা করেছি। কাউকে ভালোবাসলে সকল পরিস্থিতিতে তার সাথে থাকতে হয়! আমরাও সেই চেষ্টা করে যাচ্ছি।

আগের পর্ব

ফেসবুকের অর্গানিক রিচ কমে যাওয়ার কারনে অনেক পোস্ট সবার হোম পেইজে যাচ্ছে না। সরাসরি গল্পের লিংক পেতে আমার হোয়াটসএপ বা টেলিগ্রামে যুক্ত হতে পারেন। এছাড়া যাদের এসব নেই তারা ফেসবুক ব্রডকাস্ট চ্যানেলেও জয়েন হতে পারেন।

অপু তানভীরের দুটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে

বইটি সংগ্রহ করতে পারেন ওয়েবসাইট বা রকমারী বা ফেসবুকে থেকে।

এছাড়া সকল গল্পের লিস্ট পাবেন সূচিপত্রে। পুরানো আগের গল্প পড়তে পারবেন সামহোয়্যারইন ব্লগ ও ওয়াটপ্যাড থেকে।

How useful was this post?

Click on a star to rate it!

Average rating 4.5 / 5. Vote count: 21

No votes so far! Be the first to rate this post.


Discover more from অপু তানভীর

Subscribe to get the latest posts sent to your email.

About অপু তানভীর

আমি অতি ভাল একজন ছেলে।

View all posts by অপু তানভীর →